মাছের khoto Rog ও Ukuner প্রতিকার: ভাইরাস ও কবচী প্রাণী দমনের সেরা উপায়

মাছের ক্ষত রোগ উকুনের প্রতিকার
মাছের ক্ষত রোগে আক্রান্ত মাছের দৃশ্য দেখাচ্ছেন মৎস চাষী।

মাছ চাষে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হলো রোগ দমনে সঠিক পদক্ষেপ। আজকের এই নিবন্ধে আমরা মাছের ক্ষত রোগ ও উকুনের প্রতিকার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। অনেক সময় চাষিরা প্রাথমিক লক্ষণগুলো বুঝতে পারেন না, যার ফলে পুরো পুকুরের মাছ মারা যায়। তাই মাছের ক্ষত রোগ ও উকুনের প্রতিকার সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান রাখা আপনার ব্যবসার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

১. মাছের উকুন বা আরগুলোসিস এবং মাছের ক্ষত রোগ ও উকুনের প্রতিকার

মাছের উকুন হলো এক ধরণের সন্ধিপদ বা কবচী প্রাণী যা মাছের দেহ থেকে রক্ত শোষণ করে মাছকে নিস্তেজ করে দেয়। মূলত রুই, কাতলা ও মৃগেল মাছে এই আক্রমণ বেশি দেখা যায়।

ক) মাছের উকুনের লক্ষণ ও চেনার উপায়

  • শারীরিক পরিবর্তন: আরগুলাস বা মাছের উকুন খালি চোখে দেখা যায়। এরা মাছের ফুলকা, পাখনা ও গায়ে আটকে থেকে রক্ত শোষণ করে। এর ফলে মাছের আঁশ আলগা হয়ে যায় এবং আক্রান্ত স্থানে লালচে ক্ষত দেখা দেয়।
  • আচরণগত পরিবর্তন: মাছ ছটফট করতে থাকে এবং যন্ত্রণায় পুকুরের কিনারায় বা শক্ত বস্তুতে গা ঘষতে থাকে। ধীরে ধীরে মাছের রং ফ্যাকাশে হয়ে যায় এবং দেহ লম্বাটে দেখায়।

খ) সংক্রমণের কারণ

Argulus sp. (স্বচ্ছ কাঁচ টিপের মতো), Larnaea sp. (সুতোর মতো), এবং Ergasilus sp. নামক পরজীবীর কারণে এটি হয়। সাধারণত দূষিত জলজ পরিবেশ এবং অতিরিক্ত পরিপূরক খাদ্য ব্যবহারের ফলে এই পরজীবীর উৎপত্তি ঘটে।

গ) মাছের উকুন বা আরগুলোসিস প্রতিরোধের উপায়

  • জলাশয়ে কোনো অতিরিক্ত জলজ উদ্ভিদ বা শ্যাওলা রাখা যাবে না।
  • জৈব সার ও পরিপূরক খাদ্য যেন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখুন।
  • সময়মতো এবং নিয়মিত চুন প্রয়োগ করে জলের ক্ষারত্ব বজায় রাখা।

ঘ) উকুনের কার্যকরী চিকিৎসা ও ঔষধ

  • লবণ জল: প্রাথমিক অবস্থায় প্রতি লিটার জলে ৩০ গ্রাম সাধারণ লবণ মিশিয়ে আক্রান্ত মাছকে ৫-৬ মিনিট ডুবিয়ে রাখুন। এটি টানা ২-৩ দিন করতে হবে।
  • গ্যামাকসিন প্রয়োগ: লিটার প্রতি ০.৫ মিলিগ্রাম হিসাবে সপ্তাহে ২-৩ বার প্রয়োগ করুন। অর্থাৎ বিঘা প্রতি (১ মিটার গভীরতায়) ৬৭০ গ্রাম গ্যামাকসিন দিতে হবে।
  • নুভান (Nuvan) এর ব্যবহার: এটি মাছের উকুনের মহৌষধ। বিঘা প্রতি ৮-১০ মিলিলিটার নুভান প্রয়োগ করুন। মনে রাখবেন, নুভান উকুনের ডিম মারে না। তাই প্রথম প্রয়োগের ৪ দিন পর (যখন ডিম ফুটে বাচ্চা বের হবে) আবার একই মাত্রায় দ্বিতীয় বার নুভান প্রয়োগ করলে পুকুর সম্পূর্ণ উকুনমুক্ত হবে।

আড়ও দেখুন মাছের রোগের কারণ ও প্রতিকার: আধুনিক মাছ চাষের পূর্ণাঙ্গ গাইড

২. মাছের ক্ষত রোগ বা ভাইরাস ঘটিত মহামারীর প্রতিকার

পশ্চিমবঙ্গে মহামারী ক্ষত রোগ (EUS) মাছ চাষিদের কাছে এক আতঙ্কের নাম। বিশেষ করে শীতের শুরুতে যখন পুকুরের জল কমে যায়, তখন মাছের ক্ষত রোগ নিয়ে সবথেকে বেশি সচেতন থাকতে হয়।

ক) ক্ষত রোগের কারণ ও ইতিহাস

১৯৮৮ সালে ভারতে এই রোগ মহামারী আকার ধারণ করে। সাধারণত বর্ষার শেষে এবং শীতের শুরুতে এই রোগ বেশি দেখা যায়। চাষের জমির কীটনাশক ধোয়া জল পুকুরে ঢুকলে মাছেদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক একত্রে আক্রমণ করে এই ক্ষত সৃষ্টি করে।

খ) মাছের ক্ষত রোগের লক্ষণ

মাছের গায়ে বিশেষ করে লেজের দিকে লাল গোলাকার ছোপ ছোপ দাগ দেখা যায়। ক্রমে মাংসপেশী খসে পড়ে বড় বড় ক্ষত তৈরি হয়। আক্রান্ত মাছ জলের মধ্যে অস্বাভাবিকভাবে ছোটাছুটি করে।

গ) মাছের ক্ষত রোগ প্রতিরোধের উপায়

  • বর্ষার সময় খেত-খামারের কীটনাশকযুক্ত জল যেন পুকুরে না ঢোকে সেজন্য পুকুরের পাড় উঁচু করতে হবে।
  • পুকুরের গভীরতা বজায় রাখা এবং অতিরিক্ত পাঁক সময়মতো তুলে ফেলা।
  • প্রতি মাসে একবার বিঘা প্রতি ৬-৮ কেজি চুন দিয়ে তলার মাটি ঘেঁটে দেওয়া। মাছের সঠিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে এবং মড়ক রুখতে মাছের ক্ষত রোগ ও উকুনের প্রতিকার অপরিহার্য।

ঘ) মাছের ক্ষত রোগের ধাপভিত্তিক চিকিৎসা (step-by-step)

মাছের ক্ষত রোগ এর প্রতিকারকরতে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:

প্রাথমিক ধাপ: ১ মিটার গভীরতাযুক্ত জলে বিঘা প্রতি ১২-১৩ গ্রাম মিথিলিন ব্লু প্রতি সপ্তাহে একবার করে দিতে হবে। প্রাথমিক অবস্থায় পুকুরে মিথিলিন ব্লু প্রয়োগ করা মাছের ক্ষত রোগ ও উকুনের প্রতিকার এর প্রথম ধাপ ।

স্নান পদ্ধতি: আক্রান্ত মাছকে ১০ লিটার জলে ৫০ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট এবং ৫০০ গ্রাম লবণ মিশ্রিত জলে ডুবিয়ে পুকুরে ছাড়ুন।

পটাশ প্রয়োগ: চুন দেওয়ার একদিন পর ১.৩ কেজি পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট (বিঘা প্রতি ১ মিটার গভীরতায়) প্রয়োগ করুন।

ঔষধ প্রয়োগ (ড্যাপসন): ১০০ মিলিগ্রাম ড্যাপসন প্রতি কেজি খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে টানা ১৪ দিন খাওয়ান। এটি ক্ষত রোগের জন্য অত্যন্ত কার্যকর।

ভেষজ চিকিৎসা: বিঘা প্রতি ১৬ কেজি চুন (ঠাণ্ডা করা) এবং ১ কেজি ৬০০ গ্রাম কাঁচা হলুদের রস মিশিয়ে ছিটিয়ে দিন। ১০-১২ দিন পর পুনরায় প্রয়োগ করুন। চুনের সাথে কাঁচা হলুদের রস মিশিয়ে প্রয়োগ করলে ক্ষত দ্রুত শুকায়, যা মাছের ক্ষত রোগ ও উকুনের প্রতিকার করার একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ভেষজ পদ্ধতি ।

ফিটকিরির ব্যবহার: বিঘা প্রতি ৬৫০-৭০০ গ্রাম ফিটকিরি ব্যবহার করা যায়, তবে এর ফলে প্রাকৃতিক খাদ্য কমে গেলে পুনরায় জৈব সার দিয়ে খাদ্য উৎপাদন করতে হবে।

CIFAX এর ব্যবহার: ভারতীয় কৃষি অনুসন্ধান সংস্থা (ICAR) উদ্ভাবিত CIFAX ঔষধটি মাছের ক্ষত রোগে জাদুর মতো কাজ করে। বিঘা প্রতি ১৩০ মিলিলিটার সিফ্যাক্স ১৫ লিটার জলে গুলে পুকুরে ছিটিয়ে দিন।

৩. মাছ চাষিদের জন্য বিশেষ সতর্কতা

মাছের ক্ষত রোগ ও উকুনের প্রতিকার করার সময় মনে রাখবেন:

  • কোনো একটি ঔষধ প্রয়োগ করার পর ফলাফল পর্যবেক্ষণ করুন। কাজ হলে অন্য ঔষধ ব্যবহারের প্রয়োজন নেই।
  • পুকুরে ছাই প্রয়োগ (বিঘা প্রতি ৫০-৫৫ কেজি) অনেক সময় পিএইচ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং ক্ষত সারাতে ভূমিকা রাখে।
  • চুন ও ফিটকিরি ব্যবহারের সময় অবশ্যই মাত্রার দিকে খেয়াল রাখবেন।

উপসংহার

মাছ চাষে রোগের প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম।পুকুর পরিষ্কার রাখা এবং নিয়মমাফিক চুন ও সার প্রয়োগ করলেই আপনি মাছের ক্ষত রোগ ও উকুনের প্রতিকার করতে পারবেন। নিয়মিত আপনার মৎস্য খামার পর্যবেক্ষণ করুন এবং কোনো লক্ষণ দেখা দিলেই আমাদের দেওয়া পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করুন।

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)

প্রশ্ন: মাছের উকুনের জন্য নুভান (Nuvan) কতবার প্রয়োগ করতে হয়?

উত্তর: নুভান প্রয়োগ করলে মাছের প্রাপ্তবয়স্ক উকুন মারা গেলেও তাদের ডিম নষ্ট হয় না। তাই প্রথমবার প্রয়োগের ঠিক ৪-৫ দিন পর (যখন ডিম ফুটে নতুন বাচ্চা বের হবে) আবার একই মাত্রায় দ্বিতীয় বার নুভান প্রয়োগ করতে হয়। এতে পুকুর সম্পূর্ণ উকুনমুক্ত হয়।

প্রশ্ন ২: মাছের ক্ষত রোগের (EUS) সবথেকে কার্যকরী ঔষধ কোনটি?

উত্তর: মাছের ক্ষত রোগের চিকিৎসায় সবথেকে আধুনিক ও সফল ঔষধ হলো CIFAX (সিফ্যাক্স)। এছাড়া খাবারের সাথে ড্যাপসন (Dapsone) ট্যাবলেট এবং পুকুরে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট প্রয়োগ করলে দ্রুত সুফল পাওয়া যায়।

প্রশ্ন: শীতের শুরুতে কেন মাছের ক্ষত রোগ বেশি দেখা যায়?

উত্তর: শীতের শুরুতে পুকুরের জল কমে যায় এবং দূষণ ঘনীভূত হয়। এছাড়া চাষের জমির কীটনাশক ধোয়া জল পুকুরে মিশলে মাছেদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। এই প্রতিকূল পরিবেশে ছত্রাক ও ভাইরাস সম্মিলিতভাবে আক্রমণ করে ক্ষত সৃষ্টি করে।

প্রশ্ন: মাছের ক্ষত নিরাময়ে কাঁচা হলুদের ভূমিকা কী?

উত্তর: কাঁচা হলুদ একটি প্রাকৃতিক অ্যান্টিসেপটিক। চুনের সাথে কাঁচা হলুদের রস মিশিয়ে পুকুরে প্রয়োগ করলে মাছের শরীরের ঘা দ্রুত শুকায় এবং নতুন কোনো ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধ হয়।

প্রশ্ন: পুকুরে চুন ও ফিটকিরি একসাথে ব্যবহার করা কি ঠিক?

উত্তর: না, চুন এবং ফিটকিরি ব্যবহারের মধ্যে অন্তত ৭-১০ দিনের ব্যবধান রাখা উচিত। চুন প্রয়োগের পর জলের পিএইচ (pH) স্থিতিশীল হলে তবেই প্রয়োজনবোধে ফিটকিরি ব্যবহার করা নিরাপদ।

তথ্য সুত্র

মৎস বিভাগ ,পশ্চিমবঙ্গ সরকার

Spread the love

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top