
হাঁস পালন লাভজনক করতে হলে আপনাকে খামারের প্রতিটি হাঁসের গতিবিধি ও স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিতে হবে। অনেক সময় বইয়ের তাত্ত্বিক জ্ঞানের চেয়ে খামারিদের বাস্তব অভিজ্ঞতা মাঠ পর্যায়ে বেশি কার্যকর হয়। আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা হাঁসের বাচ্চা থেকে শুরু করে বড় হাঁসের রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা পদ্ধতি দিয়ে ২৮টি জটিল সমস্যার সমাধান নিয়ে আলোচনা করব।
- বিশেষ সতর্কবার্তা: নিচে হাঁসের রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা বর্ণিত ঔষধগুলো অভিজ্ঞ খামারিদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় কার্যকর প্রমাণিত। তবে হাঁসের বয়স, ওজন এবং রোগের তীব্রতা অনুযায়ী ঔষধের মাত্রা (Dose) ভিন্ন হয়। তাই যেকোনো ঔষধ প্রয়োগের আগে অবশ্যই আপনার নিকটস্থ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বা রেজিস্টার্ড ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সঠিক পরিমাণ নিশ্চিত করুন।
১. হাঁসের বাচ্চার প্রাথমিক যত্ন ও চিকিৎসা
১. বাচ্চার প্রথম ডোজ (১-৩ দিন): বাচ্চা আনার পর প্রাথমিক ধকল কাটাতে অক্সিটেট্রাসাইক্লিন (Oxytetracycline) গ্রুপের ঔষধ অত্যন্ত কার্যকর। পরিমাণ ১ গ্রাম পাউডার ১-২ লিটার জলে মিশিয়ে প্রথম ৩ দিন। সতর্কতা: মাত্র ঠিক করার জন্যে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন [অতিরিক্ত গরমে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের সময় সাথে অবশ্যই গ্লুকোজ বা ইলেকট্রোলাইট জল রাখা জরুরি, যাতে বাচ্চার শরীর ডিহাইড্রেটেড না হয় ]।
২. ভিটামিন বি কোর্স (৪-৬ দিন): স্নায়বিক গঠন মজবুত করতে ভিটামিন বি (Vitamin B) সমৃদ্ধ ঔষধ ব্যবহার করুন।
৩. ভিটামিন সি ও ক্যালসিয়াম (৭-৯ দিন): হাড়ের গঠন ও দ্রুত বৃদ্ধির জন্য ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন সি কোর্স করানো প্রয়োজন।
৪. কৃমিনাশক ও প্রাকৃতিক চিকিৎসা: ২ মাস বয়সে অ্যালবেন্ডাজল (Albendazole) গ্রুপের ঔষধ দেওয়া হয়। তবে প্রাকৃতিক সুরক্ষায় ১ মাস বয়স থেকে সপ্তাহে ১ দিন নিমপাতার রস খাওয়ানো যেতে পারে।
৫. রোগ প্রতিরোধে রসুন ও মধু: ইমিউনিটি বাড়াতে নিয়মিত হলুদ গোলা জলের সাথে রসুন ও মধু মিশিয়ে দেওয়া একটি প্রমাণিত ঘরোয়া পদ্ধতি।
৬. লিভার টনিক: বাচ্চার বয়স ৪০ দিন পূর্ণ হলে লিভারের সুরক্ষা ও হজমশক্তি বাড়াতে ভালো মানের লিভার টনিক ব্যবহার করুন।
২. শারীরিক ও স্নায়বিক সমস্যার হাঁসের রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা
৭. আঘাতজনিত সমস্যা: হাঁস কোথাও চোট পেলে হলুদ ও তেল একসাথে গরম করে ক্ষতস্থানে লাগালে দ্রুত উপশম হয়।
৮. পা খুড়িয়ে হাঁটা: হাঁস পা খুঁড়িয়ে হাঁটলে বা পায়ে ব্যথার লক্ষণে হোমিওপ্যাথি ঔষধ আরসেনিক অ্যালবাম (Arsenic Album) ব্যবহার করা যায়।
৯. চোখ কানা হওয়া ও লালা পড়া: চোখ দিয়ে জল পড়া বা মুখ দিয়ে লালা পড়ার চিকিৎসায় এনরোফ্লক্সাসিন (Enrofloxacin) গ্রুপের ঔষধ কার্যকর। পরিমাণ ১ গ্রাম পাউডার ১-২ লিটার জলে মিশিয়ে প্রথম ৩ দিন।
[সতর্কতা: এই ঔষধটি ব্যবহারের সময় হাঁসকে কড়া রোদে রাখবেন না এবং সঠিক ডোজের জন্য অবশ্যই রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।]
১০. ঘাড় উল্টে যাওয়া বা মৃত্যু: এটি মূলত ভিটামিন ই-এর অভাব। এক্ষেত্রে ভিটামিন ই ভেট পাউডার বা মানুষের ই-ক্যাপ (E-Cap) ব্যবহার করা হয়।পরিমাণ: ১টি ই-ক্যাপ বা ১ গ্রাম পাউডার ৫-১০টি হাঁসের জন্য খাবারের সাথে। টানা ৫ দিন।
সতর্কতা: [রোগের শুরুতেই এটি দিতে হবে, রোগ বেশি পুরোনো হয়ে গেলে শুধু ভিটামিনে কাজ না-ও হতে পারে।]
১১. খাদ্য থলি ফুলে যাওয়া: বাচ্চার খাদ্য থলি ফুলে গেলে জীবাণুমুক্ত খাবার ও জলের সাথে সিপ্রোফ্লক্সাসিন (Ciprofloxacin) ব্যবহার করতে হবে।
১২. চোখ নীল ও ঘাড় বাঁকা: এই লক্ষণ দেখা দিলে বুঝতে হবে এটি ভিটামিন বি-এর অভাব। দ্রুত ভিটামিন বি১ ও বি২ সমৃদ্ধ ঔষধ প্রয়োগ করতে হবে।
আপনার হাসের সাথে মাছের রোগ সমাধানে আড়ও দেখুন মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার: মাছের ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া রোগের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা
৩. সংক্রামক ও ভাইরাস ঘটিত জটিল রোগের সমাধান
১৩. হাঁসের জ্বর: হাঁসের শরীরের তাপমাত্রা বাড়লে সিপ্রোফ্লক্সাসিন গ্রুপের ঔষধ কার্যকর।
১৪. হাঁস কুঁজো হয়ে হাঁটা: হাঁস কুঁজো হয়ে বুকে ভর দিয়ে হাঁটলে এনরোফ্লক্সাসিন গ্রুপের ঔষধ ব্যবহার করা হয়। [ডোজের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন]।
১৫. চুনপায়খানা ও ঝিমানো: হাঁস ঝিমানো ও সাদা চুন পায়খানা করলে এনরোফ্লক্সাসিন বা লেভোফ্লক্সাসিন গ্রুপের ঔষধ ব্যবহার করা হয়। এটি চুন পায়খানার একটি প্রধান হাঁসের রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা।পরিমাণ: ১ মিলি ঔষধ ১ লিটার জলে মিশিয়ে ৩-৫ দিন।
সতর্কতা: [চুনপায়খানা শুরু হওয়া মানেই শরীরে সংক্রমণ ছড়িয়েছে, তাই দেরি না করে দ্রুত পদক্ষেপ নিন এবং ডাক্তারের পরামর্শে ডোজ নিশ্চিত করুন।]
১৬. অরুচি ও খাদ্য গ্রহণে অনীহা: খাবার না খেলে দ্রুত কৃমিনাশক ঔষধ এবং ভিটামিন এ টু জেট (A2Z) সাপ্লিমেন্ট খাওয়ান।
১৭. মাথার চুল উঠে যাওয়া: হাঁসের বাচ্চার মাথার পশম বা চুল উঠে গেলে জিঙ্ক (Zinc Syrup) খাওয়ালে দ্রুত সমাধান হয়।
১৮. ডিমের উৎপাদন বৃদ্ধি: বেশি ডিম পাওয়ার জন্য প্রথমে কৃমিনাশক এবং তার পর নিয়মিত ভিটামিন ই সমৃদ্ধ ঔষধ খাওয়াতে হবে।
১৯. চোখ ঘোলা ও ঘাড় বাঁকা: ঘাড় বাঁকা ও চোখ ঘোলা হয়ে যাওয়ার চিকিৎসায় ভিটামিন A, D ও E এর সংমিশ্রণ প্রয়োগ করুন।
২০. পেট ফোলা ও সাদা পায়খানা: বাচ্চার পেট ফুলে যাওয়া ও সাদা পায়খানার চিকিৎসায় এনরোফ্লক্সাসিন কার্যকর। [ডোজের জন্য ডাক্তারের পরামর্শ নিন]।
২১. ডাক কলেরা রোগ: পাতলা পায়খানা করে ,প্রবল জ্বর হয় চামড়ার নিচে লালচে হয় । এর চিকিৎসায় সিপ্রোফ্লক্সাসিন ব্যবহার করা হয়। তবে নিয়মিত ভ্যাকসিন দেওয়াই এর প্রধান সুরক্ষা।পরিমাণ: ১ মিলি ঔষধ ২-৩ লিটার জলে মিশিয়ে টানা ৫ দিন।
সতর্কতা: [ডাক কলেরা খুব দ্রুত ছড়ায়, তাই একটি হাঁস আক্রান্ত হলে পুরো ঝাঁককে আক্রান্ত করে দিতে পারে ।রেজিস্টার্ড ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ডোজ করান এবং পরিবেশ দ্রুত জীবাণুমুক্ত করুন।]
২২. ক্রমাগত অরুচি: বাচ্চা দীর্ঘসময় না খেলে পুনরায় কৃমিনাশক কোর্স করান এবং লিভার টনিক দিন।
২৩. চলাফেরায় সমস্যা ও খাবার বন্ধ: হাঁটাচলা ও খাবার বন্ধ করে দিলে সালফামেথক্সেজল এবং ট্রাইমেথোপ্রিম (Sulfamethoxazole + Trimethoprim) গ্রুপের ঔষধ চিকিৎসকের পরামর্শে ব্যবহার করুন।
২৪. ডাক প্লেগ রোগ: ডানা ঝুলে পরে। পা খুড়ায় , সবুজ পাতলা পায়খানা করে ও মাথা ফুলে যায় । হাঁসের রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা তে এটি ভাইরাস ঘটিত এই রোগে সেকেন্ডারি ইনফেকশন রোধে চিকিৎসকরা অনেক সময় সিপ্রোফ্লক্সাসিন পরামর্শ দেন। তবে এটি পুরোপুরি ভ্যাকসিনের ওপর নির্ভরশীল।
২৫. প্যারালাইসিস বা পক্ষাঘাত: হাঁসের প্যারালাইসিস দেখা দিলে ভিটামিন বি১ ও বি২ সমৃদ্ধ ঔষধ প্রয়োগ করতে হবে।
২৬. সর্দি ও কফ: সর্দি-কাশিতে বাচ্চার গলা ঘরঘর করলে এবং নাকে জল থাকলে এনরোফ্লক্সাসিন গ্রুপের ঔষধ কার্যকরী।পরিমাণ: ১ মিলি ঔষধ ১ লিটার জলে মিশিয়ে ৩ দিন।
সতর্কতা: [সর্দির সাথে যদি জ্বর থাকে তবেই এটি কার্যকর, তবে অতিরিক্ত ঠান্ডায় হাঁসকে ঘরোয়া চিকিৎসায় উষ্ণ রাখাও সমান জরুরি। রেজিস্টার্ড ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ডোজ করান]
২৭. দলছুট হয়ে ঝিমানো: বাচ্চা দলছুট হয়ে ঝিমালে অ্যামোক্সিসিলিন (Amoxicillin) গ্রুপের ঔষধ ব্যবহার করা হয়।
২৮. জল থেকে ফেরার পর মৃত্যু: হাঁসের বাচ্চা জল থেকে ফিরে ঘাড় উল্টে মারা যেতে থাকলে তৎক্ষণাৎ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এনরোফ্লক্সাসিন প্রয়োগ করুন। এটি অনেক বাচ্চার প্রাণ বাঁচাতে পারে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. হাঁসের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে কি করা উচিত?
উত্তর: নিয়মিত পরিষ্কার জল, পুষ্টিকর খাবার এবং প্রাকৃতিক উপায়ে রসুন, হলুদ ও নিমপাতার রস খাওয়ালে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।
২. হাঁসকে কখন ডাক প্লেগের ভ্যাকসিন দিতে হয়?
উত্তর: সাধারণত ৬ সপ্তাহ বয়সে প্রথমবার এবং ৪ মাস বয়সে দ্বিতীয়বার ডাক প্লেগ ভ্যাকসিন দিতে হয়। তবে জলবায়ু অঞ্চল ভেদে কোম্পানী অনুসারে ভিন্ন হতে পারে বাংলাদেশ প্রথম ২১ দিন ও দ্বিতীয় ৪৫ দিন পরামর্শ দিয়ে থাকেন ।
কৃষিসুত্র পরামর্শ ও শেষ কথা
হাঁসের খামারে লাভবান হওয়ার মূল মন্ত্র হলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা। হাঁসের রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা সম্পর্কে জানলে আপনি দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবেন। তবে মনে রাখবেন, যেকোনো ঔষধ ব্যবহারের আগে নিকটস্থ প্রাণিসম্পদ অফিসের সাথে যোগাযোগ করা বাঞ্ছনীয়।
তথ্য সুত্র
- প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (DLS) বাংলাদেশ ।
- প্রাণী সম্পদ বিকাশ বিভাগ (ARD)
আড়ও দেখুন আনন্দধারা প্রকল্পের অধীনে মহিলা প্রোডিউসার গ্রুপ (PG) বা উৎপাদক গোষ্ঠী গঠনের পূর্ণাঙ্গ গাইড










