
কৃষি ক্ষেত্রে ধান চাষিদের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো ধানের কারেন্ট পোকা বা বাদামি শোষক পোকা। আমাদের গ্রামের সাধারণ চাষিরা প্রায়ই বলে থাকেন—”ধানের জমি যেন হঠাৎ পুড়ে গেছে” কিংবা ” ধানের গাছ ছোপ ছোপ হয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে “। রাতারাতি মাঠের ধান ঝলসিয়ে দেয় বলে একে কারেন্ট পোকা বলা হয়। কৃষি বিজ্ঞানের ভাষায় এটিই হলো ধানের বাদামী গাছফড়িং দমন সংক্রান্ত সমস্যা, আর এর আক্রমণের ফলে ধান গাছ শুকিয়ে যাওয়াকে বলা হয় ধানের হপার বার্ন রোগের প্রতিকার-এর প্রধান ক্ষেত্র। ইংরেজিতে একে BPH বা (Brown Plant Hopper) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ধানের কারেন্ট পোকা দমনে করণীয় ও হপার বার্ন রোগের সঠিক চিকিৎসা আলোচনা করা হল নিচে-
১. কারেন্ট পোকা কী ও এর স্থানীয় নামসমূহ
ধানের এই ক্ষতিকর পোকাটি এলাকাভেদে বিভিন্ন নামে পরিচিত। কোথাও একে বলা হয় Dhaner Current poka, কোথাও বাদামী গাছফড়িং, আবার কোণো কোনো অঞ্চলে শোষক পোকা, কারেন্ট মাছি বা গুড়ি পোকা নামেও ডাকা হয়।
| চাষ সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট দেখুন | বিস্তারিত |
|---|---|
| অশ্বিন মাসে উন্নত সবজি জাত তালিকা | ক্লিক করুন |
| জৈব কীটনাশক কিভাবে তৈরি করবেন | ক্লিক করুন |
| ধানের মাজরা ও অন্য রোগ পোকা নিয়ন্ত্রণ | ক্লিক করুন |
| ধান বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতি | ক্লিক করুণ |
২. আক্রমণের লক্ষণ ও কখন এটি বেশি দেখা যায়
কখন দেখা যায়: সাধারণত ভাদ্র-আশ্বিন মাসে ধান গাছে থোড় আসার সময় থেকে শুরু করে ধান পাকার আগ পর্যন্ত এই পোকার আক্রমণ সবচেয়ে বেশি হয়। বিশেষ করে আবহাওয়া যদি কুয়াশাচ্ছন্ন, আর্দ্র ও স্যাঁতসেঁতে থাকে।
আক্রমণের লক্ষণ:
- ধান ক্ষেতের মাঝে মাঝে চাকা চাকা বা বৃত্তাকারে ধান গাছ হলুদ হয়ে পচে বা শুকিয়ে যায়।
- পোকা আক্রমণের ৭ দিনের মধ্যে সমস্ত জমি নষ্ট হয়ে যায়।
- ওপর থেকে মনে হবে যেন জমিতে আগুন লেগে ধান পুড়ে গেছে।
- ধান গাছের গোড়া ফাঁক করে দেখলে দেখা যাবে ছোট ছোট অসংখ্য বাদামী রঙের পোকা কাণ্ডের রস চুষে খাচ্ছে।
৩. আক্রমণের মূল কারণ
- ১. জমিতে আলো-বাতাস চলাচলের অবহেলা করে খুব ঘন করে চারা রোপণ করা।
- ২. সুষম সারের তোয়াক্কা না করে অতিরিক্ত মাত্রায় ইউরিয়া সার ব্যবহার করা।
- ৩. ক্ষেতে সবসময় জল জমিয়ে রাখা।
- ৪. পোকার সঠিক জীবনচক্র না বুঝে প্রাথমিক অবস্থায় নজর না দেওয়া।
৪. প্রাক-রোগ সমাধান ও প্রাথমিক সতর্কতা
পোকা আসার আগেই সতর্ক হলে সহজে এই মড়ক এড়ানো সম্ভব:
- চারা রোপণের নিয়ম: চারা রোপণের সময় লাইন থেকে লাইন এবং গোছা থেকে গোছার দূরত্ব সঠিক রাখুন। প্রতি ৮-১০ লাইন পর পর একটি করে ফাঁকা লাইন (লোগো পদ্ধতি) রাখুন, যাতে জমিতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচল করতে পারে।
- নিয়মিত পর্যবেক্ষণ: নিয়মিত জমির ভেতর ঢুকে ধানের গোড়ার দিকে নজর রাখুন।
- আলোক ফাঁদ: প্রয়োজনে রাতে জমির আলে টর্চ জ্বালিয়ে বা হারিকেন/বাল্ব জ্বালিয়ে নিচে পাত্রে সাবান-জল রেখে দিন। আলোক ফাঁদে পোকা আসছে কি না তা দেখে পোকার উপস্থিতি আগেই টের পাওয়া যায়।

৫. জৈব চিকিৎসা ও প্রাকৃতিক নিয়ন্ত্রণ
রাসায়নিক বিষ মুক্ত উপায়ে বা জৈব পদ্ধতিতে কারেন্ট পোকা আটকে রাখা সম্ভব, যদি শুরু থেকেই সচেতন থাকা যায়:
- ইউরিয়া ব্যবহারে সংযম: জমিতে ইউরিয়া কম ব্যবহার করলে এবং নিম খৈল বা জৈব সার দিলে ধানের কারেন্ট পোকা দমনে করণীয় পদক্ষেপগুলো অনেক বেশি কার্যকর হয়।
- জৈব বা প্রাকৃতিক স্প্রে: পোকার আক্রমণ প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলে কিংবা প্রতিরোধ হিসেবে নিমাস্ত্র, অগ্নিঅস্ত্র বা জৈব নিম তেল নিয়মিত দিলে পোকার ডিম ফুটতে পারে না এবং বংশবৃদ্ধি আটকে যায়। পোকা আক্রমণের আগে নিমিত স্প্রে করলে পোকা আসে না এবং অত্যাধিক বিষাক্ত খাদ্য উৎপাদন থেকে নিজেকে ও পরিবারকে দূরে রাখা যায়।
আড়ও জানতে ক্লিক করুন বাড়িতে বসে জৈবকীটনাশক অগ্নিঅস্ত্র তৈরির পদ্ধতি।
৬. রাসায়নিক ওষুধ ও সঠিক মাত্রার তালিকা
বাজার থেকে কীটনাশক কেনার সময় অবশ্যই জেনে নিন তা অন্তর্বাহী (Systemic) পোকা দমনের ওষুধ কি না। ঔষধ ক্রয়ের সময় ঔষধের মেয়াদ এবং রাসায়নিক নাম ও শতাংশ দেখে নিবেন আপনি যেটা চাচ্ছেন সেটা আছে কিনা ? অনেক সময় ভুল রাসায়নিক ও শতাংশ পরিমাণ দেওয়ার কারণে ফসল নষ্ট হয়। স্প্রে করার আগে প্যাকেটের গায়ে লেখা সঠিক ডোজ দেখে নিয়ে সঠিক মাত্রা স্প্রে করুন।
ডিনেটোফুরান (Dinotefuran 20% SG):
- কিভাবে কাজ করে: এটি একটি অন্তর্বাহী ওষুধ। পোকার স্নায়ুতন্ত্র অচল করে সংস্পর্শে আসার বা রস চোষার সাথে সাথেই মেরে ফেলে।
- ব্যবহারের পরিমাণ: প্রতি ড্রাম/ট্যাংকিতে (১৫ লিটার) ৬ গ্রাম। প্রতি একরে ৫০ থেকে৬০ গ্রাম (১৫০-২০০ লিটার জলে)
- ফসল কাটার আগের সময়সীমা (PHI – ২১ দিন): এই কীটনাশক স্প্রে করার পর ধানের ভেতরের বিষাক্ত প্রভাব সম্পূর্ণ কেটে যেতে অন্তত ২১ দিন সময় লাগে, তাই স্প্রে করার পর পরবর্তী ২১ দিনের মধ্যে কোনোভাবেই ধান কাটা বা বিক্রি করা যাবে না; নির্দিষ্ট সময়ের আগে ধান কাটলে চাল ও খড়ে বিষাক্ত রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ থেকে যায় যা মানুষ ও গবাদি পশুর স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
- মৌমাছির ওপর প্রভাব: এটি নিয়োনিকোটিনয়েড গোত্রের হওয়ায় মৌমাছির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
- IPM উপযুক্ততা: ফুল ফোটার সময়ে স্প্রে করা এড়িয়ে চলতে হয়।
পাইমেট্রোজিন (Pymetrozine 50% WDG):
- কিভাবে কাজ করে: স্প্রে করার পর পোকা আর রস চুষতে পারে না এবং মুখ অবশ হয়ে মারা যায়।
- ব্যবহারের পরিমাণ: এটি দানা/পাউডার জাতীয় ওষুধ, তাই প্রতি ১৬ লিটার ট্যাংকিতে ১২-১৫ গ্রাম। প্রতি একরে ১২০ গ্রাম (১৫০-২০০ লিটার জলে গুলে)
- ফসল কাটার আগের সময়সীমা (PHI – ২১ দিন): পাইমেট্রোজিন ৫০% ডাব্লিউজি স্প্রে করার পর ধানের ভেতরের রাসায়নিক বিষক্রিয়া সম্পূর্ণ কেটে যেতে অন্তত ২১ দিন সময় লাগে, তাই স্প্রে করার পরবর্তী ২১ দিনের মধ্যে ধান কাটা বা বিক্রি করা যাবে না; নির্দিষ্ট সময়ের আগে ধান কাটলে চাল ও খড়ে ক্ষতিকর কেমিক্যালের অবশিষ্টাংশ থেকে যায় যা স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করে।
- বন্ধু পোকার ওপর প্রভাব: এটি কিছুটা বিউপ্রোফেজিনের মতোই বন্ধু পোকা ও উপকারী কীটপতঙ্গের জন্য বেশ নিরাপদ।
- IPM উপযুক্ততা: এটি চুষি পোকার খাওয়া সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দেয় কিন্তু মৌমাছি বা মাকড়সার মতো শিকারী পোকার ক্ষতি করে না। তাই এটিও IPM পদ্ধতির জন্য উপযোগী।
পেক্সালোন (Pexalon 10% SC – Corteva Agriscience):
- উপাদান: ট্রাইফ্লুমেজোপাইরিম (Triflumezopyrim 10% SC)।
- কিভাবে কাজ করে: এটি সম্পূর্ণ নতুন প্রজন্মের একটি অতি-কার্যকর অন্তর্বাহী কীটনাশক। পোকা স্প্রে করা ধান গাছে বসামাত্রই তার স্নায়ুতন্ত্র অবশ হয়ে যায় এবং খাওয়া বন্ধ করে দেয়। আক্রমণের যেকোনো পর্যায়ে (ডিম, বাচ্চা ও পূর্ণাঙ্গ পোকা) এটি এক স্প্রেতেই চমৎকার কাজ করে।
- ব্যবহারের পরিমাণ: প্রতি ১৫ লিটারের স্প্রে ড্রামে ৭ মিলি (প্রতি লিটার জলে ০.৪৭ মিলি হিসেবে) এবং প্রতি একরে ৯৪ মিলি (২০০ লিটার জলে গুলে)
- বিশেষ সুবিধা: এটি প্রয়োগ করলে গাছে দীর্ঘদিন (প্রায় ২১ দিন) নতুন করে কারেন্ট পোকার আক্রমণ হয় না।
- ফসল কাটার আগের সময়সীমা (PHI – ২১ দিন): ট্রাইফ্লুমিজোপাইরিম ১০% এসসি স্প্রে করার পর ধানের ভেতরের রাসায়নিক বিষক্রিয়া সম্পূর্ণ কেটে যেতে অন্তত ২১ দিন সময় লাগে, তাই স্প্রে করার পরবর্তী ২১ দিনের মধ্যে কোনোভাবেই ধান কাটা বা বিক্রি করা যাবে না; নির্দিষ্ট সময়ের আগে ধান কাটলে চাল ও খড়ে বিষাক্ত কেমিক্যালের অবশিষ্টাংশ থেকে যায় যা মানুষ ও গবাদি পশুর স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
- জলজ প্রাণী ও মৌমাছির ওপর প্রভাব: এটি মৌমাছি এবং জলজ প্রাণীর (যেমন মাছ বা ব্যাঙ) জন্য বিষাক্ত।
- IPM উপযুক্ততা: জলাশয়ের কাছাকাছি বা ফুল ফোটার সময়ে সরাসরি ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে নির্দেশিত সঠিক মাত্রায় ব্যবহার করলে মূল ধান ক্ষেতের বন্ধু পোকাদের ওপর বিষাক্ততা তুলনামূলক কম হয়।
বুপ্রোফেজিন (Buprofezin 25% SC):
- কিভাবে কাজ করে: এটি দীর্ঘ সময় ধরে পোকার বাচ্চা ও ডিম নষ্ট করে বংশবৃদ্ধি বন্ধ করে।
- ব্যবহারের পরিমাণ: প্রতি ১৬ লিটার ট্যাংকিতে ২৫-৩০ মিলি। প্রতি একরে ৩০০ – ৪০০ মিলি (২০০ লিটার জলে গুলে)
- ফসল কাটার আগের সময়সীমা (PHI – ২০ দিন): ধানের ক্ষেত্রে বিউপ্রোফেজিন ২৫% এসসি স্প্রে করার পর রাসায়নিক প্রভাব সম্পূর্ণ কেটে যেতে অন্তত ২০ দিন সময় লাগে, তাই স্প্রে করার পরবর্তী ২০ দিনের মধ্যে কোনোভাবেই ধান কাটা বা বাজারজাত করা যাবে না; নির্দিষ্ট সময়ের আগে ধান কাটলে চাল ও খড়ে কেমিক্যালের অবশিষ্টাংশ থেকে যায় যা স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
- মৌমাছি ও বন্ধু পোকার জন্য নিরাপদ: এটি মৌমাছি, উপকারী বন্ধু পোকা এবং প্রাকৃতিক শিকারী পোকাদের কোনো ক্ষতি করে না, তাই সমন্বিত পোকা দমন (IPM) পদ্ধতিতে ব্যবহার করা সহজ।
ইমিডাক্লোপ্রিড (Imidacloprid 17.8% SL):
- কাজের ধরণ: গাছে শোষিত হয়ে রসকে বিষাক্ত করে। তবে মনে রাখবেন, অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে কারেন্ট পোকা এর বিরুদ্ধে সহনশীলতা তৈরি করায় তীব্র আক্রমণে ধানের কারেন্ট পোকার ওষুধ হিসেবে এটি এখন এককভাবে কম কাজ করে।
- ব্যবহারের পরিমাণ: প্রতি ১৬ লিটার ট্যাংকিতে ৪-৫ মিলি। প্রতি একরে ৪০ – ৫০ মিলি (২০০ – ২৮০ লিটার জলে গুলে)
- ফসল কাটার আগের সময়সীমা (PHI – ৪০ দিন): ধানের ক্ষেত্রে ইমিডাক্লোপ্রিড ১৭.৮% এসএল ধানে ক্ষেত্রে স্প্রে করার পর রাসায়নিক বিষক্রিয়া সম্পূর্ণ কেটে যেতে অন্তত ৪০ দিন সময় লাগে; তাই স্প্রে করার পরবর্তী ৪০ দিনের মধ্যে কোনোভাবেই ধান কাটা বা বাজারজাত করা যাবে না, অন্যথায় চাল ও খড়ে বিষাক্ত কেমিক্যালের অবশিষ্টাংশ থেকে গিয়ে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
- মৌমাছি ও বন্ধু পোকার ওপর প্রভাব: এটি মৌমাছি, মাছি এবং যেকোনো পরাগায়নকারী কীট-পতঙ্গের জন্য অত্যন্ত মারাত্মক বিষাক্ত।
- IPM উপযুক্ততা: ফুল ফোটার সময়ে বা মৌমাছির যাতায়াত থাকলে এটি ব্যবহার করা একদম নিষেধ। তাই সমন্বিত পোকা দমন (IPM) পদ্ধতিতে এটি সতর্কতার সাথে ব্যবহার করতে হয়।
৭. কীটনাশক ব্যবহারের বিশেষ নিয়ম ও সতর্কতা
সঠিক ওষুধ কেনার পরও শুধু স্প্রে করার ভুলের কারণে অনেকের জমিতে ধানের বাদামী গাছফড়িং দমন করা সম্ভব হয় না। তাই নিচের নিয়মগুলো কঠোরভাবে মেনে চলুন:
- একই ওষুধ বারবার নয়: একই উপাদানের ওষুধ বারবার স্প্রে করবেন না। আপনি বা আপনার আশপাশের জমিতে আগে যে ওষুধ ব্যবহার করা হয়েছে, তা পরিবর্তন করুন। কারণ পোকা খুব দ্রুত ওষুধের বিরুদ্ধে সহনশীল ক্ষমতা (Resistance) গড়ে তোলে।
- ব্যক্তিগত সুরক্ষা: স্প্রে করার সময় ফুল হাতা জামা, প্যান্ট, মাস্ক, চশমা (Goggles) এবং গ্লাভস ব্যবহার করতে হবে।
- খাদ্য ও পানীয়: স্প্রে করার সময় বা খালি হাতে কোনো কিছু খাওয়া, পান করা বা ধূমপান করা যাবে না।
- স্প্রে করার পর: কাজ শেষে হাত-মুখ সাবান দিয়ে ভালো করে ধুয়ে জামাকাপড় পরিষ্কার করতে হবে।
- আবহাওয়া ও সময়: অতিরিক্ত বাতাসে (যাতে গায়ে না লাগে) বা বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলে এবং কড়া রোদে স্প্রে করা যাবে না।
- সংরক্ষণ ও ড্রাম: খালি বোতল/প্যাকেট ভেঙে মাটিতে পুঁতে দিতে হবে এবং শিশুকাল ও গবাদি পশুর নাগালের বাইরে রাখতে হবে।
- মৌমাছি ও জলজ প্রাণীর সুরক্ষা: এটি মাছ, জলজ প্রাণী ও মৌমাছির জন্য ক্ষতিকর; তাই জলাশয়ের কাছাকাছি কিংবা মৌমাছির চলাচলের সময়ে স্প্রে করা যাবে না।
- পুনরায় জমিতে প্রবেশের সময় : স্প্রে করার পর অন্তত ২৪ ঘণ্টা জমিতে নামা যাবে না।
স্প্রে করার সঠিক পদ্ধতি:
- ধানের জমির আল দিয়ে ঘোরার সময় প্রথমে চারদিকের কিনারা দিয়ে গোল করে স্প্রে করে নিন, যাতে পোকা পাশের জমিতে পালাতে না পারে।
- এরপর ভিতরের ধান গাছের গোড়া ফাঁকা করে নজেল সবসময় নিচের দিকে রেখে ধানের গোড়ায় স্প্রে করুন, কারণ পোকা পাতার ওপরে থাকে না, গোড়ায় থাকে।
- প্রতিবেশীর সাথে সমন্বয়: পাশের জমির চাষির সাথে কথা বলে একই দিনে স্প্রে করার চেষ্টা করুন। অন্যথায় আপনার জমি থেকে পোকা পাশের জমিতে যাবে এবং দুই দিন পর আবার আপনার জমিতে ফিরে আসবে।
- পোকা দেখা মাত্রই সঠিক পদক্ষেপ: লক্ষণ বা পোকা দেখা দেওয়া মাত্রই দেরী না করে স্প্রে করুন।
- জমি শুকানো: সম্ভব হলে স্প্রে করার আগে জমির জমা জল বের করে দিয়ে জমি ৩-৪ দিন শুকনো রাখুন। জল শুকিয়ে গেলে পোকা এমনিতেই দুর্বল হয়ে পড়ে।
- বিকেলের দিকে স্প্রে: রোদ কমে যাওয়ার পর বিকেলে স্প্রে করা সবচেয়ে কার্যকর।
উপরে উল্লিখিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ও ওষুধ প্রয়োগের সঠিক নিয়ম মেনে চললে সহজেই ধানের হপার বার্ন রোগের প্রতিকার করা সম্ভব হবে এবং ফসলকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা যাবে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা ও উত্তর (FAQ)
প্রশ্ন ১: ধানের গাছ হঠাৎ গোল হয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে কেন?
উত্তর: ধানের গাছ গোল বা চাকা চাকা হয়ে শুকিয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হলো কারেন্ট পোকা বা বাদামী গাছফড়িং (BPH)-এর আক্রমণ। এরা দলবেঁধে ধানের গোড়ায় বসে রস চুষে নেয়, ফলে গাছ পুষ্টি না পেয়ে শুকিয়ে মারা যায়। ধানের এই অবস্থাকে কৃষি বিজ্ঞানের ভাষায় “হপার বার্ন” (Hopper Burn) বলা হয়।
প্রশ্ন ২: ধান ক্ষেতে ছোপ ছোপ পোড়া ভাব হওয়ার কারণ কী?
উত্তর: ধান ক্ষেতে ছোপ ছোপ বা জায়গায় জায়গায় আগুন লাগার মতো পোড়া ভাব হওয়ার মূল কারণ হলো বাদামী গাছফড়িং বা কারেন্ট পোকার বংশবৃদ্ধি। এছাড়া জমিতে অতিরিক্ত ইউরিয়া সার ব্যবহার, খুব ঘন করে চারা রোপণ এবং সবসময় জল জমিয়ে রাখলে এই পোড়া ভাব দ্রুত পুরো মাঠে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রশ্ন ৩: ধান গাছে কারেন্ট লাগলে কী স্প্রে করব?
উত্তর: ধানে কারেন্ট পোকা দেখা দিলে জরুরি ভিত্তিতে ডিনেটোফুরান ২০% এসজি (যেমন: ওশিন/তোফান), পাইমেট্রোজিন ৫০% ডাব্লিউডিজি (যেমন: চেস) অথবা ট্রাইফ্লুমেজোপাইরিম ১০% এসসি (যেমন: পেক্সালোন) স্প্রে করতে হবে। স্প্রে করার সময় নজেলটি ধানের পাতার ওপর না রেখে গাছের গোড়ার দিকে নির্দেশ করে ভালোভাবে ভিজিয়ে দিন এবং ক্ষেতের জমা জল ৩-৪ দিন শুকনো রাখুন।
প্রশ্ন ৪: কারেন্ট পোকার ডিম নষ্ট করার ঔষধ কোনটা?
উত্তর: কারেন্ট পোকার ডিম ও বাচ্চার বাড়বাড়ন্ত বন্ধ করার জন্য বুপ্রোফেজিন ২৫% এসসি (Buprofezin) অত্যন্ত কার্যকর, এটি একটি Insect Growth Regulator (IGR) যা পোকার ডিম ফুটতে দেয় না। এছাড়া প্রাকৃতিক উপায়ে ডিম নষ্ট করতে চাইলে প্রতি লিটার জলে ৩ মিলি নিম তেল (১০,০০০ ppm) বা ঘরে তৈরি নিমাস্ত্র স্প্রে করা যেতে পারে।
তথ্য সূত্র
- বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (BCKV) থেকে মূলত ধানে পোকা আক্রমণের কারণ, চাষগত ব্যবস্থাপনা (Alley formation, AWD পদ্ধতি, আলোক ফাঁদ) এবং জমিতে সঠিকভাবে ওষুধ প্রয়োগের নিয়মাবলি নেওয়া হয়েছে।
- জৈব উপকরণসমূহ ন্যাশনাল সেন্টার ফর অর্গানিক অ্যান্ড ন্যাচারাল ফার্মিং (NCONF) এবং জাতীয় প্রাকৃতিক কৃষি মিশন (NMNF)-এর স্বীকৃত নিয়মাবলী অনুযায়ী সংকলিত।
- রাসায়নিক ঔষধ: বিভিন্ন টেকনিক্যাল উপাদানের ব্যবহার, মাত্রা (Dosage) এবং ফসল কাটার আগের সময়সীমা (PHI) সংক্রান্ত তথ্যসমূহ কেন্দ্রীয় কীটনাশক বোর্ড ও নিবন্ধন কমিটি (CIB&RC), প্রস্তুতকারক কোম্পানির রেজিস্টার্ড লেবেল এবং অনুমোদিত এগ্রি-ইনপুট প্ল্যাটফর্মের প্রোডাক্ট স্পেসিফিকেশন থেকে সংগৃহীত ও সংকলিত।
বিশেষ ঘোষণা: কৃষিসূত্র-এর উদ্দেশ্য হলো কৃষকদের কাছে সঠিক টেকনিক্যাল তথ্য পৌঁছে দেওয়া। জমিতে যেকোনো ওষুধ ব্যবহারের আগে অবশ্যই প্যাকেটের গায়ে থাকা লেবেল ও নির্দেশিকা ভালোভাবে পড়ে নিন এবং স্থানীয় কৃষি বিভাগ ও কৃষি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।










