Beejamrit: বীজামৃত কিভাবে তৈরি করে? বীজামৃতের প্রস্তুতি- বীজামৃতের প্রয়োগ ও ব্যাবহার

বীজামৃত (Bijamrit) তৈরি পদ্ধতি: প্রাকৃতিক উপায়ে বীজ শোধনের নিয়ম
বীজামৃত (Bijamrit) তৈরি পদ্ধতি-তে উপকরণ ও বীজ শোধন সাদৃশ্য।

ভূমিকা (Introduction): চাষের শুরুটা যদি ভুল হয়, তবে হাজার টাকা খরচ করেও শেষ রক্ষা হয় না। বাজার থেকে দামী বীজ বা সার দিলেও দেখা যায় চারা গজানোর পরেই পচে যাচ্ছে। কেন এমন হয়? কারণ আমরা বীজের ভেতরের প্রাণশক্তি রক্ষা করতে ভুলে যাই। এখানেই কাজ করে বীজামৃত (Bijamrit) তৈরি পদ্ধতি বা Bijamrit Preparation Method

এটি কেবল একটি জৈব মিশ্রণ নয়, বরং ফসলের জন্য একটি জীবন্ত সুরক্ষা কবচ। মূলত বীজামৃত কিভাবে কাজ করে তা জানলে আপনিও রাসায়নিক বিষ ছাড়তে বাধ্য হবেন। বর্তমানে সফল প্রাকৃতিক কৃষকরা এই বীজামৃত প্রস্তুতিসঠিক বীজামৃত তৈরির নিয়ম মেনে কাজ করছেন। ঘরোয়া উপকরণে তৈরি এই মিশ্রণ ফলন ২০% পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে। চলুন জেনে নিই সেই বিজ্ঞানের কথা যা আপনার চাষের ধারণা বদলে দেবে।

বীজামৃত (Bijamrito) তৈরি পদ্ধতি (১০০ কেজি বীজের জন্য)

বীজামৃত প্রস্তুতির জন্য সঠিক অনুপাত মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। ১০০ কেজি বীজ শোধনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

  • বট বা পাকুড় গাছের গোড়ার মাটি: এক মুঠো (যা অণুজীবের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে)
  • জল: ২০ লিটার
  • দেশী গোমূত্র: ৫ লিটার (এটি প্রাকৃতিক ছত্রাকনাশক হিসেবে কাজ করে)
  • দেশী গোবর: ৫ কেজি (উপকারী ব্যাকটেরিয়ার আধার)
  • ভেজানো চুন: ৫০ গ্রাম (এটি বীজামৃত তৈরির নিয়ম অনুযায়ী ক্যালসিয়ামের জোগান দেয়)
  • এই উপকরণগুলো দিয়ে bijamrit preparetion করলে বীজের অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা অনেক বেড়ে যায়।

আড়ও দেখুন ১২ মাসে সবজি চাষ করার পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা: কৃষকের লাভজনক ক্যালেন্ডার

বীজামৃত (bijamrit) তৈরি পদ্ধতি:  প্রস্তুতি উপকরন তালিকা।
বীজামৃত তৈরি পদ্ধতি: প্রস্তুতি উপকরন তালিকা।

বীজামৃত (Bijamrit) তৈরি পদ্ধতি

বীজামৃত প্রস্তুতির ধাপগুলো নিচে দেওয়া হলো:

একটি প্লাস্টিকের ড্রামে ২০ লিটার জলের সাথে ৫ কেজি গোবর এবং ৫ লিটার গোমূত্র মেশান। এবার আগে থেকে ভিজিয়ে রাখা চুনের জল এবং এক মুঠো মাটি যোগ করুন। এটিই মূলত সঠিক বীজামৃত তৈরির নিয়ম।

মিশ্রণটি ভালো করে নাড়িয়ে একটি পাতলা কাপড় বা চট দিয়ে মুখ ঢেকে ২৪ ঘণ্টা ছায়ায় রেখে দিন। দিনে দুবার নাড়িয়ে দিন। ২৪ ঘণ্টা পর বীজামৃত (Bijamrit) ব্যবহারের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। সঠিক সময়ে এটি তৈরি করলে বীজামৃত কিভাবে কাজ করে তার সেরা ফলাফল আপনি দেখতে পাবেন।

বীজ শোধনে ব্যবহারের সঠিক পদ্ধতি

বীজামৃত প্রয়োগের নিয়ম মেনে বীজ শোধন করলে ফসলের রোগবালাই অনেক কমে যায়। মূলত বীজামৃত (Bijamrit) তৈরি পদ্ধতি সফল হওয়ার পর নিচে দেওয়া উপায়ে এটি ব্যবহার করতে হয়:

  • বড় বীজের জন্য (ধান, গম, ভুট্টা, ডাল): বীজগুলো একটি চটের ওপর ছড়িয়ে দিন। তার ওপর তৈরি করা বীজামৃত (Bijamrito) ছিটিয়ে আলতো করে মাখান যাতে বীজের ওপর একটি পাতলা স্তর পড়ে। এটিই মূলত বীজামৃত (Bijamrito) তৈরি পদ্ধতি অনুযায়ী শোধনের সেরা উপায়। এবার ছায়ায় শুকিয়ে নিয়ে বপন করুন।
  • ছোট বীজের জন্য (লঙ্কা, বেগুন, টমেটো): বীজগুলো একটি কাপড়ে বেঁধে কয়েক মিনিট মিশ্রণে ডুবিয়ে রাখুন। এটি বীজামৃত ব্যবহারের নিয়ম অনুযায়ী ছোট বীজের অঙ্কুরোদগম বাড়াতে সাহায্য করে। এই বীজামৃত (Bijamrit) তৈরি পদ্ধতি ছোট বীজের সুরক্ষায় দারুণ কার্যকর। এরপর ছায়ায় শুকিয়ে নিন।
  • চারার ক্ষেত্রে: চারা রোপণের আগে এর শিকড়গুলো ৫ মিনিট এই মিশ্রণে ডুবিয়ে রাখুন। চারা শোধনেও এই বীজামৃত (Bijamrito) তৈরি পদ্ধতি মেনে চললে ‘শিকড় পচা‘ রোগ হবে না। এটিই হলো বীজামৃত প্রস্তুতির পর প্রয়োগের অন্যতম ধাপ।

বীজামৃত (Bijamrito) কী? এর বায়োলজিক্যাল ও বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব

বীজামৃত (Bijamrit) তৈরি পদ্ধতি আসলে কোটি কোটি উপকারী অণুজীবের একটি ককটেল। যারা জানতে চান বীজামৃত কিভাবে কাজ করে, তাদের জন্য এর প্রতিটি উপাদানের পেছনের বিজ্ঞান নিচে দেওয়া হলো:

  • দেশী গোবর: গোবরে থাকা ‘লিগনোসেলুলোলিটিক‘ ব্যাকটেরিয়া বীজের শক্ত আবরণকে নরম করে, ফলে অঙ্কুরোদগম দ্রুত হয়।
  • দেশী গোমূত্র: এটি প্রাকৃতিক অ্যান্টিবায়োটিক। এতে থাকা এনজাইম বীজকে ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। এটি bijamrit preparetion Method-এর অন্যতম প্রধান উপাদান।
  • চুন: চুন বীজের চারপাশের অম্লত্ব নিয়ন্ত্রণ করে এবং চারাকে ক্যালসিয়াম দেয়। এটি বীজামৃত ব্যবহারের নিয়ম অনুযায়ী পিএইচ (pH) ব্যালেন্স ঠিক রাখে।
  • বট/পাকুড় গাছের তলার মাটি: এই মাটিতে থাকা ‘রাইজোবিয়াম’ ও ‘আজোটোব্যাকটর’ চারা জন্মানোর সাথে সাথেই বাতাস থেকে নাইট্রোজেন টেনে শিকড়ে জোগান দেয়। এটি বীজামৃত প্রস্তুতির সময় অণুজীবের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।

আড়ও দেখুন: জীবামৃত (Jeevamrut): প্রাকৃতিক কৃষির মহাবিজ্ঞান ও মাটির হারানো সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের সূত্র

রাসায়নিকের চেয়ে কেন ভালো? লাভের হিসাব

রাসায়নিক শোধক (যেমন- কার্বেন্ডাজিম) কেবল রোগ প্রতিরোধ করে, কিন্তু গাছের বৃদ্ধিতে কোনো ভূমিকা রাখে না। উপরন্তু এটি মাটির পরম বন্ধু অণুজীবদের মেরে ফেলে। কিন্তু বীজামৃত (Bijamrit) তৈরি পদ্ধতি-তে যদি লাভের অঙ্ক দেখা যায় :

  • শূন্য খরচ: আপনার বাড়ির উপকরণ দিয়েই এটি তৈরি হচ্ছে। বিঘা প্রতি আপনার ২০০-৫০০ টাকা সাশ্রয় হবে।
  • অঙ্কুরোদগম: সাধারণ বীজের তুলনায় বীজামৃত শোধিত বীজের অঙ্কুরোদগমের হার ৯৫% পর্যন্ত হয়।
  • ফলন: সুস্থ শিকড় মানেই শক্তিশালী গাছ। গবেষণায় দেখা গেছে, বীজামৃত (Bijamit) ব্যবহার করলে ফসলের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে এবং ফলন ১৫-২০% বৃদ্ধি পায়।

কোথায় এবং কারা ব্যবহার করছেন?

বর্তমানে অন্ধ্রপ্রদেশ, হিমাচল প্রদেশ এবং হরিয়ানার লাখ লাখ কৃষক সরকারি উদ্যোগে এই পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন। বিশেষ করে কুরুক্ষেত্রের ড. হরিওম এবং প্রাকৃতিক কৃষির জনক সুভাষ পালেকর জির তত্ত্বাবধানে (ZBNF) পরিচালিত খামার গুলোতে এর ব্যাপক সাফল্য দেখা গেছে।

যারা সঠিক বীজামৃত (Bijamrit) তৈরি পদ্ধতি এবং বীজামৃত তৈরির নিয়ম অনুসরণ করছেন, তাদের জমিতে চারা পচা রোগ (Damping off) নেই বললেই চলে। হিমাচল প্রদেশের পাহাড়ি আপেল থেকে শুরু করে বাংলার ধান ও সবজি চাষে বীজামৃত ব্যবহারের নিয়ম ও এর জয়জয়কার এখন তুঙ্গে।

কৃষি সুত্র সতর্কতা ও পরামর্শ

  • চুন মিশানোর পদ্ধতি: চুন সরাসরি ড্রামে ঢেলে দেওয়া ভুল পদ্ধতি হব। চুন আলাদা ১ লিটার জলে আগের রাতে ভিজিয়ে রেখে তার ওপরের পরিষ্কার জলটুকু মেশানো সঠিক, এতে অণুজীবের কোনো ক্ষতি হয় না।
  • গোবর বাছাই: যেকোনো গরুর গোবর ব্যবহার করা যাবে না, বীজামৃতের সর্বোচ্চ ফল পেতে অবশ্যই দেশী জাতের গরুর টাটকা গোবর ব্যবহার করা সঠিক, কারণ এতে অণুজীবের সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি থাকে।
  • নাড়ানোর দিক: ইচ্ছামতো ডানে-বামে নাড়ানো যাবে না। বীজামৃত (Bijamrit) মিশ্রণটি সবসময় ঘড়ির কাঁটার দিকে (Clockwise) নাড়ানো সঠিক পদ্ধতি , এটি অণুজীবের কর্মক্ষমতা বাড়ায়।

আড়ও দেখুন জৈব কীটবিতারক(কীটনাশক) অগ্নিঅস্ত্র (Agniastra) কি? কিভাবে তৈরি করবেন ও ব্যবহার করবেন?

উপসংহার (Conclusion):

আমরা যদি আমাদের মাটিকে বিষমুক্ত করতে চাই, তবে তার শুরুটা হতে হবে বিষমুক্ত বীজ দিয়ে। তাই সঠিকভাবে বীজামৃত (Bijamrit) তৈরি পদ্ধতি আয়ত্ত করা প্রতিটি কৃষকের জন্য জরুরি।

বীজামৃত (Bijamrito) কেবল একটি পদ্ধতি নয়, এটি প্রকৃতির প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা। আজই আপনার ছোট একখণ্ড জমিতে এই বীজামৃত তৈরির নিয়ম পরীক্ষা করে দেখুন, আপনি নিজেই চারা গাছের সতেজতা দেখে অবাক হবেন। মনে রাখবেন, বীজামৃত প্রস্তুতিসঠিক বীজামৃত প্রয়োগের নিয়ম মেনে চলা সুস্থ বীজ এবং সমৃদ্ধ ফসলের নিশ্চয়তা দেয়।

গুগলে সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন: বীজামৃত কি ফ্রিজে রাখা যায়?

উত্তর: না, এটি জীবন্ত অণুজীবের মিশ্রণ। এটি সবসময় সাধারণ তাপমাত্রায় ছায়াযুক্ত স্থানে রাখতে হবে।

প্রশ্ন: বাজার থেকে কেনা বিষ মাখানো বীজে কি বীজামৃত কাজ করবে?

উত্তর: হ্যাঁ, তবে প্রথমে বীজগুলো সাধারণ জলে ধুয়ে বিষমুক্ত করে তারপর বীজামৃত মাখালে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়।

প্রশ্ন: বীজামৃত কতদিন ভালো থাকে?

উত্তর: এটি তৈরির ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবহার করা সবচেয়ে কার্যকর।

তথ্যসূত্র

  • সুভাষ পালেকর ন্যাচারাল ফার্মিং (SPNF)
  • ড. হরিওম, আচার্য দেবব্রত হরিয়ানা রাজ্যপাল, কুরুক্ষেত্র গুরুকুল গবেষণা কেন্দ্র।
  • ন্যাশনাল পোর্টাল অন ন্যাচারাল ফার্মিং(NMNF) ভারত সরকার।
  • ZBNF (Zero Budget Natural Farming)
Spread the love

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top