সরিষা চাষ পদ্ধতি: উন্নত জাত নির্বাচন এবং আধুনিক জৈব চাষের সম্পূর্ণ নির্দেশিকা

উন্নত সরিষা চাষ পদ্ধতি
উন্নত সরিষা চাষ পদ্ধতি

১. ভূমিকা

বাঙালির হেঁশেলে সরিষার তেল ও মশলা হিসেবে সরিষার দানা অপরিহার্য। বর্তমান সময়ে ভোজ্য তেলের অগ্নিমূল্যের বাজারে নিজের জমিতে সরিষা চাষ পদ্ধতি জানা থাকলে পারিবারিক চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাজারে বিক্রি করে বড় অঙ্কের মুনাফা অর্জন সম্ভব। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের কথা মাথায় রেখে কৃষকদের উচিত সরিষা চাষ পদ্ধতিতে উন্নত ও হাইব্রিড জাত নির্বাচন করা এবং পরিবেশবান্ধব চাষে জোর দেওয়া।

২. সরিষার উন্নত জাত ও তাদের বৈশিষ্ট্য

উন্নত জাত নির্বাচন হল সরিষা চাষ পদ্ধতির প্রাথমিক সিদ্ধান্ত। সরিষার ফলন নির্ভর করে সঠিক জাত নির্বাচনের ওপর। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের উপযোগী কিছু উল্লেখযোগ্য জাত নিচে দেওয়া হলো:

২.ক. পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার জন্য উপযোগী উন্নত সরিষার জাত

এই অঞ্চলের আবহাওয়া এবং মাটির গুণাগুণ বিচার করে নিচের জাতগুলো ২০২৬ সালে সবথেকে বেশি ফলন দিচ্ছে:

  • DMH – ১ (হাইব্রিড): এটি একটি অত্যন্ত উচ্চফলনশীল হাইব্রিড জাত। জীবনকাল প্রায় ১২৬ দিন এবং একর প্রতি ফলন ১১-১২ কুইন্টাল পর্যন্ত হতে পারে। এতে তেলের পরিমাণ ৪০%।
  • DMRIJ – ৩১ গিরিরাজ: দীর্ঘ মেয়াদী জাত (১৩০-১৫০ দিন)। গাছের উচ্চতা ১৮০-২১০ সেমি পর্যন্ত হয় এবং ফলন একর প্রতি ৯-১০ কুইন্টাল। ৩৯-৪২% তেল পাওয়া যায়।
  • বিনয় (বি-৯): যারা অল্প সময়ে ফসল তুলতে চান তাদের জন্য সেরা। মাত্র ৯০-৯৫ দিনে ফসল ওঠে। এর বিশেষত্ব হলো তেলের পরিমাণ (৪৬%) যা অন্যান্য জাতের তুলনায় অনেক বেশি।
  • পুষা মাস্টার্ড-৩১: এটি একটি আধুনিক জাত যা খরা সহনশীল। ১২০ দিনের মধ্যে ফলন দেয় এবং একর প্রতি ৮-৯ কুইন্টাল সরিষা পাওয়া যায়।
  • বারাণসী রাই: পশ্চিমবঙ্গের পলি মাটির জন্য এটি বিশেষভাবে তৈরি। দানার আকার বেশ বড় এবং বাজারমূল্য ভালো পাওয়া যায়।
  • পুসা ২৮ (NPJ-১২৪): সব ধরণের মাটিতে চাষযোগ্য এই জাতটি ৯১-১৩১ দিনের মধ্যে ফসল দেয়। ফলন একর প্রতি ৭-৮ কুইন্টাল।

২.খ. বাংলাদেশের জন্য উপযোগী উন্নত সরিষার জাত

বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গ ও উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য কৃষি গবেষণা কেন্দ্র (BARI) এবং পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BINA) উদ্ভাবিত সেরা জাতগুলো হলো:

  • বারী সরিষা-১৮: এটি বর্তমান সময়ের সেরা ক্যানোলা টাইপ জাত। তেলের গুণমান স্বাস্থ্যের জন্য দারুণ। জীবনকাল ১১০-১১৫ দিন এবং ফলন হেক্টর প্রতি ২.৫ টন পর্যন্ত হতে পারে।
  • বারী সরিষা-১৪ ও ১৭: এই জাত দুটি রিলের (Relay) চাষের জন্য সেরা। মাত্র ৭৫-৮০ দিনে ফসল ওঠে, ফলে আমন ও বোরো ধানের মাঝের সময়ে অনায়াসেই চাষ করা যায়।
  • বিনা সরিষা-৯ ও ১০: উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য এটি আশীর্বাদ। এই জাতগুলো লবণাক্ততা সহনশীল এবং ৮০-৯০ দিনের মধ্যে ফলন দেয়।
  • DMH – ১ (হাইব্রিড): বাংলাদেশেও এই ভারতীয় হাইব্রিড জাতটি ভালো সেচ সুবিধাযুক্ত এলাকায় ব্যাপক ফলন (১১-১২ কুইন্টাল একর প্রতি) দিচ্ছে।
  • বিনয় (বি-৯): বাংলাদেশের চাষীদের মধ্যেও এই জাতটি জনপ্রিয় কারণ এর তেলের পরিমাণ (৪৬%) এবং স্বল্প জীবনকাল।
  • সাফল্য (হাইব্রিড): বর্তমানে কিছু বেসরকারি বীজ কোম্পানি উচ্চফলনশীল হাইব্রিড সরিষা বাজারজাত করছে যা বাংলাদেশে ভালো ফলন দিচ্ছে।

কৃষি সুত্র টিপস: সরিষা চাষ পদ্ধতিতে আপনার এলাকা এবং চাষের সময় অনুযায়ী জাত নির্বাচন করুন। যদি ধান চাষের আগে সরিষা করতে চান তবে বারী সরিষা-১৪ বা বিনয় (বি-৯) বেছে নিন। আর যদি একক ফসল হিসেবে করতে চান তবে গিরিরাজ বা বারী সরিষা-১৮ সেরা ফলন দেবে।

আড়ও দেখুন বাকলা চাষ পদ্ধতি: গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন দিশা ও আধুনিক নির্দেশিকা

৩. সরিষা রোপণের সঠিক সময়

সরিষা মূলত একটি রবি শস্য। এর জন্য শুকনো ও ঠান্ডা আবহাওয়া (১০-২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস) আদর্শ।

  • কার্তিক-অগ্রহায়ণ: আমন ধান কাটার পর লাল বা কালো সরিষা লাগানোর উপযুক্ত সময়।
  • জলদি চাষ (তোরিয়া): আশ্বিন মাসের শুরুতেই উঁচু জমিতে হলুদ সরিষা বা তোরিয়া লাগানো যায়, যা ৮০-৮৫ দিনেই ফসল দেয়।

৩. জমি নির্বাচন ও মাটির প্রস্তুতি

  • বেলে দোঁয়াশ থেকে এঁটেল—সব ধরনের মাটিতেই সরিষার চাষ সম্ভব। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে:
  • মাটি যেন মাঝারি থেকে গভীর হয় এবং জল নিকাশের ভালো ব্যবস্থা থাকে।
  • মাটির আদর্শ pH মান ৬.০ থেকে ৭.৫ হওয়া প্রয়োজন।
  • প্রাকৃতিক কৃষি মিশন ২০২৬ অনুযায়ী, জমিতে রাসায়নিকের ব্যবহার কমিয়ে মাটির বাস্তুতন্ত্র ঠিক রাখতে হবে।

৪. আধুনিক সেচ প্রয়োগ পদ্ধতি

সরিষা চাষ পদ্ধতিতে মাটিতে জো (Moisture) থাকা অবস্থায় বীজ বপন করা জরুরি।

  • প্রথম সেচ: বীজ বপনের ৩০-৩৫ দিনের মাথায়।
  • দ্বিতীয় সেচ: প্রথম সেচের ২০ দিন পর।
  • টিপস: যদি জলের অভাব থাকে, তবে দানা পুষ্ট হওয়ার সময় অন্তত একটি সেচ দিলে ফলন অনেক বেড়ে যায়।

৫. বপন পদ্ধতি: সারি ও বীজের হার

সরিষা চাষ পদ্ধতিতে সঠিক দূরত্ব বজায় রাখলে সার প্রয়োগ ও পরিচর্যা সহজ হয়।

  • দূরত্ব: সারি থেকে সারি ৪৫ সেমি এবং গাছ থেকে গাছ ১৫-২০ সেমি।
  • গভীরতা: বীজ ৫-৬ সেমি (প্রায় ২ ইঞ্চি) গভীরে বুনতে হবে।
  • বীজের হার: বিঘা প্রতি ৮০০ গ্রাম (হেক্টরে প্রায় ৬ কেজি)।

আড়ও দেখুন সূর্যমুখী চাষ করার আধুনিক নিয়ম: অধিক লাভের সেরা ৫টি কৌশল

৬. সঠিক সার ও অনুখাদ্য ব্যবস্থাপনা

সরিষার খাদ্যের চাহিদা বেশি। উচ্চ ফলনের জন্য সঠিক সুষম সার জরুরি।

  • জৈব সার: সরিষা চাষ পদ্ধতিতে বিঘা প্রতি ৬০০-৮০০ কেজি কম্পোস্টের সাথে অ্যাজোটোব্যাক্টর ও পিএসবি জীবাণুসার মেশালে মাটির উর্বরতা বাড়ে।
  • রাসায়নিক সার: মূল সার হিসেবে ১৬-১৮ কেজি সিঙ্গল সুপার ফসফেট ও ৬-৮ কেজি ইউরিয়া ব্যবহার করা যায়। তবে অবশ্যই মাটি পরীক্ষার ভিত্তিতে সার প্রয়োগ করা উচিত।

কৃষি সুত্র বিশেষ পরামর্শ: তেলের পরিমাণ বাড়াতে সরিষা চাষ পদ্ধতিতে বিঘা প্রতি সালফার ব্যবহার করুন। এছাড়া ৩০ ও ৪৫ দিনের মাথায় ১% ‘সালফেট অফ পটাশ’ স্প্রে করলে বীজের মান উন্নত হয়। দ্রুত বৃদ্ধির জন্য জলে দ্রবণীয় NPK 18:18:18 স্প্রে করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

৭. মিশ্র ও সাথি ফসল হিসেবে সরিষা চাষ

  • সরিষা চাষে ঝুঁকি কমাতে এবং লাভ বাড়াতে সাথি ফসল একটি দুর্দান্ত উপায়।
  • গম, ছোলা বা মুসুরের সাথে মিশ্র ফসল হিসেবে সরিষা লাগানো যায়। এক্ষেত্রে বীজের পরিমাণ অর্ধেক করতে হবে।
  • ধান কাটার পর পয়রা পদ্ধতি অবলম্বন করলে খরচ কমে এবং অতিরিক্ত আয় নিশ্চিত হয়।

৮. সরিষার রোগ ও পোকা দমন: আধুনিক ও জৈব পদ্ধতি

সরিষা চাষে প্রধানত জাব পোকা এবং ছত্রাকজনিত রোগের প্রকোপ দেখা যায়। আপনার ফসলকে নিরাপদ ও বিষমুক্ত রাখতে সরিষা চাষ পদ্ধতিতে নিচের পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করুন:

৮.ক. প্রধান ক্ষতিকারক পোকা ও প্রতিকার

১. জাব পোকা (Aphid):

  • আক্রান্তের ধরণ : এটি সরিষার সবথেকে মারাত্মক শত্রু। এই পোকা গাছের কচি পাতা ও ফুলের রস চুষে খায়, ফলে ফলন মারাত্মক কমে যায়।
  • জৈব দমন: বিঘা প্রতি অন্তত ৫-৬টি হলুদ আঠালো ফাঁদ (Yellow Sticky Trap) ব্যবহার করুন। এছাড়া ১ লিটার জলে ৫ মিলি নিম তেল ও সামান্য ডিটারজেন্ট মিশিয়ে ১০ দিন অন্তর স্প্রে করুন।

কৃষি সুত্র উপদেশ: আর্লি বা আগাম চাষ (অক্টোবর মাসের মধ্যে) করলে জাব পোকার আক্রমণ অনেক কম হয়।

২. করাত মাছি (Saw Fly):

  • লক্ষণ: এই পোকার লার্ভা পাতার কিনারা থেকে খাওয়া শুরু করে এবং পাতা ঝাঁঝরা করে দেয়।
  • প্রতিকার: সকালবেলা ক্ষেতে গিয়ে পোকা সংগ্রহ করে ধ্বংস করুন। নিম বীজের নির্যাস স্প্রে করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।

৮.খ. প্রধান ছত্রাকজনিত রোগ ও প্রতিকার

১. অল্টারনারিয়া ব্লাইট (Alternaria Blight):

  • লক্ষণ: পাতায় ও সরিষার শুঁটিতে গাঢ় বাদামী বা কালো রঙের বৃত্তাকার দাগ দেখা যায়। এটি হলে দানা পুষ্ট হয় না।
  • জৈব দমন: বীজ বপনের আগে ট্রাইকোডার্মা ভিরিডি (Trichoderma Viride) দিয়ে বীজ শোধন করে নিন। আক্রমণের শুরুতে ১ লিটার জলে ৩-৪ গ্রাম সিউডোমোনাস ফ্লুরোসেন্স (Pseudomonas fluorescens) মিশিয়ে স্প্রে করুন।

২. সাদা মরিচা রোগ (White Rust):

  • লক্ষণ: পাতার নিচে সাদাটে পাউডারের মতো দাগ দেখা দেয় এবং গাছ কুঁকড়ে যায়।
  • প্রতিকার: আক্রান্ত গাছ বা পাতা দ্রুত তুলে জমি থেকে দূরে ফেলে দিন। মাটি পরীক্ষার সময় জমিতে পর্যাপ্ত পটাশ সার ব্যবহার করলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।

কৃষি সুত্র পরামর্শ: চাষের পূর্বে মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে নিন আপনার নিকটবর্তী ব্লক কৃষি বিভাগে এবং তাদের পরামর্শ অনুসারে চাষে কি সার কতটা প্রয়োজন প্রয়োগ করলে কম খরচে ফলন ভাল পাবেন । রোগ পোকা দমনের জন্যে কৃষি বিশেষজ্ঞের(কৃষি বিভাগ) পরামর্শ নিয়ে ঔষধের দোকানে ঔষধ ক্রয় করুন ।

৮.গ. ২০২৬ সালের জন্য স্মার্ট কৃষি টিপস:

১. পাখির বসার জায়গা (T-Perch):

সরিষা চাষ পদ্ধতিতে ক্ষেতের মাঝে মাঝে ইংরেজি ‘T’ অক্ষরের মতো খুঁটি পুঁতে দিন। এতে পাখি বসবে এবং ক্ষতিকারক পোকা ও লার্ভা খেয়ে ফেলবে। এটি একটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও নিখরচায় পোকা দমনের পদ্ধতি।

২. বন্ধু পোকা সংরক্ষণ:

লেডি বার্ড বিটল (Lady Bird Beetle) হলো সরিষার ক্ষেতের বন্ধু পোকা কারণ এরা জাব পোকা খেয়ে ফেলে। অতিরিক্ত রাসায়নিক বিষ প্রয়োগ করলে এই বন্ধু পোকাগুলো মারা যায়, তাই সরিষা চাষ পদ্ধতিতে সবসময় জৈব পদ্ধতিকে অগ্রাধিকার দিন।

আড়ও দেখুন তিল চাষ পদ্ধতি: অধিক লাভের জন্য ১০টি উন্নত জাত ও চাষের আধুনিক কৌশল

৯. কৃষি সূত্র পরামর্শ (উপসংহার)

পরিশেষে বলা যায় অধিক ফলন পেতে সঠিক সরিষা চাষ পদ্ধতি জেনে নিয়ে সঠিক জাত নির্বাচন করে চাষ করলে লাভ আশানুরূপ হয় । সেই সাথে চাষে জৈব সার,জীবাণু সার এবং কিটবিতারক ব্যাবহার ব্যাবহার খরচ কমেই লাভ বেশি হয় ।

১১. প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন. কোন জাতের সরিষায় তেলের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি?

উত্তর: সাধারণত বিনয় (বি-৯) জাতে তেলের পরিমাণ সবথেকে বেশি (প্রায় ৪৬%) থাকে।

প্রশ্ন. সরিষা চাষে সালফার কেন গুরুত্বপূর্ণ?

উত্তর: সরিষা একটি তেলবীজ জাতীয় ফসল। সালফার বীজের ভেতরে তেলের ঘনত্ব বাড়াতে এবং উৎপাদন বৃদ্ধিতে সরাসরি সাহায্য করে।

প্রশ্ন. সরিষার জমিতে জাব পোকা বা মাফিড পোকা দমন করব কীভাবে?

উত্তর: প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে নিম তেল স্প্রে করা যেতে পারে অথবা সঠিক সময়ে বীজ বপন করলে পোকার উপদ্রব কম হয়।

১২. তথ্য সুত্র

Spread the love

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top