ছাগলের রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার: আধুনিক খামারিদের চিকিৎসার পূর্ণাঙ্গ গাইড

ছাগলের রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার: নারী উদ্যোক্তা ছাগলের নাকে ঠান্ডা প্রতিরোধক ঘরোয়া টোটকা বানিয়ে দিচ্ছে।
ছাগলের রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার: নারী উদ্যোক্তা ছাগলের নাকে ঠান্ডা প্রতিরোধক ঘরোয়া টোটকা বানিয়ে দিচ্ছে।

একটি খামারকে সাফল্যের চূড়ায় নিয়ে যেতে হলে ছাগলের রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা আবশ্যক। অনেক সময় দেখা যায় সঠিক চিকিৎসার অভাবে খামারে মড়ক লেগে খামারি সর্বস্বান্ত হয়ে যান। আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা অভিজ্ঞ পশু চিকিৎসক এবং প্রাণী সম্পদ বিকাশ দপ্তরের তথ্যানুসারে ছাগলের বিভিন্ন রোগ, লক্ষণ এবং সেগুলোর ঘরোয়া ও আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

১. সাধারণ পেটের সমস্যা ও হজম সংক্রান্ত জটিলতা

ছাগল পালনে সবচেয়ে বেশি যে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় তা হলো হজমের সমস্যা। সময়মতো ছাগলের রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার ব্যবস্থা না নিলে সাধারণ গ্যাস থেকেও ছাগল মারা যেতে পারে।

ক) পেটে গ্যাস বা আফরা রোগ:

লক্ষণ: ছাগলের পেটের বাম দিক ফুলে যায়, শ্বাস নিতে কষ্ট হয় এবং ছাগল অস্থির হয়ে ওঠে।

আধুনিক চিকিৎসা: রোটাসিল বা জেলোসিল লিকুইড দিন। বাচ্চা ছাগলের জন্য ২৫ মিলি এবং বড় ছাগলের জন্য ৫০ মিলি ঔষধ দিনে ২ বার ৬ ঘণ্টা অন্তর খাওয়াতে হবে।

ঘরোয়া টোটকা: সরিষার তেলের সাথে সামান্য কালোজিরা মিশিয়ে খাওয়ালে পেটের গ্যাস দ্রুত বেরিয়ে যায়।

সতর্কতা: রোগের প্রভাব, লক্ষণ ও বয়স অনুসারে ঔষধের ডোজ এবং ব্র্যান্ডের প্রয়োজনীয়তা আলাদা হতে পারে, তাই প্রয়োগের পূর্বে অভিজ্ঞ ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

খ) পেটে খাদ্য জমা হওয়া বা অজীর্ণ:

লক্ষণ: পেট ভার হয়ে থাকে এবং ছাগল মলত্যাগ বন্ধ করে দেয়।

আধুনিক চিকিৎসা: ম্যাগ-সালফ (বড়দের জন্য ৫০ গ্রাম, বাচ্চাদের জন্য ২৫ গ্রাম) গরম জলে মিশিয়ে খাওয়াতে হবে।

সংশোধিত চিকিৎসা: বাচ্চা ছাগলকে আদা ১০ গ্রাম ও জোয়ান ১ চা চামচ এবং বড়ো ছাগলকে ২৫ গ্রাম আদা ও জোয়ান ১ চা চামচ মিশিয়ে খেতে দিলে দ্রুত কাজ করবে।

ঘরোয়া টোটকা: বিট লবণের সাথে জোয়ান গুঁড়ো করে কুসুম কুসুম গরম জলে মিশিয়ে খাওয়ালে হজম ক্ষমতা বাড়ে।

সতর্কতা: তাৎক্ষণিক চিকিৎসা বা ধীরে চিকিৎসার প্রয়োজন অনুসারে ঔষধের পাওয়ার আলাদা হতে পারে, তাই ঔষধ প্রয়োগের আগে ছাগলের রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার সুনিশ্চিত করতে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

২. পাতলা পায়খানা ও কৃমিনাশক ব্যবস্থাপনা

ছাগলের রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার আলোচনায় কৃমি এবং পাতলা পায়খানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ক) পাতলা পায়খানা বা ডাইরিয়া:

লক্ষণ: ছাগল সাদা বা হলুদ রঙের দুর্গন্ধযুক্ত জলীয় পায়খানা করে এবং দুর্বল হয়ে পড়ে।

আধুনিক চিকিৎসা: ডায়ারক, এস্ট্রিনজেন্স বা নেবলন পাউডার বড় ছাগল ১০ গ্রাম, বাচ্চা ৫ গ্রাম দিনে ৩ বার করে ২ দিন খাওয়াতে হবে। তৃতীয় দিন সকালে কৃমির ঔষধ খাওয়াতে হবে।

ঘরোয়া টোটকা: কাঁচকলা সেদ্ধ করে তার সাথে সামান্য থকুনি পাতার রস মিশিয়ে খাওয়ালে পাতলা পায়খানা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে।

সতর্কতা: বয়স ও ওজনের ওপর ভিত্তি করে ঔষধের ডোজ ভিন্ন হতে পারে, তাই চূড়ান্ত চিকিৎসার ছাগলের রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার সুনিশ্চিত করতে আগে অবশ্যই ডাক্তারের সাথে কথা বলুন।

খ) কৃমিনাশক ব্যবস্থা (Deworming):

লক্ষণ: ছাগল রোগা হয়ে যায়, গায়ের লোম রুক্ষ দেখায় এবং ঘন ঘন পায়খানা করে।

আধুনিক চিকিৎসা: ১ থেকে ৬ মাস বয়সী বাচ্চার জন্য পাইপারজিন ২-৫ মিলি: ১ দিন । ৭ মাসের উপরের ছাগলের জন্য অ্যালবেনডাজল ৩০০ থেকে ৫০০ মি.গ্রা: ঔষধ ব্যবহার করুন ৩ মাস অন্তর।

সতর্কতা: গর্ভবতী ছাগীকে কৃমিনাশক দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে, তাই ছাগলের রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার সুনিশ্চিত করতে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ঔষধ দেবেন না।

৩. জ্বর, সর্দি ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা

বর্ষাকালে এবং শীতের শুরুতে ছাগলের রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে আরও সচেতন হতে হবে কারণ এ সময় ঠান্ডাজনিত রোগ বেশি হয়।

ক) সাধারণ জ্বর ও নিমনিয়া

ঋতু পরিবর্তনের সময় ছাগলের রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার না জানলে সাধারণ সর্দি নিমোনিয়ায় রূপ নিতে পারে।

লক্ষণ: ছাগলের শরীরের তাপমাত্রা ১০৩ ডিগ্রি ফাঃ এর উপরে চলে যায়, জ্বর হয় ও কান ঠান্ডা থাকে এবং খাবার খাওয়া বন্ধ করে দেয়। অনেক সময় ৩-৪ দিন পর ঠান্ডা বসে ব্যাকটেরিয়াজনিত নিমনিয়া হয়।

চিকিৎসা: প্রথম দিন প্যারাসিটামল ট্যাবলেট বা ইনজেকশন দিন ১২ ঘণ্টা অন্তর। জ্বর না কমলে পরদিন দ্বিতীয় দিন থেকে ২ দিন পর্যন্ত বাচ্চা ছাগল হলে ১ মিলি: এবং বড়ো ছাগল হলে ২ মিলি: করে প্যারাসিটামল (ম্যালোক্সিকাম/নেমোসোলাইড/আইবোজেসিক) + অ্যান্টি-বায়োটিক (স্ট্রেপটো্পেনেসিলিন/এনরোফ্লোক্সাসিন/অক্সি) ইনজেকশন ১২ ঘণ্টা অন্তর দিতে হবে।

ঘরোয়া টোটকা: তুলসি পাতার রসের সাথে গোলমরিচ এবং মধু মিশিয়ে খাওয়ালে সাধারণ জ্বর ও সর্দিতে উপকার পাওয়া যায়।

সতর্কতা: জ্বরের মাত্রা এবং ছাগলের শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী ঔষধের পাওয়ার আলাদা হতে পারে, তাই ছাগলের রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার সুনিশ্চিত করতে রেজিস্টার্ড ভ্যাটেনারী চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ঔষধ প্রয়োগ করবেন না।

খ) সর্দি ও কাশি

লক্ষণ: নাক দিয়ে জল পড়ে এবং ছাগল বারবার হাঁচি দেয়।

চিকিৎসা: অ্যান্টি-হিস্টামিন জাতীয় ঔষধ (এভিল বা জীট ) ১২ ঘণ্টা অন্তর ২ দিন খাওয়াতে হবে।

সতর্কতা: সাধারণ সর্দি থেকে নিউমোনিয়া হওয়ার ঝুঁকি থাকে, তাই ঔষধ প্রয়োগের আগে ভ্যাটেরিনারি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া শ্রেয়।

গ. সর্দির বিশেষ ঘরোয়া টোটকা (ভেষজ তেল তৈরি ও ব্যবহার)

গ্রামবাংলার অভিজ্ঞ খামারিরা শীত ও বর্ষায় ছাগলকে সর্দির হাত থেকে বাঁচাতে একটি বিশেষ ভেষজ তেল ব্যবহার করেন। ছাগলের রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার-র এটি তৈরির পদ্ধতি নিচে ধাপে ধাপে দেওয়া হলো:

প্রয়োজনীয় উপকরণ:

  • সর্ষের তেল: ২৫০ মিলি (ভিত্তি হিসেবে)।
  • কালোজিরা: ১ টেবিল চামচ (রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়)।
  • রসুন: ৫-৬ কোয়া, থেঁতো করা (প্রাকৃতিক অ্যান্টি-বায়োটিক)।
  • কাঁচা হলুদ: ১ টুকরো, কুঁচি করা বা বাটা (জীবাণুনাশক)।
  • মেথি: ১ চা চামচ (শরীরে উষ্ণতা যোগায়)।
  • জোয়ান: ১ চা চামচ (গ্যাস ও ঠান্ডা উপশম করে)।

তৈরির নিয়ম:

  • প্রথমে একটি লোহার কড়াই বা পাত্রে সর্ষের তেল হালকা গরম করে নিন।
  • তেল গরম হলে এতে কালোজিরা, থেঁতো করা রসুন, হলুদ কুঁচি, মেথি এবং জোয়ান গুঁড়ো দিয়ে দিন।
  • একদম অল্প আঁচে প্রায় ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা গরম (খুব বেশি কড়া আঁচে গরম করবেন না, এতে ভেষজ গুণ নষ্ট হতে পারে; ধীর জ্বালে গরম করা উত্তম) করতে থাকুন যতক্ষণ না উপাদানগুলোর নির্যাস তেলে মিশে যায়।
  • তেল ঠান্ডা হয়ে এলে একটি পরিষ্কার কাঁচের বোতলে ছেঁকে বা উপাদানসহ ভরে রাখুন।

ব্যবহার বিধি ও উপকারিতা:

  • প্রয়োগ পদ্ধতি: প্রতিদিন সকালে এবং রাতে প্রতিটি ছাগলের নাকের ফুটোয় ১ ফোঁটা করে এই তেল মালিশ করে দিন (যখন দিবেন তখন নাকের যে কোন একটি ফুটোয় দিবেন যেমন, বাদিকের নাকের ফুটোয় দিলে পরের বার ডান দিকের নাকের ফুটোয় দিবেন) ।
  • কখন দেবেন: বিশেষ করে শীতের দিনে এবং বর্ষার সময় নিয়মিত দিলে ছাগলের নাক বন্ধ হওয়া বা সর্দি হওয়ার ঝুঁকি কমে।
  • উপকারিতা: এটি ছাগলের ফুসফুসকে সচল রাখে এবং সর্দির কারণে ঘড়ঘড় শব্দ হওয়া বন্ধ করতে সাহায্য করে। এছাড়াও ছাগলের হাঁচি দ্রুত কমে যায় এবং নাক পরিষ্কার থাকে। এছাড়া ছাগলের বুকের খাঁচায় এবং পিঠে এই তেল মালিশ করলে শরীর গরম থাকে।

৪. আধুনিক লাভজনক পদ্ধতিতে ছাগলের যত্ন

ছাগলের রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার সফল করতে হলে শুধু ঔষধ দিলেই হবে না, ঘরোয়া ব্যবস্থাপনায় জোর দিতে হবে। ছাগলের ঘর সব সময় শুকনো রাখতে হবে এবং তাদের পানীয় জলের পাত্র প্রতিদিন পরিষ্কার করতে হবে। মনে রাখবেন, পরিষ্কার জল এবং পুষ্টিকর খাবারই রোগের অর্ধেক প্রতিকার করে দেয়।

ছাগল পালন করতে হলে খামারে যেন রোগ না আসে তার জন্যে ছাগলের বাসস্থান, প্রজনন ও খাদ্য সম্পর্কে জানা জরুরী । এর জন্যে আমাদের লাভজনক ছাগল পালন পদ্ধতি জানতে এখানে ক্লিক করুন

৫. মারাত্মক সংক্রামক ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ

ছাগলের রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার গাইডের এই পর্যায়ে আমরা এমন কিছু রোগ নিয়ে আলোচনা করব যা খামারের জন্য মহামারি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ক) পিপিআর (PPR – ছাগলের মহামারি):

লক্ষণ: পিপিআর আক্রান্ত ছাগলের উচ্চ তাপমাত্রার জ্বর (১০৫-১০৬ ডিগ্রি ফাঃ) হয়। এর প্রধান লক্ষণ হলো নাক ও মুখ দিয়ে পুঁজমিশ্রিত সর্দি ঝরা, মুখে ঘা এবং দুর্গন্ধযুক্ত রক্তমিশ্রিত পাতলা পায়খানা। ছাগল দ্রুত ওজন হারায় এবং ডিহাইড্রেশনে ভোগে। ৩-৪ দিন পর মারা যায় এবং অনেক সময় খামারে বা গ্রামে মরক দেখা দেয়।

আধুনিক চিকিৎসা: যেহেতু এটি ভাইরাসজনিত রোগ, তাই নির্দিষ্ট কোনো ঔষধ নেই। তবে সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন রোধে অ্যান্টি-বায়োটিক ইনজেকশন ৮ ঘণ্টা অন্তর ৩ দিন এবং এন্টিহিসটামিন ১২ ঘণ্টা অন্তর ২ দিন দিতে হবে এবং স্যালাইন দিতে হবে। তবে এর মূল

ঘরোয়া টোটকা: নিম পাতা সেদ্ধ জল দিয়ে নিয়মিত ছাগলের মুখ এবং নাকের ক্ষত পরিষ্কার করে দিতে হবে। এছাড়া শরীর ঠান্ডা রাখতে ডাবের জল বা গ্লুকোজ মেশানো জল খাওয়ানো যেতে পারে।

সতর্কতা: পিপিআর অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ। রোগের তীব্রতা ও ছাগলের বয়স অনুসারে ঔষধের ডোজ এবং ভ্যাকসিনের প্রয়োজনীয়তা আলাদা হতে পারে, তাই প্রয়োগের পূর্বে অভিজ্ঞ ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

খ) এনথ্রাক্স বা তড়কা (Anthrax):

  • লক্ষণ: এটি একটি মারাত্মক ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ। আক্রান্ত ছাগলের হঠাৎ জ্বর আসে এবং কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছাগল কাঁপতে কাঁপতে মারা যায়। মৃত্যুর পর নাক, মুখ ও মলদ্বার দিয়ে কালচে ও জমাট না বাঁধা রক্ত বের হতে দেখা যায়।
  • আধুনিক চিকিৎসা: এনথ্রাক্স হলে চিকিৎসার সময় খুব কম পাওয়া যায়। তবে প্রাথমিক অবস্থায় পেনিসিলিন জাতীয় ইনজেকশন কার্যকর হতে পারে।

প্রতিকার ও সতর্কতা: মৃত ছাগলকে কখনোই কাটা যাবে না, কারণ এটি মানুষের শরীরেও ছড়াতে পারে। তড়কা রোগের প্রভাব ও লক্ষণ অনুসারে ঔষধের পাওয়ার আলাদা হতে পারে, তাই তাৎক্ষণিক চিকিৎসার জন্য দ্রুত অভিজ্ঞ পশু চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

ছাগলের রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার প্রাণী মিত্রা PPR ভ্যাক্সিন দিচ্ছে প্রিয়াংকা রায়ের ছাগল খামারে ।
ছাগলের রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার প্রাণী মিত্রা PPR ভ্যাক্সিন দিচ্ছে প্রিয়াংকা রায়ের ছাগল খামারে ।

আড়ও দেখুন- ছাগল খামারীর শূন্য থেকে লাখপতি দিদি হয়ে ওঠার সাফল্য গল্প [এখানে ক্লিক করুন ]

৬. এন্টেরোটক্সিমিয়া বা ‘ফিট হওয়া’ রোগ (জটিল সমস্যা)

  • লক্ষণ: ছাগল অস্বাভাবিকভাবে কান খাড়া করে দৌড়াতে থাকে, গোল গোল ঘুরে পড়ে যায়, দাঁত কিড়মিড় করে এবং মুখ দিয়ে সাদা ফেনা বের হয়। অনেক সময় ছাগলের পেছনের পা অবশ হয়ে যায়। এটি মূলত ক্লোস্ট্রিডিয়াম নামক ব্যাকটেরিয়ার বিষক্রিয়ার ফলে ঘটে।
  • আধুনিক চিকিৎসা: আক্রান্ত হওয়ার সাথে সাথে অ্যান্টি-টক্সিন সিরাম এবং উচ্চশক্তির অ্যান্টি-বায়োটিক প্রয়োজন হয়।
  • ঘরোয়া টোটকা: এই রোগে পেটে প্রচুর গ্যাস জমে, তাই দ্রুত আদা ও জোয়ান ভেজানো জল সামান্য বিট লবণ দিয়ে খাওয়ালে সাময়িক উপশম হতে পারে।

সতর্কতা: এই রোগের আক্রমণ অত্যন্ত দ্রুত হয়, তাই ঔষধের ব্র্যান্ড বা পাওয়ার নির্বাচনে ভুলের কোনো অবকাশ নেই। প্রয়োগের পূর্বে অবশ্যই রেজিস্টার্ড ভ্যাটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

৭. ছাগলের চর্মরোগ ও খুরা রোগ (FMD)

ক) এ্যাসো বা খুরা রোগ: ভাইরাসজনিত রোগ

  • লক্ষণ: ছাগলের জিহ্বা, মাঢ়ি এবং খুরের মাঝখানে ছোট ছোট ঘা বা ফোস্কা দেখা দেয়। মুখ দিয়ে অনবরত লালা ঝরতে থাকে।
  • চিকিৎসা: পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট মিশ্রিত জল দিয়ে পা ও মুখ ধুয়ে দিতে হবে।
  • ঘরোয়া টোটকা: সোহাগার খই মধুর সাথে মিশিয়ে ঘা-এর স্থানে প্রলেপ দিলে দ্রুত আরাম পাওয়া যায়।

সতর্কতা: খুরা রোগের প্রভাব ও লক্ষণ ভেদে ঔষধের মাত্রা আলাদা হতে পারে, তাই অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো কড়া অ্যান্টি-বায়োটিক ব্যবহার করবেন না।

খ) ছাগ বসন্ত: ভাইরাসজনিত রোগ

  • লক্ষণ: সর্দি পরে ও জ্বর হয় এবং শরীরের নরম অংশে ফোস্কা হয়। ৩-৪ দিন পর মারা যায়।
  • চিকিৎসা: ক্ষত স্থানে হিমাক্স বা সোরীন মলম লাগাতে হবে। ৩ দিন ৮ ঘণ্টা অন্তর এন্টিবায়টিক ইনজেকশন ৩ দিন এবং ২ দিন এন্টি – হিসটামিন ইনজেকশন ১২ ঘণ্টা অন্তর দিতে হবে।

সতর্কতা: বসন্ত রোগের প্রভাব ও লক্ষণ ভেদে ঔষধের মাত্রা আলাদা হতে পারে, তাই অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো কড়া অ্যান্টি-বায়োটিক ব্যবহার করবেন না।

৮. প্রাণী সম্পদ বিকাশ দপ্তর অনুমোদিত টিকাদান সূচী

ছাগলের রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার সুনিশ্চিত করতে নিচের চার্টটি অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি:

  • পিপিআর টিকা: ৪০ দিন বয়সে ১ম ডোজ, ৩ মাস বয়সে ২য় ডোজ। প্রতি বছর একবার বুস্টার ডোজ।
  • গোট পক্স (বসন্ত): বছরে একবার।
  • এ্যাসো বা খুরা রোগ: বছরে দুইবার (বর্ষার আগে ও পরে)।
  • তড়কা বা এনথ্রাক্স: বছরে একবার নির্দিষ্ট সময়ে।

পরিবারের আয় বাড়াতে আড়ও জানুন লাভজনক Murgi Palon পদ্ধতি: বাসস্থান থেকে টিকার তালিকা—এক নজরে সব (২০২৬)

বিশেষ রোগের লক্ষণ ও কৃষি সূত্র সতর্কতা

রোগের নামপ্রধান লক্ষণঘরোয়া যত্ন (প্রাথমিক)
ছাগ বসন্তশরীরে দানাদার ফোস্কাপটাশ মিশ্রিত জলে ক্ষত ধোওয়া।
এ্যাসো (FMD)পা ও মুখে ঘা, লালা পড়াসোহাগার খই ও মধু ঘা-এ লাগানো।
নিউমোনিয়াঘন শ্বাস ও কাশির শব্দছাগলকে শুকনো ও গরম জায়গায় রাখা।

কৃষি সূত্র বিশেষ সতর্কতা: এই ছাগলের রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার কন্টেন্টে বর্ণিত প্রতিটি ঔষধ এবং পদ্ধতি খামারিদের প্রাথমিক জ্ঞান অর্জনের জন্য। ছাগলের বয়স, ওজন এবং সংক্রমণের মাত্রা অনুসারে ঔষধের ডোজ ভিন্ন হয়। ভুল ঔষধের প্রয়োগে ছাগলের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তাই যেকোনো ধরণের ঔষধ বা ভ্যাকসিন প্রয়োগের পূর্বে অবশ্যই আপনার নিকটস্থ সরকারি প্রাণী সম্পদ বিকাশ কেন্দ্র বা একজন রেজিস্টার্ড পশু চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করুন।

জরুরি পশু চিকিৎসা ও অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা (হেল্পলাইন)

যদি আপনার খামারে হঠাৎ কোনো ছাগল মারা যায় বা অনেক ছাগল অসুস্থ হয় পশু হাসপাতাল বা ভ্যাটেনারী রেজিস্টার্ড পশু চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় , তবে সময় নষ্ট না করে সরকারি টোল ফ্রি নম্বরে কল করুন। আপনার এলাকায় থাকা সরকারি মোবাইল মেডিকেল ভ্যান দ্রুত আপনার ঠিকানায় পৌঁছে যাবে।

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন: ছাগলের পিপিআর (PPR) রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার কী?

উত্তর: উচ্চ জ্বর, দুর্গন্ধযুক্ত সর্দি ও রক্তমিশ্রিত পায়খানা পিপিআর-এর লক্ষণ। প্রতিকারে পরিষ্কার জল ও ওআরএস দিন এবং পিপিআর টিকা নিশ্চিত করুন। ছাগলের রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার জানতে এটি জরুরি।

প্রশ্ন: ছাগলের পাতলা পায়খানা হলে ঘরোয়া চিকিৎসা কী?

উত্তর: পাতলা পায়খানা হলে পরিষ্কার জল ও ওআরএস দিন। ঘরোয়াভাবে আদা ও জোয়ান বাটা কাজ করে। তবে অবস্থা উন্নত না হলে ডায়ারক বা নেবলন পাউডার ব্যবহার করে ছাগলের রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার নিশ্চিত করুন।

প্রশ্ন: ছাগলের কৃমির ঔষধ খাওয়ার নিয়ম কী?

উত্তর: ছাগলকে ৩ মাস অন্তর সকালে খালি পেটে পরিষ্কার জল-এর সাথে কৃমিনাশক (যেমন: পাইপারজিন) দিন। সঠিক ছাগলের রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার ব্যবস্থাপনায় কৃমিনাশক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ

প্রশ্ন: ছাগল গোল গোল ঘুরে পড়ে মারা যায় কেন?

উত্তর: এটি এন্টেরোটক্সিমিয়া বা ফিট রোগের লক্ষণ। অতিরিক্ত দানাদার খাবার বা অন্ত্রে বিষক্রিয়ায় এমন হয়। নিয়মিত কৃমিনাশক ও টিকা দিয়ে এই ছাগলের রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার প্রতিরোধ করা সম্ভব।

প্রশ্ন: ছাগলের ওলান বা বাট শক্ত হয়ে ফুলে গেলে কী করণীয়?

উত্তর: এটি ওলান প্রদাহ বা ম্যাসটাইটিস। আক্রান্ত বাটের দুধ বের করে পটাশ মেশানো জল দিয়ে ধুয়ে দিন। অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টি-বায়োটিক দিয়ে ছাগলের রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার নিশ্চিত করুন।

প্রশ্ন: ছাগলের সর্দি ও কাশির জন্য সেরা ঔষধ কোনটি?

উত্তর: সাধারণ সর্দিতে এভিল বা জীত ঔষধ দারুণ কাজ করে। ঘরোয়াভাবে সর্ষের তেলের সাথে কালোজিরা ও রসুন গরম করে নাকে মাখানো একটি কার্যকর ছাগলের রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার পদ্ধতি।

প্রশ্ন: ছাগলের পেটে গ্যাস বা আফরা হলে দ্রুত প্রতিকার কী?

উত্তর: পেটে গ্যাস হলে রোটাসিল বা জেলোসিল লিকুইড দিন। ঘরোয়াভাবে আদা, জোয়ান ও বিট লবণ মেশানো জল দ্রুত গ্যাস কমায়। সঠিক ছাগলের রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার মেনে চললে প্রাণহানি এড়ানো যায়।

প্রশ্ন: ছাগলের ওলান বা বাট শক্ত হয়ে ফুলে গেলে কী করণীয়?

উত্তর: এটি ওলান প্রদাহ বা ম্যাসটাইটিস। আক্রান্ত বাটের দুধ বের করে পটাশ মেশানো জল দিয়ে ধুয়ে দিন। অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টি-বায়োটিক দিয়ে ছাগলের রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার নিশ্চিত করুন।

তথ্য সুত্র

  • প্রাণী সম্পদ বিকাশ (ARDD) পশ্চিমবঙ্গ সরকার।
  • পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য গ্রামীণ আজীবিকা মিশন (WBSRLM)
Spread the love

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top