বায়োফ্লক মাছ চাষ পদ্ধতি: আধুনিক ব্যবসায়িক গাইড ও সরকারি লোন পাওয়ার নিয়ম

একজন গ্রামীণ গৃহবধূ বায়োফ্লক মাছ চাষ পদ্ধতি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ট্যাঙ্কে মলাসেস দিচ্ছেন
একজন গ্রামীণ গৃহবধূ বায়োফ্লক মাছ চাষ পদ্ধতি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ট্যাঙ্কে মলাসেস দিচ্ছেন

বর্তমান সময়ে মাছ চাষে বিপ্লব ঘটিয়েছে বায়োফ্লক মাছ চাষ পদ্ধতি (Biofloc Fish Farming)। আপনি কি কম জায়গায় অধিক মুনাফা পেতে চান? তাহলে এই আধুনিক প্রযুক্তি আপনার জন্য সেরা সমাধান। আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ ও ত্রিপুরার মৎস্য চাষিদের জন্য বায়োফ্লক চাষের খুঁটিনাটি আলোচনা করব।

১. বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষ কী?

বায়োফ্লক মাছ চাষ পদ্ধতি হলো একটি পরিবেশবান্ধব ও লাভজনক মাছ চাষ প্রযুক্তি, যেখানে হেটেরোট্রফিক ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে মাছের বর্জ্য ও ক্ষতিকারক অ্যামোনিয়াকে প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবারে রূপান্তরিত করা হয়। এতে জলের ব্যবহার সর্বনিম্ন রেখে অল্প জায়গায় প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে ১০ গুণ বেশি মাছ উৎপাদন করা সম্ভব।

বায়োফ্লক মাছ চাষ পদ্ধতি হলো ইন-সিটু (In-situ) অণুজীব উৎপাদনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি টেকসই চাষ পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে জলকে পুনঃব্যবহার করা যায়, যার ফলে জল খরচ হয় নগণ্য।

সহজ কথায়, এটি পুকুর বা ট্যাঙ্কের ভেতর জীবিত ও মৃত জৈব পদার্থ, ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন এবং ব্যাকটেরিয়ার একটি সমষ্টি। এই ব্যবস্থায় প্রধান ভূমিকা পালন করে ‘হেটেরোট্রফিক ব্যাকটেরিয়া‘, তাই একে অনেক সময় ‘সবুজ স্যুপ পুকুর’ বা ‘হেটেরোট্রফিক ট্যাঙ্ক‘ বলা হয়। কম জায়গায় অধিক মাছ উৎপাদনই হলো এই প্রযুক্তির মূল আকর্ষণ। বর্তমানে মৎস্য চাষিদের কাছে সবথেকে জনপ্রিয় নাম হলো বায়োফ্লক মাছ চাষ পদ্ধতি বা biofloc-fish-farming

২. বায়োফ্লক মাছ চাষ পদ্ধতি প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করে?

বায়োফ্লক সিস্টেম একটি উচ্চমানের বায়োরিয়্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। উচ্চতর সি-এন অনুপাত বজায় রাখাই হলো বায়োফ্লক মাছ চাষ পদ্ধতি এর প্রধান কার্যকারিতা। এর প্রধান ধাপগুলি হলো:

  • সি-এন অনুপাত (C:N Ratio): গুড় বা মোলাসেস যোগ করে কার্বন ও নাইট্রোজেনের অনুপাত সঠিক রাখা হয়, যা জলের গুণমান ঠিক রাখে।
  • নাইট্রোজেন বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ: মাছের মল ও অব্যবহৃত খাবার থেকে তৈরি বিষাক্ত অ্যামোনিয়াকে ব্যাকটেরিয়া প্রোটিনে রূপান্তর করে।
  • প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার: এই পদ্ধতিতে তৈরি ফ্লক বা অণুজীবের সমষ্টিতে ২৫-৫০% প্রোটিন থাকে, যা মাছ সরাসরি খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। ফলে ফিড বা খাবারের খরচ অনেক কমে যায়।

৩. বায়োফ্লক চাষে উপযুক্ত মাছের প্রজাতি

সব মাছ বায়োফ্লক মাছ চাষ পদ্ধতি-তে চাষের উপযোগী নয়। বায়োফ্লক সিস্টেমে সেই মাছগুলিই ভালো হয় যারা সরাসরি ফ্লক খেতে পারে এবং উচ্চ ঘনত্বে থাকতে অভ্যস্ত।

  • বেশি সহনশীল মাছ: মাগুর, শিঙি, কোই (কৈ), পাবদা এবং পাঙ্গাশ।
  • অন্যান্য উপযুক্ত মাছ: তেলাপিয়া, কমন কার্প, রোহু এবং টাইগার চিংড়ি।

আড়ও দেখুন মাছের ডিম পোনা চাষ পদ্ধতি: পুকুর প্রস্তুতি থেকে রেণু পোনার পরিচর্যার সঠিক নিয়ম

৪. বায়োফ্লক তৈরির পদ্ধতি: শুরু করবেন কীভাবে?

নিখুঁতভাবে বায়োফ্লক মাছ চাষ পদ্ধতি শুরু করার জন্য ১৫,০০০ লিটার মিঠা জলের জন্য ১৫০ লিটার ইনোকুলাম বা প্রাথমিক ফ্লক তৈরি করবেন কিভাবে ? নিচে আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক দুটি পদ্ধতি দেওয়া হলো:

ক. প্রথম পদ্ধতি (প্রাকৃতিক উপায়):

  • ১. একটি পরিষ্কার ড্রামে ১৫০ লিটার জল নিয়ে জোরালো এরিয়েশন বা বায়ু চলাচল শুরু করুন।
  • ২. এতে ৩ কেজি পুকুরের তলার মাটি যোগ করুন।
  • ৩. ১.৫ গ্রাম অ্যামোনিয়াম সালফেট বা ইউরিয়া যোগ করুন।
  • ৪. ৩০ গ্রাম কার্বন উৎস হিসেবে গুড় বা মোলাসেস মেশান এবং ২৪-৪৮ ঘণ্টা অপেক্ষা করুন।

খ. দ্বিতীয় পদ্ধতি (প্রোবায়োটিক ব্যবহার):

  • ১. ড্রামে ১৩০ লিটার জল এবং ২০ লিটার পুকুর বা আরএএস (RAS) এর জল নিন।
  • ২. এতে ৩০ গ্রাম কার্বন উৎস এবং ১০ গ্রাম উন্নত মানের প্রোবায়োটিক (ব্যাসিলাস এসপি সমৃদ্ধ) যোগ করুন।
  • ৩. ইনোকুলাম তৈরি হয়ে গেলে জলের উপরে ফেনা দেখা দেবে। মাছের জন্য আদর্শ ফ্লক ভলিউম ২৫-৩৫ মিলি/লিটার হওয়া উচিত।

৫. ফ্লক তৈরির পর প্রধান ট্যাঙ্কে জল প্রস্তুতি ও মাছ ছাড়ার নিয়ম

ইনোকুলাম বা ফ্লক তৈরি হয়ে গেলে তা প্রধান ট্যাঙ্কে স্থানান্তর করার পর নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:

জল প্রস্তুতি: ইনোকুলামটি প্রধান ট্যাঙ্কের জলে মেশানোর পর ৫-৭ দিন জোরালো এরিয়েশন চালিয়ে যেতে হবে। যখন দেখবেন জলের রঙ হালকা বাদামী বা সবুজাভ হয়েছে এবং ফ্লক ভলিউম (Floc Volume) ১৫-২০ মিলি/লিটার ছুঁয়েছে, তখনই বুঝবেন জল মাছ ছাড়ার জন্য তৈরি।

মাছ ছাড়ার সময়: মাছ ছাড়ার আগে অবশ্যই পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট দিয়ে মাছকে শোধন (স্নান) করে নিতে হবে। মাছ সবসময় ভোরে অথবা সন্ধ্যায় যখন তাপমাত্রা কম থাকে তখন ছাড়া উচিত।

৬. মাছের ঘনত্ব ও উৎপাদনের সময়সীমা (Stocking & Harvesting)

বায়োফ্লক পদ্ধতিতে কোন মাছ কতটুকু ছাড়বেন এবং সব ধরণের মাছের জন্য বায়োফ্লক মাছ চাষ পদ্ধতি উপযোগী নয়, তাই সঠিক প্রজাতি নির্বাচন জরুরি। কতদিনে বিক্রিযোগ্য হবে তার একটি বৈজ্ঞানিক ধারণা নিচে দেওয়া হলো:

মাছের প্রজাতিপ্রতি ১০০০ লিটারে উৎপাদনের সময়
তেলাপিয়া৮০ – ১০০টি ৪ – ৫ মাস
শিং / মাগুর৩০০ – ৪০০টি ৫ – ৬ মাস
কোই (কৈ)৪০০ – ৫০০টি ৩ – ৪ মাস
পাঙ্গাশ৪০ – ৫০টি ৫ – ৬ মাস
চিংড়ি (ভ্যানামাই) ১০০ – ১৫০টি৩ – ৪ মাস

৭. উৎপাদন পর্যন্ত পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ

মাছ ছাড়ার পর বায়োফ্লক মাছ চাষ পদ্ধতি তে নিয়মিত জলের প্যারামিটার চেক করা আবশ্যক। মাছ ছাড়ার পর থেকে হার্ভেস্টিং পর্যন্ত প্রতিদিনের কাজগুলো হলো:

  • অ্যামোনিয়া ও pH পরীক্ষা: প্রতিদিন অন্তত একবার জলের অ্যামোনিয়া এবং pH চেক করুন। অ্যামোনিয়া ০.৫ পিপিএম-এর বেশি হলে দ্রুত কার্বন উৎস (গুড়) যোগ করতে হবে।
  • ফিডিং বা খাবার প্রদান: মাছের ওজনের ২-৩% হারে দিনে দুইবার খাবার দিন। লক্ষ্য রাখবেন যেন খাবার অতিরিক্ত না হয়, কারণ অতিরিক্ত খাবার পচে অ্যামোনিয়া বাড়িয়ে দেয়।
  • এরিয়েশন চেক: ২৪ ঘণ্টা এরিয়েশন বা অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করুন। মনে রাখবেন, বায়োফ্লকে অক্সিজেন বন্ধ হওয়া মানেই মাছের মৃত্যু।
  • স্লাজ নিষ্কাশন: ট্যাঙ্কের তলায় জমে থাকা অতিরিক্ত ময়লা বা স্লাজ সপ্তাহে অন্তত একবার ড্রেনেজ পাইপ দিয়ে বের করে দিন।

৮. সফল চাষের মূল সূত্র (Expert Advice & Guidelines)

বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষের সফলতাকে মূলত একটি বৈজ্ঞানিক সমীকরণ বা সূত্র হিসেবে দেখা হয়। নিচে CIFA এবং অভিজ্ঞ চাষিদের অভিজ্ঞতার আলোকে সেই মূল সূত্রগুলো দেওয়া হলো:

  • সূত্র ১ (জল ব্যবস্থাপনা): বায়োফ্লকে মাছের মৃত্যুহার কমাতে হলে অ্যামোনিয়া (Ammonia) সর্বদা ০.৫ পিপিএম-এর নিচে এবং pH ৭.৫ থেকে ৮.৫ এর মধ্যে রাখা বাধ্যতামূলক। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে biofloc-fish-farming শুরু করলে অ্যামোনিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং জলের গুণমান বজায় রাখা অনেক সহজ হয়।
  • সূত্র ২ (খাবার ও ফ্লকের ভারসাম্য): প্রতিদিন ফ্লক ভলিউম চেক করুন। যদি ফ্লকের ঘনত্ব মাছের জন্য প্রয়োজনীয় সীমার (২৫-৩৫ মিলি/লিটার) বাইরে যায়, তবে খাবারের পরিমাণ ও কার্বন উৎসের অনুপাত পুনরায় সমন্বয় করুন।
  • সূত্র ৩ (অক্সিজেন নিরাপত্তা): বায়োফ্লক হলো অক্সিজেন নির্ভর চাষ। এরিয়েশন বা অক্সিজেন সরবরাহ ১ মিনিটের জন্য বন্ধ হওয়া মানে পুরো সিস্টেমের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া। তাই নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ বা ব্যাকআপ রাখা সফলতার প্রধান সূত্র।
  • সূত্র ৪ (শোধন ও সতর্কতা): মাছ ছাড়ার আগে অবশ্যই পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট দিয়ে শোধন করে নিন। মনে রাখবেন, “রোগ প্রতিরোধের চেয়ে প্রতিকার কঠিন”।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই সূত্রগুলো CIFA (Central Institute of Freshwater Aquaculture) এর গবেষণা এবং মাঠ পর্যায়ের চাষিদের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এগুলো মেনে চললে আপনার খামারে মাছের ফলন ও গুণমান দুটিই বৃদ্ধি পাবে।

৯. বায়োফ্লক মাছ চাষে সরকারি লোন ও সাবসিডি (PMMSY)

ভারত সরকার এখন বায়োফ্লক মাছ চাষ পদ্ধতি জনপ্রিয় করতে বিশেষ ঋণের ব্যবস্থা করেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী মৎস্য সম্পদ যোজনা (PMMSY)-এর অধীনে বায়োফ্লক মাছ চাষের জন্য ৪০% থেকে ৬০% পর্যন্ত সাবসিডি বা সরকারি ভর্তুকি পাওয়া যায়।

পুকুর ও ট্যাঙ্কের ক্ষেত্রে সরকারি সহায়তার নিয়ম:

ব্যক্তিগত চাষিদের জন্য: একজন চাষি ০.১ হেক্টর আয়তনের ২ ইউনিট পর্যন্ত পুকুরে বায়োফ্লক করার জন্য সরকারি সাহায্য পেতে পারেন। ট্যাঙ্কের ক্ষেত্রে ছোট, মাঝারি বা বড় ইউনিটের যেকোনো ১টি ইউনিটে সহায়তা সীমাবদ্ধ।

মৎস্যজীবী গোষ্ঠী বা SHG-এর জন্য: ২০ জনের একটি গ্রুপ হলে সদস্য সংখ্যা অনুযায়ী ইউনিটের পরিমাণ বাড়ানো যায়। সাধারণত গোষ্ঠী পর্যায়ে ৪টি ছোট বা ৩টি মাঝারি বায়োফ্লক ইউনিটে সহায়তা দেওয়া হয়।

আবেদন করার জন্য প্রয়োজনীয় নথি:

  • ১. প্রজেক্ট রিপোর্ট (DPR): প্রকল্পের খরচ, মাছের প্রজাতি এবং কর্মসংস্থানের বিবরণ সহ একটি পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট।
  • ২. জমির নথি: নিজস্ব জমি বা অন্তত ৭ বছরের নিবন্ধিত লিজ বা ইজারা সংক্রান্ত দলিল।
  • ৩. আবেদন স্থল: এই সমস্ত নথি নিয়ে আপনার জেলা মৎস্য আধিকারিক বা District Fisheries Officer (DFO)-এর অফিসে যোগাযোগ করতে হবে।

১০. বায়োফ্লক মাছ চাষ পদ্ধতি খরচ (২০২৬ আপডেট)

অনেকেই জানতে চান যে বাণিজ্যিক ভাবে বায়োফ্লক মাছ চাষ পদ্ধতি শুরু করতে খরচ কেমন হয় ? সরকারি নির্দেশিকা এবং বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী বায়োফ্লক ট্যাংক সেটআপ খরচ এর একটি সম্ভাব্য তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

প্রজেক্টের ধরণআয়তন / ইউনিটনির্মাণ খরচ উৎপাদন খরচমোট খরচ
মিঠা জলের পুকুর ০.১ হেক্টর১০ লক্ষ টাকা৪ লক্ষ টাকা ১৪ লক্ষ টাকা
লোনা জলের পুকুর০.১ হেক্টর ১৪ লক্ষ টাকা৪ লক্ষ টাকা ১৮ লক্ষ টাকা
ট্যাঙ্ক সেটাআপ ৪ মিটার ব্যাসের ৭টি ট্যাঙ্ক ৫.৫ লক্ষ টাকা ২ লক্ষ টাকা ৭.৫ লক্ষ টাকা

তবে একটা সমস্যা আছে… অনেকেই মনে করেন শুধু ট্যাঙ্ক বানালেই হলো। কিন্তু প্রতি ট্যাঙ্ক প্রতি অতিরিক্ত মাছ ছাড়লে এবং সঠিক তদারকি না করলে খরচ আরও ১ লক্ষ টাকা (সঠিকভাবে বললে ব্যবস্থাপনা খরচ ১০-১৫% বাড়তে পারে) পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

১১. বায়োফ্লক মাছ চাষ প্রশিক্ষণ ও সরকারি সহায়তা কেন্দ্র [২০২৬]

বায়োফ্লক মাছ চাষ পদ্ধতি সঠিকভাবে শেখার জন্য ভারত ও বাংলাদেশের সেরা বায়োফ্লক মাছ চাষ প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য নিচে দেওয়া হলো। সঠিক গাইডলাইন পেতে আপনার নিকটস্থ সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বায়োফ্লক মাছ চাষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।

ক. ভারতের প্রধান প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (ICAR ও সরকারি)

  • ICAR-CIFA (ভুবনেশ্বর, ওড়িশা): এটি বায়োফ্লক প্রযুক্তির প্রধান গবেষণা কেন্দ্র। ঠিকানা: সেন্ট্রাল ইনস্টিটিউট অফ ফ্রেশওয়াটার অ্যাকুয়াকালচার, কৌশল্যাগঙ্গা, ভুবনেশ্বর, ওড়িশা। এখানে আধুনিক গবেষণার ভিত্তিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
  • ICAR-CIFRI (ব্যারাকপুর, পশ্চিমবঙ্গ): উত্তর ২৪ পরগণার ব্যারাকপুরের মণিরামপুরে এই প্রতিষ্ঠানটি অবস্থিত। পশ্চিমবঙ্গের চাষিদের জন্য এটি সবথেকে নির্ভরযোগ্য জায়গা।
  • নিমপীঠ কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র (দক্ষিণ ২৪ পরগণা): দক্ষিণবঙ্গের চাষিদের জন্য নিমপীঠ KVK অত্যন্ত জনপ্রিয়। এখানে নিয়মিত বায়োফ্লকের ওপর কর্মশালা হয়।
  • অশোকনগর কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র (উত্তর ২৪ পরগণা): যারা উত্তর ২৪ পরগণা বা সংলগ্ন এলাকায় থাকেন, তারা অশোকনগর KVK-তে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন।
  • ত্রিপুরা মৎস্য কলেজ (COF, লেম্বুছড়া): ত্রিপুরার জন্য এটিই সেরা প্রতিষ্ঠান। ঠিকানা: কলেজ অফ ফিশারিজ, লেম্বুছড়া, আগরতলা, ত্রিপুরা।

খ. বাংলাদেশের সরকারি প্রশিক্ষণ ও সহায়তা

বাংলাদেশে বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষিদের জন্য মৎস্য অধিদপ্তর আধুনিক সব সুবিধা দিচ্ছে।

  • প্রধান কেন্দ্র: মৎস্য অধিদপ্তর (DoF), মৎস্য ভবন, রমনা, ঢাকা। এছাড়া সাভারের বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (BFRI) থেকে বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ নেওয়া যায়।
  • ঋণ সুবিধা (বাংলাদেশ): বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ৪% থেকে ৯% সুদে মৎস্য ঋণ পাওয়া যায়। বিশেষ করে শিক্ষিত বেকারদের জন্য জামানতবিহীন ঋণের সুবিধাও অনেক ক্ষেত্রে দেওয়া হয়।

ঘ. আপনার জেলার স্থানীয় যোগাযোগ মাধ্যম

আপনার এলাকায় বায়োফ্লক মাছ চাষ পদ্ধতি-তে সরকারি লোন বা অনুদান আছে কি না জানতে নিচের অফিসগুলোতে সরাসরি যোগাযোগ করুন:

  • নিজ জেলা মৎস্য অফিস (DFO): সরকারি লোন বা সাবসিডির জন্য ডিস্ট্রিক্ট ফিশারিজ অফিসার (DFO)-এর সাথে দেখা করুন।
  • ব্লক মৎস্য দপ্তর (FEO): নিজ ব্লকের ফিশারি এক্সটেনশন অফিসারের কাছে প্রশিক্ষণের আবেদন জানান।
  • জেলা KVK (কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র): আপনার নিজের জেলায় যে KVK আছে, সেখানে মৎস্য বিজ্ঞানীর সাথে কথা বলুন।

ঙ. বিশেষ ঘোষণা ও দায়বদ্ধতা (Undertaking)

সতর্কতা: এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত সকল প্রতিষ্ঠান সরকার স্বীকৃত। বায়োফ্লক একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি। তাই কোনো বেসরকারি অখ্যাত সেন্টারে বড় অঙ্কের টাকা দিয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়ার আগে অবশ্যই নিকটস্থ সরকারি মৎস্য দপ্তরের পরামর্শ নিন। বায়োফ্লক মাছ চাষ পদ্ধতি ভুল হলে বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে। আমাদের এই তথ্যগুলো CIFAমৎস্য দপ্তরের নির্দেশিকা মেনে দেওয়া হয়েছে।

১২. উপসংহার

বায়োফ্লক মাছ চাষ পদ্ধতি কেবল একটি ব্যবসা নয়, এটি আধুনিক কৃষি বিজ্ঞানের এক অনন্য দান। বর্তমানে মৎস্য চাষিদের কাছে সবথেকে জনপ্রিয় নাম হলো বায়োফ্লক মাছ চাষ পদ্ধতি। উন্নত প্রযুক্তির biofloc-fish-farming এবং সঠিক প্রশিক্ষণ সরকারি সহায়তা এবং আমাদের এই গাইড মেনে চললে আপনিও একজন সফল মৎস্য উদ্যোক্তা হতে পারেন।

১৩. সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন: বায়োফ্লক কি লস না কি লাভ?

উত্তর: সঠিক নিয়মে অ্যামোনিয়া ও pH কন্ট্রোল করতে পারলে এটি অত্যন্ত লাভজনক। তবে লস হয় তখনই যখন পর্যাপ্ত অক্সিজেন বা এরিয়েশনের অভাব ঘটে।

প্রশ্ন: ১০০০ লিটার ট্যাঙ্কে কতগুলো মাছ ছাড়া যায়?

উত্তর: মাছের প্রজাতির ওপর নির্ভর করে। তবে সাধারণভাবে শিং বা কৈ মাছের ক্ষেত্রে প্রতি ১০০০ লিটারে ৪০০-৫০০টি (তবে তা ২০০-৩০০ রাখা নিরাপদ) মাছ ছাড়া ভালো।

প্রশ্ন: বায়োফ্লক সরকারি লোন কীভাবে পাব?

উত্তর: ভারতে PMMSY যোজনা এবং বাংলাদেশে মৎস্য অধিদপ্তরের অধীনে বায়োফ্লক সরকারি লোন ও সাবসিডি দেওয়া হয়। বিস্তারিত জানতে আপনার জেলা মৎস্য অফিসে যোগাযোগ করুন।

প্রশ্ন: বায়োফ্লক ট্যাংক সেটআপ খরচ কত?

উত্তর: একটি ১০ হাজার লিটারের বায়োফ্লক ট্যাংক সেটআপ খরচ সরঞ্জামসহ আনুমানিক ২৫,০০০ – ৩০,০০০ টাকা। বড় বাণিজ্যিক প্রজেক্টের ক্ষেত্রে খরচ ট্যাঙ্কের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে।

প্রশ্ন: biofloc-fish-farming এর প্রধান লাভ কী?

উত্তর: biofloc-fish-farming-এর মূল সুবিধা হলো অল্প জায়গায় ও কম জলে (জলের) প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে ১০ গুণ বেশি মাছ উৎপাদন এবং খাবারের খরচ ২০% পর্যন্ত কমিয়ে আনা।

তথ্যসূত্র

এই প্রতিবেদনটি তৈরি করতে ভারত ও বাংলাদেশের সরকারি মৎস্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গাইডলাইন এবং অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে:

  • ICAR-CIFA (কেন্দ্রীয় মিঠা জলজ পালন গবেষণা কেন্দ্র): বায়োফ্লক প্রযুক্তির প্রধান বৈজ্ঞানিক তথ্যের জন্য এটিই সেরা উৎস।
  • ICAR-CIFRI (ব্যারাকপুর): অভ্যন্তরীণ মৎস্য গবেষণার জন্য পশ্চিমবঙ্গের চাষিরা এখানে যোগাযোগ করতে পারেন।
  • NFDB (National Fisheries Development Board): নীল বিপ্লব ও সরকারি লোন/সাবসিডির বিস্তারিত তথ্যের জন্য।
  • পশ্চিমবঙ্গ মৎস্য দপ্তর (Matshya Dept, WB): রাজ্যের নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ ও প্রকল্পের জন্য।
  • মৎস্য অধিদপ্তর (Department of Fisheries, Bangladesh): বাংলাদেশের মৎস্য চাষের নীতি ও পরামর্শের প্রধান কেন্দ্র।
  • বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (BFRI): বাংলাদেশে বায়োফ্লক গবেষণার বৈজ্ঞানিক তথ্যের জন্য।ওয়েবসাইট:
  • জাতীয় তথ্য বাতায়ন (মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়): সরকারি লোন এবং প্রকল্পের বিস্তারিত গ্যাজেটের জন্য।

শেয়ার করুন ও সেভ রাখুন: এই তথ্যটি আপনার কৃষি গ্রুপে বা চাষি বন্ধুর সাথে শেয়ার করুন যাতে তারও উপকারে আসে। এই টিপসগুলো পরবর্তীতে মাছ ছাড়ার সময় কাজে লাগবে, তাই এখনই এটি আপনার WhatsApp-এ সেভ করে রাখুন।

Spread the love

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top