লাভজনক ঝিনুক ও মুক্তা চাষের আধুনিক পদ্ধতি: সরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ভারত (পশ্চিমবঙ্গ) ও বাংলাদেশ

লাভজনক ঝিনুকে মুক্তা চাষের আধুনিক পদ্ধতি সরকারি প্রশিক্ষণ দৃশ্য CIFA
সরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নারী উদ্যোক্তারা ঝিনুকে মুক্তা চাষ প্রশিক্ষণ নিচ্ছে দৃশ্য।

মুক্তার ব্যবহার কমবেশি অনেকেই করে থাকেন, কিন্তু এটি কীভাবে উৎপাদিত হয় তা অনেকেই হয়তো জানার চেষ্টা করেন এবং কোথায় কীভাবে লাভজনক ঝিনুকে মুক্তা চাষের আধুনিক পদ্ধতি প্রশিক্ষণ নেবেন তা নিয়ে ভেবে থাকেন এবং মুক্তা চাষের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র কোথায় খোজ করে থাকেন, তারা এখানে মুক্তা চাষ পদ্ধতি ও সরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গুলি বিস্তারিত তথ্য পাবেন। মুক্তা মূলত দুই ধরণের হয়ে থাকে—প্রাকৃতিক এবং কৃত্রিম। বর্তমানে এই চাষে মানুষের চাহিদা বাড়ছে, কারণ এটি একটি অত্যন্ত লাভজনক মুক্তা চাষ ব্যবসা।

মুক্তা চাষ পদ্ধতি (Pearl Farming Method) মূলত ঝিনুকের মাধ্যমে মিষ্টি জলের পুকুরে বা ট্যাংকে সম্পন্ন হয়। যারা মাছ চাষের সাথে যুক্ত, তারা মুক্তা চাষ করলে লাভের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়; কারণ মুক্তার জন্য জলের ভেতর আলাদা কোনো খাদ্য তৈরি করতে হয় না। ভালো প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে করলে এটি খুব কঠিন বিষয় নয়। তবে যেখানে-সেখানে প্রশিক্ষণ নিলে ব্যর্থতার ঝুঁকি থাকে, তাই সরকারি বা নির্দিষ্ট কোনো স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে চাষ করলে সাফল্য খুব সহজে আসে।

ঝিনুকে মুক্তা চাষযোগ্য প্রজাতি

মুক্তা অনেক ধরণের হলেও মূলত তিনটি প্রজাতির চাষ বেশি হয়:

  • ১. ল্যামেলিডেন্স মার্জিনালিস (LAMELLIDENS MARGINALIS)
  • ২. পাররেসিয়া কররুগাটা (PARREYSIA CORRUGATA)
  • ৩. কোররিয়ানাস (CORRIANUS)

প্রজাতিভেদে চাষের সময়কাল সাধারণত ১ বছর থেকে ৩ বছর পর্যন্ত হয়ে থাকে।

ঝিনুক চাষ ও মুক্তা তৈরির সম্পর্ক:

মুক্তা চাষ পদ্ধতি আসলে একটি সমন্বিত ঝিনুক পালন প্রক্রিয়া। ঝিনুক হলো একটি জীবন্ত প্রাণী, আর মুক্তা হলো তার শরীরের ভেতর তৈরি হওয়া রত্ন। তাই লাভজনক মুক্তা চাষ করতে হলে আগে ঝিনুককে সঠিকভাবে বাঁচিয়ে রাখার কৌশল শিখতে হবে। পুকুর বা ট্যাংকের জলের তাপমাত্রা এবং খাদ্যের যোগান ঠিক থাকলে ঝিনুক দ্রুত বাড়ে এবং উন্নত মানের মুক্তা উপহার দেয়।

মিঠা পানির মুক্তা চাষ

আমাদের দেশে বাড়ির পাশের পুকুর বা ছোট জলাশয়ে মিঠা পানির মুক্তা চাষ করা সবথেকে সহজ এবং লাভজনক। মূলত ল্যামেলিডেন্স (Lamellidens) প্রজাতির ঝিনুক মিঠা জলে খুব ভালো থাকে। এই পদ্ধতিতে ঝিনুক গুলো প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া খাবার খেয়ে দ্রুত বাড়ে। মিঠা পানির মুক্তা চাষের সুবিধা হলো, এতে লবণের কোনো ঝামেলা নেই এবং প্রাকৃতিক ঝিনুকগুলো আমাদের নদী-নালা বা বিলেই প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। তবে পানি বা জলের গুণাগুণ যেমন—ক্যালসিয়াম এবং পিএইচ (pH) সঠিক মাত্রায় রাখা এই চাষের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।

মাছের সাথে মুক্তা চাষ

আপনি যদি আগে থেকেই মাছ চাষের সাথে যুক্ত থাকেন, তবে মাছের সাথে মুক্তা চাষ করা আপনার জন্য সবথেকে বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এর প্রধান সুবিধা হলো, মাছের জন্য পুকুরে যে প্লাঙ্কটন বা প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরি হয়, ঝিনুক সেই একই খাবার খেয়ে বড় হয়। ফলে আলাদা করে কোনো খাদ্য দিতে হয় না। এছাড়া ঝিনুক প্রাকৃতিকভাবে পানির ময়লা ও শৈবাল খেয়ে পানি পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে।

আড়ও দেখুন বড় মাছ চাষ পদ্ধতি: লাভজনক মজুত পুকুর নির্বাচন ও প্রস্তুতির নিয়ম

আধুনিক মুক্তা চাষের মূল ধাপ সমূহ

লাভজনক ঝিনুকে মুক্তা চাষের আধুনিক পদ্ধতি কয়েকটি বিশেষ ধাপ অবলম্বন করে করা হয়:

  • ১. প্রশিক্ষণ: এই চাষ শুরু করার আগে সঠিক প্রশিক্ষণ নেওয়া বাধ্যতামূলক।
  • ২. পুকুর বা ট্যাংক নির্বাচন: পুকুরে সারা বছর ৩ থেকে ৪ ফুট জল থাকা আবশ্যক।
  • ট্যাংকে চাষ করলে জল নিকাশের জন্য ভালো আউটলেট ব্যবস্থা রাখতে হবে।
  • ৩. ঝিনুক সংগ্রহ ও প্রস্তুতি: খাল-বিল বা নদী থেকে ঝিনুক সংগ্রহ করা যায় অথবা ক্রয় করা যায়। সংগ্রহের পর ঝিনুক পুকুরে ছাড়তে হবে। ঝিনুকের আকার ৭-৮ সেন্টিমিটার হলে সেটি অপারেশনের জন্য উপযুক্ত হয়। ঝিনুকের খোলসের ভেতর ‘ম্যান্টল‘ নামক কোষ যতক্ষণ সজীব থাকে, ততক্ষণই তা চাষের জন্য ব্যবহারযোগ্য। এক্ষেত্রে একটি ঝিনুক দাতা ও অন্যটি গ্রহীতা হিসেবে কাজ করে। দাতা ঝিনুক থেকে ম্যান্টল বের করে ২ মিমি করে কেটে অন্য ঝিনুকের ভেতর প্রবেশ করানোকে অপারেশন বলে।
  • ৪. খাদ্য ব্যবস্থাপনা: পুকুরে প্লাঙ্কটন থাকলে আলাদা খাদ্যের প্রয়োজন হয় না। প্লাঙ্কটন না থাকলে গোবর সার মিশ্রিত করে মাছ চাষের উপযোগী খাদ্য তৈরি করতে হয়। ট্যাংকে চাষ করলেও খাদ্য তৈরি আবশ্যক।
  • ৫. ঝিনুক স্থাপন পদ্ধতি: অপারেশনের আগে পুকুর বা ট্যাংকের জলের ওপর ৫ ফুট দূরত্ব বজায় রেখে দড়ি টানাতে হবে এবং বোতল বা ভাসমান কিছু বেঁধে দিতে হবে।
  • ৬. অপারেশন ও ডাইস স্থাপন: ম্যান্টল বা বিভিন্ন নকশার ডাইস ঝিনুকের ভেতর প্রবেশ করিয়ে ১০ মিনিটের মধ্যে অপারেশন সম্পন্ন করতে হয়, যা পরবর্তীতে মুক্তার আকার নেয়।
  • ৭. ঝিনুক পরিচর্যা: অপারেশন শেষ হলে ৬-৮টি ঝিনুক একসাথে নেটের ব্যাগে ভরে দড়িতে বেঁধে জলের ১ থেকে ১.৫ ফুট নিচে ঝুলিয়ে দিতে হবে।
  • ৮. তাপমাত্রা ও পর্যবেক্ষণ: নিয়মিত ঝিনুকগুলো পরীক্ষা করতে হবে। জলের তাপমাত্রা যেন ২৫°C এর মধ্যে থাকে, সেজন্য তাপমাত্রা অনুযায়ী ঝিনুকের ব্যাগগুলো উপরে বা নিচে নামিয়ে বাঁধতে হবে।
  • ৯. উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ: সাধারণত এক বিঘা পুকুরে ৩ থেকে ৪ হাজার ঝিনুক ঝোলানো যায়। প্রজাতি অনুযায়ী ১ বছর পর ঝিনুক তুলে মুক্তা বের করা হয়।
  • ১০. আয়: গুণমান অনুযায়ী একটি মুক্তা ৩০০ টাকা থেকে শুরু করে অনেক বেশি দামে বিক্রি করা সম্ভব।
লাভজনক ঝিনুকে মুক্তা চাষের আধুনিক পদ্ধতি-তে মুক্তা চাষের দৃশ্য
লাভজনক ঝিনুকে মুক্তা চাষের আধুনিক পদ্ধতি-তে মুক্তা চাষের দৃশ্য।

ঝিনুকে মুক্তা চাষের বাণিজ্যিক লাভ

বর্তমান বাজারে ঝিনুকে মুক্তা চাষের বাণিজ্যিক লাভ অন্যান্য অনেক কৃষি ব্যবসার চেয়ে বেশি। কেন এটি লাভজনক, তা নিচের পয়েন্টগুলো দেখলেই বুঝবেন:

  • অল্প পুঁজিতে শুরু: আপনার যদি নিজের একটি পুকুর থাকে, তবে শুধু ঝিনুক সংগ্রহ এবং অপারেশনের সামান্য খরচে এটি শুরু করা যায়।
  • চাহিদা ও দাম: বর্তমানে জুয়েলারি এবং শোপিস তৈরির জন্য মুক্তার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ভালো মানের একটি মুক্তা বাজারে সর্বনিম্ন ৩০০ টাকা থেকে শুরু করে ১০০০ টাকার বেশি দামেও বিক্রি হতে পারে।
  • সাফল্যের হার: সঠিক প্রশিক্ষণ নিয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ করলে ৮০ শতাংশের বেশি ঝিনুক থেকে ভালো উৎপাদন পাওয়া সম্ভব। যদি আপনি ৩০০০ ঝিনুক থেকে গড়ে ২-৩টি করেও মুক্তা পান, তবে ১-২ বছর শেষে এটি কয়েক লক্ষ টাকার মুনাফা নিশ্চিত করে।

ঝিনুকে মুক্তা চাষের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র : ভারত ও বাংলাদেশ

ব্যবসায়িক ভিত্তিতে ঝিনুকে মুক্তা চাষ করে অল্প পুঁজিতে ও স্বল্প সময়ে লক্ষ লক্ষ টাকা আয়ের জন্য লাভজনক ঝিনুকে মুক্তা চাষের আধুনিক পদ্ধতি অত্যন্ত কার্যকর। তবে এই চাষে পূর্ণ সফলতা পেতে সঠিক কারিগরি জ্ঞান ও প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে সরকারি ঝিনুকে মুক্তা চাষের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র : ভারত ও বাংলাদেশ থেকে হাতে-কলমে শিক্ষা নিলে চাষে ঝুঁকি কমে এবং সফলতা আসে সহজেই। নিচে ভারত ও বাংলাদেশে অবস্থিত প্রধান সরকারি মুক্তা চাষ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর বিস্তারিত তথ্য এবং ভর্তির নিয়মাবলী উল্লেখ করা হলো।

ভারতে ঝিনুক ও মুক্তা চাষ প্রশিক্ষিন কেন্দ্র

ভারতে মুক্তা চাষ পদ্ধতি শেখার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গুলির মধ্যে প্রধান মুক্তা চাষ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ভুবনেশ্বর এবং পশ্চিমবঙ্গে ও অন্যান্য আঞ্চলিক ঝিনুক ও মুক্তা চাষ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গুলি উল্লেখ করা হল:

সরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র: ICAR-CIFA, ভুবনেশ্বর (ওড়িশা)

ভারতে সরকারিভাবে উন্নত মানের মুক্তা চাষ পদ্ধতি প্রশিক্ষণের জন্য একমাত্র এবং প্রধান কেন্দ্রটি ওড়িশার ভুবনেশ্বরের কৌসল্যাগঙ্গাতে অবস্থিত ICAR-সেন্ট্রাল ইনস্টিটিউট অফ ফ্রেশওয়াটার অ্যাকুয়াকালচার (CIFA)। ১৯৯২ সাল থেকে এখানে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মিঠা পানির মুক্তা চাষের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ছাড়াও বিদেশিরাও এখানে প্রশিক্ষণের জন্য আবেদন করে থাকেন।

প্রশিক্ষণের বিস্তারিত তথ্য ও নিয়মাবলী:
  • ব্যাচ ও সময়সীমা: প্রতিটি ব্যাচে সাধারণত ২০ জন করে প্রশিক্ষণার্থী নেওয়া হয়। এটি একটি ৫ থেকে ৭ দিনের আবাসিক প্রশিক্ষণ কোর্স।
  • খরচ: বর্তমানে প্রশিক্ষণ ফি হিসেবে ৮,০০০ টাকা (জিএসটি ছাড়া) ধার্য করা হয়ে থাকে। এছাড়া থাকা-খাওয়ার জন্য মাথাপিছু দৈনিক ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা (মান অনুযায়ী) আলাদা দিতে হয়।
  • নির্বাচন পদ্ধতি: আবেদনের পর প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাই করে ২০ জনকে বাছাই করা হয় এবং ইমেলের মাধ্যমে পেমেন্ট ও তারিখ জানিয়ে দেওয়া হয়।
আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও অগ্রাধিকার:

প্রশিক্ষণে নির্বাচনের ক্ষেত্রে CIFA নিচের বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখে:

  • ১. প্রশিক্ষণার্থীদের মাছ চাষ, ঝিনুক চাষ বা জলজ চাষ (Aquaculture) সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান থাকতে হবে।
  • ২. আবেদনকারীর বয়স ১৮ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে হতে হবে।
  • ৩. নিজস্ব অবকাঠামো যেমন—পুকুর, সিমেন্টের ট্যাংক বা ছোট জলাশয় থাকা আবশ্যক।
  • ৪. নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ২০% কোটা বা অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
  • ৫. ভারতের প্রতিটি রাজ্য থেকে অংশগ্রহণকারীদের সমানভাবে বিবেচনা করা হয়।
প্রশিক্ষণ কোর্সের মূল বিষয়বস্তু:

প্রশিক্ষণে মূলত তিনটি প্রধান বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়:

  • মিঠা জলের ঝিনুকের শারীরিক গঠন ও বৈশিষ্ট্য এবং নিউক্লিয়াস পুঁতি বা ডাইস পরিচিতি।
  • ম্যান্টল ক্যাভিটি, ম্যান্টল টিস্যু এবং গোনাডাল ইমপ্লান্টেশন বা অপারেশনের ব্যবহারিক শিক্ষা।
  • অপারেশন পরবর্তী ব্যবস্থাপনা, জলের গুণমান রক্ষা এবং ঝিনুক রাখার ব্যাগ তৈরির পদ্ধতি।
আবেদন করার সঠিক পদ্ধতি (২০২৬ আপডেট):
  • অনলাইন আবেদন (ইমেল): সরাসরি ইমেলের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারেন: ssaurabh02@rediffmail.com অথবা সিফার অফিসিয়াল ট্রেনিং সেলে।
  • অফলাইন আবেদন (স্পিড পোস্ট): আবেদন ফরমটি www.cifatraining.com ওয়েবসাইট থেকে ডাউনলোড করে পূরণ করুন। এরপর নিচের ঠিকানায় স্পিড পোস্টের মাধ্যমে পাঠান:

ইনচার্জ, ট্রেনিং সেল (In-charge, Training Cell) ICAR-সেন্ট্রাল ইনস্টিটিউট অফ ফ্রেশওয়াটার অ্যাকুয়াকালচার (CIFA) কৌসল্যাগঙ্গা, ভুবনেশ্বর – ৭৫১ ০০২, ওড়িশা।

ঝিনুকে মুক্তা চাষ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পশ্চিমবঙ্গ

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মৎস্য বিভাগ এবং কেন্দ্রীয় মৎস্য গবেষণা সংস্থাগুলো নিয়মিত মুক্তা চাষ পদ্ধতি প্রশিক্ষণের আয়োজন করে।

CIFRI (সেন্ট্রাল ইনল্যান্ড ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট):

  • অবস্থান: ব্যারাকপুর, উত্তর ২৪ পরগণা।
  • কাজ: এখানে নদী ও বদ্ধ জলের মাছ চাষের ওপর উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

CIFA (সেন্ট্রাল ইনস্টিটিউট অফ ফ্রেশওয়াটার অ্যাকুয়াকালচার):

  • অবস্থান: রহড়া, উত্তর ২৪ পরগণা এবং কল্যাণী, নদীয়া।
  • কাজ: মিঠা জলের বা পানির মাছ ও মুক্তা চাষের জন্য এটি ভারতের অন্যতম সেরা কেন্দ্র।

রাজ্য মৎস্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র:

  • অবস্থান: জুনপুট (পূর্ব মেদিনীপুর), কালকালা (উত্তর ২৪ পরগণা) এবং আমতলা।
  • কাজ: এখানে পুকুরে মাছ চাষ, চারা উৎপাদন ও মাছের রোগ দমনের ওপর স্বল্পমেয়াদী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

কিষাণ বিজ্ঞান কেন্দ্র (KVK): প্রতিটি জেলার কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রে মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। স্থানীয় KVK-তে যোগাযোগ করা যায়।

যোগাযোগের উপায়: সরাসরি স্থানীয় ব্লক মৎস্য অফিসে (FEO Office) গিয়ে ফর্ম জমা দিতে হয় অথবা মৎস্য দপ্তরের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে নজর রাখতে হয়।

ঝিনুকে মুক্তা চাষ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বাংলাদেশ

বাংলাদেশে মৎস্য অধিদপ্তর (DoF) এবং মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (BFRI) সারা দেশে প্রশিক্ষণ পরিচালনা করে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (BFRI):

  • প্রধান কেন্দ্র: ময়মনসিংহ (ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন)।
  • কাজ: আধুনিক মাছ চাষ, মুক্তা চাষ এবং কার্প জাতীয় মাছের হ্যাচারি ব্যবস্থাপনার ওপর প্রশিক্ষণ।

মৎস্য অধিদপ্তর (Department of Fisheries):

  • সাভার মৎস্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র: ঢাকার সাভারে অবস্থিত এই কেন্দ্রটি বড় পরিসরে প্রশিক্ষণের জন্য পরিচিত।
  • জেলা ও উপজেলা মৎস্য অফিস: বাংলাদেশের প্রতিটি উপজেলায় মৎস্য কর্মকর্তা রয়েছেন। চাষিরা সরাসরি সেখানে গিয়ে প্রশিক্ষণের জন্য নাম নিবন্ধন করতে পারেন।
  • চাঁদপুর ও রায়পুর মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র: ইলিশ গবেষণা এবং কার্প জাতীয় মাছের প্রজনন প্রশিক্ষণের জন্য এই কেন্দ্রগুলো বিখ্যাত।
  • যোগাযোগের উপায়: আপনার এলাকার উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে পরবর্তী মুক্তা চাষ পদ্ধতি প্রশিক্ষণের তারিখ ও নিয়ম জানা যাবে।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, লাভজনক ঝিনুকে মুক্তা চাষের আধুনিক পদ্ধতি বর্তমানে অল্প পুঁজিতে ও স্বল্প সময়ে স্বাবলম্বী হওয়ার এক অনন্য সুযোগ। বিশেষ করে যারা মাছ চাষ করছেন, তারা বাড়তি কোনো খরচ ছাড়াই মাছের সাথে মুক্তা চাষ পদ্ধতি বা মিঠা পানির মুক্তা চাষ করে নিজেদের আয় বহুগুণ বাড়াতে পারেন। তবে এই ব্যবসায় সফল হতে হলে সঠিক ঝিনুক চাষ পদ্ধতি এবং পানির গুণাগুণ রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।

সঠিক কারিগরি জ্ঞান অর্জনের জন্য ভারতে মুক্তা চাষ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ওড়িশার (ICAR-CIFA) এবং বাংলাদেশে ঝিনুক ও মুক্তা চাষ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ময়মনসিংহের (BFRI) মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। সঠিক ঝিনুক ও মুক্তা চাষ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে হাতে-কলমে শিক্ষা নিয়ে আধুনিক এই কৃষি ব্যবসায় নামলে মুক্তা চাষে লাভ লাখ টাকা পর্যন্ত হওয়া সম্ভব। তাই দেরি না করে আধুনিক মুক্তা চাষ শুরু করুন এবং নিজের ভাগ্য বদলে ফেলুন।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

১. চাষের মুক্তা চেনার উপায় কী?

উত্তরঃ প্রাকৃতিক ও চাষের মুক্তা চেনার সবথেকে সহজ উপায় হলো দাঁত দিয়ে ঘর্ষণ করা। মুক্তাটি দাঁত দিয়ে হালকা ঘষলে যদি বালির মতো দানাদার অনুভব হয়, তবে সেটি আসল (চাষের বা প্রাকৃতিক)। আর যদি মসৃণ বা প্লাস্টিকের মতো মনে হয়, তবে সেটি নকল। এছাড়া আসল মুক্তা আগুনের শিখায় ধরলে তা পুড়ে যায় না বা গলে না।

২. ঝিনুক চাষ বিদ্যাকে কী বলে?

উত্তরঃ বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় ঝিনুক বা জলজ প্রাণী চাষের এই বিদ্যাকে অ্যাকুয়াকালচার (Aquaculture) বলা হয়। তবে বিশেষভাবে ঝিনুক বা মুক্তা উৎপাদনকে অনেক সময় পার্ল কালচার (Pearl Culture) বলা হয়ে থাকে।

৩. মুক্তা চাষকে কী বলে?

উত্তরঃ মুক্তা চাষকে সহজ ভাষায় পার্ল কালচার (Pearl Culture) বলা হয়। এটি মিঠা জলের বা লোনা জলের ঝিনুক ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে মুক্তা তৈরির একটি আধুনিক পদ্ধতি।

৪. পশ্চিমবঙ্গে মুক্তা চাষ কেন্দ্র কোথায় আছে?

উত্তরঃ পশ্চিমবঙ্গে মুক্তা চাষের প্রধান সরকারি কেন্দ্র হলো উত্তর ২৪ পরগণার রহড়া ও কল্যাণী (CIFA উপকেন্দ্র)। এছাড়া ব্যারাকপুরের CIFRI থেকেও জলের গুণমান ও ঝিনুক পালন বিষয়ে কারিগরি সহায়তা পাওয়া যায়।

৫. বাংলাদেশে মুক্তা চাষ কেন্দ্র কোথায় আছে?

উত্তরঃ বাংলাদেশে মুক্তা চাষের প্রধান কেন্দ্র হলো বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (BFRI), ময়মনসিংহ। এছাড়া মৎস্য অধিদপ্তরের অধীনে সাভার ও বিভিন্ন জেলা মৎস্য অফিস থেকেও এই বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

তথ্য সূত্র

  • ICAR-সেন্ট্রাল ইনস্টিটিউট অফ ফ্রেশওয়াটার অ্যাকুয়াকালচার ওড়িশা।
  • সেন্ট্রাল ইনল্যান্ড ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট (CIFRI)।
  • বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (BFRI)।

Spread the love

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top