তিল চাষ পদ্ধতি: অধিক লাভের জন্য ১০টি উন্নত জাত ও চাষের আধুনিক কৌশল

তিল চাষ পদ্ধতি ও আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনা
তিল চাষ

বর্তমানে লাভজনক কৃষির কথা বললে তিল চাষ পদ্ধতি সবার আগে আসে। তিল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। বর্তমানে ভোজ্য তেলের বাজারে তিলের তেলের আকাশচুম্বী চাহিদা থাকায় কৃষকদের কাছে তিল চাষ পদ্ধতি একটি লাভজনক মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। খুব কম খরচে এবং সামান্য পরিশ্রমে তিল থেকে ভালো লাভ করা সম্ভব। আমাদের রাজ্যে তৈলবীজের মধ্যে সরিষার পরেই তিলের স্থান। সঠিক নিয়ম তিল চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করলে খুব অল্প পুঁজিতেই দ্বিগুণ লাভ করা সম্ভব। আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা তিলের আধুনিক জাত থেকে শুরু করে সঠিক তিল চাষ পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

কেন তিল চাষ করবেন? এর চাহিদা ও গুরুত্ব

বাজারে তিল এবং তিল তেলের চাহিদা প্রচুর থাকা সত্ত্বেও চাহিদার তুলনায় চাষ অনেক কম হয়। তিল তেলের ভেষজ গুণ এবং দীর্ঘস্থায়িত্বের কারণে এটি বাণিজ্যিক ও ঘরোয়া উভয় ক্ষেত্রেই সমাদৃত। তিল চাষের প্রধান সুবিধা হলো এটি যেকোনো পতিত জমিতে বা আলু চাষের পরে সহজেই চাষ করা যায়।

তিল চাষের জন্য উন্নত জাত নির্বাচন

সাফল্যের প্রধান চাবিকাঠি হলো এলাকা ভিত্তিক সঠিক জাত নির্বাচন করা। ভারত ও বাংলাদেশে চাষের জন্য উপযোগী কিছু উল্লেখযোগ্য উচ্চফলনশীল জাত নিচে দেওয়া হলো:

পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় তিলের জাত

  • তিলোত্তমা ও রমা: এই জাতগুলো সারা বছর চাষের উপযোগী এবং ফলনও বেশ ভালো।
  • সাবেত্রী ও উমা: খরা সহনশীল এবং কম সময়ে ফলন দেয়।
  • কৃষ্ণা ও বি-৬৭: এগুলো রবি ও গ্রীষ্ম উভয় মৌসুমের জন্য উপযোগী।
  • অন্যান্য জাত: জহর, রাজস্থান, জি.টি-২ এবং টি.কে.জি-২১।

কৃষি সুত্র টিপস: পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান এবং উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় তিলের ফলন সবথেকে বেশি হয়। নদীয়া ও মুর্শিদাবাদ জেলায় আলু তোলার পর তিলোত্তমা বা রমা জাতের চাষ করলে জমিতে অতিরিক্ত জলসেচ লাগে না, কারণ মাটির নিচের স্তরে অবশিষ্ট রস তিল গাছ সংগ্রহ করে নিতে পারে। মেদিনীপুর ও বাঁকুড়ার লাল মাটিতে কৃষ্ণা জাতটি খরা সহ্য করে ভালো ফলন দেয়।

বাংলাদেশের সেরা তিলের জাত (BARI উদ্ভাবিত)

বাংলাদেশে তিল চাষের জন্য বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) বেশ কিছু আধুনিক জাত উদ্ভাবন করেছে:

  • বারী তিল-৩: বর্তমানে বাংলাদেশের সবথেকে জনপ্রিয় জাত। এটি উচ্চফলনশীল এবং এর বীজ সাদাটে হয়।
  • বারী তিল-৪: উপকূলীয় নোনা মাটিতেও এই জাতটি ভালো ফলন দিতে সক্ষম। এতে তেলের পরিমাণ ৪৪-৪৬%।

তিল চাষের উপযুক্ত সময় ও জলবায়ু

তিল চাষ মূলত সারা বছরই করা যায়, তবে সঠিক ফলন পেতে ঋতুভিত্তিক সময় মেনে চলা জরুরি।

  • গ্রীষ্মকালীন চাষ: ফাল্গুন মাস পর্যন্ত বপনের উপযুক্ত সময়। তাপমাত্রা ২০-৩৪° সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে তিলের বৃদ্ধি ভালো হয়।
  • বর্ষাকালীন চাষ: জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষ দিকে বীজ বপন করতে হয়।
  • শরৎকালীন চাষ: ভাদ্র মাসের শেষ দিকে মৌসুমি বায়ুর প্রভাব কমে গেলে তিল চাষের ভালো সময় শুরু হয়।

জমি তৈরি ও মাটি নির্বাচন

তিল চাষ পদ্ধতি-তে উঁচু ও মাঝারি জমি নির্বাচন করা সবথেকে নিরাপদ। পলি-দোঁয়াশ এবং বেলে-দোঁয়াশ মাটি তিল চাষের জন্য সবথেকে উপযোগী। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের উপকূলীয় অঞ্চলে অনেক জমি শীতের পর পতিত থাকে। সেসব এলাকায় বারী তিল-৪ বা লবণাক্ততা সহিষ্ণু জাতগুলো চাষ করা যেতে পারে। নোনা মাটিতে তিল চাষের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ কৌশল হলো—বীজ বপনের আগে জমিটি একবার মিষ্টি জল দিয়ে ধুয়ে নেওয়া (যদি সম্ভব হয়)। এতে মাটির উপরিভাগের লবণের ঘনত্ব কমে যায় এবং চারাগুলো দ্রুত সতেজ হয়ে ওঠে।
তিল চাষে বীজের অঙ্কুরোদগম সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ। মাটিতে জো (আর্দ্রতা) ঠিক না থাকলে বীজের অপচয় হয়। মাটির জো পরীক্ষা করার একটি সহজ উপায় হলো—এক মুঠো মাটি হাতে নিয়ে গোল বল তৈরির চেষ্টা করা। যদি বলটি তৈরি হয় এবং হাত দিয়ে চাপ দিলে ঝুরঝুরে হয়ে ভেঙে যায়, তবেই বুঝতে হবে জমিটি বীজ বপনের জন্য উপযুক্ত। যদি মাটি খুব শক্ত হয় তবে বীজের চারা গজাতে দেরি হবে এবং ফলন কমে যাবে। তিল চাষ পদ্ধতিতে ৩-৪ টি ভাল চাষ দেওয়া জরুরী ।

কৃষি সুত্র সতর্কতা: জমির জল নিকাশী ব্যবস্থা অবশ্যই ভালো হতে হবে। গাছের গোড়ায় জল দাঁড়ালে ‘গোড়া পচা’ রোগ দেখা দেয়। আলু চাষের পর তিল চাষ করলে জমি তৈরির খরচ অনেক কমে যায়।

বীজ শোধন ও বপন পদ্ধতি

তিল চাষ পদ্ধতিতে সুস্থ চারা ও রোগমুক্ত ফসলের জন্য বীজ শোধন করা বাধ্যতামূলক।

  • বীজ শোধন প্রক্রিয়া: ১ কেজি বীজের জন্য ২ গ্রাম কার্বেন্ডাজিম (৫০%) অথবা ৫ গ্রাম ট্রাইকোডার্মা ভিরিডি দিয়ে বীজ ভালো করে মিশিয়ে নিতে হবে। একটি কৌটোতে বীজ ও জীবাণুনাশক ভরে ঝাঁকিয়ে নিলেই সহজে শোধন করা যায়। এছাড়া ‘বীজামৃত’ দিয়ে জৈবভাবেও শোধন করা যায়।
  • সারি ও দূরত্ব: লাইনে বুনলে সারি থেকে সারির দূরত্ব ১ ফুট (৩০ সেমি) এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ৪ ইঞ্চি রাখা উচিত।
  • বীজের হার: ছিটিয়ে বপন করলে বিঘা প্রতি ১ কেজি এবং সারিতে বপন করলে ৮০০ গ্রাম বীজ প্রয়োজন হয়।

সুষম সার প্রয়োগ ও মাটি পরীক্ষা

সার প্রয়োগের আগে মাটি পরীক্ষা করে নিলে খরচ কমে এবং ফলন বাড়ে। ঠিক সার ব্যবস্থাপনা হলো উন্নত তিল চাষ পদ্ধতি-র অন্যতম প্রধান শর্ত। যারা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে কাজ করছেন, তাদের জন্য রাসায়নিক ও জৈব সারের সুষম ব্যবহারই হলো সেরা তিল চাষ পদ্ধতি। তিল চাষ পদ্ধতি-তে সারের চাহিদা নিম্নরূপ:

  • মৌলিক চাহিদা: বিঘা প্রতি ৬.৫ কেজি নাইট্রোজেন, ৩.৩ কেজি ফসফেট এবং ৩.৩ কেজি পটাশ প্রয়োজন।
  • বেসাল ডোজ: জমি তৈরির সময় বিঘায় ৭ কেজি ইউরিয়া, ২১ কেজি সিঙ্গেল সুপার ফসফেট এবং ৩ কেজি পটাশ ছড়িয়ে শেষ চাষ দিতে হবে।
  • টপ ড্রেসিং: বপনের ১ মাস পর ৭ কেজি ইউরিয়া ও ৩ কেজি পটাশ দিতে হবে।
  • জৈব সার: বিঘায় ৬০০-১০০০ কেজি কম্পোস্ট এবং কাঠা প্রতি ১-১.৫ কেজি নিমখোল ব্যবহার করলে মাটির স্বাস্থ্য ভালো থাকে।

কৃষি সুত্র বিশেষ টিপস: তৈলবীজ চাষে সালফার অবশ্যই প্রয়োগ করবেন। বিঘায় ৩ কেজি সালফার দিলে বীজে তেলের পরিমাণ ও মান অনেক বেড়ে যায়।তিল চাষে শুধু ইউরিয়া বা পটাশ যথেষ্ট নয়। বর্তমান সময়ে মাটির উর্বরতা কমে যাওয়ায় জিংক ও বোরনের অভাব দেখা দেয়। তিলের ফুল ঝরা রোধ করতে এবং সুটিগুলো পূর্ণাঙ্গ করতে বিঘা প্রতি ১ কেজি দস্তা (Zinc) এবং ৫০০ গ্রাম বোরন সার প্রয়োগ করলে অবিশ্বাস্য ফলন পাওয়া যায়। যদি চারা গজানোর পর গাছের বৃদ্ধি কম মনে হয়, তবে ২ গ্রাম প্রতি লিটার জলে ইউরিয়া গুলে বিকেলের দিকে স্প্রে করলে দ্রুত কাজ হয়।

সেচ ও জল ব্যবস্থাপনা

তিল চাষে জল কম লাগে। মাটিতে পর্যাপ্ত ‘জো’ বা আর্দ্রতা থাকা অবস্থায় বীজ বপন করতে হবে। তিল চাষ পদ্ধতি মেনে চাষ করলে নিচের পদ্ধতিতে জল সেচ আবশ্যক ।

  • প্রথম সেচ: বপনের ৩০-৩৫ দিন পর।
  • দ্বিতীয় সেচ: প্রথম সেচের ২০ দিন পর।
  • বর্ষাকালীন সতর্কতা: বর্ষায় সেচের প্রয়োজন হয় না, তবে জল নিষ্কাশনের দিকে কড়া নজর রাখতে হবে।
তিল চাষ পদ্ধতিতে একটি সুস্থ সবল গাছ
তিল চাষ পদ্ধতিতে একটি সুস্থ সবল গাছ

রোগ ও পোকা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা

তিলের রোগ সাধারণত কম হয় যদি বীজ শোধন করা থাকে। তবে কিছু প্রধান সমস্যা নিচে আলোচনা করা হলো:

প্রধান রোগ ও প্রতিকার

  • ফাইলোডি (Phyllody): এটি তিলের মারাত্মক রোগ। এর ফলে গাছের মাথায় পাতার ছোট ছোট ঝুটি হয়ে যায়, ফুল-ফল হয় না। এটি বাহক পোকার মাধ্যমে ছড়ায়। প্রতিকারের জন্য ইমিডাক্লোরোপিড (১৭.৬%) ২ এম.এল প্রতি লিটার জলে গুলে স্প্রে করতে হবে।
  • উইল্টিং বা ঝিমিয়ে পড়া: গাছ হঠাৎ শুকিয়ে যায়। এটি রোধে ট্রাইকোডার্মা দিয়ে বীজ শোধন করতে হবে।
  • পাতা ধসা: অতিরিক্ত বৃষ্টিতে এটি হয়।

অনেকে মনে করেন তিল চাষ পদ্ধতি-তে কোনো রোগ নেই, কিন্তু ফাইলোডি বা পাতা মোড়ানো পোকা দমনে সতর্ক না থাকলে পুরো ফসল নষ্ট হতে পারে। তাই রোগমুক্ত তিল চাষ পদ্ধতি নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন।

পোকা দমন ও জৈব পদ্ধতি

  • পোকা: পাতা মোড়ানো পোকা, ক্যাপসুল ছিদ্রকারী এবং বিছা পোকা পাতা খেয়ে ফেলে।
  • প্রতিকার: নিয়মিত মাঠ পর্যবেক্ষণ করে হাত দিয়ে পোকা মারুন। নিম তেল (১০০০০ পিপিএম) ব্যবহার করা যেতে পারে। জমিতে বিঘায় ৫-৬টি ডাল পুঁতে দিলে পাখি বসে পোকা খেয়ে ফেলে। বিষটোপ বা আলোক ফাঁদ ব্যবহার করেও পোকা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

সাথি ফসল ও আন্তঃচাষ

তিল চাষের সাথে মুগ, বিউলি বা ছোট দানা শস্য সাথি ফসল হিসেবে চাষ করলে কৃষকের বাড়তি আয় নিশ্চিত হয়।

ফসল সংগ্রহ, মাড়াই ও সংরক্ষণ

গাছ হলুদ হয়ে পাতা ঝরতে শুরু করলে এবং ৭৫% সুটি বাদামী রঙ ধারণ করলে ফসল কাটার সময় হয়েছে বুঝতে হবে।

  • জাক দেওয়া: কাটার পর উঁচু জায়গায় স্তূপ করে ৫-৭ দিন ‘জাক’ দিয়ে রাখতে হবে। এতে দানা পুষ্ট হয় এবং তেলের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।
  • শুকানো: ২ দিন রোদে শুকিয়ে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে তিল ছাড়িয়ে নিতে হবে। এরপর ভালো করে শুকিয়ে ঘরের তাপমাত্রায় ঠান্ডা করে বস্তাবন্দি করতে হবে।
  • কৃষি সুত্র পরামর্শ: তিল সংগ্রহের পর অনেকে তাড়াহুড়ো করে বস্তাবন্দি করেন। এটি বড় ভুল। তিলের আর্দ্রতা ৯% এর নিচে নামিয়ে তবেই বস্তাবন্দি করা উচিত। সংরক্ষণের জন্য বায়ুরোধী প্লাস্টিক ড্রাম বা পলিথিন লাইনার যুক্ত চটের বস্তা ব্যবহার করলে দীর্ঘ ১ বছর পর্যন্ত তিলের গুণমান ঠিক থাকে এবং পোকা লাগে না।

উৎপাদন ও লাভের হিসাব

সঠিক তিল চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করলে বিঘা প্রতি ২০০-২৫০ কেজি দানা পাওয়া সম্ভব। তিল থেকে ৪০-৫০% তেল পাওয়া যায়। বর্তমান বাজারের চাহিদা অনুযায়ী মোট খরচের ৩০-৪০% বাদ দিলে নিট লাভের পরিমাণ প্রায় ৬০-৭০% পর্যন্ত হতে পারে।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, আপনি যদি একজন সফল কৃষক হতে চান, তবে আধুনিক তিল চাষ পদ্ধতি আপনার জন্য সেরা বিকল্প হতে পারে। উন্নত জাত এবং বৈজ্ঞানিক তিল চাষ পদ্ধতি প্রয়োগ করে আপনিও তৈলবীজ চাষে নতুন বিপ্লব আনতে পারেন।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন: তিল চাষে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ সার কোনটি?

উত্তর: ইউরিয়া, ফসফেট ও পটাশের পাশাপাশি সালফার তিল চাষের জন্য অত্যন্ত জরুরি, কারণ এটি বীজে তেলের পরিমাণ বাড়ায়।

প্রশ্ন: তিলের ফাইলোডি রোগ কেন হয়?

উত্তর: এটি মূলত একটি ভাইরাস ঘটিত রোগ যা বাহক পোকার মাধ্যমে ছড়ায়। এটি হলে গাছে ফুল ও ফল হয় না।

প্রশ্ন: আলু চাষের পর কি তিল চাষ করা যায়?

উত্তর: হ্যাঁ, আলু চাষের পর অবশিষ্ট সারের প্রভাবে তিল চাষ করলে খরচ অনেক কমে এবং ফলন ভালো হয়।

তথ্য সুত্র

Spread the love

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top