আধুনিক মাছ মোটাতাজাকরণ পদ্ধতি: বিঘা প্রতি ২২ কুইন্টাল মাছ উৎপাদন

মাছ মোটাতাজাকরণ পদ্ধতি
আধুনিক মাছ মোটাতাজাকরণ পদ্ধতি-তে মাছ আহরণের দৃশ্য।

বর্তমান সময়ে খাদ্যের অপচয় রোধ করে কম খরচে বড় মাছ উৎপাদন করে বেশি দামে বিক্রি করে মাছ চাষে অধিক লাভের দিশা দেখাচ্ছেন মৎস্য গবেষকরা। মাছের সাইজ বড় করা বা মোটাতাজাকরণ করতে হলে কয়েকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। মৎস্য গবেষকদের মতে, মাছ মোটাতাজাকরণ পদ্ধতি-র এই নিয়মগুলি যথাযথভাবে পালন করলে কম খরচে অধিক লাভ আশা করা যায়।

ফিশ ফ্যাটেনিং বা মোটাতাজাকরণ করতে হলে যে বিষয়গুলি প্রথম জানা দরকার:

  • ১. পুকুর নির্বাচন
  • ২. পুকুর প্রস্তুতি
  • ৩. পুকুরে পোনা মজুত
  • ৪. পুকুরের যত্ন বা পরিচর্যা

নিচে মাছ মোটাতাজাকরণ পদ্ধতি বিষয়গুলি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

১. পুকুর নির্বাচন

সব পুকুর ফ্যাটেনিং বা বড় মাছ চাষের জন্য উপযুক্ত নয়। সঠিক পুকুর নির্বাচনের শর্তগুলি হলো:

  • জলের গভীরতা: যে সব পুকুরে সারা বছর ৪.৫ – ৬ ফুট জল থাকে সেগুলি নির্বাচন করুন। পুকুরের পাড় উঁচু হতে হবে যাতে বর্ষায় সহজে প্লাবিত না হয়।
  • মাটির গুণাগুণ: পুকুরের মাটি এঁটেল দোআঁশ এবং পাক বা কাদা কম হওয়া জরুরি।
  • আয়তন ও গঠন: পুকুর আয়তাকার ও আয়তনে ১ বিঘার থেকে বড় হওয়া ভালো। পুকুরের ঢাল ৬০ ডিগ্রি কোণে থাকলে এবং বর্ষায় ৮ থেকে ১০ ফুট জল থাকলে সেরা ফল পাওয়া যায়। পুকুরের আয়তন এক একরের বেশি হলে ভালো।
  • সূর্যালোক: পুকুরের জলে বিনা বাধায় যেন সূর্যালোক পড়তে পারে এমন ব্যবস্থা রাখা ভালো। তবে পাড়ে নারকেল বা সুপারি এই জাতীয় গাছ থাকলে অসুবিধে নেই।

আড়ও দেখুন গলদা চিংড়ি চাষের আধুনিক পদ্ধতি: চারা মজুত থেকে রোগ বালাই দমন

২. পুকুর প্রস্তুতি

বড় মাছের চাষ ব্যবস্থাপনায় পোনা মজুতের পূর্বে পুকুর প্রস্তুতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেক কৃষক বন্ধু এই ধাপগুলিতে ভুল করেন। সঠিক পদ্ধতিটি নিচে দেওয়া হলো:

ক. পুকুরে উপস্থিত অপ্রয়োজনীয় বস্তুর দমন

পুকুরের আগাছা পরিষ্কার করে ফেলতে হবে। তবে গ্রাসকার্পের খাদ্য হিসেবে কিছু আগাছা রাখা যেতে পারে।

  • পুকুরের পাড় মেরামত করতে হবে এবং যে কোনো খাল বা ছিদ্র বন্ধ রাখতে হবে। অতিরিক্ত জল বাইরে বের করার ব্যবস্থা রাখতে হবে কিন্তু সেটি দিয়ে যেন বাইরের জল ভেতরে প্রবেশ না করে সেই ব্যবস্থা রাখা জরুরি।
  • অবাঞ্ছিত মাছ নিধনের জন্য ২৫ পিপিএম (PPM) হারে ৩ ফুট জলের গভীরতায় প্রতি শতকে ৯ কেজি মহুয়া খৈল অথবা একই জলের গভীরতায় প্রতি শতকে তিনটি গ্যাস ট্যাবলেট দেওয়া যেতে পারে।

খ. চুন প্রয়োগ

মহুয়া খৈল বা গ্যাস ট্যাবলেট ব্যবহারের ৭ দিন পর ৩ ফুট জলের গভীরতায় প্রতি শতক জলে ১-১.৫ কেজি পাথরে চুন দিতে হবে। কাদা বেশি থাকলে প্রতি শতকে ২ কেজি চুন দিয়ে ঘেটে দিতে হবে। পুকুরে ৬ ফুট জল থাকলে প্রতি শতকে ৩-৪ কেজি চুন প্রয়োগ করতে হবে।

গ. জলে খাদ্য তৈরি (প্রাকৃতিক খাদ্য)

মাছ চাষের জন্য পুকুরে জৈব ও অজৈব খাদ্য মজুত করাই হল মাছ দ্রুত বড় করার উপায়। জলে মূলত দুই ধরণের খাদ্য তৈরি করা হয়:

১. গোবর বা কম্পোস্ট সার প্রয়োগ:

মহুয়া খৈল ব্যবহার করলে চুন দেওয়ার ৩ দিন পর প্রতি শতকে ১৫ কেজি গোবর বা কম্পোস্ট সার দিতে হবে। আর যদি মহুয়া খৈল ব্যবহার না করা হয়, তবে শতকে ৩০ কেজি গোবর বা কম্পোস্ট সার দিতে হবে। এটি পুকুরের তলায় মজুত হয়।

২. জু প্ল্যাঙ্কটন (প্রাণী কণা):

বড় মাছের চাষ ব্যবস্থাপনায় এটি হল জৈব খাদ্য যা প্রয়োগ করলে পুকুরের জল হালকা বাদামি রঙ ধারণ করে। এই খাদ্য তৈরির জন্য প্রতি শতকে ৬০০ গ্রাম কাঁচা গোবর এবং ১৫০ গ্রাম সরিষার খৈল একত্রে ৫ দিন পচিয়ে প্রয়োগ করতে হয়। এটি নিয়মিত মাসে একবার প্রয়োগ করা উচিত যাতে পর্যাপ্ত প্রাণী কণা তৈরি হয়।

৩. ফাইটো প্ল্যাঙ্কটন (উদ্ভিদ কণা):

বড় মাছের চাষ ব্যবস্থাপনায় এটি অজৈব উপাদান দিয়ে তৈরি জলজ প্রাকৃতিক খাদ্য। এটি প্রয়োগ করলে জল স্বচ্ছ সবুজ হয়। এটি মাছের খাদ্য হওয়ার পাশাপাশি সূর্যালোকে সালোকসংশ্লেষণ ঘটিয়ে পুকুরে অক্সিজেন তৈরি করে।

  • তৈরির নিয়ম: প্রতি শতকে DAP ১০০ গ্রাম ও ইউরিয়া ৫০ গ্রাম অথবা ফসফেট ১০০-১৫০ গ্রাম, ইউরিয়া ১০০-১৫০ গ্রাম ও ১০ গ্রাম পটাশ মিশিয়ে জলে গুলে ছড়িয়ে দিতে হবে।
  • বিশেষ সতর্কতা: DAP ও ফসফেট জলে গুলতে সময় লাগে, তাই প্রয়োগের ২-৩ ঘণ্টা আগে ভিজিয়ে নিতে হবে। প্রয়োগের ৩০ মিনিট আগে ইউরিয়া মিশিয়ে দিতে হবে। ৩-৪ দিন পর জলের রঙ পরিবর্তন হবে এবং ৭ দিন পর পুকুরটি পোনা ছাড়ার উপযুক্ত হবে।

৩. পুকুরে পোনা মজুত

কার্প ফ্যাটেনিং পদ্ধতিতে মাছ চাষ বা মাছের মোটাতাজাকরণের ক্ষেত্রে পোনার সংখ্যা এবং সঠিক প্রজাতি নির্ধারণই সাফল্যের চাবিকাঠি। এই পদ্ধতি গ্রহণ করার আগে কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বুঝে নেওয়া জরুরি:

ক. পুকুরের স্তর অনুযায়ী মাছ নির্বাচন

মাছ মোটাতাজাকরণ পদ্ধতি-তে মাছ ছাড়ার আগে জানতে হবে কোন মাছ পুকুরের কোন স্তরে বাস করে এবং কী আহার গ্রহণ করে। পুকুরে মূলত তিনটি স্তর থাকে:

  • উপরের স্তর: এই স্তরের মাছগুলোর নিচের ঠোঁট বড় এবং উপরের ঠোঁট ছোট হয়। যেমন— কাতল, সিলভার কার্প ও বিগহেড। এরা উপরের স্তরের খাবার খায়; যেমন সিলভার কার্প মূলত উদ্ভিদকণা খেয়ে বেঁচে থাকে।
  • মধ্যম স্তর: এদের দুটি ঠোঁটই প্রায় সমান হয়। যেমন— রুই, গ্রাস কার্প ও পুঁটি। রুই মূলত প্রাণীকণা খায়। গ্রাস কার্প তার দৈহিক ওজনের সমপরিমাণ ঘাস বা লতাপাতা (যেমন কলমি, হেলেঞ্চা) খেয়ে থাকে।
  • তলার স্তর: এদের উপরের ঠোঁট বড় এবং নিচের ঠোঁট ছোট হয়। যেমন— মৃগেল ও সারপ্রিনারস। এরা মূলত পুকুরের নিচে জমে থাকা খাবার এবং ছোট ছোট প্রাণী খেয়ে থাকে।

খ. পোনার সাইজ নির্ণয়

কার্প ফ্যাটেনিং পদ্ধতিতে মাছ চাষ প্রযুক্তিতে যত বড় সাইজের মাছ ছাড়া যাবে, উৎপাদন তত দ্রুত হবে।

  • বৃদ্ধির হার: একটি ১০০ গ্রাম ওজনের মাছ দৈনিক ৩% বৃদ্ধি পেলে মাসে বাড়ে ৯০ গ্রাম। কিন্তু ১ কেজি ওজনের মাছ দৈনিক ২% বৃদ্ধি পেলেও মাসে বাড়ে ৬০০ গ্রাম।
  • পরামর্শ: ফ্যাটেনিংয়ের জন্য প্রতি শতকে ৫০০ গ্রামের ঊর্ধ্বে থেকে ১-১.৫ কেজি ওজনের একই সাইজের পোনা ছাড়া উচিত। এতে অল্প খাবারেই মোট ওজনের বৃদ্ধি বেশি পাওয়া যায়।
  • পোনা শোধন: মাছ ছাড়ার আগে ১ লিটার জলে ১ এমএল পটাশিয়াম পারমেঙ্গানেট অথবা ২০ গ্রাম লবণ গুলে সেই জলে মাছগুলিকে স্নান করিয়ে নিতে হবে। এতে ক্ষত থেকে রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।

গ. শতকে পোনার সংখ্যা নির্ধারণ

পুকুরের একটি নির্দিষ্ট ধারণক্ষমতা থাকে। অতিরিক্ত মাছ ছাড়লে অক্সিজেন ব্যাহত হয় এবং কার্বন ডাই অক্সাইড বেড়ে গিয়ে মাছের বৃদ্ধি কমিয়ে দেয়। ফিশ ফ্যাটেনিং বা মাছ দ্রুত বড় করার উপায় অনুসরণ করলে প্রতি শতকে মাছের সংখ্যা হবে নিম্নরূপ:

  • উপরের স্তর: কাতলা (১টি), সিলভার কার্প (১টি), বিগহেড (১টি)।
  • মধ্যম স্তর: রুই (৩টি), গ্রাস কার্প (১টি)।
  • তলার স্তর: মৃগেল (৪টি), সারপ্রিনারস (১টি)।
  • মোট: প্রতি শতকে ১২টি (বিঘা প্রতি ৩৯৬টি)।

বিশেষ সতর্কবার্তা: আবেগের বশে বেশি সংখ্যায় বা ছোট পোনা ছাড়া যাবে না। মাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হলে কার্বন সোর্স হিসেবে চিটে গুড় (মোলাসেস) ব্যবহার করা যেতে পারে।

আড়ও দেখুন ধানী পোনা চাষ পদ্ধতি: আধুনিক লালন পুকুর ব্যবস্থাপনা ও প্রস্তুতির সম্পূর্ণ গাইড

ঘ. মাছের উৎপাদন ও আহরণ

কার্প ফ্যাটেনিং পদ্ধতিতে মাছ চাষ প্রক্রিয়া ১৫ থেকে ১৮ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়।

  • আংশিক আহরণ: যখন শতকে ১২টি মাছের মোট ওজন ৪০ কেজি হবে, তখন প্রথমবার যে মাছগুলোর বৃদ্ধি কম মনে হবে সেগুলো তুলে ফেলতে হবে।
  • দ্বিতীয় ও শেষ আহরণ: দ্বিতীয় দফায় শতকে ৮টি মাছ যখন ৪০ কেজি হবে তখন আহরণ করতে হবে। চূড়ান্ত পর্যায়ে বাকি মাছগুলো তুলে ফেলতে হবে।
  • হিসাব: সঠিকভাবে পালন করলে ১ বিঘা পুকুরে ১৮ মাসে মোট উৎপাদন ২২ কুইন্টাল-এর অধিক পাওয়া সম্ভব।

৪. পুকুরের যত্ন ও নিয়মিত পরিচর্যা

মাছ মোটাতাজাকরণ বা কার্প ফ্যাটেনিং পদ্ধতিতে মাছ চাষ প্রক্রিয়ায় সঠিক খাদ্য ব্যবস্থাপনা এবং জলজ পরিবেশ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। নিচে আপনার প্রাকটিক্যাল অভিজ্ঞতার আলোকে পরিচর্যার ধাপগুলি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

ক. খাদ্য প্রয়োগ ও সঠিক মাত্রা

হাতে তৈরি খাদ্য দিলে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে দু’বেলা পুকুরে খাদ্য দিতে হবে। মাছের ওজন অনুযায়ী খাদ্যের পরিমাপ হবে নিম্নরূপ:

  • ৫০০ গ্রাম থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের মাছ: মোট দৈহিক ওজনের ১.৫% থেকে ২% হারে খাদ্য দিতে হবে।
  • ৮০০ গ্রামের বেশি ওজনের মাছ: দৈহিক ওজনের মাত্র ১% হারে খাদ্য দিতে হবে।
  • উদাহরণ: যদি পুকুরে মোট ১০০ কেজি মাছ থাকে, তবে ১% হিসাবে ১ কেজি খাদ্য দুই বেলা ভাগ করে দিতে হবে।

খ. খাদ্য তৈরির উপাদান ও পদ্ধতি

  • উপাদান: সরিষার খৈল এবং রাইস ব্রান (না পেলে চালের কুঁড়ো) ১:১ অনুপাতে মিশিয়ে দিতে হবে। এর সাথে মোট খাদ্যের ০.০২৫% হারে লবণ (১০ কেজিতে ১০০ গ্রাম) এবং ডি.ও.আর.বি (DORB) যুক্ত করতে হবে।
  • বিকল্প উপাদান: সরিষার খৈল, রাইস ব্রান, খেসারি ভুষি, শুটকি মাছের গুঁড়ো এবং গমের ভুষি সমপরিমাণে (১:১:১:১:১) মিশিয়েও ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • প্রয়োগ কৌশল: প্রথম এক মাস সবকিছু ভালো করে গুঁড়ো করে ছেঁকে পুকুরে ছড়িয়ে দিন। এক মাস পর থেকে সরিষার খৈল আগের দিন ভিজিয়ে রেখে পরদিন অন্যান্য উপাদানের সাথে মিশিয়ে বড় বড় বল তৈরি করুন। এই বলগুলি বাসের বা প্লাস্টিকের ঝুড়িতে রেখে জলের নিচে নির্দিষ্ট স্থানে বসিয়ে দিন।

গ. গ্রাসকার্পের বিশেষ যত্ন

বড় মাছের চাষ ব্যবস্থাপনায় গ্রাসকার্প মাছের জন্য তার দৈহিক ওজনের সমপরিমাণ উদ্ভিদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে। ১ কেজি ওজনের মাছের জন্য দৈনিক ১ কেজি ঘাস, এজোলা বা কুটিপানা দিতে হবে। এছাড়া পুকুরের পাড়ে কলমি ও হেলেঞ্চা শাকের উপস্থিতি রাখা জরুরি।

ঘ. মাসিক পরিচর্যা ও জল শোধন

মাছ মোটাতাজাকরণ পদ্ধতি-তে পুকুরের পরিবেশ ভালো রাখতে প্রতি মাসে নিচের ধাপগুলি অনুসরণ করুন: জলের গভীরতা ৩ ফুট হিসাবে নিচের পরিমাণ বলা হয়েছে এবং ৬ ফুট হলে দীগুণ হবে।

  • চুন প্রয়োগ: প্রতি মাসে শতক প্রতি ২০০ গ্রাম (বিঘায় ৬.৫ কেজি) চুন ২৪ ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে সকাল ১০টার পর রৌদ্রোজ্জ্বল আকাশে প্রয়োগ করুন।
  • লবণ প্রয়োগ: প্রতি মাসে শতক প্রতি ১০০ গ্রাম (বিঘায় ৩.৩ কেজি) লবণ জলে ১ ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে সমস্ত পুকুরে ছড়িয়ে দিন। এটি মাছের ফুলকা পরিষ্কার রাখে এবং রোগ প্রতিরোধ করে।
  • মোলাসেস বা চিটে গুড়: প্রতি মাসে শতকে ৫০ গ্রাম চিটে গুড় জলে গুলে প্রয়োগ করলে জল ভালো থাকে।

আড়ও দেখুন মাছের রোগ ও প্রতিকার পদ্ধতি: ১৫টি প্রধান রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা

ঙ. প্রাকৃতিক খাদ্য বজায় রাখার চার্ট (জৈব ও অজৈব সার)

জলের বাদামি বা সবুজ রঙ বজায় রাখতে চুন-লবণ দেওয়ার ৩ দিন পর মাসে একবার সার প্রয়োগ করুন জলের গভীরতা ৩ ফুট হিসেবে:

  • ১. জৈব ও অজৈব মিশ্রণ: প্রতি শতকে ৬.৫০ গ্রাম গোবর ও ১.৫০ গ্রাম সরিষার খৈল ৫ দিন পচিয়ে রাখুন। প্রয়োগের ২ ঘণ্টা আগে ১.৫০ গ্রাম ডিএপি (DAP) ভিজিয়ে নিয়ে একত্রে মিশিয়ে সকাল ১০টার পর রোদ থাকলে ছিটিয়ে দিন।
  • ২. শুকনো গোবর: সার প্রয়োগের ১৫ দিন অন্তর প্রতি শতকে ৪ কেজি শুকনো গোবর প্রয়োগ করুন। এই সময়ে জাল টানা উচিত, এতে মাছ সুস্থ থাকে।

চ. বিশেষ পরিস্থিতিতে করণীয়

মাছ মোটাতাজাকরণ পদ্ধতি-তে পুকুরে মাছের গ্রোথ বাড়ানোর টিপস ।

  • জল সবুজ না হলে: প্রতি শতকে ৭৫ গ্রাম আটা এবং ৪ গ্রাম ইউরিয়া জলে আধা ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে প্রয়োগ করুন।
  • জু-প্ল্যাঙ্কটন (বাদামি জল) তৈরি না হলে: প্রতি শতকে ২০০ গ্রাম রাইস ব্রান, ২০ গ্রাম চিটে গুড় এবং ১ গ্রাম ইস্ট একত্রে ২৪ ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে ছিটিয়ে দিন।
  • বিকল্প পদ্ধতি: প্রতি শতকে ৪০০ গ্রাম (বিঘায় ১৩ কেজি) ধানের খড় পুকুরের সাইডে ভিজিয়ে রাখলে ৪ ঘণ্টা পর থেকে নির্যাস তৈরি হয় যা প্রাকৃতিক খাদ্য বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
  • বাজারজাতকরণ টিপস: মাছ আহরণের পর গাড়িতে জল নিয়ে তাজা অবস্থায় বাজারে উপস্থিত করলে অনেক বেশি দাম পাওয়া যায়।

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর (FAQ)

প্রশ্ন ১: কার্প ফ্যাটেনিং বা মাছ মোটাতাজাকরণ কি?

উত্তর: কার্প ফ্যাটেনিং পদ্ধতিতে মাছ চাষ হলো একটি বিশেষ বাণিজ্যিক পদ্ধতি যেখানে বড় সাইজের (৫০০ গ্রাম থেকে ১.৫ কেজি) কার্প জাতীয় মাছকে (রুই, কাতলা, মৃগেল) পুকুরে নির্দিষ্ট ঘনত্বে ছেড়ে এবং উচ্চ পুষ্টিমান সম্পন্ন খাবার ও সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে খুব দ্রুত কয়েক গুণ বেশি ওজন বৃদ্ধি করা হয়।

প্রশ্ন ২: মাছ মোটাতাজাকরণে ১ কেজি পোনা থেকে কত বড় মাছ করা সম্ভব?

উত্তর: মাছ মোটাতাজাকরণ পদ্ধতি-তে সঠিক স্তরায়ন এবং উন্নত মানের খাবার নিশ্চিত করতে পারলে ১৮ মাসের মধ্যে ১ কেজি ওজনের পোনা থেকে ১৫ থেকে ৩০ কেজি বা তারও বেশি ওজনের মাছ উৎপাদন করা সম্ভব। এটি মূলত নির্ভর করে মাছের প্রজাতি এবং পুকুরের ধারণক্ষমতার ওপর।

প্রশ্ন ৩: মাছ দ্রুত বড় করার জন্য প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরির সঠিক নিয়ম কি?

উত্তর: মাছ দ্রুত বড় করার উপায় হিসেবে পুকুরে জু-প্ল্যাঙ্কটন ও ফাইটো-প্ল্যাঙ্কটন থাকা জরুরি। প্রতি শতকে ৬০০ গ্রাম কাঁচা গোবর ও ১৫০ গ্রাম সরিষার খৈল ৫ দিন পচিয়ে প্রয়োগ করলে জু-প্ল্যাঙ্কটন তৈরি হয়। এছাড়া ডিএপি (DAP) ও ইউরিয়া সার সঠিক অনুপাতে ব্যবহার করলে জলের প্রাকৃতিক খাদ্য বজায় থাকে।

তথ্য সূত্র

  • মৎস বিভাগ পশ্চিমবঙ্গ সরকার।
  • কাজী আবেদ লতীফ – উপজেলা মৎস বিভাগ প্রাক্তন আধিকারিক, বাংলাদেশ মৎস বিভাগ
Spread the love

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top