
মাছ চাষে লোকসান এড়াতে মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার সম্পর্কে জ্ঞান রাখা প্রতিটি চাষির একান্ত কর্তব্য। পরিবেশগত সমস্যা ছাড়াও মূলত ৬টি প্রধান জীবাণুর কারণে মাছের মরণব্যাধি রোগগুলো হয়ে থাকে। আজকের এই পর্বে আমরা বিশেষভাবে ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া ঘটিত রোগের গভীর বিশ্লেষণ ও সমাধান নিয়ে আলোচনা করব। আপনি যদি মাছের মড়ক ঠেকাতে চান, তবে মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার সংক্রান্ত এই নির্দেশিকাটি মনোযোগ দিয়ে পড়ুন।
১. মাছের ছত্রাক ঘটিত রোগ এবং মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার
ছত্রাক ঘটিত সংক্রমণের কারণে সাধারণত মাছের ফুলকা গলা, স্যাপ্রোলেগনিয়াসিস এবং সাদা লোম বা সুতো গুচ্ছ ক্ষত—এই তিনটি প্রধান রোগ দেখা দেয়। মাছেদের সুস্বাস্থ্য ফেরাতে মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার হিসেবে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
ক) মাছের ফুলকা গলা রোগ (Gillrot) এবং এর প্রতিকার
এই রোগটি এক ধরণের ছত্রাক জাতীয় উদ্ভিদ থেকে হয়, যার নাম Branchiomyces sp.। সাধারণত গ্রীষ্মকালে অতিরিক্ত গরমে পুকুরের জৈব পদার্থ পচে জল দূষিত হলে এই ছত্রাক মাছের ফুলকায় দ্রুত বংশবিস্তার করে। মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার করতে এর লক্ষণ ও চিকিৎসা জানা জরুরি।
- লক্ষণ: ফুলকায় প্রথমে লাল গুটি দেখা যায়, যা পরে ধূসর হয়ে যায়। ছত্রাক ফুলকায় রক্ত চলাচল বন্ধ করে দেয়, ফলে ফুলকা পচতে শুরু করে এবং দুর্গন্ধ বের হয়। অক্সিজেনের অভাবে মাছ খাবি খায় এবং মারা যায়।
- প্রতিরোধ ব্যবস্থা: বাইরের জল যাতে না ঢোকে তার ব্যবস্থা করা, নিয়মিত চুন ও সার প্রয়োগ, নির্দিষ্ট পরিমাণ পোনা মজুত এবং ৪ বছর অন্তর পুকুরের পাঁক তোলা।
- চিকিৎসা: রোগের শুরুতে প্রতি লিটার জলে ৩০-৩৫ গ্রাম সাধারণ লবণ মিশিয়ে আক্রান্ত মাছকে ৫-১০ মিনিট ডুবিয়ে রাখুন। ১০ লিটার জলে ১ গ্রাম তুঁতে মিশ্রিত করে মাছকে ১০-৩০ মিনিট ডুবিয়ে রাখলে উপকার পাওয়া যায়। বিঘা প্রতি ২৫ কেজি কলিচুন প্রয়োগ করে জলের পিএইচ (pH) ৯ এর কাছাকাছি রাখতে পারলে এই মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার সম্ভব। এছাড়া পুকুরে খাবার বন্ধ রাখতে হবে এবং বিশুদ্ধ জল প্রবেশ করাতে হবে।
খ) মাছের স্যাপ্রোলেগনিয়াসিস রোগ ও প্রতিকার
মাছ পরিবহনের সময় বা জাল টানার সময় দেহে আঘাত লাগলে ক্ষতস্থানে সাদা সূতোর মতো ছত্রাক বাসা বাঁধে। এই অবস্থায় মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার না করলে মাছ দ্রুত মারা যায়।
- লক্ষণ: ঘায়ের ওপর সাদা সাদা সূতোর টুকরার মতো ছত্রাক দেখা যায় এবং মাছ ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে।
- চিকিৎসা: চারাপোনার জন্য প্রতি লিটার জলে ১০ গ্রাম সাধারণ লবণ (২০ মিনিট) এবং বড় মাছের জন্য ৩০ গ্রাম লবণ (১০ মিনিট) মিশিয়ে ডুবিয়ে রাখতে হবে। এছাড়া প্রতি লিটার জলে ৫ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট মিশ্রিত করে ৫-১০ মিনিট মাছকে স্নান করালে সুফল পাওয়া যাবে। ১০ লিটার জলে ৫ গ্রাম তুঁতে মিশ্রিত দ্রবণে মাছকে ডুবিয়ে রাখা মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার হিসেবে খুবই কার্যকর।
মাছের রোগ ও প্রতিকার দেখতে আড়ও দেখুন মাছের রোগের কারণ ও প্রতিকার: আধুনিক মাছ চাষের পূর্ণাঙ্গ গাইড
গ) মাছের সাদা লোম বা সুতো গুচ্ছ ক্ষত
জলের দূষণ বাড়লে Saprolegnia parasitica নামক ছত্রাকের আক্রমণে এই রোগ হয়। মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার হিসেবে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা জরুরি।
- লক্ষণ: মাছের পাখনা, দেহ, চোখ ও ফুলকায় প্রাথমিকভাবে সাদা দাগ দেখা যায়, যা পরে লোমের মতো গুচ্ছ আকার ধারণ করে ক্ষতের সৃষ্টি করে।
- প্রতিরোধ: তলার পচনশীল জৈব পদার্থ পরিষ্কার রাখা, নিয়মিত পাঁক তোলা এবং বাইরে থেকে দূষিত জল ঢুকতে না দেওয়া।
- চিকিৎসা: ৩% লবণ জলের দ্রবণে আক্রান্ত মাছকে ৪-৫ মিনিট স্নান করানো। এছাড়া প্রতি ১০ লিটারে ১ মিলিগ্রাম মেলাচাইট গ্রীণ বা প্রতি লিটারে ১ মিলিগ্রাম তুঁতে অথবা ২-৩ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট মিশিয়ে ২-৪ মিনিট স্নান করালে মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার করা সম্ভব।
২. মাছের ব্যাকটেরিয়া ঘটিত রোগ এবং মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার
জীবাণু বা ব্যাকটেরিয়ার কারণে মাছের শরীরে মড়ক লাগা সবথেকে সাধারণ ঘটনা। মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার হিসেবে ব্যাকটেরিয়া ঘটিত এই ৪টি মারাত্মক রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত নিচে দেওয়া হলো:
ক) মাছের লেজ ও পাখনা পচা রোগ (Tail & Fin rot) ও চিকিৎসা
এটি একটি ছোঁয়াচে রোগ যা Aeromonas hydrophila ও Pseudomonas fluorescens ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়। মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার হিসেবে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- লক্ষণ: পুকুরে অত্যাধিক পাঁক জমলে এই রোগ হয়। শুরুতে পাখনা বা লেজের কিনারায় সাদা রেখা দেখা দেয়, পরে পচন শুরু হয়ে পাখনা খসে পড়ে এবং রক্ত ঝরে। মাছ পুকুরে পাগলের মতো ঘুরপাক খেতে থাকে।
- প্রতিরোধ: জলের গভীরতা বাড়ানো, নিয়মিত পাঁক পরিষ্কার করা এবং বিঘা প্রতি ২০-২৫ কেজি চুন প্রয়োগ।
- চিকিৎসা: লিটার প্রতি ২০ মিলিগ্রাম তুঁতে গোলা দ্রবণে ১-২ মিনিট স্নান করান। পুকুরে বিঘা প্রতি ১.৩ কেজি পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট প্রয়োগ করুন। প্রতি কেজি খাদ্যের সঙ্গে ১০০ মিলিগ্রাম টেরামাইসিন ট্যাবলেট মিশিয়ে টানা ৭ দিন খাওয়ানো মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার করার সেরা উপায়।

খ) মাছের ড্রপসি বা পেট ফোলা রোগ ও প্রতিকার
এটি মূলত অপুষ্টি ও Aeromonas hydrophila ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে হয়। মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার না করলে মাছের শরীরে ভেতরে জল জমে পেট ফুলে যায়।
- লক্ষণ: মাছের দেহের আঁশ খাড়া হয়ে যায় এবং তার নিচে জল জমে। এটি একটি সংক্রামক রোগ।
- প্রতিরোধ: বিঘা প্রতি ২৫-৩০ কেজি চুন প্রয়োগ এবং মাসে অন্তত একবার নিমখোল ও হলুদ গুঁড়ো (১:০.০৫:২০ অনুপাতে) মেশানো খাবার দিন।
- চিকিৎসা: আক্রান্ত মাছকে পুকুর থেকে সরিয়ে ফেলাই শ্রেয়। লিটারে ১৫ মিলিগ্রাম ক্লোরোমাইসেটিন বা টেরামাইসিন মিশিয়ে মাছকে স্নান করান। এছাড়া কেজি প্রতি খাবারে ১০০ মিলিগ্রাম টেরামাইসিন মিশিয়ে ৭ দিন খাওয়ালে মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার সম্ভব।
গ) মাছের চোখ সাদা বা ঘোলা হওয়া রোগ ও চিকিৎসা
Aeromonas liquifaciens ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে কাতলা মাছে এই রোগ সবথেকে বেশি দেখা যায়। মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার হিসেবে নিচের পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করুন:
- লক্ষণ: চোখ ঘোলাটে হয় এবং পরে ছানি পড়ে সাদা হয়ে পচে যায়।
- প্রতিরোধ: জলাশয়ের অতিরিক্ত পাঁক তোলা এবং বিঘা প্রতি ২৫-৩০ কেজি চুন প্রয়োগ করা।
- চিকিৎসা: লিটারে ৮ মিলিগ্রাম ক্লোরোমাইসেটিন গুলে মাছকে ১ মিনিট ডুবিয়ে রাখুন (টানা ৩ দিন)। অথবা লিটারে ২-৪ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট বা এক্রিফ্লোভিন দ্রবণে ২-৩ মিনিট স্নান করানো মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার হিসেবে কার্যকর।
ঘ) শিঙ্গি ও মাগুরের শুঁড় খসা রোগ ও প্রতিকার
জলের গভীরতা কমলে এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে Aeromonas sp. ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে এটি হয়।
- লক্ষণ: মাছের শুঁড় ভেঙে রক্ত ঝরে বা ঘা হয়। মাছ অস্বস্তিতে ছটফট করে মারা যায়।
- প্রতিরোধ: বাইরে থেকে জল এনে গভীরতা বাড়ানো এবং বিঘা প্রতি ২৫-৩০ কেজি চুন প্রয়োগ করা।
- চিকিৎসা: লিটারে ৫০-১০০ মিলিগ্রাম তুঁতে বা ৩-৫ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট দ্রবণে ১-২ মিনিট স্নান করান। কেজি প্রতি খাবারে ১০০-১২০ মিলিগ্রাম অ্যান্টিবায়োটিক ১০ দিন খাওয়ালে মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার দ্রুত হয়।
কৃষি সুত্র পরামর্শ
পরিশেষে বলা যায়, পুকুরের পরিচ্ছন্নতা এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণই হলো মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার করার মূল চাবিকাঠি। পুকুরে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করুন । নেটিং করে দেখুন এবং সমস্যা বুঝতে না পারলে নিকটবর্তী মৎস পালন অফিসে বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করুন । বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া ঔষধ বিক্রেতার পরামর্শ থেকে দূরে থাকুন । আজকের পর্বে আমরা ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া নিয়ে বিস্তারিত জানলাম। মনে রাখবেন, সঠিক সময়ে ব্যবস্থা না নিলে মাছের মড়ক পুরো চাষাবাদ ধ্বংস করে দিতে পারে।
মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন (FAQ)
১. মাছের লাল ক্ষত বা লেজ পচা রোগে কোন ঔষধ সবথেকে ভালো?
উত্তর: মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার হিসেবে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট (বিঘা প্রতি ১.৩ কেজি) এবং খাবারের সাথে টেরামাইসিন অ্যান্টিবায়োটিক সবথেকে বেশি কার্যকর।
২. মাছের পেট ফুলে গেলে কি অন্য মাছেও এটি ছড়ায়?
উত্তর: হ্যাঁ, ড্রপসি বা পেট ফোলা রোগ একটি মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ। তাই আক্রান্ত মাছকে সরিয়ে ফেলাই মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার করার প্রথম ধাপ।
৩. ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া ঘটিত রোগের তফাত কী?
উত্তর: ছত্রাক আক্রমণে মাছের গায়ে সাদা তুলোর মতো আস্তরণ পড়ে, আর ব্যাকটেরিয়া আক্রমণে লেজ-পাখনা পচে যায় বা শরীরে ক্ষত সৃষ্টি হয়। উভয় ক্ষেত্রেই চুন ও লবণের ব্যবহার মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার হিসেবে কাজ করে।
তথ্য সুত্র
মাছ চাষের পাশাপাশি পরিবারের আয় বাড়াতে আড়ও দেখুন ওয়েস্টার বা ঝিনুক মাশরুম চাষ পদ্ধতি: বাণিজ্যিক চাষে সফল হওয়ার সম্পূর্ণ গাইড










