মাছের রোগ ও প্রতিকার পদ্ধতি: ১৫টি প্রধান রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা

মাছের রোগ ও প্রতিকার পদ্ধতি: মাছের ১৫টি প্রধান রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা
মাছের রোগ ও প্রতিকার পদ্ধতি: ফুলকা পচা রোগের দৃশ্য ।

মৎস্য চাষে সফল হতে হলে মাছের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা সবথেকে জরুরি। অনেক সময় অভিজ্ঞ চাষিরাও মাছের সঠিক রোগ চিনতে না পেরে ভুল চিকিৎসার কারণে লোকসানের মুখে পড়েন। আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা মাছের রোগ ও প্রতিকার পদ্ধতি এবং খামারে সচরাচর দেখা দেওয়া মাছের ১৫টি প্রধান রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা নিয়ে আলোকপাত করব। মাছের রোগ ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকাটি অনুসরণ করলে আপনি সহজেই আপনার পুকুরের মাছকে রোগমুক্ত রাখতে পারবেন।

১. মাছের ছত্রাকজনিত ও জীবাণু ঘটিত রোগের প্রতিকার

মাছের রোগ ও প্রতিকার পদ্ধতি-তে ছত্রাক ঘটিত সংক্রমণের কারণে সাধারণত মাছের ফুলকা গলা, স্যাপ্রোলেগনিয়াসিস এবং সাদা লোম বা সুতো গুচ্ছ ক্ষত—এই তিনটি প্রধান রোগ দেখা দেয়। মাছেদের সুস্বাস্থ্য ফেরাতে মাছের জীবাণু ঘটিত রোগের প্রতিকার হিসেবে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

ক) মাছের ফুলকা পচা রোগের চিকিৎসা

এই রোগটি এক ধরণের ছত্রাক জাতীয় উদ্ভিদ থেকে হয়, যার নাম Branchiomyces sp.। সাধারণত গ্রীষ্মকালে অতিরিক্ত গরমে পুকুরের জৈব পদার্থ পচে জল দূষিত হলে এই ছত্রাক মাছের ফুলকায় দ্রুত বংশবিস্তার করে। মাছের রোগ ব্যবস্থাপনাতে জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার করতে এর লক্ষণ ও চিকিৎসা জানা জরুরি।

  • লক্ষণ: ফুলকায় প্রথমে লাল গুটি দেখা যায়, যা পরে ধূসর হয়ে যায়। ছত্রাক ফুলকায় রক্ত চলাচল বন্ধ করে দেয়, ফলে ফুলকা পচতে শুরু করে এবং দুর্গন্ধ বের হয়। অক্সিজেনের অভাবে মাছ খাবি খায় এবং মারা যায়।
  • প্রতিরোধ ব্যবস্থা: বাইরের জল যাতে না ঢোকে তার ব্যবস্থা করা, নিয়মিত চুন ও সার প্রয়োগ, নির্দিষ্ট পরিমাণ পোনা মজুত এবং ৪ বছর অন্তর পুকুরের পাঁক তোলা।
  • চিকিৎসা: রোগের শুরুতে প্রতি লিটার জলে ৩০-৩৫ গ্রাম সাধারণ লবণ মিশিয়ে আক্রান্ত মাছকে ৫-১০ মিনিট ডুবিয়ে রাখুন। ১০ লিটার জলে ১ গ্রাম তুঁতে মিশ্রিত করে মাছকে ১০-৩০ মিনিট ডুবিয়ে রাখলে উপকার পাওয়া যায়। বিঘা প্রতি ২৫ কেজি কলিচুন প্রয়োগ করে জলের পিএইচ (pH) ৯ এর কাছাকাছি রাখতে পারলে এই মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার সম্ভব। এছাড়া পুকুরে খাবার বন্ধ রাখতে হবে এবং বিশুদ্ধ জল প্রবেশ করাতে হবে।

আড়ও দেখুন বড় মাছ চাষ পদ্ধতি: লাভজনক মজুত পুকুর নির্বাচন ও প্রস্তুতির নিয়ম

খ) মাছের স্যাপ্রোলেগনিয়াসিস রোগ ও প্রতিকার

মাছ পরিবহনের সময় বা জাল টানার সময় দেহে আঘাত লাগলে ক্ষতস্থানে সাদা সূতোর মতো ছত্রাক বাসা বাঁধে। এই অবস্থায় মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার না করলে মাছ দ্রুত মারা যায়।

  • লক্ষণ: ঘায়ের ওপর সাদা সাদা সূতোর টুকরার মতো ছত্রাক দেখা যায় এবং মাছ ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে।
  • চিকিৎসা: চারাপোনার জন্য প্রতি লিটার জলে ১০ গ্রাম সাধারণ লবণ (২০ মিনিট) এবং বড় মাছের জন্য ৩০ গ্রাম লবণ (১০ মিনিট) মিশিয়ে ডুবিয়ে রাখতে হবে। এছাড়া প্রতি লিটার জলে ৫ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট মিশ্রিত করে ৫-১০ মিনিট মাছকে স্নান করালে সুফল পাওয়া যাবে। ১০ লিটার জলে ৫ গ্রাম তুঁতে মিশ্রিত দ্রবণে মাছকে ডুবিয়ে রাখা মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার হিসেবে খুবই কার্যকর।

গ) মাছের সাদা লোম বা সুতো গুচ্ছ ক্ষত

জলের দূষণ বাড়লে Saprolegnia parasitica নামক ছত্রাকের আক্রমণে এই রোগ হয়। মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার হিসেবে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা জরুরি।

  • লক্ষণ: মাছের পাখনা, দেহ, চোখ ও ফুলকায় প্রাথমিকভাবে সাদা দাগ দেখা যায়, যা পরে লোমের মতো গুচ্ছ আকার ধারণ করে ক্ষতের সৃষ্টি করে।
  • প্রতিরোধ: তলার পচনশীল জৈব পদার্থ পরিষ্কার রাখা, নিয়মিত পাঁক তোলা এবং বাইরে থেকে দূষিত জল ঢুকতে না দেওয়া।
  • চিকিৎসা: ৩% লবণ জলের দ্রবণে আক্রান্ত মাছকে ৪-৫ মিনিট স্নান করানো। এছাড়া প্রতি ১০ লিটারে ১ মিলিগ্রাম মেলাচাইট গ্রীণ বা প্রতি লিটারে ১ মিলিগ্রাম তুঁতে অথবা ২-৩ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট মিশিয়ে ২-৪ মিনিট স্নান করালে মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার করা সম্ভব।

২. মাছের ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণু ঘটিত রোগের প্রতিকার

জীবাণু বা ব্যাকটেরিয়ার কারণে মাছের শরীরে মড়ক লাগা সব থেকে সাধারণ ঘটনা। মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার হিসেবে ব্যাকটেরিয়া ঘটিত মারাত্মক রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত নিচে দেওয়া হলো:

ক) মাছের লেজ ও পাখনা পচা রোগের চিকিৎসা

মাছের রোগ ব্যবস্থাপনায় এটি একটি ছোঁয়াচে রোগ যা Aeromonas hydrophilaPseudomonas fluorescens ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়। মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার হিসেবে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

  • লক্ষণ: পুকুরে অত্যাধিক পাঁক জমলে এই রোগ হয়। শুরুতে পাখনা বা লেজের কিনারায় সাদা রেখা দেখা দেয়, পরে পচন শুরু হয়ে পাখনা খসে পড়ে এবং রক্ত ঝরে। মাছ পুকুরে পাগলের মতো ঘুরপাক খেতে থাকে।
  • প্রতিরোধ: জলের গভীরতা বাড়ানো, নিয়মিত পাঁক পরিষ্কার করা এবং বিঘা প্রতি ২০-২৫ কেজি চুন প্রয়োগ।
  • চিকিৎসা: মাছের রোগ ব্যবস্থাপনায় লিটার প্রতি ২০ মিলিগ্রাম তুঁতে গোলা দ্রবণে ১-২ মিনিট স্নান করান। পুকুরে বিঘা প্রতি ১.৩ কেজি পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট প্রয়োগ করুন। প্রতি কেজি খাদ্যের সঙ্গে ১০০ মিলিগ্রাম টেরামাইসিন ট্যাবলেট মিশিয়ে টানা ৭ দিন খাওয়ানো মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার করার সেরা উপায়।
মাছের রোগ ও প্রতিকার পদ্ধতি: মাছের পাখনা পচা রোগ আক্রান্ত মাছের দৃশ্য
মাছের লেজ ও পাখনা পচা রোগ আক্রান্ত মাছের দৃশ্য।

খ) মাছের ড্রপসি বা পেট ফোলা রোগ ও প্রতিকার

মাছের রোগ ব্যবস্থাপনা-তে এটি মূলত অপুষ্টি ও Aeromonas hydrophila ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে হয়। মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার না করলে মাছের শরীরে ভেতরে জল জমে পেট ফুলে যায়।

  • লক্ষণ: মাছের দেহের আঁশ খাড়া হয়ে যায় এবং তার নিচে জল জমে। এটি একটি সংক্রামক রোগ।
  • প্রতিরোধ: বিঘা প্রতি ২৫-৩০ কেজি চুন প্রয়োগ এবং মাসে অন্তত একবার নিমখোল ও হলুদ গুঁড়ো (১:০.০৫:২০ অনুপাতে) মেশানো খাবার দিন।
  • চিকিৎসা: মাছের রোগ ব্যবস্থাপনাতে আক্রান্ত মাছকে পুকুর থেকে সরিয়ে ফেলাই শ্রেয়। লিটারে ১৫ মিলিগ্রাম ক্লোরোমাইসেটিন বা টেরামাইসিন মিশিয়ে মাছকে স্নান করান। এছাড়া কেজি প্রতি খাবারে ১০০ মিলিগ্রাম টেরামাইসিন মিশিয়ে ৭ দিন খাওয়ালে মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার সম্ভব।

গ) মাছের চোখ সাদা বা ঘোলা হওয়া রোগ ও চিকিৎসা

মাছের রোগ ব্যবস্থাপনা-তে Aeromonas liquifaciens ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে কাতলা মাছে এই রোগ সব থেকে বেশি দেখা যায়। মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার হিসেবে নিচের পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করুন:

  • লক্ষণ: চোখ ঘোলাটে হয় এবং পরে ছানি পড়ে সাদা হয়ে পচে যায়।
  • প্রতিরোধ: জলাশয়ের অতিরিক্ত পাঁক তোলা এবং বিঘা প্রতি ২৫-৩০ কেজি চুন প্রয়োগ করা।
  • চিকিৎসা: লিটারে ৮ মিলিগ্রাম ক্লোরোমাইসেটিন গুলে মাছকে ১ মিনিট ডুবিয়ে রাখুন (টানা ৩ দিন)। অথবা লিটারে ২-৪ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট বা এক্রিফ্লোভিন দ্রবণে ২-৩ মিনিট স্নান করানো মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার হিসেবে কার্যকর।

আড়ও দেখুন ধানী পোনা চাষ পদ্ধতি: আধুনিক লালন পুকুর ব্যবস্থাপনা ও প্রস্তুতির সম্পূর্ণ গাইড

ঘ) শিঙ্গি ও মাগুরের শুঁড় খসা রোগের চিকিৎসা

জলের গভীরতা কমলে এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে Aeromonas sp. ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে এটি হয়।

  • লক্ষণ: মাছের শুঁড় ভেঙে রক্ত ঝরে বা ঘা হয়। মাছ অস্বস্তিতে ছটফট করে মারা যায়।
  • প্রতিরোধ: বাইরে থেকে জল এনে গভীরতা বাড়ানো এবং বিঘা প্রতি ২৫-৩০ কেজি চুন প্রয়োগ করা।
  • চিকিৎসা: মাছের রোগ ও প্রতিকার পদ্ধতি-তে লিটারে ৫০-১০০ মিলিগ্রাম তুঁতে বা ৩-৫ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট দ্রবণে ১-২ মিনিট স্নান করান। কেজি প্রতি খাবারে ১০০-১২০ মিলিগ্রাম অ্যান্টিবায়োটিক ১০ দিন খাওয়ালে মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার দ্রুত হয়।

৩. মাছের উকুন বা আরগুলোসিস প্রতিরোধের উপায়

মাছের উকুন হলো এক ধরণের সন্ধিপদ বা কবচী প্রাণী যা মাছের দেহ থেকে রক্ত শোষণ করে মাছকে নিস্তেজ করে দেয়। মূলত রুই, কাতলা ও মৃগেল মাছে এই আক্রমণ বেশি দেখা যায়।

ক) মাছের উকুনের লক্ষণ ও চেনার উপায়

শারীরিক পরিবর্তন: আরগুলাস বা মাছের উকুন খালি চোখে দেখা যায়। এরা মাছের ফুলকা, পাখনা ও গায়ে আটকে থেকে রক্ত শোষণ করে। এর ফলে মাছের আঁশ আলগা হয়ে যায় এবং আক্রান্ত স্থানে লালচে ক্ষত দেখা দেয়।
আচরণগত পরিবর্তন: মাছ ছটফট করতে থাকে এবং যন্ত্রণায় পুকুরের কিনারায় বা শক্ত বস্তুতে গা ঘষতে থাকে। ধীরে ধীরে মাছের রং ফ্যাকাশে হয়ে যায় এবং দেহ লম্বাটে দেখায়।

খ) সংক্রমণের কারণ

Argulus sp. (স্বচ্ছ কাঁচ টিপের মতো), Larnaea sp. (সুতোর মতো), এবং Ergasilus sp. নামক পরজীবীর কারণে এটি হয়। সাধারণত দূষিত জলজ পরিবেশ এবং অতিরিক্ত পরিপূরক খাদ্য ব্যবহারের ফলে এই পরজীবীর উৎপত্তি ঘটে।

গ) মাছের উকুন দমনের ঘরোয়া পদ্ধতি

মাছের রোগ ব্যবস্থাপনা অনুসারে নিচের ঘরোয়া পদ্ধতি গুলি কার্যকরী:

  • জলাশয়ে কোনো অতিরিক্ত জলজ উদ্ভিদ বা শ্যাওলা রাখা যাবে না।
  • জৈব সার ও পরিপূরক খাদ্য যেন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখুন।
  • সময়মতো এবং নিয়মিত চুন প্রয়োগ করে জলের ক্ষারত্ব বজায় রাখা।

ঘ) উকুনের কার্যকরী চিকিৎসা ও ঔষধ

  • লবণ জল: প্রাথমিক অবস্থায় প্রতি লিটার জলে ৩০ গ্রাম সাধারণ লবণ মিশিয়ে আক্রান্ত মাছকে ৫-৬ মিনিট ডুবিয়ে রাখুন। এটি টানা ২-৩ দিন করতে হবে।
  • গ্যামাকসিন প্রয়োগ: লিটার প্রতি ০.৫ মিলিগ্রাম হিসাবে সপ্তাহে ২-৩ বার প্রয়োগ করুন। অর্থাৎ বিঘা প্রতি (১ মিটার গভীরতায়) ৬৭০ গ্রাম গ্যামাকসিন দিতে হবে।
  • নুভান (Nuvan) এর ব্যবহার: মাছের রোগ ব্যবস্থাপনায় এটি উকুনের মহৌষধ। বিঘা প্রতি ৮-১০ মিলিলিটার নুভান প্রয়োগ করুন। মনে রাখবেন, নুভান উকুনের ডিম মারে না। তাই প্রথম প্রয়োগের ৪ দিন পর (যখন ডিম ফুটে বাচ্চা বের হবে) আবার একই মাত্রায় দ্বিতীয় বার নুভান প্রয়োগ করলে পুকুর সম্পূর্ণ উকুনমুক্ত হবে।

৪. পুকুরে মাছের ক্ষত রোগ ও প্রতিকার

পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশে মহামারী ক্ষত রোগ (EUS) মাছ চাষিদের কাছে এক আতঙ্কের নাম। বিশেষ করে শীতের শুরুতে যখন পুকুরের জল কমে যায়, তখন মাছের ক্ষত রোগ নিয়ে সবথেকে বেশি সচেতন থাকতে হয়। নিচে পুকুরে মাছের ক্ষত রোগ ও প্রতিকার আলোচনা হল:

ক) ক্ষত রোগের কারণ ও ইতিহাস

১৯৮৮ সালে ভারতে এই রোগ মহামারী আকার ধারণ করে। সাধারণত বর্ষার শেষে এবং শীতের শুরুতে এই রোগ বেশি দেখা যায়। চাষের জমির কীটনাশক ধোয়া জল পুকুরে ঢুকলে মাছেদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক একত্রে আক্রমণ করে এই ক্ষত সৃষ্টি করে।

খ) মাছের ক্ষত রোগের লক্ষণ

মাছের গায়ে বিশেষ করে লেজের দিকে লাল গোলাকার ছোপ ছোপ দাগ দেখা যায়। ক্রমে মাংসপেশী খসে পড়ে বড় বড় ক্ষত তৈরি হয়। আক্রান্ত মাছ জলের মধ্যে অস্বাভাবিকভাবে ছোটাছুটি করে।

গ) মাছের ক্ষত রোগ প্রতিরোধের উপায়

  • বর্ষার সময় খেত-খামারের কীটনাশকযুক্ত জল যেন পুকুরে না ঢোকে সেজন্য পুকুরের পাড় উঁচু করতে হবে।
  • পুকুরের গভীরতা বজায় রাখা এবং অতিরিক্ত পাঁক সময়মতো তুলে ফেলা।
  • প্রতি মাসে একবার বিঘা প্রতি ৬-৮ কেজি চুন দিয়ে তলার মাটি ঘেঁটে দেওয়া। মাছের সঠিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে এবং মড়ক রুখতে মাছের ক্ষত রোগ ও উকুনের প্রতিকার অপরিহার্য।

ঘ) মাছের ক্ষত রোগের ধাপ ভিত্তিক চিকিৎসা

মাছের রোগ ব্যবস্থাপনা-তে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:

  • প্রাথমিক ধাপ: ১ মিটার গভীরতাযুক্ত জলে বিঘা প্রতি ১২-১৩ গ্রাম মিথিলিন ব্লু প্রতি সপ্তাহে একবার করে দিতে হবে। প্রাথমিক অবস্থায় পুকুরে মিথিলিন ব্লু প্রয়োগ করা মাছের ক্ষত রোগ ও উকুনের প্রতিকার এর প্রথম ধাপ ।
  • স্নান পদ্ধতি: আক্রান্ত মাছকে ১০ লিটার জলে ৫০ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট এবং ৫০০ গ্রাম লবণ মিশ্রিত জলে ডুবিয়ে পুকুরে ছাড়ুন।
  • পটাশ প্রয়োগ: চুন দেওয়ার একদিন পর ১.৩ কেজি পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট (বিঘা প্রতি ১ মিটার গভীরতায়) প্রয়োগ করুন।
  • ঔষধ প্রয়োগ (ড্যাপসন): ১০০ মিলিগ্রাম ড্যাপসন প্রতি কেজি খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে টানা ১৪ দিন খাওয়ান। এটি ক্ষত রোগের জন্য অত্যন্ত কার্যকর।
  • ভেষজ চিকিৎসা: বিঘা প্রতি ১৬ কেজি চুন (ঠাণ্ডা করা) এবং ১ কেজি ৬০০ গ্রাম কাঁচা হলুদের রস মিশিয়ে ছিটিয়ে দিন। ১০-১২ দিন পর পুনরায় প্রয়োগ করুন। চুনের সাথে কাঁচা হলুদের রস মিশিয়ে প্রয়োগ করলে ক্ষত দ্রুত শুকায়, যা মাছের ক্ষত রোগ ও উকুনের প্রতিকার করার একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ভেষজ পদ্ধতি ।
  • ফিটকিরির ব্যবহার: বিঘা প্রতি ৬৫০-৭০০ গ্রাম ফিটকিরি ব্যবহার করা যায়, তবে এর ফলে প্রাকৃতিক খাদ্য কমে গেলে পুনরায় জৈব সার দিয়ে খাদ্য উৎপাদন করতে হবে।
  • CIFAX এর ব্যবহার: মাছের রোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভারতীয় কৃষি অনুসন্ধান সংস্থা (ICAR) উদ্ভাবিত CIFAX ঔষধটি মাছের ক্ষত রোগে জাদুর মতো কাজ করে। বিঘা প্রতি ১৩০ মিলিলিটার সিফ্যাক্স ১৫ লিটার জলে গুলে পুকুরে ছিটিয়ে দিন।

৫. প্রোটোজোয়া ঘটিত মাছের রোগ ও প্রতিকার

আদ্যপ্রাণী বা প্রোটোজোয়া ঘটিত আক্রমণের ফলে মাছের ফুলকা পচা, সাদা দাগ বা হোয়াইট স্পট, সাদাগুটি এবং মাথা ঘোরা—এই ৪টি প্রধান লক্ষণ দেখা দেয়।মাছের রোগ ও প্রতিকার পদ্ধতি রোগের প্রতিকার হিসেবে নিচে বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:

ক) মাছের ফুলকো পচা রোগের চিকিৎসা

এটি Trichodina indica নামক এক ধরণের আদ্যকোষী প্রাণীর আক্রমণে হয়। মূলত পুকুরের জল অতিরিক্ত দূষিত হলে এই জীবাণু দ্রুত বংশবিস্তার করে। মাছের পরজীবী ও কৃমিঘটিত রোগের প্রতিকার করতে নিচের লক্ষণগুলো খেয়াল করুন:

  • লক্ষণ: আক্রান্ত মাছের ফুলকা থেকে প্রচুর পরিমাণে লালা বা রস নির্গত হয়। মাছের চরম শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় এবং মাছ জলের ওপর অলসভাবে ভাসতে থাকে। ধীরে ধীরে মাছের ওজন কমে যায় এবং মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ে। এরা অনেক সময় মাছের চামড়াতেও আক্রমণ করে।
  • প্রতিরোধ ব্যবস্থা: পুকুরের অতিরিক্ত পাঁক সময়মতো তুলে ফেলা। নিয়মিত প্রতি মাসে বিঘা প্রতি ৬-৮ কেজি চুন প্রয়োগ করা এবং দূষিত জল পুকুরে ঢোকা বন্ধ করা। মাছের প্রাকৃতিক খাবার বাড়াতে নিয়ম মেনে জৈব সার প্রয়োগ করুন।
  • চিকিৎসা: ২-৩% লবণ জলের দ্রবণে আক্রান্ত মাছকে ১-২ মিনিট স্নান করান। এছাড়া পুকুরে বা জলাশয়ে লিটার প্রতি ১-২ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম পারমাঙ্গানেট ব্যবহার করা মাছের পরজীবী ও কৃমিঘটিত রোগের প্রতিকার হিসেবে অত্যন্ত কার্যকর।

খ) মাছের সাদা দাগ বা হোয়াইট স্পট রোগ (White spot)

এটি মূলত রেণু বা বীজ পোনার ক্ষেত্রে একটি ভয়াবহ রোগ। Ichthyophthirius multifiliis নামক আদ্যকোষীর আক্রমণে এই রোগ হয়।

  • লক্ষণ: মাছের গায়ের উজ্জ্বলতা কমে যায় এবং পাখনা ও ফুলকায় আলপিনের ডগার মতো ছোট ছোট সাদা দাগ দেখা দেয়। আক্রান্ত স্থান থেকে রস বের হয়।
  • প্রতিকার: পুকুরের পরিবেশ স্বাস্থ্যকর রাখা এবং চুন প্রয়োগ করা। প্রাকৃতিক খাদ্যের জোগান সঠিক রাখা মাছের পরজীবী ও কৃমিঘটিত রোগের প্রতিকার এর মূল ধাপ।
  • চিকিৎসা: মাছের রোগ ব্যবস্থাপনায় ২-৩% লবণ জলের দ্রবণে আক্রান্ত মাছকে ১-২ মিনিট স্নান করান (টানা ৬-৭ দিন)। এছাড়া লিটার প্রতি ০.০৫-০.১০ মিলিগ্রাম মেলাকাইট গ্রীণ দ্রবণে ৩-৪ মিনিট মাছকে ডুবিয়ে রাখা যেতে পারে। ৫ লিটার জলে ১ মিলিলিটার ফরমালিন মিশিয়ে ১০-১৫ মিনিট ডোবালে দ্রুত উপকার হয়।

গ) মাছের সাদা গুটি বা বসন্ত রোগ (Mixosporidiosis)

এটি মূলত বর্ষার শেষে দেখা দেয় এবং কাতলা মাছ এই রোগে সবথেকে বেশি আক্রান্ত হয়।

  • লক্ষণ: মাছের দেহ ও ফুলকাতে আলপিনের মাথার মতো সাদা সাদা গুটি দেখা যায়। মাছের আঁশ আলগা হয়ে খসে পড়ে এবং চরম শ্বাসকষ্টের কারণে মাছ খাবি খেয়ে মারা যায়।
  • চিকিৎসা: মাছের রোগ ব্যবস্থাপনায় প্রতি লিটার জলে ২০ গ্রাম সাধারণ লবণ মিশিয়ে ৫ মিনিট মাছকে ডুবিয়ে রাখতে হবে। ৫ লিটার জলে ১ মিলিলিটার ফরমালিন মিশ্রিত দ্রবণে ১০-১৫ মিনিট স্নান করানো মাছের পরজীবী ও কৃমিঘটিত রোগের প্রতিকার এর একটি প্রমাণিত পদ্ধতি।

ঘ) মাছের মাথা ঘোরা রোগ

Myxosoma cerebralis নামক আদ্যপ্রাণীর আক্রমণে মাছের মেরুদণ্ডের বিকৃতি ঘটে এবং মাছ ভারসাম্য হারায়।

  • লক্ষণ: মাছ জলের উপরিভাগে অস্বাভাবিকভাবে গোল হয়ে ঘুরপাক খেতে থাকে এবং হঠাৎ করে তলিয়ে গিয়ে মারা যায়। মাছ খুব বেশি লেজ নাড়ায়।
  • প্রতিরোধ: বিঘা প্রতি ৭-৮ কেজি চুন প্রয়োগ করুন এবং পুকুরের তলার মাটি মাঝে মাঝে ঘেঁটে দিন।
  • চিকিৎসা: এটি একটি অত্যন্ত জটিল রোগ, যার কোনো কার্যকর চিকিৎসা এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। তাই প্রতিরোধই একমাত্র উপায়।

আড়ও দেখুন মাছের ডিম পোনা চাষ পদ্ধতি: পুকুর প্রস্তুতি থেকে রেণু পোনার পরিচর্যার সঠিক নিয়ম

৬. মাছের কৃমি ঘটিত রোগ ও প্রতিকার

কৃমি ঘটিত রোগ মাছ চাষিদের জন্য এক নীরব ঘাতক। মূলত চ্যাপ্টা কৃমি ও জোঁকের আক্রমণে মাছের ব্যাপক ক্ষতি হয়। মাছের পরজীবী ও কৃমি ঘটিত রোগের প্রতিকার নিয়ে নিচে আলোচনা করা হলো:

ক) গাইরোড্যাটাইলোসিস ও ড্যাকটাইলোগাইরাস কৃমি আক্রমণ

ক্ষুদ্র চ্যাপ্টা কৃমিরা হুকের সাহায্যে মাছের ফুলকা ও দেহে আটকে থাকে এবং নিয়মিত রক্ত শোষণ করে। নিচে মাছের রোগ ব্যবস্থাপনা দেখুন:

  • লক্ষণ: বর্ষাকালে এই রোগ বেশি ছড়ায়। কৃমির কামড়ে মাছের দেহে জ্বালা অনুভূত হয়, ফলে মাছ ছটফট করে এবং দেহ থেকে প্রচুর শ্লেষ্মা নির্গত হয়। ছোট পোনা মাছ এই কৃমির কারণে সবথেকে বেশি মারা যায়।
  • প্রতিরোধ: পুকুরে রোদ ঢোকার ব্যবস্থা করতে পাড়ের গাছের ডাল ছেঁটে দিন। তিন মাস অন্তর চুন প্রয়োগ এবং তলদেশের পাঁক পরিষ্কার রাখা জরুরি। পুকুরে আধফালি বাঁশ পুঁতে দিন যাতে মাছ সেখানে গা ঘষতে পারে।
  • চিকিৎসা: মাছের রোগ ও প্রতিকার পদ্ধতি-তে প্রতি লিটার জলে ৩০ গ্রাম সাধারণ লবণ মিশিয়ে আক্রান্ত মাছকে ৫-৬ মিনিট করে টানা ২-৩ দিন স্নান করান। এছাড়া ১০০ লিটার জলে ২৫ মিলিলিটার ফরমালিন মিশিয়ে ১০-১৫ মিনিট ডুবিয়ে রাখলে মাছের পরজীবী ও কৃমিঘটিত রোগের প্রতিকার করা সম্ভব।

খ) মাছের জোঁক ও এর প্রতিকার

Hemicilepsis piscicola নামক জলজ জোঁক মাছের দেহের নরম অংশ থেকে রক্ত পান করে।

  • লক্ষণ: মাছের দেহে রক্তের ছোপ দাগ দেখা যায়। জোঁক সাধারণত চোখ ও মলদ্বারের মাংসল অংশে লেগে থাকে। যন্ত্রণায় মাছ জলে এলোপাথারি দৌড়াতে থাকে এবং ঘায়ের জায়গায় পরে ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাকের আক্রমণ ঘটে।
  • প্রতিরোধ: সময়মতো পাঁক তোলা এবং চুন প্রয়োগ। পুকুরে বাঁশের ফালি রাখা যাতে মাছ গা ঘষে জোঁক ছাড়াতে পারে।
  • চিকিৎসা: মাছের রোগ ব্যবস্থাপনায় ২-৩% লবণের জলীয় দ্রবণে আক্রান্ত মাছকে ৩-৪ মিনিট ধরে স্নান করানো মাছের পরজীবী ও কৃমিঘটিত রোগের প্রতিকার করার সবথেকে সহজ উপায়।

উপসংহার

সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং মাছের রোগ ও প্রতিকার পদ্ধতি-র সঠিক প্রয়োগই পারে একটি মৎস্য খামারকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে। তবে মনে রাখবেন, মাছের রোগ ব্যবস্থাপনায় প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। নিয়মিত পুকুরের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ এবংমাছের ১৫টি রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকলে মৎস্য চাষে আপনি নিশ্চিত লাভের মুখ দেখবেন।

সাধারণ প্রশ্ন (FAQ)

১. মাছের লাল ক্ষত বা লেজ পচা রোগে কোন ঔষধ সবথেকে ভালো?

উত্তর: মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার হিসেবে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট (বিঘা প্রতি ১.৩ কেজি) এবং খাবারের সাথে টেরামাইসিন অ্যান্টিবায়োটিক সবথেকে বেশি কার্যকর।

২. মাছের পেট ফুলে গেলে কি অন্য মাছেও এটি ছড়ায়?

উত্তর: হ্যাঁ, ড্রপসি বা পেট ফোলা রোগ একটি মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ। তাই মাছের রোগ ও প্রতিকার পদ্ধতি-তে আক্রান্ত মাছকে সরিয়ে ফেলাই মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার করার প্রথম ধাপ।

৪. পুকুরে মাছের সাদা দাগ দেখলে কি ঔষধ প্রয়োগ করা উচিত?

উত্তর: সাদা দাগ বা হোয়াইট স্পট রোগের চিকিৎসায় লবণ জল এবং ফরমালিনের মিশ্রণ সবথেকে ভালো কাজ করে। তবে ডোজের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।

৫. মাছ কেন পুকুরে গোল হয়ে মাথা ঘোরে?

উত্তর: এটি মূলত আদ্যপ্রাণী বা প্রোটোজোয়ার আক্রমণে মেরুদণ্ডের ক্ষতি হওয়ার কারণে হয়। একে ‘Whirling disease’ বলে। এর সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা না থাকায় পুকুর প্রস্তুতিতে চুন ব্যবহার করা জরুরি।

৬. শীতের শুরুতে কেন মাছের ক্ষত রোগ বেশি দেখা যায়?

উত্তর: শীতের শুরুতে পুকুরের জল কমে যায় এবং দূষণ ঘনীভূত হয়। এছাড়া চাষের জমির কীটনাশক ধোয়া জল পুকুরে মিশলে মাছেদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। এই প্রতিকূল পরিবেশে ছত্রাক ও ভাইরাস সম্মিলিতভাবে আক্রমণ করে ক্ষত সৃষ্টি করে।

তথ্য সুত্র

মৎস বিভাগ ,পশ্চিমবঙ্গ সরকার

মাছ চাষের পাশাপাশি পরিবারের আয় বাড়াতে আড়ও দেখুন ওয়েস্টার বা ঝিনুক মাশরুম চাষ পদ্ধতি: বাণিজ্যিক চাষে সফল হওয়ার সম্পূর্ণ গাইড

Spread the love

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top