প্রধানমন্ত্রী মৎস্য সম্পদ যোজনা (PMMSY) 2026: মাছ চাষের জন্য লোন ও 15 লক্ষ্ টাকা পর্যন্ত অনুদান পেতে কি কি ডকুমেন্ট লাগবে ও আবেদন পদ্ধতি।

প্রধানমন্ত্রী মৎস্য সম্পদ যোজনা (PMMSY) প্রকল্পের আওতায় আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ ও সরকারি অনুদানের সুযোগ। মাছ চাষের জন্য লোন অনলাইন আবেদন পদ্ধতি, সুবিধা ম ডকুমেন্টস , সাবসিডি লোন পেতে আবেদন করুন।
PMMSY এর সুবিধা পেতে মাছ চাষের সরকারি অনুদানের পুকুর ও সফল চাষী।

আমাদের পশ্চিমবঙ্গ তথা পুরো ভারতে মৎস্য চাষ এখন গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম লাভজনক ব্যবসা। কিন্তু সঠিক তথ্যের অভাবে অনেক সাধারণ মৎস্যচাষী বা স্বনির্ভর দলের দিদিরা সরকারের বড় স্কিমগুলোর আসল সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। অনেকেই মনে করেন সরকারি সাহায্য মানেই শুধু পঞ্চায়েত থেকে কয়েকটা চুন বা সারের প্যাকেট পাওয়া। কিন্তু আপনি কি জানেন, আপনার মাছ চাষের ব্যবসাকে বড় করতে বা আধুনিক প্রযুক্তিতে চাষ করতে সরকার আপনাকে লক্ষ লক্ষ টাকা পর্যন্ত অনুদান দিতে পারে?

আজকের আর্টিকেলে আমরা প্রধানমন্ত্রী মৎস্য সম্পদ যোজনা (PMMSY) নিয়ে মাছ চাষের জন্য লোন ও মাঠ স্তরের সমস্ত খুঁটিনাটি তথ্য এক জায়গায় আলোচনা করব, যা আপনাকে কোনো দালালের চক্করে না পড়ে সরাসরি সরকারি লোন ও অনুদান পেতে সাহায্য করবে।

২. প্রধানমন্ত্রী মৎস্য সম্পদ যোজনা (PMMSY) আসলে কী?

সহজ কথায় বলতে গেলে, এটি কোনো প্রতি মাসের ছোট ভাতা বা সাধারণ খয়রাতি প্রকল্প নয়। এটি হলো মাছ চাষের ব্যবসা বড় করা, মৎস্য শিল্পের আধুনিকীকরণ এবং গ্রামীণ এলাকায় নতুন পরিকাঠামো তৈরি করার একটি মেগা সরকারি প্রকল্প।

এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো—এখানে নতুন ব্যবসা শুরু করার বা পরিকাঠামো গড়ার জন্য মোট খরচের একটি বিশাল অংশ সরকার অনুদানের (Subsidy) মাধ্যমে মৎস্যচাষীকে ফেরত দিয়ে দেয়। অর্থাৎ, এই প্রকল্পে টাকা ফেরত পাওয়ার পর আপনার ব্যবসার আসল পুঁজিতে টান পড়ে না এবং লোন বা খরচের বোঝা অনেক কমে যায়।

৩. PMMSY প্রকল্পে অনুদান বা সাবসিডির সাধারণ হিসাব

PMMSY প্রকল্পের অধীনে সরকার মূলত আবেদনকারীর ক্যাটাগরি অনুযায়ী দুই ধরনের আর্থিক অনুদান প্যাকেজ দিয়ে থাকে:

  • ৪০% অনুদান: সাধারণ এবং ওবিসি বিভাগের সমস্ত পুরুষ মৎস্যচাষীদের জন্য (General & OBC Male)।
  • ৬০% অনুদান : সমস্ত মহিলা মৎস্যচাষী (যেমন স্বনির্ভর দলের দিদিরা) এবং তপশিলি জাতি/উপজাতি (SC/ST) ক্যাটাগরির পুরুষ ও মহিলাদের জন্য।

একটি সহজ উদাহরণ: আপনি যদি এই প্রকল্পের অধীনে একটি ১০ লক্ষ টাকার প্রজেক্ট পাস করান এবং আপনি কোনো স্বনির্ভর গোষ্ঠীর (SHG) সদস্য বা মহিলা হন, তবে কাজ সফলভাবে শেষ করার পর সরকার আপনাকে সরাসরি ৬ লক্ষ টাকা অনুদান হিসেবে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ফেরত দেবে। আর আপনি সাধারণ পুরুষ হলে পাবেন ৪ লক্ষ টাকা।

আড়ও দেখুন – পি এম কিষান স্ট্যাটাস চেক ও online আবেদন পদ্ধতি

৪. কারা এই প্রকল্পের অধীনে আবেদনের যোগ্য?

PMMSY প্রকল্পের সুবিধা অত্যন্ত বিস্তৃত এবং এটি গ্রামীণ এলাকার প্রতিটি স্তরের মৎস্যচাষীকে ছুঁয়ে যায়:

  • ব্যক্তিগত মৎস্যচাষী: যাদের নিজস্ব বা দীর্ঘমেয়াদী লিজ নেওয়া পুকুর/জলাশয় আছে।
  • বয়স সীমা: আবেদন কারীর বয়স ১৮-৬০ বছরের মধ্যে হতে হবে।
  • স্বনির্ভর গোষ্ঠী (SHG): গ্রামীণ এলাকার দিদিরা যারা দলগতভাবে বা যৌথ উদ্যোগে মাছ চাষ, বায়োফ্লক বা ব্যবসা করতে চান।
  • মৎস্য সমবায় সমিতি: রেজিস্টার্ড কোনো মৎস্যজীবী দল বা কো-অপারেটিভ সোসাইটি।
  • নব্য গ্রামীণ উদ্যোক্তা: যারা মাছের বড় হ্যাচারি, আরএএস (RAS) বা আধুনিক ফিড মিল বসিয়ে বাণিজ্যিক ব্যবসা করতে চান।

৫. PMMSY প্রকল্পে অর্থায়নের মোট পরিমাণ

ক. নতুন বাণিজ্যিক পুকুর খনন ও ইনপুট

যারা সম্পূর্ণ নতুনভাবে বড় আকারে বা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মাছ চাষ শুরু করতে চান, তাদের জন্য এই স্কিমটি একটি বড় হাতিয়ার।

  • মোট প্রজেক্ট প্যাকেজ (১ হেক্টর বা প্রায় সাড়ে ৭ বিঘা জমির জন্য): আনুমানিক ৭,০০,০০০ টাকা।
  • ৪০% অনুদান (সাধারণ পুরুষ): ২,৮০,০০০ টাকা সরকার দেবে।
  • ৬০% অনুদান (মহিলা/SC/ST): ৪,২০,০০০ টাকা সরকার দেবে।

(নোট: আপনার জায়গার পরিমাণ বা পুকুরের আয়তন যদি এর চেয়ে কম হয়, তবে এই খরচের হিসাব এবং অনুদানের পরিমাণও সেই অনুপাত অনুযায়ী কমে আসবে।)

খ. আধুনিক বায়োফ্লক প্রযুক্তি

গ্রামীণ এলাকায় যাদের চাষের জমি নেই বা খুব অল্প জায়গা আছে, অথচ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ট্যাংকের মাধ্যমে বেশি মাছ উৎপাদন করতে চান, তাদের জন্য এই আধুনিক স্কিম।

  • ছোট ইউনিট (কমপক্ষে ৭টি ট্যাংক): মোট প্রজেক্ট প্যাকেজ ধরা হয় আনুমানিক ৭,৫০,০০০ টাকা।
  • ৪০% অনুদান (সাধারণ পুরুষ): ৩,০০,০০০ টাকা ফেরত পাবেন।
  • ৬০% অনুদান (মহিলা/SC/ST): ৪,handle,০০০ টাকা (৪.৫ লক্ষ) ফেরত পাবেন।

গ. মাছের ব্রিডিং ও হ্যাচারি স্থাপন

উন্নত মানের মাছের ডিম থেকে ধানি পোনা বা রেণু তৈরি করার ব্যবসা মৎস্য শিল্পের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এই কাজের জন্য সরকার সবচেয়ে বড় মেগা ফান্ড বা প্যাকেজ দিয়ে থাকে।

  • কার্প মাছের বড় হ্যাচারি: রুই, কাতলা, মৃগেল বা কার্প জাতীয় মাছের বৈজ্ঞানিক হ্যাচারি ও ব্রিডিং পুল তৈরির জন্য মোট প্রজেক্ট প্যাকেজ ধরা হয় আনুমানিক ২৫,০০,০০০ টাকা (২৫ লক্ষ টাকা)।
  • ৪০% অনুদান (সাধারণ পুরুষ): ১০,০০,০০০ টাকা (১০ লক্ষ) সরকার সরাসরি অনুদান দেবে।
  • ৬০% অনুদান (মহিলা/SC/ST): ১৫,০০,০০০ টাকা (১৫ লক্ষ) সরকার অনুদান দেবে।
  • রঙিন মাছের ব্যাকইয়ার্ড ব্রিডিং ইউনিট: বাড়ির পেছনে ছোট আকারে রঙিন মাছ (Ornamental Fish) চাষ ও ব্রিডিংয়ের জন্য ১,০০,০০০ টাকার ছোট প্যাকেজও রয়েছে, যেখানে ক্যাটাগরি অনুযায়ী ৪০,০০০ থেকে ৬০,০০০ টাকা অনুদান মেলে।

৭. তারপলিন বিছানো আধুনিক রেসওয়ে বা আরএএস স্কিম

আজকাল অনেক প্রগতিশীল মৎস্যচাষী বড় পুকুর বা গর্ত খুঁড়ে তারপলিন (Geomembrane Sheet) বিছিয়ে কৃত্রিমভাবে জল আটকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে চাষ করছেন।

  • মাঝারি বা ব্যাকইয়ার্ড রেসওয়ে/আরএএস সিস্টেম: মোট প্রজেক্ট প্যাকেজ ধরা হয় আনুমানিক ৭,৫০,০০০ টাকা (সাড়ে ৭ লক্ষ টাকা)। ক্যাটেগরি অনুযায়ী এখানে ৩ লক্ষ (৪০%) থেকে ৪.৫ লক্ষ (৬০%) টাকা অনুদান মেলে।
  • বড় বাণিজ্যিক রেসওয়ে/আরএএস সিস্টেম: বড় পরিকাঠামোর জন্য সরকার অনুমোদিত প্যাকেজ প্রায় ২৫,০০,০০০ টাকা (২৫ লক্ষ টাকা)। যেখানে ১০ লক্ষ (৪০%) থেকে ১৫ লক্ষ (৬০%) টাকা পর্যন্ত বড় অংকের সাবসিডি পাওয়া যায়।

৫. চাষ শুরু করার জন্য ব্যাংক লোনের আসল নিয়ম

আমরা আগেই জেনেছি, PMMSY-এর নিয়ম হলো—আগে নিজের খরচে বা লোন নিয়ে কাজ শেষ করতে হয়, সরকার সাবসিডির টাকা পরে দেয়। গ্রামীণ এলাকার সাধারণ চাষী বা স্বনির্ভর দলের দিদিদের পক্ষে প্রথমে নিজের পকেট থেকে লাখ লাখ টাকা নগদ জোগাড় করা অসম্ভব। এই সমস্যার সমাধানের জন্যই এই প্রকল্পটিকে সরাসরি ব্যাংক ঋণের সাথে যুক্ত করা হয়েছে:

  • মার্জিন মানি বা নিজস্ব অংশ: মোট প্রজেক্ট খরচের মাত্র ১০% থেকে ২০% টাকা চাষীকে নিজের পকেট থেকে দেখাতে হয়। আপনার নিজস্ব পুকুর বা জমি থাকলে সেটির মূল্যই আপনার পুঁজি হিসেবে ধরা হবে।
  • ব্যাংক ঋণ : প্রকল্পের বাকি খরচের একটা বড় অংশ (সাধারণত ৪০% থেকে ৫০%) ব্যাংক আপনাকে লোন হিসেবে অগ্রিম দেবে, যা দিয়ে আপনি কাজ শুরু করতে পারবেন।

অনুদানের টাকা কীভাবে কাটে: কাজ শেষ হওয়ার পর সরকার যে ৪০% বা ৬০% অনুদান দেবে, সেই টাকাটি সরাসরি আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আসবে এবং ব্যাংক সেটি আপনার লোনের আসল অ্যামাউন্ট থেকে কেটে নেবে। ফলে আপনার লোনের বোঝা এক ধাক্কায় প্রায় শেষ হয়ে যাবে।

৬. কোন সুবিধা নিলে কী প্রয়োজন ও সাথে কী দিতে হবে?

মাঠ স্তরে আবেদনের সময় কোন সুবিধার জন্য ঠিক কী কী জিনিস বা শর্ত পূরণ করতে হবে এবং ফর্মের সাথে কী কী নথি জমা দিতে হবে, তা নিচে পরিষ্কারভাবে সাজিয়ে দেওয়া হলো:

ক) নতুন পুকুর খনন স্কিমের জন্য:

মূল শর্ত: নিজস্ব বা দীর্ঘমেয়াদী লিজ নেওয়া উপযুক্ত জমি থাকতে হবে (অনূন্য ১ হেক্টর বা আনুপাতিক অংশ)।

প্রয়োজনীয় নথিপত্র:

  • জমির হালনাগাদ পর্চা বা রেজিস্টার্ড লিজ ডিড।
  • ভোটার কার্ড, আধার কার্ড ও প্যান কার্ড।
  • ব্যাংক পাসবুকের প্রথম পাতার জেরক্স (যেখানে IFSC কোড স্পষ্ট)।
  • পুকুর খননের প্রাথমিক এস্টিমেট ও নকশা।

খ) বায়োফ্লক ও আধুনিক রেসওয়ে (RAS) স্কিমের জন্য:

মূল শর্ত: তারপলিন ট্যাংক বা রেসওয়ে বসানোর মতো উপযুক্ত নিজস্ব বা লিজের জায়গা এবং নিরবিচ্ছিন্ন জলের উৎস।

প্রয়োজনীয় নথিপত্র:

  • জমির মালিকানা বা লিজের কাগজ।
  • থ্রি-ফেজ বিদ্যুৎ সংযোগের বিল অথবা বিদ্যুৎ পর্ষদের থেকে নেওয়া ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট।
  • ২৪ ঘণ্টা ব্যাকআপের জন্য জেনারেটর বা ইনভার্টার রাখার স্বঘোষণা পত্র।
  • বায়োফ্লক/RAS টেকনিক্যাল প্রজেক্ট রিপোর্ট।

গ) মাছের বড় বাণিজ্যিক হ্যাচারি স্থাপনের জন্য:

মূল শর্ত: PMMSY প্রকল্প সুবিধা নিতে অন্তত ১ থেকে ২ একর বা তার বেশি উপযুক্ত জমি এবং আবেদনকারীর মৎস্য চাষ বা পোনা উৎপাদনের ওপর সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া থাকতে হবে।

প্রয়োজনীয় নথিপত্র:

  • জমির সম্পূর্ণ আইনি রেকর্ড ও নকশা।
  • সরকারি খামার বা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নেওয়া ট্রেনিং সার্টিফিকেট。
  • অনুমোদিত এক্সপার্ট দ্বারা তৈরি করা মেগা ডিপিআর (DPR)।

৭. PMMSY প্রকল্পের সুবিধার জন্য আবেদনের পদ্ধতি

PMMSY প্রকল্প অনলাইন বা অফলাইন—আপনার সুবিধা অনুযায়ী নিচের যেকোনো একটি পদ্ধতি বেছে নিয়ে আপনি আবেদন করতে পারবেন:

১. NFDP অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের মাধ্যমে আবেদন

যদি পোর্টালের টেকনিক্যাল সমস্যা না থাকে, তবে কম্পিউটারের মাধ্যমে সরাসরি কেন্দ্রীয় পোর্টালে এভাবে আবেদন করতে পারেন:

  • সাইটে প্রবেশ: প্রথমে জাতীয় মৎস্য ডিজিটাল পোর্টালের অফিশিয়াল লিঙ্ক nfdp.dof.gov.in অথবা nfdp.fdfis.gov.in-এ যান।
  • রেজিস্ট্রেশন (Sign Up): হোমপেজে থাকা “Registration on NFDP” বা “Apply for sub-schemes benefits” অপশনে ক্লিক করে আপনার মোবাইল নম্বর, আধার কার্ড এবং ব্যাংকের তথ্য দিয়ে একটি নতুন প্রোফাইল তৈরি করুন।
  • স্কিম ও ডকুমেন্ট আপলোড: প্রোফাইল তৈরি হলে লগইন করে আপনার পছন্দের স্কিমটি বেছে নিন এবং আপনার জমির পর্চা/লিজের কাগজ, ব্যাংক পাসবুক এবং তৈরি করা ডিপিআর (DPR) স্ক্যান করে আপলোড করে ফর্মটি সাবমিট করুন।

২. মোবাইল অ্যাপ ইনস্টল করার মাধ্যমে আবেদন (সবচেয়ে সহজ অনলাইন মাধ্যম)

যদি ওয়েবসাইটে রিডাইরেক্ট বা হোমপেজে ফিরে আসার মতো টেকনিক্যাল সমস্যা হয়, তবে মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করা সবচেয়ে সেরা বিকল্প:

  • অ্যাপ ডাউনলোড: আপনার অ্যান্ড্রয়েড মোবাইলের গুগল প্লে-স্টোরে (Google Play Store) গিয়ে মৎস্য দপ্তরের অফিশিয়াল “Matsya Setu” অথবা “NFDP” অ্যাপটি সার্চ করে ইনস্টল করে নিন।
  • মোবাইলে আবেদন: অ্যাপটি খুলে ‘Beneficiary/Farmer Registration’ সেকশনে যান। মোবাইলের ক্যামেরা দিয়ে সরাসরি আপনার আধার কার্ড, ব্যাংক পাসবুক ও প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টের ছবি তুলে এবং ডিপিআর (DPR)-এর ফাইলটি আপলোড করে খুব সহজেই আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবেন।

৩. সিএসসি (CSC) বা তথ্যমিত্র কেন্দ্রের মাধ্যমে আবেদন

আপনার যদি নিজে নিজে মাছ চাষের জন্য লোন অনলাইন ফর্ম ফিলাপ করতে বা ডিপিআর (DPR) আপলোড করতে সমস্যা হয়, তবে এই পদ্ধতিটি সবচেয়ে নিরাপদ:

  • নিকটবর্তী কেন্দ্রে যোগাযোগ: আপনার এলাকার যেকোনো অনুমোদিত Common Service Center (CSC) বা ডিজিটাল তথ্যমিত্র কেন্দ্রে চলে যান।
  • এজেন্টের মাধ্যমে আবেদন: সিএসসি এজেন্টের কাছে আপনার আধার, ভোটার কার্ড, ব্যাংক পাসবুক, জমির পর্চা বা লিজের কাগজ এবং ডিপিআর (DPR)-এর কপিটি দিন। তাঁদের বিশেষ সরকারি আইডি (Digital Seva Portal)-এর মাধ্যমে সার্ভার জ্যাম থাকলেও খুব দ্রুত ও নির্ভুলভাবে আপনার আবেদনটি পোর্টালে আপলোড করিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।

৪. ব্লক বা জেলা মৎস্য অফিসে আবেদন (ঐতিহ্যবাহী অফলাইন মাধ্যম)

অনলাইনে কোনোভাবেই কাজ না হলে বা সরাসরি অফিসারদের সাথে কথা বলে আবেদন করতে চাইলে:

  • অফিসে যোগাযোগ: আপনার নিজস্ব ব্লকের মৎস্য উন্নয়ন আধিকারিকের (FEO – Fishery Extension Officer) অফিসে অথবা সরাসরি জেলা মৎস্য দপ্তরে (District Fishery Office) চলে যান।
  • ফর্ম ও ফাইল জমা: অফিস থেকে PMMSY বা মৎস্যজীবী ক্রেডিট কার্ডের নির্দিষ্ট ফর্মটি সংগ্রহ করে তা ফিলাপ করুন। এরপর ফর্মের সাথে আপনার সমস্ত নথির জেরক্স এবং ডিপিআর (DPR) ফাইলের একটি হার্ড কপি ফিজিক্যালি অফিসারদের টেবিলে জমা দিয়ে একটি অফিসিয়াল রসিদ (Acknowledgement Receipt) সংগ্রহ করুন।

৫. আবেদন হয়ে গেলে PMMSY স্টেটাস চেক করবেন কীভাবে?

মাছ চাষ অনুদান আবেদন প্রক্রিয়াটি সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর আপনার ফাইলটি সরকারিভাবে কোন স্তরে অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে, তা ঘরে বসেই চেক করতে পারবেন:

  • অ্যাপ্লিকেশন আইডি : আবেদন সাবমিট করার পর যে রসিদ বা স্লিপ পাবেন, সেখানে একটি ইউনিক ‘Application Tracking ID’ বা ‘Registration Number’ থাকবে। সেটি যত্ন করে রাখুন।
  • অনলাইন ট্র্যাকিং: পুনরায় NFDP পোর্টাল বা Matsya Setu অ্যাপে লগইন করুন। সেখানে “Track Application Status” বা “Check Status” নামক একটি অপশন দেখতে পাবেন।
  • বর্তমান অবস্থা জানা: ওই বক্সে আপনার ট্র্যাকিং আইডিটি বসিয়ে সার্চ করলেই স্ক্রিনে দেখিয়ে দেবে আপনার ফাইলটি এখন ব্লকের FEO টেবিলে আছে, নাকি জেলা স্ক্রীনিং কমিটির (District Level Committee) কাছে অনুমোদনের জন্য পেন্ডিং রয়েছে।

১২. ডিপিআর (DPR) কী, কীভাবে ও কাকে দিয়ে তৈরি করাবেন?

ডিপিআর বা Detailed Project Report হলো আপনার মৎস্য চাষের ব্যবসার একটি লিখিত খসড়া বা ব্লু-প্রিন্ট। এতে আপনার পুকুর বা প্রজেক্টের সাইজ, সিভিল ওয়ার্কের খরচ, মাছের পোনা ও খাবারের খরচ এবং বছর শেষে কত টাকা লাভ হতে পারে, তার একটি নিখুঁত হিসাব থাকে। মৎস্য দপ্তরের অফিসাররা এই কাগজটি দেখেই আপনার প্রজেক্ট পাস করেন।

ক. ডিপিআর (DPR) কাকে দিয়ে তৈরি করাবেন?

মাঠ স্তরে ডিপিআর তৈরি করার ৩টি সহজ উপায় রয়েছে:

  • ১. মৎস্য দপ্তরের মেন্টর বা এক্সপার্ট: আপনার ব্লকের মৎস্য উন্নয়ন আধিকারিক (FEO) বা মৎস্য দপ্তরের অনুমোদিত কোনো টেকনিক্যাল এক্সপার্টকে দিয়ে এটি তৈরি করানো সবচেয়ে ভালো। কারণ তাঁরা সরকারি ফরম্যাট ও খরচের সঠিক গাইডলাইন (Schedule of Rates) জানেন।
  • ২. কৃষি গ্র্যাজুয়েট বা সিভিল কনসালট্যান্ট: বড় হ্যাচারি বা আরএএস (RAS) প্রজেক্টের ক্ষেত্রে কোনো রেজিস্টার্ড সিভিল ইঞ্জিনিয়ার বা অ্যাকুয়াকালচার এক্সপার্টকে দিয়ে ডিপিআর ও নকশা তৈরি করিয়ে নিতে পারেন।
  • ৩. অনুমোদিত কোটেশন: আধুনিক যন্ত্রপাতির (যেমন বায়োফ্লক বা রেসওয়ে ফিল্টার) জন্য কোনো নামী সরবরাহকারী বা কোম্পানির দেওয়া খরচের এস্টিমেট বা কোটেশন ডিপিআর-এর সাথে যুক্ত করতে হবে।

খ. ডিপিআর কোথায় এবং কাকে জমা দেবেন?

আপনার ডিপিআর এবং সমস্ত নথিপত্র একসাথে ফাইল করে আপনার নিজস্ব ব্লকের মৎস্য উন্নয়ন আধিকারিক (FEO – Fishery Extension Officer) অথবা জেলা মৎস্য দপ্তরে গিয়ে সরাসরি জমা দিতে হবে।

১৩. ব্যাংক যে প্রথমে টাকা দেয়, তার স্টেপ-বাই-স্টেপ প্রসেস

আমরা আগে জেনেছি যে, (PMMSY) প্রকল্পে সরকার অনুদানের টাকা দেয় কাজ শেষ হওয়ার পর। তাই কাজ শুরু করার জন্য ব্যাংক কীভাবে আপনাকে ধাপে ধাপে টাকা দেয়, তার বাস্তব প্রসেসটি নিচে দেওয়া হলো:

ধাপ ১: সরকারি ওয়ার্ক অর্ডার: আপনি মৎস্য দপ্তরে ডিপিআর জমা দেওয়ার পর, স্ক্রীনিং কমিটি আপনার প্রজেক্ট অনুমোদন করলে মৎস্য দপ্তর আপনাকে একটি “অনুমোদন পত্র” বা “Work Order” দেবে।

ধাপ ২: ব্যাংকে লোন অ্যাকাউন্ট খোলা: মৎস্য দপ্তরের সেই অনুমোদন পত্র নিয়ে আপনাকে ব্যাংকে যেতে হবে। আপনার নিজের জমি থাকলে ব্যাংক আপনার KCC অ্যাকাউন্টের লিমিট বাড়াবে, আর জমি না থাকলে MJCC কার্ডের মাধ্যমে একটি নতুন লোন অ্যাকাউন্ট চালু করবে।

ধাপ ৩: মার্জিন মানি জমা দেওয়া: মোট প্রজেক্ট খরচের ১০% থেকে ২০% টাকা (যা চাষীর নিজস্ব অংশ) আপনাকে প্রথমে নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দেখাতে বা জমা করতে হবে।

ধাপ ৪: ধাপে ধাপে লোন রিলিজ: ব্যাংক আপনাকে একবারে সব লোন হাতে দেবে না। কাজের অগ্রগতি দেখে তারা ধাপে ধাপে টাকা ছাড়বে। যেমন:

  • প্রথম কিস্তি: নতুন পুকুর কাটার জন্য বা তারপলিন ট্যাংক বানানোর জন্য সিভিল কাজের টাকা দেওয়া হবে।
  • দ্বিতীয় কিস্তি: সিভিল কাজ শেষ হলে ব্যাংক ম্যানেজার বা মৎস্য আধিকারিক এসে তা ভেরিফাই করবেন। এরপর মাছের পোনা এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনার জন্য দ্বিতীয় কিস্তির টাকা ছাড়বে।
  • তৃতীয় কিস্তি: মাছের খাবার (Feed) এবং দৈনিক খরচ চালানোর জন্য বাকি টাকা দেওয়া হবে।

ধাপ ৫: সাবসিডি জমা ও লোন ক্লোজার: আপনার প্রজেক্টের কাজ সম্পূর্ণ শেষ হলে মৎস্য দপ্তর থেকে চূড়ান্ত ভেরিফিকেশন ও জিও-ট্যাগিং করা হবে। এরপর সরকারের প্রাপ্য অনুদানের টাকাটি (৪০% বা ৬০%) সরাসরি আপনার ওই লোন অ্যাকাউন্টে চলে আসবে। ফলে আপনার লোনের একটা বড় অংশ সাথে সাথে শোধ হয়ে যাবে এবং বাকি সামান্য টাকা আপনি সহজ কিস্তিতে ব্যাংকে শোধ করতে পারবেন।

১১. মৎস্যচাষীদের জন্য ‘কৃষিসূত্র’ টিম টিপস

আর্টিকেলের শেষে আপনার পাঠকদের উদ্দেশ্যে এই ৩টি বিশেষ পরামর্শ দিতে পারেন, যা তাদের আবেদন সফল করতে সাহায্য করবে:

১. লোন না লাগলে কার্ড জরুরি নয়: আপনার যদি কাজ শুরু করার মতো নিজস্ব পুঁজি থাকে, তবে কোনো KCC বা MJCC কার্ড ছাড়াই আপনি সরাসরি PMMSY-এর ৪০% বা ৬০% সাবসিডির জন্য মৎস্য দপ্তরে ফর্ম জমা দিতে পারেন।
২. KCC থাকলে MJCC অ-প্রয়োজনীয়: আপনার যদি আগে থেকেই সচল কিসান ক্রেডিট কার্ড (KCC) থাকে, তবে নতুন করে মৎস্যজীবী কার্ড (MJCC) করার কোনো প্রয়োজন নেই। পুরনো কার্ডের লিমিট বাড়িয়েই ব্যাংক আপনাকে মাছ চাষের লোন দেবে।
৩. বিদ্যুৎ ব্যাকআপ বাধ্যতামূলক: বায়োফ্লক, আরএএস (RAS) বা হ্যাচারির মতো আধুনিক প্রজেক্ট করার সময় ডিপিআর-এ জেনারেটর বা পাওয়ার ব্যাকআপের খরচ অবশ্যই রাখবেন। কারণ কারেন্ট চলে গেলে এই আধুনিক সিস্টেমে মাছের ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে, যা মৎস্য দপ্তরের অফিসাররা ভেরিফিকেশনের সময় কড়াভাবে দেখেন।

৪. ডিপিআর (DPR)-এর জরুরি ট্রিক: বড় পুকুর বা গর্ত খুঁড়ে তারপলিন (Geomembrane Sheet) বিছিয়ে কৃত্রিমভাবে জল আটকে আধুনিক সিস্টেমের ডিপিআর করার সময় ফর্মে “নতুন পুকুর খনন” টিক না মেরে, “Establishment of RAS/Raceway Unit” অপশনটি বেছে নিতে হবে। এই ডিপিআর-এ তারপলিন শিট, মেকানিক্যাল ও বায়ো-ফিল্টার (অ্যামোনিয়া ও ময়লা দূর করার জন্য) এবং ২৪ ঘণ্টা জলকে অক্সিজেনেটেড রাখার জন্য হাই-স্পিড অ্যারেটর বা ব্লোয়ারের খরচ স্পষ্টভাবে দেখাতে হবে।

১২. উপসংহার

প্রধানমন্ত্রী মৎস্য সম্পদ যোজনা (PMMSY) মৎস্য চাষের ক্ষেত্রে গ্রামীণ অর্থনীতিকে বদলে দেওয়ার মতো দুটি বড় সরকারি পদক্ষেপ। কাগজের চক্কর বা দালালদের ভয় না পেয়ে, আপনার প্রজেক্টের সাইজ অনুযায়ী সঠিক ডিপিআর (DPR) তৈরি করুন এবং অনলাইন আবেদন করুন অথবা আপনার নিকটতম মৎস অফিসে যোগাযোগ করুন।

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর (FAQ)

প্রশ্ন ১: PMMSY যোজনায় কত টাকা পাওয়া যায়?

উত্তর: এই স্কিমে কোনো নির্দিষ্ট ফিক্সড টাকা দেওয়া হয় না। আপনি মাছ চাষের কোন প্রজেক্ট করছেন (যেমন: নতুন পুকুর, বায়োফ্লক বা আরএএস) তার মোট খরচের ওপর সরকার অনুদান বা সাবসিডি দেয়। সাধারণ শ্রেণির পুরুষদের জন্য খরচের ৪০% এবং সমস্ত মহিলা ও এসসি/এসটি (SC/ST) ক্যাটাগরির জন্য ৬০% টাকা সরকারি অনুদান হিসেবে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ফেরত পাওয়া যায়।

প্রশ্ন ২: লিজ নেওয়া জমিতে সরকারি মাছ চাষের লোন বা অনুদান পাওয়া যাবে কি?

উত্তর: হ্যাঁ, অবশ্যই পাওয়া যাবে। তবে শর্ত হলো, জমির মালিকের সাথে করা রেজিস্টার্ড লিজ চুক্তিপত্রটি (Lease Deed) পরিকাঠামো তৈরির প্রজেক্টের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ১০ বছর (10 Years) মেয়াদের হতে হবে এবং সেটি ডিপিআর (DPR)-এর সাথে জমা দিতে হবে।

তথ্য সূত্র

Pradhan Mantri Matsya Sampada Yojana (PMMSY)

Spread the love

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top