বীজামৃত (Beejamrut): আধুনিক চাষের সেই প্রাচীন চাবিকাঠি যা আপনার ফসলের ভাগ্য বদলে দেবে

প্রাকৃতিক কৃষিতে বীজামৃত (Beejamrut) তৈরির উপকরণ ও বীজ শোধন পদ্ধতি।
প্রাকৃতিক কৃষিতে বীজামৃত (Beejamrut) তৈরির উপকরণ ও বীজ শোধন সাদৃশ্য ।

ভূমিকা (Introduction): চাষের শুরুটা যদি ভুল হয়, তবে হাজার টাকা খরচ করেও শেষ রক্ষা হয় না। আমরা অনেকেই বাজার থেকে দামী বীজ কিনি, দামী সার দিই, কিন্তু দেখা যায় চারা গজানোর কদিন পরেই তা শুকিয়ে যাচ্ছে বা পচে যাচ্ছে। কেন এমন হয়? কারণ, আমরা বীজের বাহ্যিক চাকচিক্য দেখলেও তার ভেতরের প্রাণশক্তিকে রক্ষা করতে ভুলে যাই। এখানেই কাজ করে বীজামৃত (Beejamrut)। এটি কেবল একটি জৈব মিশ্রণ নয়, এটি একটি জীবন্ত সুরক্ষা কবচ। ভারতের হাজার হাজার সফল প্রাকৃতিক কৃষক আজ রাসায়নিক বিষ ছেড়ে এই বীজামৃতের ওপর ভরসা করছেন। আপনি কি জানেন, মাত্র কয়েক টাকার ঘরোয়া উপকরণ দিয়ে তৈরি এই মিশ্রণটি আপনার ফসলের ফলন ২০% পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে? চলুন জেনে নিই সেই বিজ্ঞানের কথা যা আপনার চাষের ধারণা বদলে দেবে।

কোথায় এবং কারা ব্যবহার করছেন?

বর্তমানে অন্ধ্রপ্রদেশ, হিমাচল প্রদেশ এবং হরিয়ানার লাখ লাখ কৃষক সরকারি উদ্যোগে এই পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন। বিশেষ করে কুরুক্ষেত্রের ড. হরিওম এবং প্রাকৃতিক কৃষির জনক সুভাষ পালেকর জির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত খামারগুলোতে দেখা গেছে, যারা বীজামৃত (Beejamrut) ব্যবহার করছেন, তাদের জমিতে চারা পচা রোগ (Damping off) নেই বললেই চলে। হিমাচল প্রদেশের পাহাড়ি আপেল থেকে শুরু করে বাংলার ধান ও সবজি চাষে এর জয়জয়কার এখন তুঙ্গে।

আড়ও দেখুন ১২ মাসে সবজি চাষ করার পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা: কৃষকের লাভজনক ক্যালেন্ডার

বীজামৃত (Beejamrut) কী? এর বায়োলজিক্যাল ও বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব

বীজামৃত হলো কোটি কোটি উপকারী অণুজীবের একটি ককটেল। এর প্রতিটি উপাদানের পেছনে রয়েছে গভীর বিজ্ঞান:

  • দেশী গোবর (উপকারী অণুজীবের আধার): গোবরে থাকা ‘লিগনোসেলুলোলিটিক’ ব্যাকটেরিয়া বীজের শক্ত আবরণকে নরম করে, ফলে অঙ্কুরোদগম দ্রুত হয়।
  • দেশী গোমূত্র (প্রাকৃতিক অ্যান্টিবায়োটিক): এতে রয়েছে ইউরিয়া, এনজাইম এবং লোহিত কণিকা যা বীজকে ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ থেকে রক্ষা করে।
  • চুন (pH নিয়ন্ত্রক ও ক্যালসিয়াম): চুন বীজের চারপাশের অম্লত্ব নিয়ন্ত্রণ করে এবং চারাকে শক্তিশালী কাঠামো দেয়।
  • বট/পাকুড় গাছের তলার মাটি (অণুজীবের অনুঘটক): এই মাটিতে থাকা ‘রাইজোবিয়াম’ এবং ‘আজোটোব্যাকটর’ চারা জন্মানোর সাথে সাথেই বাতাস থেকে নাইট্রোজেন টেনে শিকড়ে জোগান দেয়।

বীজামৃত তৈরির পদ্ধতি (১০০ কেজি বীজের জন্য)

উপকরণ:

  • জল: ২০ লিটার
  • দেশী গোমূত্র: ৫ লিটার
  • দেশী গোবর: ৫ কেজি
  • বুজানো চুন: ৫০ গ্রাম
  • বট বা পাকুড় গাছের গোড়ার মাটি: এক মুঠো

বীজামৃত (Beejamrut) প্রস্তুত প্রণালী

একটি প্লাস্টিকের ড্রামে ২০ লিটার জলের সাথে ৫ কেজি গোবর এবং ৫ লিটার গোমূত্র মেশান। এবার আগে থেকে ভিজিয়ে রাখা চুনের জল এবং এক মুঠো মাটি যোগ করুন। মিশ্রণটি ভালো করে নাড়িয়ে একটি পাতলা কাপড় বা চট দিয়ে মুখ ঢেকে ২৪ ঘণ্টা ছায়ায় রেখে দিন। দিনে দুবার নাড়িয়ে দিন। ২৪ ঘণ্টা পর বীজামৃত (Beejamrut) ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত।

কৃষি সুত্র সতর্কতা ও পরামর্শ

  • চুন মিশানোর পদ্ধতি: চুন সরাসরি ড্রামে ঢেলে দেওয়া ভুল পদ্ধতি হব। চুন আলাদা ১ লিটার জলে আগের রাতে ভিজিয়ে রেখে তার ওপরের পরিষ্কার জলটুকু মেশানো সঠিক, এতে অণুজীবের কোনো ক্ষতি হয় না।
  • গোবর বাছাই: যেকোনো গরুর গোবর ব্যবহার করা যাবে না, বীজামৃতের সর্বোচ্চ ফল পেতে অবশ্যই দেশী জাতের গরুর টাটকা গোবর ব্যবহার করা সঠিক, কারণ এতে অণুজীবের সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি থাকে।
  • নাড়ানোর দিক: ইচ্ছামতো ডানে-বামে নাড়ানো যাবে না। বীজামৃত (Beejamrut) মিশ্রণটি সবসময় ঘড়ির কাঁটার দিকে (Clockwise) নাড়ানো সঠিক পদ্ধতি , এটি অণুজীবের কর্মক্ষমতা বাড়ায়।

আড়ও দেখুন জৈব কীটবিতারক(কীটনাশক) অগ্নিঅস্ত্র (Agniastra) কি? কিভাবে তৈরি করবেন ও ব্যবহার করবেন?

বীজ শোধনে ব্যবহারের সঠিক পদ্ধতি

  • বড় বীজের জন্য (ধান, গম, ভুট্টা, ডাল): বীজগুলো একটি চটের ওপর ছড়িয়ে দিন। তার ওপর বীজামৃত (Beejamrut) ছিটিয়ে আলতো করে মাখান যাতে বীজের ওপর একটি পাতলা স্তর পড়ে। এবার ছায়ায় শুকিয়ে নিয়ে বপন করুন।
  • ছোট বীজের জন্য (লঙ্কা, বেগুন, টমেটো): বীজগুলো একটি কাপড়ে বেঁধে কয়েক মিনিট মিশ্রণে ডুবিয়ে রাখুন, তারপর ছায়ায় শুকিয়ে নিন।
  • চারার ক্ষেত্রে: চারা রোপণের আগে এর শিকড়গুলো ৫ মিনিট এই মিশ্রণে ডুবিয়ে রাখুন। এতে ‘শিকড় পচা’ রোগ হবে না।

রাসায়নিকের চেয়ে কেন ভালো? লাভের হিসাব

রাসায়নিক শোধক (যেমন- কার্বেন্ডাজিম) কেবল রোগ প্রতিরোধ করে, কিন্তু গাছের বৃদ্ধিতে কোনো ভূমিকা রাখে না। উপরন্তু এটি মাটির পরম বন্ধু অণুজীবদের মেরে ফেলে। লাভের অঙ্ক:

  • শূন্য খরচ: আপনার বাড়ির উপকরণ দিয়েই এটি তৈরি হচ্ছে। বিঘা প্রতি আপনার ২০০-৫০০ টাকা সাশ্রয় হবে।
  • অঙ্কুরোদগম: সাধারণ বীজের তুলনায় বীজামৃত শোধিত বীজের অঙ্কুরোদগমের হার ৯৫% পর্যন্ত হয়।
  • ফলন: সুস্থ শিকড় মানেই শক্তিশালী গাছ। গবেষণায় দেখা গেছে, বীজামৃত (Beejamrut) ব্যবহার করলে ফসলের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে এবং ফলন ১৫-২০% বৃদ্ধি পায়।

আড়ও দেখুন: জীবামৃত (Jeevamrut): প্রাকৃতিক কৃষির মহাবিজ্ঞান ও মাটির হারানো সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের সূত্র

উপসংহার (Conclusion):

আমরা যদি আমাদের মাটিকে বিষমুক্ত করতে চাই, তবে তার শুরুটা হতে হবে বিষমুক্ত বীজ দিয়ে। বীজামৃত (Beejamrut) কেবল একটি পদ্ধতি নয়, এটি প্রকৃতির প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা। আজই আপনার ছোট একখণ্ড জমিতে এটি পরীক্ষা করে দেখুন, আপনি নিজেই চারা গাছের সতেজতা দেখে অবাক হবেন। মনে রাখবেন, সুস্থ বীজই দেয় সমৃদ্ধ ফসলের নিশ্চয়তা।

গুগলে সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন: বীজামৃত কি ফ্রিজে রাখা যায়?

উত্তর: না, এটি জীবন্ত অণুজীবের মিশ্রণ। এটি সবসময় সাধারণ তাপমাত্রায় ছায়াযুক্ত স্থানে রাখতে হবে।

প্রশ্ন: বাজার থেকে কেনা বিষ মাখানো বীজে কি এটি কাজ করবে?

উত্তর: হ্যাঁ, তবে প্রথমে বীজগুলো সাধারণ জলে ধুয়ে বিষমুক্ত করে তারপর বীজামৃত মাখালে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়।

প্রশ্ন: বীজামৃত কতদিন ভালো থাকে?

উত্তর: এটি তৈরির ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবহার করা সবচেয়ে কার্যকর।

তথ্যসূত্র

  • সুভাষ পালেকর ন্যাচারাল ফার্মিং (SPNF)
  • ড. হরিওম, আচার্য দেবব্রত হরিয়ানা রাজ্যপাল, কুরুক্ষেত্র গুরুকুল গবেষণা কেন্দ্র।
  • ন্যাশনাল পোর্টাল অন ন্যাচারাল ফার্মিং(NMNF) ভারত সরকার।
Spread the love

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top