
ভূমিকা: জীবামৃত (Jeevamrut) কেন আধুনিক চাষের প্রকৃত ভিত্তি?
নমস্কার কৃষক বন্ধুগণ, আজ আমরা এমন এক বৈজ্ঞানিক সত্য নিয়ে আলোচনা করব যা আপনার চাষের প্রথাগত ধারণা বদলে দেবে। আমরা সাধারণত ভাবি বাজার থেকে কেনা সাদা দানা (ইউরিয়া) বা কালো দানা (ডিএপি) দিলেই গাছ দ্রুত বড় হয়। কিন্তু আধুনিক উদ্ভিদ বিজ্ঞান এবং ভারত সরকার এর জাতীয় প্রাকৃতিক কৃষি মিশনের (NMNF) ও বিভিন্ন কৃষি বিজ্ঞানী, বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী সত্যটা একদম আলাদা।
আপনি কি জানেন?
একটি গাছ তার প্রয়োজনীয় মোট খাদ্যের প্রায় ৯৮% উপাদান সরাসরি বাতাস, জল এবং সূর্য থেকে গ্রহণ করে। বাকি মাত্র ২% খাবার আসে মাটি থেকে। এই সামান্য পরিমাণ খাবার গাছের শিকড়ে পৌঁছে দেওয়ার গুরুদায়িত্ব পালন করে মাটির নিচে থাকা কোটি কোটি অণুজীব বা মাইক্রোবস। এরা মূলত মাটির ‘অদৃশ্য শ্রমিক’।
কিন্তু আজকের আধুনিক চাষে আমরা জমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক বিষ ও সার ঢেলে সেই উপকারী মাটির শ্রমিকদের মেরে ফেলেছি। ফলে আমাদের জমি আজ কঠোর ও বন্ধ্যা হয়ে পড়ছে। এই সংকট থেকে মুক্তির একমাত্র বৈজ্ঞানিক ও স্থায়ী পথ হলো জীবামৃত (Jeevamrut)।
জীবামৃত (Jeevamrut) আসলে কী?
জীবামৃত মানে হলো—অমৃতের সমান জীবাণু বা অণুজীব কালচার বা বায়ো-স্টিমুল্যান্ট। এটি কোনো প্রথাগত সাধারণ তরল সার নয়, বরং এটি কোটি কোটি উপকারী জীবাণুর একটি জ্যান্ত সমুদ্র। এটি মাটিতে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়া এবং ছত্রাকদের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে (৪৮-৭২ ঘণ্টায় কয়েকশ কোটি গুণ) বাড়িয়ে দেয়। যখন আমরা জীবামৃত (Jeevamrut) জমিতে প্রয়োগ করি, তখন এই অণুজীবগুলো মাটির গভীরে পেন্সিলের সিস বা পাথরের মতো শক্ত অবস্থায় আবদ্ধ থাকা মুখ্য (Macro) ও গৌণ (Micro) পুষ্টি উপাদানগুলোকে ভেঙে গলিয়ে গাছের গ্রহণযোগ্য করে তোলে এবং মাটির জৈব কার্বনের পরিমাণ বৃদ্ধি করে যা আপনার মাটির উর্বরতা ফিরিয়ে এনে ফসলকে করবে বিষমুক্ত ও শক্তিশালী।
গাছের পুষ্টির উৎস: বায়ুমণ্ডল বনাম মাটি
একজন সফল চাষি বা কৃষি বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমাদের বুঝতে হবে যে গাছ তার খাদ্যের বিশাল অংশ প্রকৃতি থেকে বিনামূল্যে সংগ্রহ করে। বায়ুমণ্ডলে থাকা উপাদানগুলো গাছ সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় নিজের দেহে রূপান্তরিত করে, আর মাটির উপাদানগুলো আহরণ করতে সাহায্য করে অণুজীব।
গাছের ১৬টি প্রয়োজনীয় উপাদানের বিভাজন তালিকা:
| খাদ্যের বিভাগ | উপাদানের নামসমূহ | উৎসের স্থান | প্রাপ্তি (%) |
|---|---|---|---|
| মূল কাঠামো উপাদান | কার্বন (C), হাইড্রোজেন (H), অক্সিজেন (O) | বায়ুমণ্ডল ও জল | ৯৮.৫% |
| মুখ্য খাদ্য (Macro) | নাইট্রোজেন (N), ফসফরাস (P), পটাশিয়াম (K), ক্যালসিয়াম (Ca), ম্যাগনেসিয়াম (Mg), সালফার (S) | মাটি ও সার | ১.৮% থেকে ১.৯% |
| গৌণ খাদ্য (Micro) | লোহা (Fe), ম্যাঙ্গানিজ (Mn), দস্তা (Zn), তামা (Cu), বোরন (B), মলিবডেনাম (Mo), ক্লোরিন (Cl) | মাটি | ০.১% থেকে ০.২% |
১. জীবামৃতের অবিশ্বাস্য গাণিতিক ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি (The Science of Billions)
অনেকেই প্রশ্ন করেন, সামান্য গোবর-গোমূত্র কীভাবে দামী সারের চেয়ে বেশি কাজ করে? উত্তর লুকিয়ে আছে জীবাণুর অবিশ্বাস্য গাণিতিক শক্তিতে:
- জীবাণুর বর্তমান অবস্থা: রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে আমাদের জমির ১ গ্রাম মাটিতে এখন জীবাণুর সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১০ লক্ষ থেকে ১ কোটিতে। অথচ একটি লাভজনক ফসলের জন্য প্রয়োজন ১ গ্রামে অন্তত ১০০ কোটি সক্রিয় জীবাণু।
- দেশী গরুর গোবরের জাদু: পদ্মশ্রী সুভাষ পালেকর এবং হরিয়ানা রাজ্যপাল আচার্য দেবব্রত গুরুকুলে তাদের 200 একর জমিতে প্রাকৃতিক কৃষি গবেষণায় দেখিয়েছেন যে একটি সুস্থ দেশী গরুর ১ গ্রাম টাটকা গোবরে ৩০০ থেকে ৫০০ কোটি (বা ৩০০০-৫০০ কোটি প্রজাতিভেদে) উপকারী জীবাণু থাকে।
- ১০ কেজি গোবরের শক্তি: ১০ কেজি গোবরে প্রায় ৩ থেকে ৫ লক্ষ কোটি জীবাণু থাকে। যখন আমরা এই গোবরকে গুড় ও বেসনের সাথে মিশিয়ে জীবাামৃত তৈরি করি, তখন এই জীবাণুগুলো প্রতি ২০ মিনিটে দ্বিগুণ হারে বাড়তে থাকে (Multiplication)।
- গাণিতিক হিসেব: ১টি জীবাণু থেকে ২০ মিনিটে ২টি, ৪০ মিনিটে ৪টি এবং ১ ঘণ্টায় ৮টি হয়। এভাবে ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সেই ড্রামের ২০০ লিটার জল আসলে অগণিত কোটি কোটি জীবাণুর এক সক্রিয় ভাণ্ডারে পরিণত হয়। এই বিশাল পরিমাণ জীবাণু যখন আপনার মাটিতে পড়ে, তখন তারা মাটির গভীরে থাকা সুপ্ত পুষ্টি উপাদানগুলোকে গলিয়ে গাছের গ্রহণ উপযোগী করে তোলে।
আড়ও দেখুন ফসফেট দ্রবণকারী ব্যাক্টেরিয়া (পি.এস.বি) কি ? ফসল উৎপাদনে পি.এস.বি জীবাণু সার এর ব্যবহার
২. বায়ুমণ্ডলীয় পুষ্টি ও নাইট্রোজেন ফিক্সেশন (Atmospheric Nutrition)
আমাদের বায়ুমণ্ডলে ৭৮.০৮% নাইট্রোজেন রয়েছে। জীবামৃত (Jeevamrut) এর মাধ্যমে আমরা যখন মাটিতে অ্যাজোটোব্যাকটর (Azotobacter) এবং রাইজোবিয়াম (Rhizobium) এর মতো জীবাণু ছড়াই, তারা বায়ুমণ্ডল থেকে সরাসরি নাইট্রোজেন শোষণ করে গাছের শিকড়ে জমা করে। একেই বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘নাইট্রোজেন ফিক্সেশন’। জীবাামৃত (Jeevamrut) ব্যবহারের ফলে গাছ প্রাকৃতিকভাবেই এই নাইট্রোজেন পেতে থাকে, যার ফলে আলাদা করে রাসায়নিক ইউরিয়া দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

৩. জিবামৃত বনাম কেঁচো সার (Vermi-compost): আসল পার্থক্য
অনেক কৃষকই কেঁচো সার এবং জীবামৃত (Jeevamrut) এর মধ্যে গুলিয়ে ফেলেন। মনে রাখবেন:
কেঁচো সার: এটি কেবল পচানো গোবর ও বর্জ্য, এতে জীবাণুর সংখ্যা জিবামৃতের তুলনায় নগণ্য। এটি বিদেশী লাল কেঁচো (Eisenia Fetida) দিয়ে তৈরি হয় যা মাটির উপরের স্তরেই থাকে।
জীবামৃত: এটি আসলে একটি ‘বায়ো-কালচার’। এটি মাটিতে পড়ার সাথে সাথে মাটির গভীরে সুপ্ত অবস্থায় থাকা দেশীয় কেঁচোদের জাগিয়ে তোলে। দেশী কেঁচোরা মাটির ১৫ ফুট গভীর পর্যন্ত চলাচল করে অসংখ্য সুড়ঙ্গ তৈরি করে, যা মাটির জল ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং কার্বন লেভেল বাড়াতে সাহায্য করে। দেশী কেঁচোরা বিদেশী কেঁচোর চেয়ে অনেক বেশি গরম সহ্য করতে পারে এবং আমাদের আবহাওয়ার জন্য ১০০% উপযোগী।
মাটির কার্বন ও অণুজীব: এক জ্যান্ত বিজ্ঞান
মাটির উর্বরতার মূল চাবিকাঠি হলো জৈব কার্বন (Organic Carbon)। মাটিকে যদি আমরা একটি কারখানা ধরি, তবে কার্বন হলো সেই কারখানার জ্বালানি।
- জীবাণুর ভূমিকা: জীবামৃত (Jeevamrut) প্রয়োগ করলে মাটিতে থাকা অণুজীবরা ফসলের অবশিষ্টাংশ (যেমন নাড়া, ঘাস, পাতা) দ্রুত পচাতে শুরু করে। এই পচনের ফলে যে হিউমাস তৈরি হয়, তা থেকেই মাটিতে কার্বন জমা হয়।
- কেঁচোর ভূমিকা: অণুজীবের উপস্থিতিতে দেশি কেঁচো মাটির গভীর থেকে ওপরে যাতায়াত শুরু করে। কেঁচো মাটি খেয়ে যে মল ত্যাগ করে (Vermicast), তাতে সাধারণ মাটির চেয়ে কয়েক গুণ বেশি কার্বন এবং পুষ্টি থাকে। কেঁচো মাটিকে ছিদ্রযুক্ত করে দেয়, ফলে মাটিতে অক্সিজেন বাড়ে যা কার্বন চক্রকে সচল রাখে।
কার্বনের আদর্শ মাত্রা ও বর্তমান চিত্র
- আদর্শ মান: ভালো ফলনের জন্য মাটিতে অন্তত ০.৭৫% থেকে ১.০% জৈব কার্বন থাকা উত্তম।
- বর্তমান চিত্র: ভারতের অধিকাংশ চাষযোগ্য মাটিতে রাসায়নিকের প্রভাবে এই মাত্রা ০.২% থেকে ০.৩%-এ নেমে এসেছে।
- সময়কাল: নিয়মিত জীবামৃত (Jeevamrut) এবং আচ্ছাদন (Mulching) ব্যবহার করলে মাটির কার্বন স্তর আদর্শ অবস্থায় ফেরাতে সাধারণত ৩ থেকে ৫ বছর সময় লাগে। তবে প্রথম বছর থেকেই মাটির টেক্সচারে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।
৬. আচ্ছাদন বা মালচিং-এর গুরুত্ব
জীবামৃত (Jeevamrut) দেওয়ার পর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো আচ্ছাদন (Mulching)। মাটির ওপর খড় বা শুকনো পাতা দিয়ে ঢেকে দিলে:
- মাটির আর্দ্রতা সংরক্ষিত হয়।
- জীবাণুরা সরাসরি সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে রক্ষা পায়।
- মাটির জৈব কার্বন (Organic Carbon) দ্রুত বৃদ্ধি পায় (বর্তমানে আমাদের মাটিতে কার্বন মাত্র ০.৩%-০.৫%, যা জিবামৃত ও আচ্ছাদনে ১%-এ পৌঁছাতে পারে)।
৪. জীবামৃত তৈরির উপকরণ ও বৈজ্ঞানিক উপাদান তত্ত্ব (Ingredients & Logic)
বিজ্ঞানী ড. হরিওম এবং পালেকরজীর নির্দেশিত উপকরণগুলোর প্রতিটি নির্দিষ্ট কারণে দেওয়া হয়:
- জল (২০০ লিটার): জীবাণুদের বসবাসের মাধ্যম।
- দেশী গোবর (১০-২০ কেজি): ৩ থেকে ৫ লক্ষ কোটি জীবাণুর প্রাথমিক উৎস।
- দেশী গোমূত্র (৫-১০ লিটার): এতে থাকা হরমোন ও অ্যামোনিয়া জীবাণুদের বংশবৃদ্ধিতে ক্যাটাালিস্ট বা অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।
- যেকোনো ডাল বেসন (২ কেজি): এতে থাকা প্রোটিন জীবাণুদের শারীরিক গঠনের জন্য অপরিহার্য।
- চিটে গুড় (২ কেজি): এটি জীবাণুদের জন্য ইনস্ট্যান্ট এনার্জি বা শর্করা। গুড় দিলে জীবাণুরা দ্রুত সক্রিয় হয়ে বংশবৃদ্ধি করে।
- জঙ্গলের জীবন্ত মাটি (৫০০ গ্রাম): বট বা পাকড় গাছের তলার মাটিতে হাজার বছরের পুরনো শক্তিশালী জীবাণু থাকে, যা ড্রামের মিশ্রণকে সমৃদ্ধ করে।
৫. জীবামৃত প্রস্তুতি ও নাড়ানোর গোপন রহস্য
একটি ২০০ লিটারের ড্রামে সব উপকরণ মিশিয়ে ৩ থেকে ৫ দিন ছায়াযুক্ত জায়গায় রাখতে হবে। একটি লাঠি দিয়ে প্রতিদিন সকালে ও বিকেলে ঘড়ির কাঁটার দিকে (Clockwise) ১০ বার করে নাড়াতে হবে। কেন ঘড়ির কাঁটার দিকে? কারণ পৃথিবীর ঘূর্ণনের সাথে তাল মিলিয়ে জীবাণুর এনার্জি ফ্লো ঘড়ির কাঁটার দিকে সবথেকে বেশি সক্রিয় থাকে, যা তাদের বংশবৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

জীবামৃত ব্যবহারের কৃষি ক্যালেন্ডার
সব ফসলে জীবামৃত (Jeevamrut) দেওয়ার একটি সঠিক সময় থাকে। নিচে একটি আদর্শ ক্যালেন্ডার দেওয়া হলো:
| পর্যায় প্রয়োগ পদ্ধতি | প্রয়োগ ডোজ | গুরুত্ব |
|---|---|---|
| জমি তৈরি চাষের আগে ভেজানো মাটিতে | একর প্রতি ২০০ লিটার | মাটির জীবাণু সক্রিয় করতে |
| রোপণের ২১ দিন পর সেচের জলের সাথে বা গোড়ায় | ২০০ লিটার | গাছের প্রাথমিক বৃদ্ধির জন্য |
| রোপণের ৪৫ দিন পর সেচের জলের সাথে | ২০০ লিটার | নাইট্রোজেন ফিক্সেশন বাড়ানোর জন্য |
| ফুল আসার আগে স্প্রে বা গোড়ায় | ৫০% জিবামৃত + ৫০% জল | ফুলের সংখ্যা বৃদ্ধিতে |
| ফল ধরার সময় সেচের জলের সাথে | ২০০ লিটার | ফলের মিষ্টতা ও ওজন বাড়াতে |
চাষের তথ্যে আমার এক্সপার্ট মতামত
গরু নির্বাচন: জার্সি বা হাইব্রিড গরুর গোবর ব্যবহার করা ভুল পদ্ধতি, আইসিএআর (ICAR) এর গবেষণা অনুযায়ী দেশী গরুর গোবরে অণুজীবের বৈচিত্র্য ও সংখ্যা হাইব্রিডের চেয়ে বহুগুণ বেশি। জীবামৃত (Jeevamrut) এর পূর্ণ ফল পেতে হলে দেশী গরুর গোবরই ব্যবহার করা সঠিক।
উপাদানের গুণমান: আটা বা ময়দা ব্যবহার করা যাবে না । আটা দিলে ড্রামে ক্ষতিকারক ছত্রাক জন্মাতে পারে। সবসময় ছোলার বা যেকোনো ডাল বেসন ব্যবহার করা সঠিক কারণ এতে উচ্চমাত্রার প্রোটিন থাকে।
জলের গুণমান: সরাসরি ট্যাপের ক্লোরিনযুক্ত জল ব্যবহার করা ভুল পদ্ধতি হবে, কারণ ক্লোরিন জীবাণুদের মেরে ফেলে। পুকুরের জল বা কুয়োর জল ব্যবহার করা সঠিক অথবা ট্যাপের জল হলে ২৪ ঘণ্টা বালতিতে রেখে ক্লোরিন উড়িয়ে তারপর ব্যবহার করা সঠিক।
মাটি নির্বাচন: রাসায়নিক চাষ হওয়া জমির মাটি ব্যবহার করা যাবে না, কারণ ঐ মাটিতে উপকারী জীবাণু প্রায় শূন্য থাকে। সবসময় পুরনো বটগাছ বা জঙ্গলের মাটি ব্যবহার করা সঠিক কারণ সেখানে ‘মাইকোরাইজা’ ও ‘অ্যাজোটোব্যাকটর’ এর ঘনত্ব বেশি থাকে।
প্রয়োগের ভুল: শুকনো ফেটে যাওয়া মাটিতে জিবামৃত প্রয়োগ করা যাবে না, কারণ মাটি ভেজা না থাকলে জীবাণু মারা যাবে। সবসময় সেচের সময় বা মাটি ভেজা অবস্থায় জিবামৃত প্রয়োগ করা সঠিক।
আড়ও দেখুন জৈব কীটবিতারক(কীটনাশক) অগ্নিঅস্ত্র (Agniastra) কি? কিভাবে তৈরি করবেন ও ব্যবহার করবেন?
খরচ ও লাভের বাস্তব খতিয়ান: আপনার পকেট কেন হাসবে?
নিচে দেওয়া জীবামৃত (Jeevamrut) ফসলে প্রয়োগ পদ্ধতি টি অনুসরণ করলে উৎপাদন ও মাটির গুনাগুন ভাল পাবেন :
| বিষয় | রাসায়নিক পদ্ধতি (বিঘা প্রতি) | জিবামৃত পদ্ধতি (বিঘা প্রতি) |
|---|---|---|
| সারের খরচ | ৩,০০০ – ৫,০০০ টাকা | মাত্র ৮০ – ১২০ টাকা (গুড় ও বেসন) |
| জল সেচের খরচ | আচ্ছাদন না থাকায় জল বেশি লাগে | আচ্ছাদনের ফলে ৫০% জল সাশ্রয় হয় |
| ফসল বিক্রি | বিষযুক্ত ফসল, বাজারে দাম কম | বিষমুক্ত প্রিমিয়াম ফসল, অনেক বেশি দাম |
| চিকিৎসা খরচ | পরিবারের রোগে লাভের ৪০% ব্যয় | পরিবার সুস্থ থাকে, ডাক্তারের খরচ বাঁচে |
প্রথম বছরের ফসল ও মিশ্র চাষের লাভ
রাসায়নিক ছাড়া প্রথম বছরের ফলন: অনেকের মনে ভয় থাকে যে রাসায়নিক ছাড়লে ফলন কমে যাবে। সত্য হলো, প্রথম বছর ফলন সামান্য (১০-১৫%) কম হতে পারে কারণ মাটি তখন বিষমুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকে। কিন্তু জীবাামৃত ব্যবহার করলে এবং সঠিক মিশ্র চাষ (Intercropping) করলে এই ঘাটতি পূরণ হয়ে যায়।
মিশ্র চাষ ও জীবামৃত (Jeevamrut) এর যুগলবন্দী: মিশ্র চাষ করলে এক ফসলের শিকড় অন্য ফসলের জন্য সহায়ক অণুজীব তৈরি করে। উদাহরণস্বরূপ, যদি আপনি ধান বা ভুট্টার সাথে ডাল জাতীয় ফসল চাষ করেন, তবে ডাল জাতীয় গাছের শিকড় বাতাস থেকে নাইট্রোজেন টেনে মাটিতে জমা করবে। জীবাামৃত এই নাইট্রোজেনকে দ্রুত প্রধান ফসলের শিকড়ে পৌঁছে দেবে। এতে সারের খরচ শূন্যে নেমে আসে এবং কৃষকের নিট লাভ বৃদ্ধি পায়।
উপসংহার
জীবামৃত কেবল একটি সার নয়, এটি আপনার জমির সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে আনার লড়াই। আমরা যখন রাসায়নিকের পেছনে দৌড়াই, তখন আমরা আসলে ঔষধ কোম্পানির দাসে পরিণত হই। কিন্তু যখন আমরা জীবামৃত (Jeevamrut) ব্যবহার করি, তখন আমরা প্রকৃতির সাথে বন্ধুত্ব করি। সিকিম, হিমাচল এবং গুজরাটের হাজার হাজার কৃষক আজ এই পথেই স্বাবলম্বী। পদ্মশ্রী সুভাষ পালেকরজীর এই “কৃষি সূত্র” আপনার জমিতে প্রয়োগ করুন এবং পৃথিবীকে একটি বিষমুক্ত ভবিষ্যৎ উপহার দিন।
সচরাচর জিজ্ঞাস্য প্রশ্ন (FAQ – জীবাামৃত)
প্রশ্ন: জীবাামৃত কী এবং কেন এটি ব্যবহার করা হয়?
উত্তর: জীবামৃত (Jeevamrut) হলো একটি প্রাকৃতিকভাবে তৈরি অণুজীব সমৃদ্ধ কালচার বা মিশ্রণ। এটি মাটিতে উপকারী অণুজীবের (Microbes) সংখ্যা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, মাটির উর্বরতা পুনরুদ্ধার করে এবং গাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
প্রশ্ন: জীবাামৃত তৈরির ৪৮ ঘণ্টা পর কেন এটি ব্যবহারের উপযোগী হয়?
উত্তর: এই সময়ে মিশ্রণের মধ্যে থাকা বেসন বা গুড় অণুজীবদের খাবার হিসেবে কাজ করে, ফলে অণুজীবের সংখ্যা কয়েকশ কোটি বেড়ে যায়। ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এই বংশবৃদ্ধি চরমে পৌঁছায়, তাই এই সময়টিই শ্রেষ্ঠ।
প্রশ্ন: ১ একর জমির জন্য কতটুকু জীবাামৃত প্রয়োজন?
উত্তর: সাধারণত ১ একর জমির জন্য ২০০ লিটার তরল জীবাামৃত প্রয়োজন। এটি সেচের জলের সাথে বা সরাসরি মাটির ওপর ছিটিয়ে ব্যবহার করা যায়।
প্রশ্ন: জীবাামৃত এবং ঘন জীবাামৃতের মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: তরল জীবামৃত (Jeevamrut) মূলত সেচের সাথে দ্রুত ব্যবহারের জন্য। আর ঘন জীবাামৃত হলো শুকনো গোবরের সাথে উপাদানগুলো মিশিয়ে তৈরি করা পাউডার বা দানা, যা দীর্ঘ ৬ মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করে রাখা যায় এবং জমিতে সারের মতো ছড়ানো যায়।
প্রশ্ন: জীবাামৃত ব্যবহারের পর কি রাসায়নিক সার ব্যবহার করা যাবে?
উত্তর: না। জীবামৃত (Jeevamrut) প্রয়োগের মূল উদ্দেশ্য হলো মাটিকে রাসায়নিকমুক্ত করা। রাসায়নিক সার ব্যবহার করলে জীবাামৃতের উপকারী অণুজীবগুলো মারা যাবে, ফলে কোনো সুফল পাওয়া যাবে না।
তথ্যসূত্রের প্রধান উৎসসমূহ
- পদ্মশ্রী সুভাষ পালেকর (Subhash Palekar): তিনি জীবাামৃতের প্রধান প্রবক্তা। তাঁর বই ‘The Philosophy of Spiritual Farming‘-এ এই উপাদানগুলোর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে।
- National Centre of Organic and Natural Farming (NCONF): ভারত সরকারের এই সংস্থাটি জীবাামৃতের কার্যকারিতা নিয়ে একাধিক ল্যাব রিপোর্ট প্রকাশ করেছে।
- ICAR (Indian Council of Agricultural Research): ভারতীয় কৃষি গবেষণা পরিষদ বিভিন্ন ট্রায়ালে জীবাামৃতের মাধ্যমে মাটির কার্বন বৃদ্ধির প্রমাণ পেয়েছে।










