মাছের পরজীবী ও কৃমিঘটিত রোগের প্রতিকার: সাদা দাগ ও মাথা ঘোরা রোগের সমাধান

মাছের পরজীবী ও কৃমিঘটিত রোগের প্রতিকার এবং সাদা দাগ রোগের চিকিৎসা।
মাছের পরজীবী ও কৃমিঘটিত রোগের প্রতিকার এবং সাদা দাগ রোগের চিকিৎসা।

মাছ চাষের ধারাবাহিকতায় আমরা ইতোমধ্যে পরিবেশ ও জীবাণুঘটিত রোগ নিয়ে আলোচনা করেছি। তবে মাছ চাষে আর এক বড় আপদ হলো অদৃশ্য আদ্যপ্রাণী বা প্রোটোজোয়া এবং বিভিন্ন প্রজাতির কৃমি। এই পরজীবীরা মাছের রক্ত শোষণ করে মাছকে নিস্তেজ করে দেয়। আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা মাছের মাথা ঘোরা ও কৃমি রোগের চিকিৎসা: ১ দিনেই পরজীবী দমনের মোক্ষম দাওয়াই! মাছের মড়ক ঠেকানোর সিক্রেট গাইড নিয়ে সবথেকে কার্যকর তথ্যগুলো তুলে ধরব। আপনার পুকুরের মাছকে সাদা দাগ, মাথা ঘোরা বা জোঁকের হাত থেকে বাঁচাতে এই গাইডটি শেষ পর্যন্ত পড়ুন।

১. আদ্যপ্ৰাণী বা প্রোটোজোয়াঘটিত মাছের রোগ ও প্রতিকার

আদ্যপ্রাণী বা প্রোটোজোয়া ঘটিত আক্রমণের ফলে মাছের ফুলকা পচা, সাদা দাগ বা হোয়াইট স্পট, সাদাগুটি এবং মাথা ঘোরা—এই ৪টি প্রধান লক্ষণ দেখা দেয়। মাছের পরজীবী ও কৃমিঘটিত রোগের প্রতিকার হিসেবে নিচে বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:

ক) মাছের ফুলকো পচা রোগ (Gillrot) ও চিকিৎসা

এটি Trichodina indica নামক এক ধরণের আদ্যকোষী প্রাণীর আক্রমণে হয়। মূলত পুকুরের জল অতিরিক্ত দূষিত হলে এই জীবাণু দ্রুত বংশবিস্তার করে। মাছের পরজীবী ও কৃমিঘটিত রোগের প্রতিকার করতে নিচের লক্ষণগুলো খেয়াল করুন:

  • লক্ষণ: আক্রান্ত মাছের ফুলকা থেকে প্রচুর পরিমাণে লালা বা রস নির্গত হয়। মাছের চরম শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় এবং মাছ জলের ওপর অলসভাবে ভাসতে থাকে। ধীরে ধীরে মাছের ওজন কমে যায় এবং মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ে। এরা অনেক সময় মাছের চামড়াতেও আক্রমণ করে।
  • প্রতিরোধ ব্যবস্থা: পুকুরের অতিরিক্ত পাঁক সময়মতো তুলে ফেলা। নিয়মিত প্রতি মাসে বিঘা প্রতি ৬-৮ কেজি চুন প্রয়োগ করা এবং দূষিত জল পুকুরে ঢোকা বন্ধ করা। মাছের প্রাকৃতিক খাবার বাড়াতে নিয়ম মেনে জৈব সার প্রয়োগ করুন।
  • চিকিৎসা: ২-৩% লবণ জলের দ্রবণে আক্রান্ত মাছকে ১-২ মিনিট স্নান করান। এছাড়া পুকুরে বা জলাশয়ে লিটার প্রতি ১-২ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম পারমাঙ্গানেট ব্যবহার করা মাছের পরজীবী ও কৃমিঘটিত রোগের প্রতিকার হিসেবে অত্যন্ত কার্যকর।

আড়ও দেখুন মাছের রোগের কারণ ও প্রতিকার: আধুনিক মাছ চাষের পূর্ণাঙ্গ গাইড

খ) মাছের সাদা দাগ বা হোয়াইট স্পট রোগ (White spot)

এটি মূলত রেণু বা বীজ পোনার ক্ষেত্রে একটি ভয়াবহ রোগ। Ichthyophthirius multifiliis নামক আদ্যকোষীর আক্রমণে এই রোগ হয়।

  • লক্ষণ: মাছের গায়ের উজ্জ্বলতা কমে যায় এবং পাখনা ও ফুলকায় আলপিনের ডগার মতো ছোট ছোট সাদা দাগ দেখা দেয়। আক্রান্ত স্থান থেকে রস বের হয়।
  • প্রতিকার: পুকুরের পরিবেশ স্বাস্থ্যকর রাখা এবং চুন প্রয়োগ করা। প্রাকৃতিক খাদ্যের জোগান সঠিক রাখা মাছের পরজীবী ও কৃমিঘটিত রোগের প্রতিকার এর মূল ধাপ।
  • চিকিৎসা: ২-৩% লবণ জলের দ্রবণে আক্রান্ত মাছকে ১-২ মিনিট স্নান করান (টানা ৬-৭ দিন)। এছাড়া লিটার প্রতি ০.০৫-০.১০ মিলিগ্রাম মেলাকাইট গ্রীণ দ্রবণে ৩-৪ মিনিট মাছকে ডুবিয়ে রাখা যেতে পারে। ৫ লিটার জলে ১ মিলিলিটার ফরমালিন মিশিয়ে ১০-১৫ মিনিট ডোবালে দ্রুত উপকার হয়।

গ) মাছের সাদা গুটি বা বসন্ত রোগ (Mixosporidiosis)

এটি মূলত বর্ষার শেষে দেখা দেয় এবং কাতলা মাছ এই রোগে সবথেকে বেশি আক্রান্ত হয়।

  • লক্ষণ: মাছের দেহ ও ফুলকাতে আলপিনের মাথার মতো সাদা সাদা গুটি দেখা যায়। মাছের আঁশ আলগা হয়ে খসে পড়ে এবং চরম শ্বাসকষ্টের কারণে মাছ খাবি খেয়ে মারা যায়।
  • চিকিৎসা: প্রতি লিটার জলে ২০ গ্রাম সাধারণ লবণ মিশিয়ে ৫ মিনিট মাছকে ডুবিয়ে রাখতে হবে। ৫ লিটার জলে ১ মিলিলিটার ফরমালিন মিশ্রিত দ্রবণে ১০-১৫ মিনিট স্নান করানো মাছের পরজীবী ও কৃমিঘটিত রোগের প্রতিকার এর একটি প্রমাণিত পদ্ধতি।

ঘ) মাছের মাথা ঘোরা রোগ (Whirling disease)

Myxosoma cerebralis নামক আদ্যপ্রাণীর আক্রমণে মাছের মেরুদণ্ডের বিকৃতি ঘটে এবং মাছ ভারসাম্য হারায়।

  • লক্ষণ: মাছ জলের উপরিভাগে অস্বাভাবিকভাবে গোল হয়ে ঘুরপাক খেতে থাকে এবং হঠাৎ করে তলিয়ে গিয়ে মারা যায়। মাছ খুব বেশি লেজ নাড়ায়।
  • প্রতিরোধ: বিঘা প্রতি ৭-৮ কেজি চুন প্রয়োগ করুন এবং পুকুরের তলার মাটি মাঝে মাঝে ঘেঁটে দিন।
  • চিকিৎসা: এটি একটি অত্যন্ত জটিল রোগ, যার কোনো কার্যকর চিকিৎসা এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। তাই প্রতিরোধই একমাত্র উপায়।

২ . মাছের কৃমিঘটিত রোগ এবং এর আধুনিক প্রতিকার

কৃমিঘটিত রোগ মাছ চাষিদের জন্য এক নীরব ঘাতক। মূলত চ্যাপ্টা কৃমি ও জোঁকের আক্রমণে মাছের ব্যাপক ক্ষতি হয়। মাছের পরজীবী ও কৃমিঘটিত রোগের প্রতিকার নিয়ে নিচে আলোচনা করা হলো:

ক) গাইরোড্যাটাইলোসিস ও ড্যাকটাইলোগাইরাস কৃমি আক্রমণ

ক্ষুদ্র চ্যাপ্টা কৃমিরা হুকের সাহায্যে মাছের ফুলকা ও দেহে আটকে থাকে এবং নিয়মিত রক্ত শোষণ করে।

  • লক্ষণ: বর্ষাকালে এই রোগ বেশি ছড়ায়। কৃমির কামড়ে মাছের দেহে জ্বালা অনুভূত হয়, ফলে মাছ ছটফট করে এবং দেহ থেকে প্রচুর শ্লেষ্মা নির্গত হয়। ছোট পোনা মাছ এই কৃমির কারণে সবথেকে বেশি মারা যায়।
  • প্রতিরোধ: পুকুরে রোদ ঢোকার ব্যবস্থা করতে পাড়ের গাছের ডাল ছেঁটে দিন। তিন মাস অন্তর চুন প্রয়োগ এবং তলদেশের পাঁক পরিষ্কার রাখা জরুরি। পুকুরে আধফালি বাঁশ পুঁতে দিন যাতে মাছ সেখানে গা ঘষতে পারে।
  • চিকিৎসা: প্রতি লিটার জলে ৩০ গ্রাম সাধারণ লবণ মিশিয়ে আক্রান্ত মাছকে ৫-৬ মিনিট করে টানা ২-৩ দিন স্নান করান। এছাড়া ১০০ লিটার জলে ২৫ মিলিলিটার ফরমালিন মিশিয়ে ১০-১৫ মিনিট ডুবিয়ে রাখলে মাছের পরজীবী ও কৃমিঘটিত রোগের প্রতিকার করা সম্ভব।

আড়ও দেখুন মাছের khoto Rog ও Ukuner প্রতিকার: ভাইরাস ও কবচী প্রাণী দমনের সেরা উপায়

খ) মাছের জোঁক (Fish leech) ও এর প্রতিকার

Hemicilepsis piscicola নামক জলজ জোঁক মাছের দেহের নরম অংশ থেকে রক্ত পান করে।

  • লক্ষণ: মাছের দেহে রক্তের ছোপ দাগ দেখা যায়। জোঁক সাধারণত চোখ ও মলদ্বারের মাংসল অংশে লেগে থাকে। যন্ত্রণায় মাছ জলে এলোপাথারি দৌড়াতে থাকে এবং ঘায়ের জায়গায় পরে ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাকের আক্রমণ ঘটে।
  • প্রতিরোধ: সময়মতো পাঁক তোলা এবং চুন প্রয়োগ। পুকুরে বাঁশের ফালি রাখা যাতে মাছ গা ঘষে জোঁক ছাড়াতে পারে।
  • চিকিৎসা: ২-৩% লবণের জলীয় দ্রবণে আক্রান্ত মাছকে ৩-৪ মিনিট ধরে স্নান করানো মাছের পরজীবী ও কৃমিঘটিত রোগের প্রতিকার করার সবথেকে সহজ উপায়।

উপসংহার

পুকুরের স্বাস্থ্য এবং মাছেদের আচরণ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করলে মাছের পরজীবী ও কৃমিঘটিত রোগের প্রতিকার করা খুবই সহজ। মনে রাখবেন, পরিষ্কার জল এবং তলার কাদা মুক্ত পরিবেশই মাছকে অধিকাংশ পরজীবী থেকে রক্ষা করে।

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

১. পুকুরে মাছের সাদা দাগ দেখলে কি ঔষধ প্রয়োগ করা উচিত?

উত্তর: সাদা দাগ বা হোয়াইট স্পট রোগের চিকিৎসায় লবণ জল এবং ফরমালিনের মিশ্রণ সবথেকে ভালো কাজ করে। তবে ডোজের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।

২. মাছ কেন পুকুরে গোল হয়ে মাথা ঘোরে?

উত্তর: এটি মূলত আদ্যপ্রাণী বা প্রোটোজোয়ার আক্রমণে মেরুদণ্ডের ক্ষতি হওয়ার কারণে হয়। একে ‘Whirling disease’ বলে। এর সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা না থাকায় পুকুর প্রস্তুতিতে চুন ব্যবহার করা জরুরি।

৩. মাছের গায়ে জোঁক লাগলে কি মাছ মারা যায়?

উত্তর: সরাসরি জোঁকের কারণে মাছ না মরলেও, জোঁক রক্ত খেয়ে মাছকে দুর্বল করে দেয় এবং জোঁকের কামড়ানো জায়গায় ক্ষত সৃষ্টি হয়ে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের ফলে মাছ মারা যেতে পারে।

তথ্য সুত্র –

মৎস বিভাগ ,পশ্চিমবঙ্গ সরকার

Spread the love

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top