মাছের রোগের কারণ ও প্রতিকার: আধুনিক মাছ চাষের পূর্ণাঙ্গ গাইড

মাছের রোগের কারণ ও প্রতিকার: পুকুরের মাছ মারা গিয়েছে কেন?জল এর পিএইচ পরীক্ষা ও প্রতিকারের একটি দৃশ্য
পুকুরের মাছ মারা গিয়েছে কেন?জল এর পিএইচ পরীক্ষা ও প্রতিকারের একটি দৃশ্য

মাছ চাষের সাফল্য মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে—পুকুরের পরিবেশ, সঠিক পরিচর্যা এবং মাছ মজুতের সঠিক পরিমাণ। কোনো কারণে পুকুরের ভৌত ও রাসায়নিক পরিবেশের ব্যাপক পরিবর্তন হলে কিংবা মাছের ঘনত্বের তুলনায় খাবার কম হলে মাছেদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। প্রিয় চাষি ভাই ও পাঠকেরা, আজকের এই আর্টিকেলে আমরা মাছের রোগের কারণ ও প্রতিকার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

১. মাছের রোগের প্রধান ৫টি কারণ

সাধারণত কার্প (রুই, কাতলা, মৃগেল) এবং অন্যান্য প্রজাতির মাছ মূলত ৫টি কারণে আক্রান্ত হয়। মাছের রোগের কারণ ও প্রতিকার জানতে হলে এই পাঁচটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি:

  • ক) পরিবেশগত কারণে: জলের গুণমান নষ্ট হওয়া।
  • খ) সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে: চাষ পদ্ধতিতে ভুল থাকা।
  • গ) অপুষ্টিজনিত কারণে: সুষম ও পুষ্টিকর খাবারের অভাব।
  • ঘ) বংশগত ও জন্মগত কারণে: দুর্বল ব্রুড মাছের পোনা ব্যবহার।
  • ঙ) জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হওয়া: ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ।

২. মাছ অসুস্থ হলে কী কী লক্ষণ দেখা যায়?

মাছ রোগাক্রান্ত হলে শরীরে এবং আচরণে পরিবর্তন আসে। মাছের রোগের কারণ ও প্রতিকার খুঁজে বের করার আগে এই ৯টি লক্ষণ দেখে নিশ্চিত হোন:

  • মাছের খাদ্য গ্রহণে অনীহা বা খাবার ছেড়ে দেওয়া।
  • মাছ পুকুর পাড়ে অলসভাবে ঘোরাঘুরি করা।
  • মাছ পুকুরের ওপর স্থির হয়ে ভাসতে থাকা।
  • সাঁতারের ভারসাম্য হারানো বা পুকুরে গোল হয়ে ঘুরপাক খাওয়া।
  • দেহের স্বাভাবিক উজ্জ্বল রং বদলে যাওয়া।
  • মাছের শরীরে লালচে ক্ষত বা ঘা সৃষ্টি হওয়া।
  • মাছের চোখ ও ফুলকা ফুলে যাওয়া।
  • দেহে আলপিনের মাথার মতো পরজীবীর সিস্ট দেখা যাওয়া।
  • পাখনা বা লেজ পচে খসে পড়া।

৩. পরিবেশগত কারণে মাছের রোগের কারণ ও প্রতিকার

পুকুরের পরিবেশ অনুকূলে না থাকলে মাছ সবথেকে বেশি আক্রান্ত হয়। মূলত ৪টি কারণে পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটে । মাছের রোগের কারণ ও প্রতিকার নিন্মরূপ :

৩.১. পুকুরে গ্যাস তৈরি হওয়া ও মাছের খাবি খাওয়া

পুকুরের তলায় গ্যাস তৈরি হলে মাছেদের শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হয়। মাছের রোগের কারণ ও প্রতিকার নিন্মরূপ

  • লক্ষণ: মাছ জলের উপরিভাগে মুখ তুলে খাবি খেতে থাকে।
  • গ্যাস হওয়ার কারণ: অতিরিক্ত পোনা মজুত, অতিরিক্ত জলজ উদ্ভিদ থাকা, তলায় জৈব পদার্থ বা কাদা (পাঁক) জমে যাওয়া এবং প্রয়োজনের বেশি পরিপূরক খাদ্য ব্যবহার করা।
  • প্রতিরোধ: পুকুরের তলা থেকে পাঁক মাটি তুলে ফেলা। বিঘা প্রতি ২০-২৫ কেজি চুন প্রয়োগ করা এবং রাসায়নিক সারের বদলে সঠিক পরিমাণে জৈব সার দেওয়া।
  • চিকিৎসা: নির্দিষ্ট সংখ্যায় পোনা মজুত রাখা। উদ্ভিদ অণুকণা বাড়লে বিঘা প্রতি ৩০ কেজি কাঁচা টাটকা গোবর ১০০-১৫০ লিটার জলে গুলে ছিটিয়ে দেওয়া। অক্সিজেনের জন্য জলে বাঁশ দিয়ে জল পেটানো বা কলা গাছ কুচি করে জলে ফেলা উপকারী।
মাছের রোগ ও প্রতিকর: পুকুরে গ্যাস তৈরি হওয়ায় মাছ উপরে ভেসে খাবি খাচ্ছে তার দৃশ্য
পুকুরে গ্যাস তৈরি হওয়ায় মাছ উপরে ভেসে খাবি খাচ্ছে তার দৃশ্য

৩.২. জল ঘোলাটে এবং কাদা থাকা (Turbidity)

জলে কাদার পরিমাণ বেড়ে গেলে মাছেদের জীবন বিপন্ন হতে পারে। পুকুরের তলায় গ্যাস তৈরি হলে মাছেদের শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হয়। মাছের রোগের কারণ ও প্রতিকার নিন্মরূপ:

  • লক্ষণ: জল দেখতে ঘোলাটে লাগে এবং মাছের ফুলকায় কাদা জমে মাছ খাবি খেয়ে মারা যায়।
  • কারণ: বৃষ্টির জল বা অন্য কারণে জলে কাদার অণুকণা বেশি থাকা।
  • চিকিৎসা: বিঘা প্রতি ৩০-৩৫ কেজি চুন প্রয়োগ করুন। জল পরিষ্কার করতে বিঘা প্রতি ৬৫০-৭০০ গ্রাম ফিটকিরি ৬০-৭০ লিটার জলে গুলে ছিটিয়ে দিন। এর ২-৩ দিন পর থেকে ২৫-৩০ কেজি পচানো গোবর ৫-৭ বার প্রয়োগ করতে হবে।

৩.৩. উদ্ভিদ কণা বা শ্যাওলার প্রাচুর্য বেড়ে যাওয়া

জলে শ্যাওলার পরিমাণ অতিরিক্ত হলে অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয়। মাছের রোগের কারণ ও প্রতিকার নিচে উল্লেখ করা হল :

  • লক্ষণ: পুকুরের জল গাঢ় সবুজ হয়ে যায় এবং জল থেকে পচা গন্ধ বের হয়।
  • কারণ: অত্যাধিক সার প্রয়োগ বা নোংরা জল পুকুরে ঢোকা।
  • চিকিৎসা: সঠিক পরিমাণে জৈব ও রাসায়নিক সার ব্যবহার করুন। বিঘা প্রতি ১৫-২০ কেজি চুন দিন। অক্সিজেনের মাত্রা বাড়াতে ২০০ লিটার জলে ১০০-১৫০ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম পারমাঙ্গানেট গুলে স্প্রে করুন।

৩.৪. রেণু ও ধানি পোনার পেটফোলা রোগ

ছোট পোনার ক্ষেত্রে এই সমস্যাটি বেশি দেখা যায়। মাছের রোগের কারণ ও প্রতিকার নিচে উল্লেখ করা হল :

  • লক্ষণ: রেণু ও ধানি মাছের পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলে থাকা।
  • কারণ: অত্যাধিক উদ্ভিদ কণার উৎপাদনে সালোক সংশ্লেষ মাধ্যমে জলে অক্সিজেনের পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাওয়া (অত্যাধিক উদ্ভিদ কণার সালোকসংশ্লেষণের কারণে)।
  • চিকিৎসা: সূর্যের আলো নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং প্রাণীকণা বাড়াতে কাঁচা গোবরের দ্রবণ জলের উপরিভাগে ছিটানো।

৪. সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব ও মাছের মড়ক

মাছের রোগের কারণ ও প্রতিকার অনেকাংশে চাষির ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে। মাছের রোগের কারণ ও প্রতিকার নিচে উল্লেখ করা হল :

  • প্রজাতি নির্বাচন: শুধু সাময়িক লাভের জন্য বিদেশী প্রজাতির মাছ চাষ না করে দেশী বড় জাতের মাছ চাষ করা উচিত।
  • সারের সঠিক ব্যবহার: রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈব সার ব্যবহার করলে জল ও মাটির গুণাগুণ বজায় থাকে।
  • নিরাপদ খাদ্য: বাজার চলতি খাদ্যের বদলে গ্রামীণ উপকরণ দিয়ে নিজেরা খাবার তৈরি করলে জলের পরিবেশ দূষিত হয় না।

৫. অপুষ্টি ও বংশগত কারণে মাছের রোগ

মাছ যদি সঠিক পুষ্টি না পায় তবে তার শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয় না।

  • অপুষ্টির প্রভাব: সঠিক সময়ে পরিমাণমতো সার ও বীজ পোনা মজুত না করলে এবং সুষম খাবারের জোগান না থাকলে মাছেদের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।
  • বংশগত সমস্যা: সুস্থ ও নিরোগ পোনা পেতে হলে প্রজননের কাজে সবল ও সঠিক ওজনের স্ত্রী ও পুরুষ মাছ (ব্রুড মাছ) ব্যবহার করা একান্ত জরুরি। এটি জন্মগত রোগ এড়ানোর একমাত্র উপায়।

কৃষি সুত্র পরামর্শ

সফল মাছ চাষের মূলমন্ত্র হলো—প্রতিরোধ প্রতিকারের চেয়ে শ্রেয়। নিয়মিত পুকুরের যত্ন, চুন প্রয়োগ এবং মাছের আচরণ পর্যবেক্ষণ করলে মাছের রোগের কারণ ও প্রতিকার খুব সহজেই করা সম্ভব। মাছ চাষ করতে গিয়ে সমস্যা লক্ষ্য করলে নিকটবর্তী ব্লক মৎস বিভাগে মৎস বিশেষজ্ঞের কাছে পরামর্শ নিন এবং সম্ভব হলে তাকে আপনার চাষ ক্ষেত্র পরিদর্শনে আমন্ত্রণ জানিয়ে আসুন । মৎস বিভাগে নিয়মিত যোগাযোগ রাখলে বিভিন্ন সরকারী সুবিধা পাওয়া যায় এবং চাষের জন্যে ঋণ পাওয়া যায় , তবে এর জন্যে মৎস ক্রেডিট কার্ড বানিয়ে নিবেন ।

আজকের এই পর্বে আমরা পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করলাম। পরবর্তী পর্বে আমরা জীবাণু ঘটিত (ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া) রোগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি । সঠিক ভাবে চাষ করতে গেলে এবং নতুন করে চাষ শুরু করতে গেলে অবশ্যই মাছের রোগ ও প্রতিকার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য গুলি দেখতে হবে এবং তার লিংক এখানে দিয়ে দেব ।

আড়ও দেখুন মাছের জীবাণুঘটিত রোগের প্রতিকার: মাছের ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া রোগের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন ১: মাছ কেন পুকুরে খাবি খায় বা ওপরের স্তরে ভেসে ওঠে?

উত্তর: মূলত জলে অক্সিজেনের অভাব হলে এবং তলায় বিষাক্ত গ্যাস জমলে মাছ খাবি খায়। এর সমাধানে বিঘা প্রতি ২০-২৫ কেজি চুন প্রয়োগ করা এবং বাঁশ দিয়ে জল পেটানো কার্যকর।

প্রশ্ন ২: পুকুরের জল ঘোলা হয়ে গেলে মাছের কী ক্ষতি হয়?

উত্তর: জল ঘোলাটে থাকলে মাছের ফুলকায় কাদা জমে শ্বাসকষ্ট হয়। এর ফলে মাছ খাবার গ্রহণ বন্ধ করে দেয় এবং অনেক সময় মারা যায়। বিঘা প্রতি ৬৫০-৭০০ গ্রাম ফিটকিরি দিয়ে জল পরিষ্কার করা সম্ভব।

প্রশ্ন ৩: মাছের পেট ফোলা রোগের প্রধান কারণ কী?

উত্তর: এটি মূলত রেণু ও ধানি পোনার ক্ষেত্রে বেশি হয়। জলে অত্যাধিক উদ্ভিদ কণা বা শ্যাওলা থাকলে সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় অক্সিজেনের মাত্রা বেড়ে যায়, যা ছোট পোনার পেটে গ্যাস তৈরি করে।

প্রশ্ন ৪: মাছ চাষে চুনের গুরুত্ব কী?

উত্তর: চুন জলের পিএইচ (pH) নিয়ন্ত্রণ করে, জল পরিষ্কার রাখে এবং ক্ষতিকারক জীবাণু ধ্বংস করে মাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

তথ্য সুত্র

মৎস বিভাগ পশ্চিমবঙ্গ সরকার মাছ।

মাছ চাষের পাশাপাশি নতুন আয়ের দিশা দেখতে দেখুন মাশরুম চাষ পদ্ধতি ও লাভ: জাত, রোগ দমন এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পূর্ণাঙ্গ গাইড ২০২৬

Spread the love

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top