প্রাকৃতিক উপায়ে কৃষিকাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট জমিতে শুধুই একটি একক ফসল চাষ না করে, প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম মেনে একসাথে বা পর্যায়ক্রমে একাধিক ফসল চাষের যে বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়, তাকেই প্রাকৃতিক কৃষি সহজাত ফসল চাষ বলা হয়। প্রচলিত রাসায়নিক চাষে মাটির প্রাকৃতিক সক্ষমতা হ্রাস পেলেও, সুপরিকল্পিত ক্রপিং সিস্টেমের মাধ্যমে চাষ করলে মাটির অনুজীব সক্রিয় থাকে, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকে এবং সীমিত সম্পদ ব্যবহার করেই কৃষকের উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
১. প্রাকৃতিক কৃষি সহজাত ফসল চাষের মূল ধারণা ও গুরুত্ব
কৃষি ক্ষেত্রে মাটি, জল, সূর্যালোক ও বায়ুমণ্ডলের সর্বোচ্চ সঠিক ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে যে ফসল বিন্যাস গড়ে ওঠে, তা-ই হলো সহজাত চাষ পদ্ধতি। ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় আবহাওয়ার দেশে ২৫০টিরও বেশি ভিন্ন ভিন্ন ক্রপিং সিস্টেম প্রচলিত রয়েছে।
- বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য: একই জমিতে ভিন্ন ভিন্ন স্বভাবের মূল বা শিকড়বিশিষ্ট উদ্ভিদ রোপণ করলে মাটির গভীর ও উপরিভাগ থেকে পুষ্টি সংগৃহীত হয়।
- উৎপাদন ব্যয় হ্রাস: প্রাকৃতিক উপায়ে নাইট্রোজেন সংবন্ধন এবং অনুজীব সংবর্ধনের ফলে কৃত্রিম সারের প্রয়োজনীয়তা কমে যায়।
- পরাগায়ন ও পোকা নিয়ন্ত্রণ: প্রাকৃতিকভাবে কীটপতঙ্গ ও পরাগায়নকারী মাছি আকর্ষণ করে রোগ-পোকার আক্রমণ প্রতিহত করা সম্ভব হয়।

২. নিবিড় চাষাবাদ ও ফসল বৈচিত্র্য বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা
জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং কৃষিজমির পরিমাণ কমে যাওয়ার কারণে একই জমি থেকে সারা বছর ধরে ফসল উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। তবে আধুনিক চাষে আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং মনোকালচারের ফলে মাটির পুষ্টি উপাদানের অবক্ষয় ঘটছে।
- ইনটেনসিভ ক্রপিং সিস্টেম : সীমিত জমিতে সর্বোচ্চ পুঁজি ও শ্রম দিয়ে জল ও পুষ্টির দক্ষ ব্যবহার করে বছরে দুই বা ততধিক ফসল ফলানো।
- এক্সটেনসিভ সিস্টেম : বড় খামারে যন্ত্রের ব্যবহারে একক ফসল চাষের পদ্ধতি, যা দীর্ঘমেয়াদে মাটির স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে।
- সহজাত চাষের অবদান: প্রাকৃতিকভাবে পুষ্টি ও জলের প্রাপ্যতা বিচার করে শস্য পর্যায় বা ক্রপিং ইন্টেন্সিফিকেশন বজায় রাখলে পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট না করেই অধিক ফলন সম্ভব।
আরও দেখুন প্রাকৃতিক কৃষি খামার তৈরি নিয়ম।
৩. একফসলীয় চাষের ক্ষতি বনাম বহুমুখী ফসল চাষের সুবিধা
বছরের পর বছর একই জমিতে একই ফসল (যেমন—ধান-ধান-ধান) চাষ করাকে একক বা একফসলীয় চাষ বলা হয়।
একফসলীয় চাষের ক্ষতিকর দিক:
- মাটিতে নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি দেখা দেয়।
- মাটির বন্ধু অনুজীবের সংখ্যা কমে যায়।
- নির্দিষ্ট পোকা ও রোগের প্রাদুর্ভাব জ্যামিতিক হারে বাড়ে।
বহুমুখী ফসল চাষের প্রধান সুবিধাসমূহ:
- ঝুঁকি হ্রাস : আবহাওয়া খারাপ বা পোকায় একটি ফসল নষ্ট হলেও অন্য ফসল থেকে আয় সুনিশ্চিত হয়।
- জমির সঠিক ব্যবহার: প্রধান শস্যের মাঝের খালি জায়গায় দ্রুত বেড়ে ওঠা সাথী ফসল চাষ করায় জমির কোনো অংশ পতিত থাকে না।
- মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা: ডালজাতীয় ফসল বায়ুমণ্ডল থেকে নাইট্রোজেন সঞ্চয় করে মাটি উর্বর রাখে এবং জৈব পদার্থের পরিমাণ বাড়ায়।
- পারিবারিক খাদ্য ও আর্থিক নিরাপত্তা: ছোট কৃষকদের জন্য সারাবছর ধরে খাদ্য ও গবাদিপশুর খাবারের যোগান থাকে এবং বাজারে সবসময় ফসল বিক্রি করে নিয়মিত আয় বজায় থাকে।
৪. পর্যায়ক্রমিক চাষ এবং রিলে চাষ পদ্ধতির প্রয়োগ
একই জমিতে এক বছরের মধ্যে নির্দিষ্ট পর্যায় ও সময়সূচি মেনে একের পর এক ফসল চাষের মাধ্যমে বহুমুখী ফসল চাষ সফলভাবে বাস্তবায়ন করা যায়। এটি মূলত জমিতে একক শস্যের একঘেয়েমি দূর করে এবং সারা বছর মাটির কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
- পর্যায়ক্রমিক ফসল চাষ : একটি ফসল পূর্ণাঙ্গভাবে কাটার পর জমি তৈরি করে বা না করে খুব দ্রুত দ্বিতীয় ফসলটি রোপণ করাকে পর্যায়ক্রমিক চাষ বলা হয়। এতে জমিকে দীর্ঘদিন পতিত রাখতে হয় না এবং মাটির ভেতরে জমে থাকা অবশিষ্ট জল ও পুষ্টির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত হয়। দ্বিমুখী ফসল : বছরে দুটি ফসল ফলানো; যেমন—বর্ষাকালে ধান চাষের পর শীতকালে গম অথবা আলু চাষ করা।
- ত্রিমুখী ফসল : বছরে তিনটি ফসল উৎপাদন; যেমন—প্রথম মরশুমে ধান, দ্বিতীয় মরশুমে সরিষা এবং তৃতীয় মরশুমে স্বল্পমেয়াদী মুগ ডাল চাষ করা।
- চতুর্মুখী ফসল : অতি নিবিড় পরিকল্পনায় এক বছরে চারটি ফসল চাষ করা; যেমন—টমেটো \ ঝিঙে \ লাল শাক \ বেবি কর্ন।
- রিলে চাষ পদ্ধতি: প্রথম ফসলটি কাটার আগেই (ফসল পাকার শেষ পর্যায়ে যখন গাছে দানা বাঁধছে) দাঁড়ানো ফসলের সারির ফাঁকে দ্বিতীয় ফসলের বীজ বুনে দেওয়াকে রিলে চাষ বলা হয়। ঠিক যেমন রিলে রেসে এক প্রতিযোগী দৌড় শেষ করার আগেই অন্য জন ব্যাটন হাতে নিয়ে দৌড় শুরু করে, এখানেও প্রথম ফসল ওঠার আগেই দ্বিতীয় ফসল বৃদ্ধি পেতে শুরু করে।
- কৃষিগত সুবিধা: এই পদ্ধতিতে দ্বিতীয় ফসলের জন্য আলাদা করে জমি চাষ দিতে হয় না। ফলে জ্বালানি, ট্রাক্টরের খরচ ও শ্রমিকের মজুরি যেমন বাঁচে, তেমনই মাটির ভেতরের স্বাভাবিক রস বা জো (Moisture) ব্যবহার করে বীজ খুব দ্রুত অঙ্কুরিত হয়।
- আগাছা ও কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ: জমিতে সবসময় কোনো না কোনো ফসলের আচ্ছাদন থাকায় আগাছা জন্মানোর সুযোগ পায় না। গবেষণায় দেখা গেছে, রোপণ চাষে আগাছার কারণে ফসলের যে ৩৫-৪০% ক্ষতি হয়, রিলে চাষে তা বহুলাংশে কমে যায়।
- বাস্তব উদাহরণ: রোপা আমন ধান কাটার ১৫-২০ দিন আগে ভিজে জমিতে কলাই, খেসারি বা ছোলার বীজ ছিটানো (যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘পাইরা’ বা ‘উতেরা’ চাষ বলা হয়)। এছাড়া ভুট্টা ক্ষেতে ফসল কাটার আগেই মাটির ফাঁকে সবজি বা কলাইয়ের বীজ রোপণ করাও রিলে চাষের চমৎকার উদাহরণ।
৫. র্যাটুনিং বা মুড়ি ফসল চাষের নিয়ম ও সুবিধা
প্রথমবার ফসল সম্পূর্ণ পেকে যাওয়ার পর মূল গাছটি মাটি থেকে সামান্য উঁচুতে কেটে ফেলা হয়, কিন্তু মাটির নিচের মূল বা গোড়াটি অক্ষত রাখা হয়। সেই পুরনো গোড়া বা মুড়ি থেকে প্রাকৃতিকভাবে পুনর্নবীকরণ ঘটে যে নতুন কুঁড়ি গজায় এবং তা থেকে যে দ্বিতীয়বার ফলন পাওয়া যায়, তাকেই র্যাটুনিং বা মুড়ি ফসল চাষ বলা হয়।
- অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সুবিধা: উৎপাদন খরচ হ্রাস: দ্বিতীয় ফসলের জন্য নতুন করে বীজ ক্রয় করতে হয় না, জমি চাষ দিতে হয় না এবং বীজ বপন বা চারা রোপণের শ্রম বেঁচে যায়। এতে প্রাথমিক উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৮০-৯০% পর্যন্ত কমে যায়।
- কার্বন ও জ্বালানি সাশ্রয়: ট্রাক্টর বা পাওয়ার টিলার চালিয়ে জমি চাষ না করার ফলে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমে এবং মাটির জৈব পদার্থের ক্ষতি হয় না। কম সময় ও দ্রুত ফলন: যেহেতু মাটির নিচে মূল বা শিকড় ব্যবস্থা আগেই সুগঠিত থাকে, তাই চারা গাছ নতুন গাছের তুলনায় অনেক দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং কম সময়ে ফসল কাটা যায়।
- উপযুক্ত ফসলসমূহ: আখের ক্ষেত্রে র্যাটুনিং অত্যন্ত জনপ্রিয়। এছাড়া গবাদিপশুর সবুজ ঘাস (যেমন—সরগাম, ন্যাপিয়ার) এবং কিছু নির্দিষ্ট জাতের ধানেও সাফল্যজনকভাবে মুড়ি চাষ করা সম্ভব।
- সতর্কতা ও ব্যবস্থাপনা: পর পর একাধিকবার র্যাটুনিং করলে মূল উদ্ভিদের জীবনীশক্তি কমে যায় এবং রোগ-পোকার প্রাদুর্ভাব বাড়তে পারে। তাই প্রথম র্যাটুনিংয়ের পর মাটিতে সঠিক জৈব উপাদান ও অনুজীব মিশ্রণ (যেমন—জীবামৃত) প্রয়োগ করা আবশ্যিক।
৬. ইন্টারক্রপিং বা সাথী ফসল চাষের মূল নীতি ও শর্তাবলী
প্রাকৃতিক কৃষি সহজাত ফসল চাষ সফল করতে হলে প্রধান ফসলের সাথে উপযুক্ত সাথী ফসল (Intercrop) নির্বাচন করার নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক নীতি মেনে চলতে হয়। ভুল ফসল নির্বাচন করলে প্রধান ফসল ও সাথী ফসলের মধ্যে আলো, বাতাস, জল ও সারের জন্য প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে সার্বিক ফলন কমে যেতে পারে।
- ১. পরিপূরক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক : প্রধান ফসল ও সাথী ফসলের শারীরিক গঠন এবং বৃদ্ধির ধরণ ভিন্ন হতে হবে। প্রধান ফসলটি যদি ধীরে বাড়ে এবং উঁচুতে ওঠে (যেমন—ভুট্টা বা আখ), তবে তার নিচের ফাঁকা জায়গায় দ্রুত বর্ধনশীল ও কম মেয়াদের ছায়া সহনশীল ফসল (যেমন—মুগ, কলাই বা শাক) রোপণ করতে হবে।
- ২. জলের বাষ্পীভবন ও ক্ষয় রোধ: মাটির উপরিভাগ ঢেকে রাখে এমন আচ্ছাদনকারী ফসল বা কভার ক্রপ সাথী ফসল হিসেবে ব্যবহার করা উচিত। এতে কড়া রোদে মাটির জল বাষ্পীভূত হয়ে উবে যেতে পারে না এবং বৃষ্টির জলে ওপরের উর্বর মাটি ধুয়ে যায় না।
- ৩. ভিন্ন গভীরতার মূল বিন্যাস : প্রধান ফসলের শিকড় যদি মাটির গভীরে প্রবেশ করে, তবে সাথী ফসলের শিকড় যেন মাটির উপরিভাগেই সীমাবদ্ধ থাকে । এর ফলে দুটি গাছ মাটির দুটি আলাদা স্তর থেকে পুষ্টি ও জল সংগ্রহ করে এবং মাটির ভেতরে পুষ্টি উপাদানের কোনো প্রতিযোগিতা হয় না।
- ৪. ডালজাতীয় শস্যের অন্তর্ভুক্তিকরণ: সাথী ফসল হিসেবে সবসময় অন্তত একটি ডালজাতীয় ফসল (যেমন—ছোলার, মুগ, অড়হর, খেসারি) রাখা উচিত। ডালজাতীয় গাছের শিকড়ে থাকা ‘রাইজোবিয়াম’ অনুজীব প্রাকৃতিকভাবে বাতাস থেকে নাইট্রোজেন শোষণ করে মাটিতে সংবন্ধন করে, যা পাশের প্রধান ফসলটিকেও পুষ্টি জোগায়।
- ৫. একই রোগ ও পোকার বাহক ফসল এড়ানো: যেসব ফসলে একই ধরনের পোকা বা ছত্রাক আক্রমণ করে, সেগুলোকে একসাথে সাথী ফসল হিসেবে রোপণ করা যাবে না। যেমন—টমেটো ও বেগুন একই পরিবারের ফসল হওয়ায় এদের একসাথে ইন্টারক্রপিং করা ক্ষতিকর।
- ৬. বাজারজাতকরণ ও অর্থনৈতিক লাভ: সাথী ফসলটি যেন কৃষক পরিবারের দৈনিক খাবারের প্রয়োজন মেটাতে পারে অথবা স্থানীয় বাজারে সহজে বিক্রি করে তাৎক্ষণিক নগদ টাকা এনে দিতে পারে, সেদিকে খেয়াল রেখে ফসল নির্বাচন করতে হবে।
৭. স্থান ও সময়ের সামঞ্জস্য বজায় রেখে ফসল নির্বাচন
প্রাকৃতিক কৃষি সহজাত ফসল চাষ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দুটি বা ততোধিক ফসলের মধ্যে স্থানিক (Spatial) এবং কালিক বা সময়ভিত্তিক (Temporal) ব্যবধানের নিখুঁত সমন্বয় ঘটাতে হয়। একে সফল করতে প্রধানত চারটি কারিগরি বিষয় মাথায় রাখতে হবে:
- স্থানিক বিন্যাস : দুটি ফসলের শারীরিক গঠন এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে তারা একে অপরের পরিপূরক হয় এবং সূর্যালোক বা মাটির পুষ্টির জন্য কোনো প্রতিযোগিতা না ঘটে। সারির দূরত্ব বা ফাঁকা জায়গাগুলোর সঠিক ব্যবহারই হলো সঠিক স্থানিক বিন্যাস।
- ঘনত্ব নিয়ন্ত্রণ : সাথী ফসল বা মিশ্র চাষে প্রতিটি ফসলের বীজ বা চারা এমন হারে রোপণ করতে হবে যেন জমির আয়তন অনুযায়ী সর্বোচ্চ সংখ্যক গাছ বাঁচতে পারে। যদি দুটি ফসলই পূর্ণ মাত্রায় ঘন করে রোপণ করা হয়, তবে তীব্র ভিড়ের কারণে কোনো গাছই সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে পারবে না। তাই মিশ্রণে প্রতিটি ফসলের বীজ বপনের হার কিছুটা কমিয়ে দিতে হয়।
- পরিপক্কতার সময়সীমা: দুটি আলাদা জাতের ফসলের জীবনকাল বা ফুল-ফল ধরার সময় যেন ভিন্ন হয়। এর ফলে একটি ফসল যখন পুষ্টি ও জলের সর্বোচ্চ চাহিদা মিটিয়ে ফেলবে, অন্য ফসলটি তখন তার ভিন্ন সময়ে বৃদ্ধি পাবে। এটি শিখর বা পিক সময়ে জল, পুষ্টি ও সূর্যালোকের চাহিদা নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হতে দেয় না।
- উদ্ভিদের স্থাপত্য বা বিন্যাস : গাছের উচ্চতা এবং পাতার বিন্যাস এমন হতে হবে যেন ওপরের বড় গাছটির ছায়া ভেদ করে নিচের ছোট গাছটিও পর্যাপ্ত সূর্যালোক পায়। এর একটি ক্লাসিক উদাহরণ হলো—উঁচু ও কম ছড়ানো ভূট্টা গাছের ফাঁকে মাটির ওপর লতানো কুমড়ো চাষ করা, যেখানে কুমড়ো গাছের পাতা মাটি ঢেকে রাখে এবং ভূট্টা গাছ সোজা ওপরে বেড়ে ওঠে।
৮. বহুতল ফসল চাষ বা ফরেস্ট ফার্মিং মডেল
জমির উল্লম্ব স্থানকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে যখন একই জমিতে বিভিন্ন উচ্চতার একাধিক স্থায়ী বা ঋতুভিত্তিক গাছ একসঙ্গে চাষ করা হয়, তখন তাকে বহুতল ফসল চাষ বা ফরেস্ট ফার্মিং বলা হয়।
- কার্যপদ্ধতি ও উচ্চতা বিন্যাস: এই পদ্ধতিতে উদ্ভিদের স্তরের তারতম্য রক্ষা করা হয়। যেমন—সবচেয়ে ওপরে থাকে বড় আকারের ফল বা কাঠ গাছ (যেমন—নারকেল বা সুপারি), তার নিচের স্তরে থাকে মাঝারি উচ্চতার গাছ (যেমন—কফি, কোকো বা পেয়ারা), এবং সবচেয়ে নিচের স্তরে বা মাটিতে রোপণ করা হয় ছায়া সহনশীল লতানো বা কন্দ জাতীয় ফসল ও শাকসবজি (যেমন—গোলমরিচ, আদা, হলুদ বা আনারস)।
- সম্পদের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার: প্রাকৃতিকভাবে গাছগুলোকে এমনভাবে সাজানো হয় যাতে জমির আলো, জল এবং পুষ্টি উপাদানের একটি কণিকাও অপচয় না হয়।
- পরিবেশগত স্থিতিশীলতা: বহুতল সিস্টেমে বনের মতো মাইক্রোক্লাউমেট বা নিজস্ব আবহাওয়া তৈরি হয়, যা মাটির আর্দ্রতা বজায় রাখতে এবং মাটির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে সবচেয়ে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।
৯. স্ট্রিপ, প্যারালাল ও সিনারজিস্টিক ইন্টারক্রপিং
বহুমুখী ফসল চাষ ব্যবস্থাকে আরও নিখুঁত করতে ইন্টারক্রপিং বা সাথী ফসলের বেশ কিছু উন্নত উপ-পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়:
- স্ট্রিপ ইন্টারক্রপিং : এই পদ্ধতিতে ভিন্ন ভিন্ন ফসলের বীজ বা চারা পাশাপাশি চওড়া ‘পটি’ বা স্ট্রিপ আকারে রোপণ করা হয়। বিশেষ করে ঢালু জমিতে মাটির ক্ষয় রোধ করতে এটি অত্যন্ত কার্যকর। প্রতি বছর স্ট্রিপগুলোর স্থান পরিবর্তন করা হয় যাতে মাটির উর্বরতা সুষম থাকে। যেমন—একই জমিতে ভুট্টা এবং মুগ ডাল বা চিনাবাদামের চওড়া সারি পর্যায়ক্রমে সাজানো।
- প্যারালাল ক্রপিং : এমন দুটি ফসল একসাথে চাষ করা যাদের প্রাকৃতিক স্বভাব বা বৃদ্ধির ধরণ সম্পূর্ণ আলাদা, কিন্তু তাদের মধ্যে কোনো প্রতিযোগিতা বা লড়ায়ে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা থাকে না। যেমন—গম এবং সর্ষে একসাথে চাষ করা। সাধারণ নিয়মে গম বপন করার পর কৃষকেরা একই জমিতে সর্ষে ছিটিয়ে দেন, যা গম ক্ষেতের ভেতরেই নিজস্ব নিয়মে বেড়ে ওঠে এবং অতিরিক্ত সুফল দেয়।
- সিনারজিস্টিক ক্রপিং: এটি এমন একটি চমৎকার চাষ পদ্ধতি যেখানে দুটি ফসল একসাথে এককভাবে রোপণ করলে প্রত্যেকে আলাদা আলাদা চাষের তুলনায় অনেক বেশি ফলন দেয়। গাছগুলোর পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া বা ইতিবাচক সহযোগিতার কারণে সামগ্রিক উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
১০. প্রাকৃতিক উপায়ে পোকা দমনে বিশেষ ফসল বিন্যাস
রাসায়নিক কীটনাশক ছাড়া ক্ষতিকর পোকা ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রাকৃতিক কৃষি সহজাত ফসল চাষে কিছু নির্দিষ্ট ফসলকে ঢাল বা আকর্ষণীয় ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এটি খামারের বাস্তুতন্ত্র ঠিক রেখে প্রধান ফসলকে রক্ষা করে:
প্রধান ফসলের চেয়ে ক্ষতিকর পোকাকে বেশি আকর্ষণ করতে পারে এমন কিছু ফসল মূল ক্ষেতের চারপাশে বা নির্দিষ্ট দূরত্বে রোপণ করা হয়। এতে মূল ক্ষেতের ক্ষতিকর পোকাগুলো আকৃষ্ট হয়ে এই ফাঁদ ফসলে গিয়ে জমা হয় এবং প্রধান ফসলটি সুরক্ষিত থাকে।
- উদাহরণ: তুলো ক্ষেতে গোলাপী বোলওয়ার্ম পোকা দমনের জন্য চারপাশে ঢ্যাঁড়শ বা ভিন্ডি রোপণ করা, অথবা বাঁধাকপি ও ফুলকপির সাথে সর্ষে রোপণ করা।
- সীমান্ত ফসল : মূল খেতের চারপাশের সীমানা বরোবর একটু উঁচু, শক্ত ও কাটাজাতীয় ফসল রোপণ করা হয়। এটি বাইরের থেকে বায়ুর সাথে উড়ে আসা রোগ-জীবাণু, ক্ষতিকর পোকা ও ঝড়ো হাওয়া থেকে প্রধান ফসলকে রক্ষা করতে দেওয়াল হিসেবে কাজ করে।
- উদাহরণ: ছোলার ক্ষেতের চারপাশে কিংবা তুলোর সীমানায় জোয়ার বা ভুট্টা রোপণ করা।
- দূরীভূতকারী ফসল : কিছু কিছু উদ্ভিদের তীব্র গন্ধ বা গন্ধের রাসায়নিক উপাদান ক্ষতিকর পোকাদের সহ্য হয় না। এ ধরনের উদ্বায়ী গন্ধযুক্ত গাছ প্রধান ফসলের সারির মাঝে লাগালে পোকাগুলো মূল খেত থেকে দূরে পালিয়ে যায়।
- উদাহরণ: শিম বা বেগুন ক্ষেতের চারপাশে কিংবা ভুট্টার সাথে নেপিয়ার বা কলাই জাতীয় ফসল অথবা গাঁদা ফুল রোপণ করে ক্ষতিকর মাছি ও মাছিজাতীয় পোকা দূরে রাখা।
১১. পোকা দমনে ‘পুশ-পুল’ প্রযুক্তির ব্যবহার
প্রাকৃতিক উপায়ে কান্ড মাজরা এবং অন্যান্য ধ্বংসাত্মক পোকা দমনে ‘পুশ-পুল’ প্রযুক্তি বিশ্বব্যাপী একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও বৈজ্ঞানিক কৌশল। এই ব্যবস্থায় মূলত একই সাথে পোকাকে মূল ক্ষেত থেকে তাড়িয়ে দেওয়া (Push) এবং ফাঁদ ফসলের দিকে টেনে নেওয়া (Pull) হয়।
কীভাবে কাজ করে:
- ১. পুশ (তাড়িয়ে দেওয়া) উপাদান: প্রধান ফসলের (যেমন—ভুট্টা) সারির মাঝখানে ‘ডেসমোডিয়াম’ (Desmodium) নামক ডালজাতীয় লতানো গাছ রোপণ করা হয়। এই গাছের পাতা থেকে এমন এক ধরণের প্রাকৃতিক গন্ধ বের হয়, যা মাজরা পোকাকে সহ্য করতে দেয় না। ফলে পোকাগুলো ভুট্টা খেত থেকে দূরে পালিয়ে যায় (তাড়িয়ে দেওয়া)।
- ২. পুল (আকৃষ্ট করা) উপাদান: ক্ষেতের একদম চারপাশের সীমানায় ‘নেপিয়ার ঘাস’ (Napier Grass) রোপণ করা হয়। এই ঘাসটি ক্ষতিকর মাজরা পোকাকে খুব বেশি আকৃষ্ট করে। ভুট্টা খেত থেকে তাড়া খাওয়া পোকাগুলো আকৃষ্ট হয়ে চারপাশের নেপিয়ার ঘাসে গিয়ে ডিম পাড়ে (আকৃষ্ট করা)।
- ৩. প্রাকৃতিক ধ্বংস: নেপিয়ার ঘাসের ভেতর এমন এক ধরণের আঠালো রসে ভরা থাকে যা মাজরা পোকার লার্ভা বা কিড়াগুলোকে আটকে মেরে ফেলে। ফলে ক্ষতিকর পোকাগুলোর বংশবৃদ্ধি প্রাকৃতিকভাবেই বন্ধ হয়ে যায়।
১২. মিশ্র চাষ বনাম ইন্টারক্রপিংয়ের পার্থক্য
অনেকেই মিশ্র চাষ (Mixed Cropping) এবং ইন্টারক্রপিং (Intercropping)-কে একই মনে করেন, কিন্তু বহুমুখী ফসল চাষ ব্যবস্থায় এদের মধ্যে সূক্ষ্ম ও গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে:
| বিষয় | মিশ্র চাষ | ইন্টার ক্রপিং |
|---|---|---|
| বীজের মিশ্রণ | একাধিক ফসলের বীজ রোপণের আগেই একসাথে মিশিয়ে নেওয়া হয়। | বীজ মিশিয়ে বোনা হয় না; আলাদা আলাদা সারিতে বোনা হয়। |
| রোপণ পদ্ধতি | জমিতে এলোমেলো বা ছিটানো পদ্ধতিতে বপন করা হয়। | নির্দিস্ট সারির দূরত্ব ও প্যাটার্ন (যেমন—১:১ বা ১:২) মেনে রোপণ করা হয়। |
| প্রোতিযোগিতা | একই সময়ে পুষ্টি ও আলোর জন্য গাছগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে। | গাছগুলোর সুনির্দিষ্ট ব্যবধান থাকায় আলো ও পুষ্টির জন্য কোনো প্রতিযোগিতা হয় না। |
| উদ্দেশ্য | মূল উদ্দেশ্য হলো প্রতিকূল আবহাওয়ায় সম্পূর্ণ ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমানো। | মূল উদ্দেশ্য হলো জমি ও সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে মোট ফলন বৃদ্ধি করা। |
| ফসল তোলার সুবিধা | আলাদা আলাদাভাবে ফসল তোলা অত্যন্ত কঠিন ও শ্রমসাধ্য। | বিভিন্ন সারিতে থাকায় খুব সহজে ও আলাদা সময়ে ফসল তোলা যায়। |
| উদাহরণ | সর্ষে, কলাই ও ছোলার বীজ একসাথে মিশিয়ে ছিটিয়ে দেওয়া। | ১ সারি ভুট্টার সাথে ২ সারি মুগ ডাল |
১৩. ভারতের ঐতিহ্যবাহী ক্রপিং সিস্টেম ও দেশীয় অঞ্চলভিত্তিক মডেল
ভারতের কৃষকেরা বহুকাল ধরে জলবায়ু, মাটির ধরন ও প্রথার ওপর ভিত্তি করে নিজস্ব প্রাকৃতিক কৃষি সহজাত ফসল চাষ ব্যবস্থা উদ্ভাবন করে এসেছেন। দেশের বিভিন্ন রাজ্যে প্রায় ৫৮৩ প্রকারের দেশীয় অনাবাদি খাদ্য উপাদান এবং প্রায় ৫০০ প্রজাতির ঐতিহ্যবাহী শাকসবজি চাষের রেকর্ড রয়েছে।
১৪. খরাপ্রবণ এলাকার জন্য ‘নবধান্য’ চাষ পদ্ধতি
অনাবৃষ্টি বা অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের ঝুঁকি রয়েছে—এমন খরাপ্রবণ বা বৃষ্টি নির্ভর (Dryland Agriculture) অঞ্চলে অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ ফসল বাঁচিয়ে রাখার এক অনবদ্য প্রাচীন সুরক্ষা কবচ হলো নবধান্য চাষ পদ্ধতি।
নবধান্য পদ্ধতির মূল বৈশিষ্ট্য:
- এতে বর্ষা শুরুর ঠিক মুখে মাত্র একবার বীজ বোনা হয়।
- ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ফসল পাকার কারণে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকে শুরু করে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত দীর্ঘ ৫-৬ মাস ধরে খেত থেকে নিয়মিত শস্য সংগ্রহ করা যায়।
- অন্তত ৯ থেকে ১০ মাস মাটির ওপর ফসলের সবুজ বা শুকনো কভার থাকে, ফলে প্রবল রোদে মাটির জল শুকিয়ে যায় না এবং গাছ থেকে ঝরে পড়া পাতা মাটিতে জৈব পদার্থের মাত্রা বজায় রাখে।
নবধান্য ফসল বিন্যাসের স্তর ও সময়সূচি:
- প্রধান ফসল : চিনা বাদাম, বাজরা বা সূর্যমুখী ইত্যাদি (জীবনকাল: ১০০ দিনের কম বা প্রায় ৩ মাস)।
- ১ম সাথী ফসলের সারি : তোলা হয় ৪ মাসের মধ্যে।
- ২য় সাথী ফসলের সারি : তোলা হয় ৬ মাসের মাথায়।
- সীমান্ত ফসল : খেতের চারপাশের সারিতে বাজরা বা জোয়ার রোপণ করা হয়।
- পারিবারিক ব্যবহারের ফসল: সারির ফাঁকে ফাঁকে নিজেদের পরিবারের খাওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি এবং পাতাযুক্ত শাক অল্প পরিমাণে ছিটানো থাকে।
১৫. সারিবদ্ধ ও ছিটানো বপন পদ্ধতি
প্রাকৃতিক কৃষিতে বীজ রোপণ বা বোনার দুটি প্রধান কৌশল ব্যবহৃত হয়:
- ১. সারিবদ্ধ বোনা: নির্দিষ্ট দূরত্ব মেনে সোজা লাইনে বীজ বোনা বা চারা রোপণ করা হয়। এতে দুটি সারির মাঝে আলো ও বাতাস সহজে চলাচল করতে পারে এবং আগাছা দমন বা আন্তঃপরিচর্যা করা সহজ হয়।
- ২. ছিটানো বপন : পুরো খেত জুড়ে এলোমেলোভাবে বীজ ছিটিয়ে দেওয়া হয়, যা প্রাকৃতিক বনের নিয়ম অনুকরণ করে গজিয়ে ওঠে। ঘন করে গাছ গজানোর কারণে এটি মাটির জল ধরে রাখতে সাহায্য করে, তবে পরবর্তীতে আগাছা পরিষ্কার করা কিছুটা কঠিন।
১৬. খামার লাভজনক করার কৌশল
প্রাকৃতিক কৃষি সহজাত ফসল চাষ শুধুমাত্র মাটির স্বাস্থ্য রক্ষাই করে না, বরং কৃষক পরিবারকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলে। একটি খামারকে সার্বিকভাবে লাভজনক ও টেকসই করতে হলে নিম্নলিখিত ব্যবস্থাপনাগুলোকে সমন্বিত করা প্রয়োজন:
- ফসল বৈচিত্র্যের মাধ্যমে ঝুঁকি হ্রাস : শুধুমাত্র ফসল উৎপাদনের ওপর নির্ভর না করে খামারে হাঁস-মুরগি পালন, ছাগল পালন, গবাদিপশু পালন (ডিয়ারি) এবং মৎস্য চাষকে যুক্ত করলে একটি সমন্বিত ইউনিট গড়ে ওঠে। এটি আবহাওয়ার দুর্যোগ বা বাজারদরের ওঠানামার বিরুদ্ধে বিমার মতো কাজ করে।
- উৎপাদন ব্যয় হ্রাস ও মাটির স্বাস্থ্যের উন্নতি: কেমিক্যাল সার ও বিষের বদলে জীবামৃত, বীজামৃত ও ঘনজীবামৃত ব্যবহার এবং সাথী ফসল হিসেবে ডালজাতীয় শস্য রোপণের ফলে সারের খরচ শূন্যে নেমে আসে।
- জৈব পদার্থের সুরক্ষা: খেত থেকে ফসলের অবশিষ্টাংশ পুড়িয়ে না ফেলে মাটিতে আচ্ছাদন (Mulching) হিসেবে ব্যবহার করলে মাটিতে বন্ধু অনুজীবের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে।
উপসংহার
সুপরিকল্পিত প্রাকৃতিক কৃষি সহজাত ফসল চাষ এবং বহুমুখী ফসল চাষ ব্যবস্থার সঠিক প্রয়োগ ঘটলে প্রাকৃতিক কৃষি কেবল পরিবেশবান্ধব থাকে না, বরং এটি ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য একটি লাভজনক, স্থায়ী ও স্বাবলম্বী জীবিকার মডেলে পরিণত হয়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: রিলে চাষ (Relay Cropping) ও ইন্টারক্রপিংয়ের (Intercropping) মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?
উত্তর: ইন্টারক্রপিংয়ে দুটি ফসলের বীজ একই সাথে বা কাছাকাছি সময়ে বিভিন্ন সারিতে বোনা হয়। অন্যদিকে, রিলে চাষে প্রথম ফসলটি পাকার শেষ পর্যায়ে (কাটার ১৫-২০ দিন আগে) দাঁড়িয়ে থাকা ফসলের ফাঁকে দ্বিতীয় ফসলের বীজ বোনা হয়।
প্রশ্ন ২: ‘পুশ-পুল’ (Push-Pull) প্রযুক্তিতে নেপিয়ার ঘাস কেন সীমান্ত ফসল হিসেবে রোপণ করা হয়?
উত্তর: নেপিয়ার ঘাস থেকে নির্গত আকর্ষণীয় উপাদান কান্ড মাজরা পোকাকে খুব দ্রুত টেনে নেয় (Pull)। পোকাগুলো মূল খেত ছেড়ে নেপিয়ার ঘাসে ডিম পাড়ে এবং ঘাসের ভেতরে থাকা আঠালো রসে লার্ভাগুলো আটকে প্রাকৃতিকভাবেই মারা পড়ে।
প্রশ্ন ৩: নবধান্য চাষ পদ্ধতি কেন খরাপ্রবণ অঞ্চলের জন্য সবচেয়ে উপযোগী?
উত্তর: নবধান্য পদ্ধতিতে বর্ষার শুরুতে একবার বীজ বুনে সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দীর্ঘ ৬ মাস ধরে দফায় দফায় ফসল তোলা যায়। এতে ৯-১০ মাস মাটি শস্যের আচ্ছাদনে ঢেকে থাকে বলে কম বৃষ্টিপাত বা খরাতেও অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ ফসল নিরাপদে বাড়ি তোলা সম্ভব হয়।
তথ্য সূত্র
- প্রাকৃতিক কৃষি মিশন (NMNF)
- সুভাষ পালেকর প্রকৃতিক কৃষি (SPK)
- জিরো বাজেট ন্যাচরাল ফার্মিং (ZBNF)










