
বর্তমান সময়ে অধিক ফলন পেতে ভুট্টার রোগ ও পোকা দমন পদ্ধতি জানা অত্যন্ত জরুরি। আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং অতিরিক্ত সার ব্যবহারের ফলে মাটির গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে, যার কারণে রোগ ও পোকার উপদ্রব বৃদ্ধি পাচ্ছে। সঠিক সময়ে রোগ শনাক্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করলে চাষের খরচ কমে এবং লাভ বৃদ্ধি পায়।
ক) আধুনিক পদ্ধতিতে ভুট্টার রোগ ও পোকা দমন ব্যবস্থাপনা
ভুট্টা চাষে প্রধান বাধা হলো বিভিন্ন রোগ। সঠিক সময়ে ভুট্টার রোগ ও পোকা দমন না করলে ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হতে পারে।
১. মেডিস লিফ ব্লাইট বা পাতার ঝলসানো রোগ
- লক্ষণ: প্রথমে পাতায় ক্ষুদ্র ৪-৬ মিলিমিটার চকচকে স্পট বা দাগ পড়ে। ধীরে ধীরে তা লম্বালম্বিভাবে বাড়ে এবং বাদামি রঙ ধারণ করে। পরবর্তীতে এটি কাণ্ডেও ছড়িয়ে পড়ে এবং গাছটি মারা যায়।
- প্রতিকার: আক্রান্ত ফসলের অবশিষ্টাংশ ধ্বংস করতে হবে। চাষের জন্য প্রতিরোধী বা সহনশীল হাইব্রিড বীজ (Hybrid Seeds) ব্যবহার করা ভালো।
- রাসায়নিক ভুট্টার রোগ দমন: ভুট্টার রোগ ও পোকা দমন করতে ম্যানকোজেব (Mancozeb) ২.৫ গ্রাম প্রতি লিটার জলে মিশিয়ে বীজ বপনের ১৫ দিন ও ৩০-৩৫ দিন পর স্প্রে করতে হবে। এছাড়া Azoxystrobin ১৮.২% + Difenconazole ১১.৪% w/w SC ১ মিলি প্রতি লিটার জলে মিশিয়ে স্প্রে করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
২. টারসিকাম লিফ ব্লাইট
- লক্ষণ: পাতায় সরু ও ধূসর-সবুজ লম্বা ক্ষত দেখা দেয় যা ১ থেকে ৭ ইঞ্চি পর্যন্ত হতে পারে। ক্ষতগুলো পরে কালচে আকার নেয়।
- প্রতিকার: শস্য আবর্তন (Crop Rotation) হিসেবে শিম জাতীয় ফসল চাষ করলে রোগের প্রকোপ কমে।
- স্প্রে: লক্ষণ দেখা দিলে ১ মিলি হেক্সাকোনাজল (Hexaconazole) বা ২.৫ গ্রাম ম্যানকোজেব প্রতি লিটার জলে মিশিয়ে স্প্রে করুন এটা ভুট্টার এই রোগ দমনে খুব কার্যকরী ।
- বীজ শোধন (Seed Treatment): বপনের আগে ট্রাইকোডার্মা (Trichoderma) ৬ গ্রাম অথবা থিরাম (Thiram) ২ গ্রাম প্রতি কেজি বীজে মিশিয়ে শোধন করতে হবে।
৩. কার্ভুলারিয়া পাতার দাগ
- লক্ষণ: পাতায় বাদামি পাড়যুক্ত ছোট সাদা ক্ষত দেখা দেয়। এটি দেখতে অনেকটা ‘চোখের দাগের’ মতো।
- প্রতিকার: ভুট্টার রোগ ও পোকা দমন করতে মাঠের আগাছা পরিষ্কার রাখতে হবে।কার্বেন্ডাজিম ১২% + ম্যানকোজেব ৬২% এর মিশ্রণ ২ গ্রাম প্রতি লিটার জলে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।
৪. ব্যান্ডেড লিফ এবং শিথ ব্লাইট
- লক্ষণ: এটি মূলত ৪০-৪৫ দিন বয়সী গাছে দেখা যায়। মাটির কাছাকাছি পাতায় বাদামি-ধূসর গোলাকার দাগ পড়ে যা পরে উপরের দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
- প্রতিকার: গোড়ার পাতাগুলো ছেঁটে দিতে হবে। Amistar Top (Azoxystrobin + Difenconazole) ১ মিলি প্রতি লিটার জলে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।
৫. কাঠকয়লা পচা রোগ
- লক্ষণ: এটি একটি মাটি বাহিত (Soil Borne) রোগ। ফুল আসার আগে বা পরে গাছ হঠাৎ শুকিয়ে যায় এবং কাণ্ডের ভেতরটা কালো হয়ে যায়।
- প্রতিকার: চাষের আগে মাটিতে বিঘাপ্রতি ২ কেজি ট্রাইকোডার্মা ভিরিডি ( Trichoderma Viride) প্রয়োগ করুন। পিএসবি (PSB) ২৫ গ্রাম ও ট্রাইকোডার্মা ৬ গ্রাম দিয়ে ভুট্টার বীজ শোধন করা জরুরি।
৬. ফুসারিয়াম ডাঁটা পচা
- লক্ষণ: আক্রান্ত গাছ খড়ের মতো রঙ ধারণ করে শুকিয়ে যায় এবং ডাঁটার ভেতরে লালচে দাগ দেখা যায়।
- প্রতিকার: ভুট্টার রোগ ও পোকা দমনে জমিতে পটাস সারের মাত্রা বাড়িয়ে নাইট্রোজেনের ডোজ কমাতে হবে। মাঠ পরিষ্কার বা স্যানিটেশন (Sanitation) করতে হবে।
৭. ব্যাকটেরিয়া ডাঁটা পচা
- লক্ষণ: গাছের ডাঁটা বা কাণ্ড জলে ভেজার মতো বাদামি হয়ে যায় এবং পচা গন্ধ বের হয়। কাণ্ডটি সহজেই মচকে যায়।
- প্রতিকার: বিঘা প্রতি ২ কেজি ট্রাইকোডার্মা ভিরিডি ( Trichoderma Viride) মাটিতে প্রয়োগ করুন। অতিরিক্ত জল সেচ এড়িয়ে চলুন এবং বীজ বপনের আগে সিউডোমোনাস স্ট্রিয়াটা দিয়ে শোধন করুন। জল নিকাশির জন্য ড্রেনেজ (Drainage) ব্যবস্থা ভালো রাখতে হবে। আক্রান্ত হলে ব্লিচিং পাউডার ১.৫ গ্রাম প্রতি ১৫ লিটার জলে মিশিয়ে গাছের গোড়ায় প্রয়োগ করুন।
৮. সাধারণ মরিচা রোগ
- লক্ষণ: পাতায় লোহার মরিচার মতো ক্ষুদ্র বাদামি রঙের পুঁজ বা স্পট দেখা দেয়।
- প্রতিকার: ডাইথেন এম-৪৫ (Dithane M-45) ২.৫ থেকে ৪ গ্রাম প্রতি লিটার জলে মিশিয়ে ১৫ দিন অন্তর স্প্রে করতে হবে।
৯. ডাউনি মিলডিউ (Downy Mildew – রাজস্থান ও সর্গাম)
- লক্ষণ: পাতার নিচে সাদা তুলোর মতো বৃদ্ধি দেখা যায় এবং পাতার বৃদ্ধি কমে যায়। উপরের পাতাগুলো বাঁকতে শুরু করে।
- প্রতিকার: এপ্রন (Apron 35SD) ৪ গ্রাম প্রতি কেজি বীজে মিশিয়ে শোধন করতে হবে। পরে ভুট্টার রোগ দমনে মেটালাক্সিল ও ম্যানকোজেব মিশ্রিত ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হবে।
১০. ভুট্টার সিস্ট নেমাটোড
- লক্ষণ: এটি এক ধরণের ছোট কৃমি যা শিকড়ে বাস করে। গাছ ছোট অবস্থাতেই আক্রমণ করে এবং শিকড় পচিয়ে গাছ মেরে ফেলে।
- প্রতিকার: তিলের সাথে ভুট্টার আন্তঃফসল (Inter-cropping) করলে ঝুঁকি কমে। এছাড়া সয়াবিন বা তুলার সাথে শস্য আবর্তন করতে হবে।
খ) ভুট্টার পোকা দমন কৌশল (Integrated Pest Management – IPM)
ভারতে ভুট্টার ফলন নষ্টকারী প্রধান চারটি পোকা হলো—গোলাপী স্টেম বোরার, দাগযুক্ত স্টেম বোরার, শুট ফ্লাই এবং ফল আর্মিওয়ার্ম। নিচে ভুট্টার পোকা মারার ওষুধ গুলি উল্লেখ করা হল
১. গোলাপী স্টেম বোরর
- লক্ষণ: শীতকালে এর প্রকোপ বেশি। লার্ভাগুলো হালকা গোলাপী রঙের হয়। এরা কাণ্ডের ভেতরে গোল টানেল তৈরি করে এবং মলমূত্র দিয়ে ছিদ্র ভরে রাখে। ফলে বৃদ্ধি থেমে যায়।
- ব্যবস্থাপনা: আক্রমণের মাত্রা ১০ শতাংশের বেশি হলে ক্লোরেন্ট্রানিলিপ্রোল (Chlorantraniliprole) ১৮.৫ SC (কোরাোজেন) ১৫০ মিলি প্রতি হেক্টর হিসেবে স্প্রে করতে হবে।
২. ভুট্টার দাগযুক্ত স্টেম বোরার
- লক্ষণ: খরিফ বা বর্ষা মৌসুমে এটি বেশি ক্ষতি করে। পাতার ওপর পিনের মতো ছিদ্র দেখা যায়।
- ব্যবস্থাপনা: ১০% গাছ আক্রান্ত হলে ক্লোরেন্ট্রানিলিপ্রোল ১৮.৫ SC স্প্রে করতে হবে।
৩. ভুট্টার ফল আর্মিওয়ার্ম দমন (Fall Armyworm – FAW)
এটি ভুট্টার সবথেকে ভয়ংকর ও আক্রমণাত্মক (Invasive) পোকা। পশ্চিমবঙ্গে এটি নদীয়া জেলাতে প্রথম দেখা গিয়েছিল।
- লক্ষণ: লার্ভার মাথায় উল্টানো ‘Y’ আকৃতির চিহ্ন থাকে। এরা পাতা, ফুল এবং ভুট্টার মোচা বা দানা পর্যন্ত খেয়ে ফেলে।
- ব্যবস্থাপনা: আগাম ব্যবস্থা হিসেবে একর প্রতি ১৩.২ কেজি কার্বোফিউরান (Carbofuran 3G) ব্যবহার করুন। লার্ভা ছোট থাকলে ইমামেকটিন বেনজয়েট ৫% SG ৪ গ্রাম প্রতি লিটার জলে স্প্রে করুন। বড় লার্ভার জন্য থায়ামেথোক্সাম(Thiamethoxam) + ল্যাম্বডা সায়হ্যালোথ্রিন (Lambda-cyhalothrin) 0.৫ মিলি প্রতি লিটার জলে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।
৪. শুট ফ্লাই (Shoot Fly)
- লক্ষণ: ফেব্রুয়ারি-মার্চে বপন করলে এটি বেশি ক্ষতি করে। কান্ডের ভেতরে হলুদ রঙের ম্যাগট ঢুকে বৃদ্ধির বিন্দুটি খেয়ে ফেলে, ফলে চারা শুকিয়ে যায়।
- ব্যবস্থাপনা: ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহের মধ্যে বীজ বপন শেষ করুন। বপনের আগে ইমিডাক্লোপ্রিড (Imidacloprid) ৬ মিলি অথবা থায়ামেথক্সাম (Thiamethoxam) ৮ মিলি প্রতি কেজি বীজে মিশিয়ে শোধন করুন।
পরিবারের আয় বাড়াতে আড়ও দেখুন মাশরুম চাষ পদ্ধতি ও লাভ: জাত, রোগ দমন এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পূর্ণাঙ্গ গাইড ২০২৬
গ. সম্ভাব্য লাভ ও কৃষি সুত্র পরামর্শ
লাভ: সঠিক সময়ে ভুট্টার রোগ ও পোকা দমন করলে ভুট্টা থেকে ধান বা গমের চেয়ে ৩০-৪০% বেশি লাভ করা সম্ভব।
কৃষি সুত্র পরামর্শ: সবসময় প্রতিরোধী হাইব্রিড জাত ব্যবহার করুন। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগের সময় সঠিক মাত্রা বজায় রাখুন।রোগ ও পোকা নির্ণয় করতে না পারলে আক্রান্ত গাছটিকে তুলে নিয়ে গিয়ে নিকটবর্তী কৃষি বিভাগে দেখিয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে ভুট্টার রোগ পোকা দমন করুন । এতে সঠিক ঔষধে আপনার সমস্যার সমাধান হবে এবং ফসলের উপর অধিক ঔষধের ডোজ না পড়ার কারণে গাছ সতেজ থাকবে , ব্যাবহারকারী হিসাবে আপনার স্বাস্থের উপর প্রভাব কম পড়বে এবং অবশ্যই কীটনাশক স্প্রে করার সময় হাত ও মুখ ঢেকে নিবেন । মনে রাখবেন আপনি আপনার পরিবার দেশের অমূল্য সম্পদ ।
কৃষি বিভাগে গেলে আপনার প্রয়োজনীয় ঔষধ বিনা মূল্যে পেতে পারেন । নিজের শরীর খারাপ হলে যেমন ভাল ডাক্তার দেখিয়ে তবেই ঔষধের দোকানে গিয়ে ঔষধ নেন ঠিক একই ভাবে গাছের রোগ হলে গাছের ডাক্তার (কৃষি বিশেষজ্ঞ) দেখিয়ে ঔষধের দোকানে গিয়ে ঔষধ নিবেন যদি অফিসে পর্যাপ্ত ঔষধ না থাকে ।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন ১: ভুট্টা চাষের জন্য উপযুক্ত তাপমাত্রা কত?
উত্তর: ১০° থেকে ৩৫° সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ভুট্টা সবচেয়ে ভালো হয়।
প্রশ্ন ২: ফল আর্মিওয়ার্ম চেনার উপায় কী?
উত্তর: লার্ভার মাথায় একটি সাদা রঙের উল্টানো ‘Y’ চিহ্ন থাকে এবং এটি পাতার মাঝখানের কচি অংশ দ্রুত খেয়ে ফেলে।
প্রশ্ন ৩: বীজ শোধন কেন জরুরি?
উত্তর: ডাঁটা পচা ও মাটিবাহিত রোগ থেকে ফসলকে বাঁচাতে বীজ শোধন সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
সারকথা (Conclusion)
ভুট্টা চাষে সঠিক পদ্ধতি এবং সময়মতো ভুট্টার রোগ-পোকা দমন করতে পারলে কৃষকরা দ্বিগুণ লাভ করতে পারেন। আধুনিক হাইব্রিড বীজ ব্যবহার, নিয়মিত মাঠ পর্যবেক্ষণ এবং উপরিউক্ত ওষুধগুলো সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করলে ভুট্টার উৎপাদন অনেক গুণ বাড়ানো সম্ভব।










