ড্রাগন ফলের চাষ পদ্ধতি: আধুনিক ড্রাগন ফল চাষে গাছের পরিচর্যা

বাণিজ্যিকভাবে ড্রাগন ফলের চাষ পদ্ধতি এবং রাতে হাতে পরাগায়ন বা hand pollination করার দৃশ্য।
বাণিজ্যিক ভাবে ড্রাগন ফলের চাষ পদ্ধতি এবং রাতে হাতে পরাগায়ন বা hand pollination করার দৃশ্য।

সূচিপত্র

ভূমিকা: ড্রাগন ফল বা ‘কমলম’ কেন চাষ করবেন?

ড্রাগন ফল, যা বর্তমানে ভারতে ‘কমলম’ নামে পরিচিত, এটি কেবল একটি বিদেশি ফল নয়, বরং বর্তমান সময়ের অন্যতম লাভজনক অর্থকরী ফসল। ক্যাকটাস গোত্রীয় এই ফলটি তার অনন্য স্বাদ এবং ঔষধি গুণের জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এর বাজার চাহিদা এবং উচ্চমূল্যের কারণে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম এবং বাংলাদেশের কৃষকদের কাছে এটি আয়ের প্রধান উৎস হয়ে উঠছে। ড্রাগন ফলের চাষ পদ্ধতি কেবল একদিনের পরিকল্পনা নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ। যদি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মাটির স্বাস্থ্যের সঠিক পরিচর্যা করা হয় এবং গাছকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি প্রদান করা যায়, তবে একটি ড্রাগন বাগান থেকে একটানা ২৫ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত বাণিজ্যিক ফলন এবং লাভ পাওয়া সম্ভব। অর্থাৎ, একবার সঠিক বিনিয়োগ করলে এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম আয়ের উৎস হয়ে দাঁড়াতে পারে।

উৎপত্তিস্থল ও বৈজ্ঞানিক পরিচিতি

ড্রাগন ফলের আদি নিবাস হলো মেক্সিকো, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা। এর বৈজ্ঞানিক নাম Hylocereus spp.। বর্তমানে ভিয়েতনাম এই ফলের বিশ্ববাজারে নেতৃত্ব দিলেও ভারতের মাটি ও আবহাওয়া ড্রাগন ফলের চাষ পদ্ধতির জন্য অত্যন্ত উপযোগী বলে প্রমাণিত হয়েছে।

চাষের সময় ও আবহাওয়া: পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও বাংলাদেশের উপযোগিতা

ড্রাগন ফল মূলত গ্রীষ্মমন্ডলীয় এবং উপ-গ্রীষ্মমন্ডলীয় আবহাওয়ার ফসল।

  • তাপমাত্রা: ২০°C থেকে ৩০°C তাপমাত্রা এর বৃদ্ধির জন্য আদর্শ। তবে উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ী ও সমতল অঞ্চলের ৬°C থেকে ৪০°C পর্যন্ত তাপমাত্রা এই গাছ সহ্য করতে পারে।
  • উপযোগিতা: পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম ও বাংলাদেশের আবহাওয়া ড্রাগন চাষের জন্য স্বর্গরাজ্য। বিশেষ করে মে থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত আমাদের এখানে যে আবহাওয়া থাকে, তা এই ফলের ফলনের জন্য সবচেয়ে ভালো।

ড্রাগনের ফলের চারা রোপনের সময়

ড্রাগন ফলের চাষ পদ্ধতি-তে চারা রোপণের জন্য সবচেয়ে উপযোগী সময় হলো বর্ষাকালের ঠিক আগে (মে থেকে জুন মাস) এবং বর্ষাকালের ঠিক পরে (সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর মাস)।

চাষের সুবিধার্থে এবং গাছের ভালো বৃদ্ধির জন্য নিচের বিষয়গুলো খেয়াল রাখা জরুরি:

  • সেরা সময় (মে-জুন এবং সেপ্টেম্বর-অক্টোবর): এই সময়ে বাতাসে আর্দ্রতা ভালো থাকে এবং তাপমাত্রা সহনশীল থাকে, যার ফলে চারার শিকড় খুব দ্রুত মাটির সাথে সেট হয়ে যায়।
  • যে সময়ে লাগানো যাবে না: অতিরিক্ত শীতের সময় (ডিসেম্বর-জানুয়ারি) এবং প্রচণ্ড গরমের সময় (এপ্রিল মাস) ড্রাগনের চারা রোপণ না করাই ভালো। অতিরিক্ত শীতে গাছের বৃদ্ধি থমকে যায় এবং প্রচণ্ড গরমে কাটিং বা চারা শুকিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
  • বর্ষাকালের সতর্কতা: যদি আপনি বর্ষার মাঝখানে চারা লাগান, তবে খেয়াল রাখবেন যেন গাছের গোড়ায় কোনোভাবেই পানি জমে না থাকে। পানি জমলে ক্যাকটাস জাতীয় এই গাছের গোড়া পচে চারা নষ্ট হয়ে যাবে।

ড্রাগন ফলের উন্নত জাতসমূহ

পিডিএফ-এর তথ্য অনুসারে ভারতে মূলত তিনটি প্রজাতির চাষ বেশি হয়:

  • Hylocereus polyrhizus: লাল খোসা ও লাল শাঁস (যেমন- জুম্বো রেড, ভিয়েতনাম রেড)।
  • Hylocereus undatus: লাল খোসা ও সাদা শাঁস।
  • Hylocereus megalanthus: হলুদ খোসা ও সাদা শাঁস (এটি কিছুটা দুষ্পাপ্য)। পরামর্শ: বাণিজ্যিক চাষের ক্ষেত্রে লাল শাঁসের জাতগুলো (Red Flesh) বাজারে বেশি জনপ্রিয়।

মাটির ধরণ ও নির্বাচন

জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ বেলে-দোআঁশ মাটি ড্রাগন চাষের জন্য সেরা। মাটির পিএইচ (pH) ৫.০ থেকে ৭.০-এর মধ্যে থাকা উচিত। তবে মনে রাখবেন, জমি যেন নিচু না হয়; কারণ ড্রাগন গাছ জলাবদ্ধতা একদম সহ্য করতে পারে না।

রোপণ দূরত্ব ও চারার সংখ্যা (বিঘা প্রতি হিসেব)

এক বিঘা (৩৩ শতক) জমিতে ড্রাগন চাষের জন্য সাধারণত ৩মি x ৩মি দূরত্বে খুঁটি পুঁততে হয়।

  • খুঁটি: ৩৩ শতকে প্রায় ২৮০-৩০০টি খুঁটি প্রয়োজন।
  • চারা: প্রতিটি খুঁটির গোড়ায় ৪টি করে চারা দিলে বিঘা প্রতি প্রায় ১,১২০ থেকে ১,২০০টি চারা লাগবে।

কেমন চারা ও খুঁটি নেবেন?

চারা নির্বাচনের ক্ষেত্রে সব সময় বিশ্বস্ত নার্সারি বা মাদার গাছ থেকে নেওয়া শিকড়যুক্ত ‘কাটিং‘ ব্যবহার করুন।

খুঁটি: ড্রাগন গাছ ৩০-৪০ বছর বাঁচে, তাই খুঁটি হতে হবে অত্যন্ত মজবুত। আরসিসি (RCC) বা কংক্রিটের খুঁটি ব্যবহার করুন। খুঁটির উচ্চতা ৫-৬ ফুট হওয়া উচিত এবং মাথায় একটি বাইকের পুরনো টায়ার বা কংক্রিটের রিং লাগাতে হবে যাতে ডালগুলো ছাতার মতো ঝুলে থাকতে পারে।

ড্রাগন গাছ রোপনের মাটি তৈরি ও সার প্রয়োগ

ড্রাগন ফলের চাষ পদ্ধতি-তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সঠিক মাটি তৈরি ও সার প্রয়োগ। যেহেতু এটি ক্যাকটাস জাতীয় গাছ, তাই এর জন্য এমন মাটি প্রয়োজন যা জল ধরে রাখবে না, কিন্তু পুষ্টিতে ভরপুর থাকবে।

বাণিজ্যিক চাষ বা মাঠের জন্য মাদার পিট (গর্ত) তৈরি করার নিখুঁত মাটি প্রস্তুত প্রণালী নিচে দেওয়া হলো:

১. মাটি তৈরির মূল উপাদান ও অনুপাত

একটি পিলারের চারপাশের গর্তের মাটির জন্য নিচের অনুপাতে মিশ্রণটি তৈরি করতে হবে:

  • দোআঁশ বা বেলে-দোআঁশ মাটি: ৫০% (ড্রাগন চাষের জন্য জল নিকাশি ক্ষমতাসম্পন্ন এই মাটি সবচেয়ে উত্তম)।
  • জৈব সার (গোবর সার বা ভার্মিকম্পোস্ট): ৩০% (মাটি নরম ও উর্বর করতে)।
  • নদীর সাদা বা লাল বালি: ১০% (মাটির জল নিকাশি ব্যবস্থা বা ড্রেনেজ আরও উন্নত করার জন্য)।
  • ধানের তুষ বা কোকোপিট: ১০% (মাটি হালকা রাখতে এবং শিকড়ের অক্সিজেন চলাচল বাড়াতে)।

২. প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান ও রাসায়নিক ডোজ

মাটি ভালো করে মেশানোর সময় নিচের উপাদানগুলো যোগ করতে হবে প্রতি পিলারের গর্তের জন্য। চাষের নিয়ম অনুযায়ী ডোজটি বোল্ড করে পাশে সঠিক পরিমাণ উল্লেখ করা হলো:

  • নিম খোল : ১০০ থেকে ১৫০ গ্রাম (এটি মাটির ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া ও কৃমি দূর করতে সাহায্য করে)।
  • হাড়ের গুঁড়ো : ২০০ গ্রাম (দীর্ঘদিন ধরে গাছে ফসফরাস ও ক্যালসিয়ামের জোগান দিতে)।
  • শিং কুচি: ১০০ গ্রাম (ধীরে ধীরে নাইট্রোজেন সরবরাহ করার জন্য)।
  • সিঙ্গেল সুপার ফসফেট : ১০০ গ্রাম (শিকড়ের দ্রুত বৃদ্ধির জন্য)।
  • মিউরেট অব পটাশ: ৫০ গ্রাম (গাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং কান্ডের শক্তি বাড়াতে)।
  • ট্রাইকোডার্মা ভিরিডি – ছত্রাকনাশক: ১০-১৫ গ্রাম (গোড়া পচা বা ফাঙ্গাসের আক্রমণ থেকে চারাকে বাঁচাতে এটি মাটির সাথে মেশানো বাধ্যতামূলক)।

৩. মাটি প্রস্তুত করার সঠিক পদ্ধতি

  • ধাপ ১ (মিশ্রণ): ওপরের সমস্ত উপাদান (মাটি, বালি, জৈব সার এবং রাসায়নিক সার) কোদাল দিয়ে খুব ভালো করে একে অপরের সাথে মিশিয়ে নিন।
  • ধাপ ২ (গর্ত ভরাট): পিলারের চারপাশে খুঁড়ে রাখা ২ ফুট × ২ ফুট × ১.৫ ফুট সাইজের গর্তটি এই তৈরিকৃত মিশ্রণ দিয়ে ভরাট করে দিন। মাটি ভরাট করার সময় হালকা চেপে দেবেন যাতে ভেতরে ফাঁকা বাতাস না থাকে।
  • ধাপ ৩ (জল দেওয়া ও ফেলে রাখা): গর্ত ভরাট করা হয়ে গেলে ভালো করে জল দিয়ে মাটি ভিজিয়ে দিন। এভাবে ১০ থেকে ১২ দিন গর্তটিকে রেখে দিতে হবে। এই সময়ে সারের গরম ভাব কেটে যাবে এবং মাটির ভেতরের উপকারী অণুজীব সচল হয়ে উঠবে।

১২ দিন পর মাটি যখন চারা লাগানোর জন্য পুরোপুরি তৈরি হয়ে যাবে, তখনই কেবল ড্রাগনের কাটিং বা চারা সেখানে ২ থেকে ৩ ইঞ্চি গভীরতায় রোপণ করবেন।

ড্রাগন ফলের গাছ কিভাবে লাগায়

  • চারা শোধন: চারা লাগানোর আগে শিকড় ‘বীজামৃত’ দিয়ে শোধন করে নিলে চারা পচা রোগ হয় না।
  • চারার সংখ্যা: প্রতিটি পিলারের চারপাশে বা চার কোণায় ৪টি চারা লাগাতে হয়।
  • গভীরতা: নার্সারি থেকে কেনা চারা বা ডাল থেকে তৈরি কাটিংটি মাটির নিচে খুব বেশি গভীরে বসানো যাবে না। মাত্র ২ থেকে ৩ ইঞ্চি (সর্বোচ্চ ৪ ইঞ্চি) মাটির নিচে ঢুকিয়ে সোজা করে রোপণ করতে হবে। বেশি গভীরে পুঁতলে চারার গোড়া পচে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
  • বাঁধাই: চারা লাগানোর পরপরই লতাগুলোকে পিলারের গায়ে আলতো করে প্লাস্টিকের সুতো বা রশি দিয়ে বেঁধে দিতে হবে, যাতে সেগুলো পিলারকে আঁকড়ে ধরে সোজা ওপরের দিকে উঠতে পারে।
এক বিঘা জমিতে ড্রাগন চাষে জৈব সার ও জীবামৃত প্রয়োগ করে গাছের পরিচর্যা করার চিত্র।
এক বিঘা জমিতে ড্রাগন চাষে জৈব সার ও ঘনজীবামৃত প্রয়োগ করে গাছের পরিচর্যা করার চিত্র।

ড্রাগন ফল গাছের পরিচর্যা ও জল সেচ

চারা রোপনের পর প্রথম এক বছর ও পূর্ণাঙ্গ ড্রাগন ফল গাছের পরিচর্যা একটু আলাদা হয়:

ড্রাগন ফল চারা রোপনের প্রথম এক বছর

  • সূর্যের আলো: ড্রাগন গাছের জন্য প্রচুর সূর্যালোক প্রয়োজন। তাই টবটি এমন জায়গায় রাখুন (যেমন- ছাদ বা খোলা মাঠ) যেখানে সারাদিনে কমপক্ষে ৬-৮ ঘণ্টা সরাসরি রোপ বা সূর্যের আলো পায়।
  • জল দেওয়ার নিয়ম: ড্রাগন গাছে জল দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে। টবের মাটি পুরোপুরি শুকিয়ে গেলে তবেই জল দিন। গাছের গোড়ায় জল যেন কোনোভাবেই জমে না থাকে, জল জমলে শিকড় পচে গাছ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
  • ছাঁটাই (Pruning): গাছটি খুঁটির মাথায় পৌঁছে গেলে (সাধারণত ৫-৬ ফুট) এর ডগাটি কেটে দিতে হবে। এর ফলে চারপাশ থেকে নতুন অনেকগুলো লতানো ডাল বের হবে এবং সেই ঝুলন্ত ডালগুলোতেই পরবর্তী সময়ে ফুল ও ফল আসবে।

পূর্ণবয়স্ক ড্রাগন ফল গাছের পরিচর্যা

একটি পূর্ণবয়স্ক ড্রাগন ফল গাছ (যার বয়স ১ বছরের বেশি) থেকে প্রচুর পরিমাণে এবং বড় সাইজের ফল পেতে গেলে ফুল ও ফল আসার সময়ে বিশেষ পরিচর্যা প্রয়োজন। নিচে আপনার উল্লেখ করা প্রতিটি বিষয়—সার, সেচ, ফুল-ফল আসার পর প্রুনিং এবং আলো—বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. ফুল ও ফল আসার পর সার প্রয়োগ

পূর্ণবয়স্ক গাছে এপ্রিল-মে মাস থেকে ফুল আসা শুরু হয় এবং অক্টোবর পর্যন্ত ফলন চলে। এই সময়ে গাছের প্রচুর পটাশ ও ফসফরাসের প্রয়োজন হয়। প্রতিটি পিলারের (৪টি গাছের জন্য) গোড়ায় নিচে দেওয়া ডোজ অনুযায়ী সার দিন:

  • জৈব সার: প্রতি ২ মাস পর পর পিলারের গোড়ায় ৪-৫ কেজি ভালো করে পচা গোবর সার বা কেঁচো সার (ভার্মিকম্পোস্ট) মাটির সাথে মিশিয়ে দিন।
  • জীবামৃত: রোপণের পর প্রতি ১৫ দিন অন্তর নিয়মিত জল-এর সাথে জীবামৃত মিশিয়ে দিতে হবে। এটি মাটির অণুজীবের সংখ্যা বাড়াতে জাদুর মতো কাজ করে। ( গাছের গোড়ায় খড় বা আগাছা দিয়ে ঢেকে আচ্ছাদন দিলে ভাল কাজ করে )

আড়ও দেখুন জীবামৃত (Jeevamrut): প্রাকৃতিক কৃষির মহাবিজ্ঞান ও মাটির হারানো সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের সূত্র

রাসায়নিক সার (ফুল-ফল আসার সময়):

নিয়মিত জীবামৃত ও জৈব সার প্রয়োগ করলে রাসায়নিক সারের প্রয়োজন হয় না। এটা আপনার ঐচ্ছিক বিষয়। আর যদি জীবামৃত না প্রয়োগ হয় তবে এই ডোজ টি দিতে হবে।

  • ইউরিয়া: ১৪০ গ্রাম ( গাছের সতেজতা শক্তি বজায় রাখতে)
  • মিউরেট অব পটাশ: ১৪০ গ্রাম (ফলের সাইজ বড় করতে এবং মিষ্টি বাড়াতে)।
  • সিঙ্গেল সুপার ফসফেট: ৫০ গ্রাম (শিকড় ও গাছের শক্তি বজায় রাখতে)।
  • মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট বা অণুখাদ্য: ফুল আসার আগে এবং ফল ধরার পর (যেমন—বোরাক্স বা বোরন ১-২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে গুলে) গাছে স্প্রে করলে ফুল ও ফল ঝরে যাওয়া বন্ধ হয়।

২. ড্রাগন গাছে সেচ ব্যবস্থাপনা

ড্রাগন ক্যাকটাস জাতীয় গাছ হলেও এর ভালো ফলনের জন্য ড্রাগন ফল গাছের পরিচর্যায় পরিমিত জল একান্ত প্রয়োজন।

  • সনাতন পদ্ধতি: অনেক চাষি নালা তৈরি করে প্লাবন সেচ দেন। তবে ড্রাগনের ক্ষেত্রে এটি ঝুঁকিপূর্ণ। অতিরিক্ত জল গোড়ায় জমলে ‘রুট রট’ বা মূল পচা রোগ হয়। যদি সনাতন পদ্ধতিতে সেচ দিতেই হয়, তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন মাটি শুধু ভেজা থাকে, কাদা না হয়।
  • ড্রিপ বা বিন্দু সেচ পদ্ধতি (আধুনিক): ড্রাগন চাষের জন্য এটিই সবচেয়ে বিজ্ঞানসম্মত উপায়। এতে পাইপের মাধ্যমে সরাসরি গাছের গোড়ায় ফোঁটায় ফোঁটায় জল পড়ে। এতে জলের অপচয় কম হয় এবং আর্দ্রতা বজায় থাকে। গ্রীষ্মকালে প্রতিটি পোল বা খুঁটির জন্য প্রতিদিন গড়ে ১.৫ থেকে ২ লিটার জল দেওয়া আদর্শ।
  • জীবামৃত প্রয়োগ: সেচের জল-এর সাথে জীবামৃত মিশিয়ে সরাসরি গোড়ায় দেওয়া যায় (যাকে ফার্টিগেশন বলে)। প্রতি মাসে অন্তত একবার ড্রাম থেকে সেচের লাইনে জীবামৃত ছেড়ে দিলে মাটির উর্বরতা এবং গাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায়।
  • ফুল আসার আগে: মার্চ-এপ্রিল মাসে যখন গাছে কুঁড়ি বা ফুল আসার সময় হয়, তখন পানি দেওয়া কিছুটা কমিয়ে দিতে হবে। মাটি সামান্য শুকিয়ে থাকলে গাছে ফুল আসার উদ্দীপনা বাড়ে।
  • ফুল ও ফল ধরার পর: কুঁড়ি একটু বড় হয়ে গেলে এবং ফল সেট হয়ে গেলে মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকতে হবে। মাটি যেন একদম শুকিয়ে না যায়। তবে মনে রাখবেন, গাছের গোড়ায় যেন কোনোভাবেই জল জমে না থাকে। পানি জমলে ফাঙ্গাস লেগে ফুল-ফল পচে যেতে পারে।
  • ফল পাকার সময়: ফল তোলার বা হারভেস্ট করার ঠিক ৫-৭ দিন আগে পানি দেওয়া একদম বন্ধ করে দিতে হবে। এই সময়ে বেশি জল দিলে ফল ফেটে যেতে পারে এবং ফলের মিষ্টি ভাব কমে যায়।

৩. ফুল ও ফল আসার পর প্রুনিং বা ডাল ছাঁটাই (Pruning)

পূর্ণবয়স্ক গাছে ফলন ভালো পেতে প্রুনিং অত্যন্ত জরুরি। এটি দুটি ধাপে করা হয়:

  • নতুন কুঁড়ি ছাঁটাই : মে থেকে অক্টোবরের মধ্যে গাছের ঝুলন্ত ডালগুলো থেকে অনবরত নতুন ডাল বা কুঁড়ি বের হতে থাকে। ফুল-ফল থাকা অবস্থায় এই নতুন ডালগুলো ভেঙে দিতে হবে। তা না হলে গাছ ফলের পুষ্টি না দিয়ে নতুন ডাল বাড়াতে শক্তি খরচ করে ফেলবে।
  • একটি ডালে ফলের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ: একটি ডালে যদি অনেকগুলো ফুল বা ফল আসে, তবে সবগুলো রাখা ঠিক নয়। ভালো সাইজের ফল পেতে একটি ডালে সর্বোচ্চ ১ থেকে ২টির বেশি ফল রাখবেন না। দুর্বল বা ছোট কুঁড়িগুলো শুরুতেই ছাঁটাই করে দিন।
  • ফলন পরবর্তী প্রুনিং (অক্টোবর-নভেম্বর): বছরের শেষ ফল তুলে নেওয়ার পর, যে ডালগুলোতে ফল হয়ে গেছে সেই ডালগুলোর ডগা কিছুটা কেটে দিতে হবে অথবা পুরোনো ও রোগাক্রান্ত ডাল কেটে বাদ দিতে হবে, যাতে পরবর্তী বছরের জন্য নতুন ফলদায়ী ডাল বের হতে পারে।

৪. আলোর প্রয়োজনীয়তা

ড্রাগন মূলত মরুভূমি অঞ্চলের ক্যাকটাস জাতীয় গাছ, তাই এর জন্য আলোর ভূমিকা অপরিসীম:

  • সারাদিনের রোদ: একটি পূর্ণবয়স্ক ড্রাগন গাছের ভালো ফলনের জন্য প্রতিদিন কমপক্ষে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা সরাসরি কড়া সূর্যের আলো বা রোদের প্রয়োজন। আলো কম পেলে গাছে ডালপালা হবে প্রচুর, কিন্তু ফুল-ফল আসবে না।
  • কৃত্রিম আলো : অনেক বড় বাণিজ্যিক খামারে শীতকালেও (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি) ফল পাওয়ার জন্য রাতে পিলারের ওপর বিশেষ এলইডি (LED) লাইট জ্বালিয়ে রাখা হয়। এর ফলে গাছ মনে করে দিন বড় আছে এবং শীতকালেও ফুল ও ফল উৎপাদন বজায় রাখে।
  • পরাগায়ন: অনেক সময় পোকামাকড়ের অভাবে পরাগায়ন হয় না। তাই একটি ব্রাশ দিয়ে পুরুষ ফুলের রেণু স্ত্রী ফুলের গর্ভমুণ্ডে লাগিয়ে দিতে হয়।

সঠিক সময়ে পটাশ সার, পরিমিত পানি এবং ফুল আসার পর নতুন ডাল ছেঁটে দেওয়ার এই পদ্ধতিগুলো মেনে চললে আপনার ড্রাগন গাছ থেকে সর্বোচ্চ ফলন পাবেন।

ড্রাগন ফল গাছের রোগ ও প্রতিকার

ড্রাগন ফল গাছে ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া এবং আবহাওয়া জনিত কারণে বেশ কিছু রোগ দেখা দিতে পারে। বাণিজ্যিক চাষের ক্ষেত্রে সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ও তার প্রতিকার করা অত্যন্ত জরুরি। নিচেড্রাগন ফল গাছের রোগ ও প্রতিকার নিয়ে প্রধান ৫টি রোগ এবং তা দমনের সঠিক উপায় বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. কান্ড ও গোড়া পচা রোগ

এটি ড্রাগন গাছের সবচেয়ে মারাত্মক রোগ। মূলত অতিরিক্ত পানি জমা এবং ছত্রাকের আক্রমণে এই রোগ হয়।

  • লক্ষণ: গাছের গোড়া বা কান্ড প্রথমে হলুদ ও নরম হয়ে যায় এবং পরে কালো রঙ ধারণ করে পচে যায়।
  • প্রতিকার: গোড়ায় যেন কোনোভাবেই পানি জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখুন। আক্রান্ত অংশটি একটি জীবাণুমুক্ত বা পরিষ্কার ছুরি দিয়ে কেটে বাদ দিন। এরপর প্রতি লিটার জলে ২ গ্রাম ম্যানকোজেব + মেটালাক্সিল (যেমন- রিডোমিল গোল্ড) অথবা কার্বেন্ডাজিম (যেমন- ব্যাভিস্টিন) ছত্রাকনাশক গুলে গাছের গোড়ায় এবং কান্ডে ভালো করে স্প্রে করুন।

২. কান্ডের অ্যানথ্রাকনোজ বা লালচে স্পট

ছত্রাকজনিত এই রোগটি গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় খুব দ্রুত ছড়ায়।

  • লক্ষণ: কান্ডের গায়ে ছোট ছোট হালকা বাদামী বা লালচে-হলুদ রঙের গোল গোল দাগ দেখা যায়। পরবর্তীতে এই দাগগুলো বড় হয়ে কান্ডের ভেতরের অংশ পচিয়ে দেয়।
  • প্রতিকার:আক্রান্ত ডাল ছাঁটাই করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। রোগ দমনের জন্য প্রতি লিটার জলে ২ মিলি অ্যাজোক্সিস্ট্রবিন + ডাইফেনোকোনাজোল (যেমন- অ্যামিস্টার টপ) অথবা ১ গ্রাম কপার অক্সিক্লোরাইড (যেমন- ব্লিটক্স) মিশিয়ে ১০-১২ দিন পর পর ২ বার স্প্রে করুন।

৩. কান্ড ফোস্কা পড়া বা স্টেম ব্লাইট

এটিও এক ধরণের ক্ষতিকর ছত্রাকের আক্রমণে হয়ে থাকে।

  • লক্ষণ: কান্ডের ওপর ধূসর বা কালচে রঙের ফোস্কার মতো দাগ পড়ে, যা ধীরে ধীরে পুরো ডালে ছড়িয়ে পড়ে এবং ডালটি শুকিয়ে মরে যায়।
  • প্রতিকার:নাইট্রোজেন জাতীয় সার (যেমন- ইউরিয়া) অতিরিক্ত পরিমাণে দেওয়া বন্ধ করতে হবে।প্রতিকার হিসেবে প্রতি লিটার জলে ০.৫ মিলি প্রোপিকোনাজোল (যেমন- টিল্ট) অথবা ২ গ্রাম থিওফ্যানেট মিথাইল (যেমন- রোকো) মিশিয়ে আক্রান্ত গাছে ভালোভাবে স্প্রে করতে হবে।

৪. ব্যাকটেরিয়াজনিত নরম পচা রোগ

ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণের কারণে এই রোগটি বর্ষাকালে বেশি দেখা দেয়।

  • লক্ষণ: কান্ডের যেকোনো অংশ হঠাৎ নরম হয়ে জলছাপের মতো দাগ তৈরি হয় এবং সেখান থেকে দুর্গন্ধযুক্ত রস বের হতে থাকে।
  • প্রতিকার: আক্রান্ত অংশ কেটে ফেলার পর সেখানে কপার অক্সিক্লোরাইডের ঘন পেস্ট বানিয়ে লাগিয়ে দিন।
    পুরো গাছে প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম স্ট্রেপ্টোসাইক্লিন (অ্যান্টিবায়োটিক) এবং ২ গ্রাম কপার ছত্রাকনাশক একসাথে মিশিয়ে স্প্রে করুন।

৫. রোদ-পোড়া রোগ বা সানবার্ন

এটি কোনো রোগ নয়, মূলত অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও কড়া রোদের কারণে সৃষ্ট একটি শারীরিক সমস্যা।

  • লক্ষণ: মে-জুন মাসের প্রচণ্ড গরমে কান্ডের যে অংশে সরাসরি কড়া রোদ লাগে, সেই অংশটি সাদা বা হলদেটে হয়ে যায়। পরবর্তীতে এই দুর্বল অংশে ছত্রাক আক্রমণ করে।
  • প্রতিকার: তীব্র গরমের সময় দুপুরের দিকে গাছে হালকা পানির কুয়াশা (Mist Spraying) স্প্রে করতে পারেন।
    বাণিজ্যিক খামারে খুব বেশি তাপমাত্রা হলে ওপরের দিকে শেড নেট (Shade Net) ব্যবহার করা যেতে পারে।

রোগমুক্ত খামারের জন্য কিছু সাধারণ টিপস:

যেকোনো ডাল ছাঁটাই করার পর কাটিং অংশে অবশ্যই বোর্ডো পেস্ট বা যেকোনো ছত্রাকনাশকের প্রলেপ দিন।
গাছ লাগানোর সময় মাটি তৈরিতে ট্রাইকোডার্মা ভিরিডি জৈব ছত্রাকনাশক ব্যবহার করলে গোড়া পচা রোগের ঝুঁকি প্রায় ৮০% কমে যায়।

ড্রাগন ফল চাষে পোকা নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি

ড্রাগন ফল গাছেও বেশ কিছু ক্ষতিকর পোকা বা পোকার আক্রমণ দেখা যায়। ক্যাকটাস জাতীয় শক্ত গাছ হলেও এর নরম ডগা, ফুল এবং মিষ্টি ফলের প্রতি পোকা-মাকড় আকৃষ্ট হয়। নিচে ড্রাগন গাছের প্রধান ক্ষতিকর পোকাগুলো এবং তাদের দমনের সহজ উপায় দেওয়া হলো:

১. পিঁপড়া

ড্রাগন গাছে পিঁপড়ার উপদ্রব সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এরা মূলত ফুলের কুঁড়ি, ফুল এবং কচি ফলের মিষ্টি রসের জন্য আক্রমণ করে। অনেক সময় এরা ডগা বা ফুলের কুঁড়ি চিবিয়ে খেয়ে নষ্ট করে দেয়।

প্রতিকার: পিলারের গোড়ার চারপাশের মাটিতে সামান্য কার্বোফিউরান (যেমন- ফুরাডান) দানা ছিটিয়ে দিতে পারেন। এছাড়া লিকুইড সাবান জলে বা নিম তেল স্প্রে করলেও পিঁপড়া দূর হয়।

২. জাব পোকা বা মিলিবাগ

এই পোকাগুলো সাদা তুলোর মতো দেখতে হয়। এরা গাছের কচি ডাল, ফুল এবং ফলের বোঁটা থেকে রস চুষে খায়, যার ফলে ডাল ও ফুল শুকিয়ে যায়।

প্রতিকার: আক্রমণ কম হলে জোরদার পানির স্প্রে দিয়ে এদের ধুয়ে ফেলা যায়। আক্রমণ বেশি হলে প্রতি লিটার জলে ১ মিলি ইমিডাক্লোপ্রিড (যেমন- এডমায়ার বা গেইনার) মিশিয়ে গাছে ভালোভাবে স্প্রে করতে হবে।

৩. ফল মাছি পোকা

যখন ড্রাগন ফল পাকতে শুরু করে এবং লাল রঙ ধারণ করে, তখন এই পোকার উপদ্রব বাড়ে। স্ত্রী মাছি পোকা ফলের খোসার নিচে ডিম পাড়ে। পরবর্তীতে ডিম থেকে কীড়া বা লার্ভা বের হয়ে ফলের ভেতরের অংশ খেয়ে পচিয়ে দেয়।

প্রতিকার: এটি দমনের সবচেয়ে সেরা ও পরিবেশবান্ধব উপায় হলো খামারে ফেরোমন ফাঁদ (Pheromone Trap) ব্যবহার করা। এছাড়া ফল আসার পর তা ফ্রুট ব্যাগিং (বিশেষ পলিথিন বা কাগজ দিয়ে ঢেকে দেওয়া) করলে এই পোকার আক্রমণ থেকে ফলকে পুরোপুরি বাঁচানো যায়।

৪. স্কেল পোকা

এরা কান্ডের গায়ে ছোট ছোট বাদামী বা হলদেটে রঙের গুটি গুটি ছাতার মতো আটকে থাকে এবং গাছের রস চুষে খায়। এতে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ফলের মান খারাপ হয়।

প্রতিকার: হাত দিয়ে বা শক্ত ব্রাশ দিয়ে ঘষে এদের কান্ড থেকে তুলে ফেলা যায়। রাসায়নিক দমনের জন্য যেকোনো ভালো মানের কীটনাশকের সাথে সামান্য শ্যাম্পু বা সাবানের গুঁড়ো মিশিয়ে স্প্রে করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।

৫. থ্রিপস বা চোষক পোকা

এই ছোট ছোট পোকাগুলো মূলত ড্রাগনের ফুল ও কচি ফলের ওপর আক্রমণ করে রস চুষে নেয়। এর ফলে ফলের ত্বকে খসখসে দাগ পড়ে যায়, যা ফলের বাণিজ্যিক মূল্য কমিয়ে দেয়।

প্রতিকার: প্রতি লিটার জলে ১.৫ মিলি ডাইমিথোয়েট (যেমন- রগর বা টাফগর) মিশিয়ে ফুল আসার শুরুতে স্প্রে করতে হবে।

সমন্বিত বা জৈব দমন টিপস:

রাসায়নিক কেমিক্যাল প্রয়োগের আগে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে সহজে এগুলি দমন করতে পারেন—গাছে পোকার আক্রমণ শুরুর আগেই প্রতি ১৫ দিন পর পর নিম তেল (প্রতি লিটার জলে ৩ মিলি) বা বাড়িতে নিমাস্ত্র ও অগ্নিঅস্ত্র কীটনাশক তৈরি করে এবং সামান্য লিকুইড সোপ একসাথে মিশিয়ে স্প্রে করলে বেশিরভাগ পোকা ধারের কাছে ঘেঁষে না।

আড়ও দেখুন – বাড়িতে শূন্য খরচে নিমাস্ত্রঅগ্নিঅস্ত্র তৈরি পদ্ধতি দেখতে ক্লিক করুন।

ছাদ বাগানে টবে ড্রাগন ফল চাষের বিশেষ টিপস

যারা ড্রাগন ফল ছাদ বাগানে করতে চান, তাদের জন্য:

  • টব: কমপক্ষে ২০ ইঞ্চির ড্রাম বা বড় টব নিন।
  • মাটি প্রস্তুতি: ১ ভাগ মাটি, ১ ভাগ বালু এবং ১ ভাগ ভার্মিকম্পোস্টের সাথে কিছু হাড়ের গুঁড়ো ও শিং কুচি মিশিয়ে নিন।
  • জল ব্যবস্থাপনা: টবের নিচে যেন জল নিকাশির ভালো ছিদ্র থাকে। অতিরিক্ত জল দিলে ড্রাগনের মূল পচে যায়।

আন্তঃফসল (Intercropping): লাভ ও খরচের হিসেব

ড্রাগন গাছ বড় হতে এবং পূর্ণ ফলন দিতে প্রায় ২ বছর সময় নেয়। এই সময়ে খুঁটিগুলোর মাঝখানের ফাঁকা জায়গা ফেলে না রেখে আন্তঃফসল চাষ করা বুদ্ধিমানের কাজ।

  • কতদিন পর্যন্ত চাষ করা যাবে: রোপণের প্রথম ২ থেকে ৩ বছর পর্যন্ত অনায়াসে আন্তঃফসল নেওয়া যায়। এরপর ড্রাগন গাছের ঝোপ বড় হয়ে গেলে ছায়ার কারণে অন্য ফসল হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
  • কী কী ফসল চাষ করা ভালো: ড্রাগনের জন্য এমন ফসল বেছে নিতে হবে যা মাটির নাইট্রোজেন বাড়ায় এবং উচ্চতায় কম হয়। যেমন—শিম, মটরশুঁটি, চীনাবাদাম, ধনেপাতা, পালং শাক বা স্বল্প মেয়াদী সবজি।
  • কেন ভালো: আন্তঃফসল চাষ করলে জমিতে আগাছা কম হয় এবং মাটির রস বজায় থাকে।

পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতা

ড্রাগন ফলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, ম্যাগনেসিয়াম এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে। এটি রক্তে হিমোগ্লোবিন বাড়াতে এবং ইমিউনিটি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। চিকিৎসকরা ডায়াবেটিস ও হৃদরোগীদের এই ফল খাওয়ার পরামর্শ দেন। তবে কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে পটাশিয়াম বেশি থাকায় ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

ড্রাগন চাষে লাভ-ক্ষতির হিসেব

ড্রাগন চাষে প্রথম বছর বিনিয়োগ কিছুটা বেশি হলেও, দ্বিতীয় বছর থেকে এটি লাভের মুখ দেখাতে শুরু করে। নিচে এক বিঘা (৩৩ শতক) জমির আদর্শ হিসেব দেওয়া হলো

এক বিঘা (৩৩ শতক) জমিতে ড্রাগন চাষের প্রাথমিক খরচ ও আয়ের হিসেব

খাতের বিবরণপরিমাণ / সংখ্যা আনুমানিক খরচ (টাকা)মন্তবব্য
কংক্রিট খুঁটি (পোল) ২৮০ – ৩০০ টি ১,২০,০০০ – ১,৪০,০০০ মাথায় টায়ার বা রিং সহ
উন্নত জাতের চারা ১,১২০ – ১,২০০ টি৫০,০০০ – ৬০,০০০প্রতি খুঁটিতে ৪টি চারা
জমি তৈরি ও গর্ত খনন ল্যাম্পসাম১০,০০০ – ১৫,০০০জৈব সার ও শোধন সহ
সার ও লেবার খরচপ্রথম বছর ২০,০০০ – ২৫,০০০জল সেচ ও পরিচর্যা
মোট প্রাথমিক বিনিয়োগ২,০,০০০০ -২,৪০,০০০ এটি এককালীন বড় বিনিয়োগ
বার্ষিক ফলন (২য় বছর+)৩,০০০ – ৪,০০০ কেজিগাছ যত বাড়বে ফলন তত বাড়বে
বার্ষিক গড় আয়১৫০ টাকা/কেজি দরে ৪,৫০,০০০ – ৬,০০,০০০বাজার দর অনুযায়ী পরিবর্তনশীল

ড্রাগন বাগানে আন্তঃফসলের (Intercropping) অতিরিক্ত লাভ

ড্রাগন বাগান পূর্ণ ফলন দেওয়ার আগে (প্রথম ২-৩ বছর) ফাঁকা জায়গায় নিচু জাতের ফসল চাষ করে বাড়তি আয় করা সম্ভব।

আন্তঃফসলের নামচাষের সময়কাল বিঘা প্রতি খরচ (টাকা) আনুমানিক লাভ (টাকা)ড্রাগন গাছের উপকারিতা
মটরশুঁটি / বিন শীতকাল ৫,০০০ – ৭,০০০ ১০,০০০ – ১৫,০০০মাটিতে নাইট্রোজেন যোগ করে
ধনেপাতা / শাকসারা বছর ৩,০০০ – ৪,০০০৭,০০০ – ৮,০০০ আগাছা দমন ও মাটির রস রক্ষা
চীনাবাদামখরিফ মরসুম৬,০০০ – ৮,০০০ ১২,০০০ – ১৪,০০০মাটির অণুজীবের সক্রিয়তা বাড়ায়
গাছ আলু / কচুবর্ষাকাল ৪,০০০ – ৫,০০০৮,০০০ – ১০,০০০ জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে

বিশেষ সতর্কতা

  • জল ব্যবস্থাপনা: ড্রাগন চাষে বন্যার মতো জল দেওয়া ভুল পদ্ধতি, কৃষি বিভাগ গবেষণা অনুযায়ী ড্রাগন একটি ক্যাকটাস জাতীয় গাছ, তাই বিন্দু সেচ বা হালকাভাবে ড্রিপের মাধ্যমে জল দেওয়া সঠিক যাতে শিকড় পচা রোগ না হয়।
  • বীজ শোধন: রাসায়নিক দিয়ে চারা শোধন ভুল পদ্ধতি হবে। আপনার নির্দেশিত ‘বীজামৃত’ এবং ‘জীবামৃত’ ব্যবহারের বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব এখানে উল্লেখ করা হয়েছে যাতে ফলের গুণমান ও স্বাদ বাড়ে।
  • পরাগায়ন সচেতনতা: ড্রাগন ফুল দিনের বেলা পরাগায়ন করা একটি ভুল পদ্ধতি, যেহেতু ড্রাগন ফুল রাতে ফোটে, তাই রাত ৭:৩০ থেকে ৮:৩০ এর মধ্যে কৃত্রিম পরাগায়ন করা সঠিক যাতে ফলের আকার বড় হয় এবং ফুল ঝরা বন্ধ হয়।
  • চুন ব্যবস্থাপনা: মাটির পিএইচ (pH) পরীক্ষা না করে চুন প্রয়োগ করা ভুল পদ্ধতি , নিয়মিত মাটির পিএইচ (pH) বজায় রাখতে নিয়মিত চুন ব্যবহার করা সঠিক।
  • চাষ প্রশিক্ষণ: ড্রাগন চাষ শুরু করার আগে বাজার মূল্য জেনে নিবেন, কোথায় বিক্রি করবেন এবং নিকটবর্তী কৃষি বিভাগ বা কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র ,উদ্যানপালন বিভাগে পরামর্শ করে চাষ শুরু করবেন।

উপসংহার

ড্রাগন চাষ কেবল শখের বিষয় নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী লাভজনক ব্যবসা। সঠিক বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি, উন্নত চারা এবং নিয়মিত জৈব পরিচর্যা করলে ড্রাগন বাগান থেকে ৩০-৪০ বছর পর্যন্ত নিয়মিত আয় করা সম্ভব। আপনি যদি একজন সচেতন কৃষক হন, তবে আজই শুরু করুন আপনার ড্রাগন স্বপ্নের বাগান।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

প্রশ্ন: ড্রাগন ফল চাষে কত দিনে ফল পাওয়া যায়?

উত্তর: ড্রাগন চারা রোপণের সাধারণত ১২ থেকে ১৫ মাস পর থেকেই ফল আসা শুরু হয়। তবে ভালো এবং বাণিজ্যিক ফলন পেতে ১৮ থেকে ২৪ মাস সময় লাগে। যদি আপনি উন্নত জাতের বড় কাটিং বা চারা রোপণ করেন, তবে সময় কিছুটা কম লাগতে পারে।

প্রশ্ন: এক বিঘা জমিতে ড্রাগন চাষে খরচ কত হয়?

উত্তর: ১ বিঘা (৩৩ শতক) জমিতে ড্রাগন চাষে প্রাথমিক খরচ (খুঁটি, চারা, জমি তৈরি ও লেবার) প্রায় ২.৫ থেকে ৩ লক্ষ টাকা। এর মধ্যে বড় খরচ হলো কংক্রিটের খুঁটি এবং উন্নত জাতের চারা। তবে একবার বাগান তৈরি হয়ে গেলে পরবর্তী ২৫-৩০ বছর শুধু পরিচর্যা খরচ ছাড়া বাড়তি বড় বিনিয়োগ লাগে না।

প্রশ্ন: ড্রাগন গাছে কত দিন পর পর জল দিতে হয়?

উত্তর: ড্রাগন গাছে জল দেওয়ার বিষয়টি নির্ভর করে আবহাওয়ার ওপর। সাধারণত গ্রীষ্মকালে মাটি শুকিয়ে গেলে ২-৩ দিন অন্তর হালকা সেচ দেওয়া ভালো (প্রতি খুঁটিতে ১.৫-২ লিটার)। বর্ষাকালে সেচের প্রয়োজন হয় না, বরং নিকাশি ব্যবস্থার দিকে নজর দিতে হয়। ড্রিপ বা বিন্দু সেচ পদ্ধতি ড্রাগনের জন্য সবচেয়ে উপযোগী।

প্রশ্ন: ড্রাগন গাছের ফুল কেন ঝরে যায়?

উত্তর: ড্রাগন ফুল ঝরে যাওয়ার প্রধান কারণ হলো পরাগায়নের অভাব। ড্রাগন ফুল রাতে ফোটে, তাই অনেক সময় প্রাকৃতিক পরাগায়ন ঠিকমতো হয় না। এছাড়া মাটিতে বোরন বা পটাশ সারের অভাব এবং অতিরিক্ত জল বা ছত্রাকের আক্রমণ থাকলেও ফুল ঝরে যেতে পারে। হাত দিয়ে কৃত্রিম পরাগায়ন (Hand Pollination) করলে এই সমস্যা ৯০% কমে যায়।

প্রশ্ন ৫: ড্রাগন ফল চাষের সবচেয়ে ভালো জাত কোনটি?

উত্তর: বর্তমানে বাজারে এবং চাষিদের কাছে ‘রেড ফ্লেশ’ বা লাল শাঁসযুক্ত জাতগুলো সবচেয়ে জনপ্রিয়। বিশেষ করে জুম্বো রেড, ভিয়েতনাম রেড এবং বাংলাদেশের বারি ড্রাগন ফল-১ বাণিজ্যিক চাষের জন্য সেরা বলে গণ্য হয়। এগুলোর মিষ্টতা বেশি এবং চাহিদা অনেক।

প্রশ্ন ৬: ড্রাগন গাছের ফুল আসার সময় কোনটি ?

ড্রাগন গাছে সাধারণত গরম ও বর্ষার মরশুমে, অর্থাৎ এপ্রিল-মে মাস থেকে শুরু করে অক্টোবর মাস পর্যন্ত দফায় দফায় ফুল আসে। এই ফুলগুলো মূলত রাতের বেলা ফোটে এবং দিনের আলো ফোটার আগেই আবার বুজে যায়।

তথ্য সুত্র

Spread the love

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top