
নমস্কার কৃষক বন্ধুগণ, বর্তমানে ফসলে রাসায়নিক বিষের প্রয়োগ আমাদের অর্থ ও শরীর—উভয়ই নষ্ট করছে। বিষাক্ত ফসল খেয়ে রোগবালাই বাড়ছে, তাই খরচ কমিয়ে পরিবারকে সুস্থ রাখতে জৈব কিটবিতারক (কীটনাশক) নিমাস্ত্র (Nimastra) তৈরি পদ্ধতি জানা আমাদের একান্ত প্রয়োজন। জৈব চাষ মানে শুধু বিষমুক্ত খাবার নয়, এটি হাতের কাছের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে ডাক্তার ও ঔষধের খরচ কমানোর সেরা উপায়। শুরুর কিছুটা সময় ধৈর্য ধরলে দেশীয় বীজে আমরা টেকসই ও লাভজনক ফলন নিশ্চিত করতে পারি।
নিমাস্ত্র তৈরী পদ্ধতি (Nimastra Preparation)
নিমাস্ত্র (Nimastra) হলো এমন একটি জৈব নির্যাস যা আপনি যে কোনো ফসলে নিয়মিত ব্যবহার করতে পারেন। এর উপকরণ ও পদ্ধতি নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
প্রয়োজনীয় উপকরণ:
- দেশী নিমপাতা (থেঁতো করা): ৫ কেজি (দেশী বা খাওয়া নিম পাতা ব্যবহার করলে এর তিক্ততা ও কার্যকারিতা সবথেকে ভালো পাওয়া যায়)।
- দেশী গরুর গোবর: ২ কেজি।
- দেশী গরুর গোমূত্র: ৫ লিটার।
- পাত্র: একটি মাটির হাড়ি বা প্লাস্টিকের ড্রাম (কখনোই লোহা বা অ্যালুমিনিয়াম ব্যবহার করবেন না)।
ক. নিমাস্ত্র প্রস্তুতি – ধাপ অনুযায়ী নির্দেশিকা
- প্রথমে টাটকা নিমপাতাগুলোকে পাটায় বা হামানদিস্তায় ভালো করে থেঁতো করে নিন যাতে পাতার কোষ থেকে নির্যাস বেরিয়ে আসে।
- টাটকা গোবর ও গোমূত্র ভালো করে ঘুঁটে নিয়ে একটি নির্যাস তৈরি করুন, তারপর তাতে থেঁতো করা নিমপাতা যোগ করুন।”
- এবার একটি বড় পাত্রে গোমূত্র, গোবর এবং ঐ থেঁতো করা নিমপাতাগুলো নিয়ে ভালো করে মিশ্রণ তৈরি করুন।
- পাত্রের মুখটি একটি সুতির কাপড় দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দিন এবং ২৪ ঘণ্টা একটি ছায়াযুক্ত জায়গায় রেখে দিন।
- ২৪ ঘণ্টা পর মিশ্রণটিকে ভালো করে নেড়ে নিয়ে একটি পাতলা কাপড় দিয়ে ছেঁকে নিন।
- ছিবড়েগুলোকে আলাদা করে সার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন এবং তরল রসটিকে একটি জারে ভরে রাখুন। এটি তৎক্ষণাৎ ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত।
খ. নিমাস্ত্র বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব: এটি বায়োলজিক্যাল ভাবে কীভাবে কাজ করে?
নিমাস্ত্র (Nimastra) মূলত ‘Antifeedant’ এবং ‘Insect Growth Regulator’ হিসেবে কাজ করে।
১. নিমপাতা (Azadirachtin):
বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব: নিমের প্রধান উপাদান হলো আজাদিরাকটিন। এটি পোকার শরীরে ‘একডাইসোন’ (Ecdysone) নামক হরমোনের নিঃসরণ বন্ধ করে দেয়।
কিভাবে কাজ করে: এই হরমোন ছাড়া পোকা তাদের খোলস বদলাতে পারে না এবং লার্ভা থেকে পূর্ণাঙ্গ পোকা হতে পারে না। ফলে পোকার জীবনচক্র থেমে যায়। এছাড়াও এটি একটি ‘Antifeedant’, যা পাতার স্বাদ তিতো করে দেয় ফলে পোকা না খেয়ে মারা যায় এবং বংশবিস্তার করতে ব্যর্থ হয়।
২. দেশী গোমূত্র (Ammonia & Phenols):
বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব: গোমূত্রে থাকে অ্যামোনিয়া, ইউরিয়া এবং বিভিন্ন ফেনোলিক অ্যাসিড।
কিভাবে কাজ করে: অ্যামোনিয়া পোকার জন্য শ্বাসরোধকারী গ্যাস হিসেবে কাজ করে। গোমূত্র এবং অন্যান্য তীব্র গন্ধযুক্ত উপাদানের মিশ্রণ গাছের চারদিকে এমন একটি উগ্র গন্ধের বলয় তৈরি করে যা ক্ষতিকারক পোকার প্রজনন বা ডিম পাড়ার সংকেতকে নষ্ট করে দেয়। গোমূত্রে থাকা ইউরিয়া ও অ্যামোনিয়া উপাদানগুলো নিমের গুনাগুণকে দ্রুত পাতার কোষে পৌঁছে দেয় এবং পোকা তাড়াতে সাহায্য করে।
৩. দেশী গরুর গোবর
বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব: উপকারী অণুজীব (Beneficial Microbes) ‘বায়ো-কালচার’ হিসেবে কাজ করে
কিভাবে কাজ করে: দেশী গরুর গোবরে কোটি কোটি উপকারী অণুজীব বা ব্যাকটেরিয়া (Beneficial Microbes) ও ছত্রাক থাকে। যখন নিমপাতা ও গোমূত্রের সাথে গোবর মেশানো হয়, তখন এই অণুজীবগুলো নিমপাতার শক্ত কোষপ্রাচীর ভেঙে ফেলে ভেতর থেকে আজাদিরাকটিন নামক শক্তিশালী কীটনাশক উপাদানটিকে বের করে আনতে সাহায্য করে।
গোবরের নির্যাসটি একটি প্রাকৃতিক আঠার কাজ করে। এটি নিমাস্ত্রকে গাছের পাতার গায়ে দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকতে সাহায্য করে, ফলে বৃষ্টির হালকা ঝাপটায় এটি সহজে ধুয়ে যায় না এবং অনেকদিন পোকা দূরে রাখে এবং গোবরের নির্যাস গাছের পাতায় পড়লে তা এক ধরণের ‘ফলিয়ার নিউট্রিশন’ বা পত্রপুষ্টি হিসেবে কাজ করে, যা গাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
গ. ব্যবহার বিধি (How to Use)
আপনি যদি এই নিমাস্ত্র (Nimastra) পুরো দ্রবণটি একবারে প্রয়োগ করতে চান, তবে তার সাথে ১০০ লিটার জল মিশিয়ে প্রায় ৩ বিঘা জমিতে ব্যবহার করতে পারেন।
সঠিক ডোজ: প্রতি লিটার পরিষ্কার জলের সাথে ৫০ মিলি (বা ৫০ গ্রাম) নিমাস্ত্র মিশ্রিত করে গাছে ভালো করে স্প্রে করুন।
কৃষি সুত্র পরামর্শ: বাড়িতে ঘরোয়া ভাবে তৈরির সময় উপকরন গুলির পরিমাণ সঠিক নাও হতে পারে, তাই ব্যবহারের সময় প্রথমে কিছু গাছে ব্যাবহার করে ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করে যদি গাছের কচি পাতা ডগায় অস্বাভাবিক কোন পরিবর্তন না দেখা যায় যেমন জ্বলে যাওয়ার মত তবে সেই পরিমাণ সঠিক ধরে আপনার প্রয়োজনীয় ফসল খেতে প্রয়োগ করুন ।
ঘ. উপকারিতা (Benefits)
নিমাস্ত্র (Nimastra) মূলত সব ধরণের শোষক পোকা (Jassids, Aphids, Whiteflies) এবং ছোট লার্ভা তাড়ানোর কাজে অত্যন্ত সফল। এটি নিয়মিত দিলে গাছে ভাইরাসের আক্রমণও অনেকটা কমে যায়। পোকা আক্রমণের অপেক্ষায় না থেকে ৭ দিন পর পর প্রয়োগ করলে পোকা আসবে না । এর পরেও যদি আসে পোকা তখন অগ্নিঅস্ত্র কিট বিতারক ব্যাবহার করবেন । বাজারে যে নিম তেল পাওয়া যায় তার পরিবর্তে নিমাস্ত্র (Nimastra) ব্যাবহার করলে খরচ অনেক কমে যাবে ।
নিমাস্ত্র এর থেকে আড়ও শক্তিশালী কীটবিতারক দেখুন জৈব কীটবিতারক(কীটনাশক) অগ্নিঅস্ত্র (Agniastra) কি? কিভাবে তৈরি করবেন ও ব্যবহার করবেন?
চাষের তথ্যে কৃষি সুত্র এক্সপার্ট মতামত
- নিমপাতা সংগ্রহ: শুকনো নিমপাতা ব্যবহার করা ব্যাবহার করা যাবে না, শুকনো পাতায় আজাদিরাকটিনের পরিমাণ কমে যায়; সবসময় টাটকা কাঁচা নিমপাতা থেঁতো করে ব্যবহার করলে সেরা ফল পাওয়া যায়।
- গোবর নির্বাচন: অনেক দিনের পুরোনো শুকনো গোবর ব্যবহার করলে কাজ হবে না, শুকনো গোবরে উপকারী অণুজীব বা মাইক্রোবস মারা যায় । নিমাস্ত্র তৈরির জন্য সবসময় টাটকা বা ১-২ দিনের দেশী গরুর গোবর ব্যবহার করা সঠিক যাতে অণুজীবগুলো সক্রিয় থাকে।
- পাত্র নির্বাচন: লোহা বা অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে নিমাস্ত্র তৈরি করা একটি ভুল পদ্ধতি, গোমূত্রের অ্যাসিডিক ধর্মের কারণে ধাতব পাত্রের সাথে বিক্রিয়া ঘটে এর গুনাগুণ নষ্ট হতে পারে তাই সবসময় প্লাস্টিক বা মাটির পাত্র ব্যবহার করা সঠিক।
- মিশ্রণ পদ্ধতি: গোবর সরাসরি দলা অবস্থায় পাত্রে ফেলে রাখা ভুল পদ্ধতি, গোবরকে প্রথমে সামান্য গোমূত্র বা জল দিয়ে ভালো করে গুলে পাতলা কাই করে নিয়ে তারপর অন্য উপাদানের সাথে মেশানো সঠিক, নচেৎ নিমপাতার সাথে এর বিক্রিয়া ঠিকমতো হয় না।
- সংরক্ষণ: নিমাস্ত্র (Nimastra) মুখ খোলা রাখা বা কড়া রোদে রাখা যাবে না, এতে উপকারী অণুজীব ও রাসায়নিক গুণ বাষ্পীভূত হয়ে যায় তাই সবসময় কাপড় দিয়ে মুখ বেঁধে ছায়ায় রাখা সঠিক।
- প্রয়োগের সময়: বৃষ্টির ঠিক আগে বা প্রবল রোদে স্প্রে করা উচিত নয়, বৃষ্টিতে দ্রবণ ধুয়ে যায় এবং রোদে দ্রুত শুকিয়ে কাজ করার সুযোগ পায় না তাই সবসময় বিকেল বেলা স্প্রে করা লাভজনক।
আড়ও দেখুন ১২ মাসে সবজি চাষ করার পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা: কৃষকের লাভজনক ক্যালেন্ডার
নিমাস্ত্রের লাভ ও খরচের খতিয়ান
নিমাস্ত্র (Nimastra) মূলত নিয়মিত ব্যবহার করা হয় যাতে পোকা আক্রমণই করতে না পারে। এর আর্থিক সাশ্রয় অবিশ্বাস্য:
| বিষয় | রাসায়নিক প্রতিরোধক (১ বিঘা) | জৈব নিমাস্ত্র (১ বিঘা) |
|---|---|---|
| ঔষধের মূল্য | ৩০০ – ৫০০ টাকা (প্রতি স্প্রে) | মাত্র ৫ – ১০ টাকা (উপকরণ খরচ) |
| বছরে সাশ্রয় | ১২০০ – ২০০০ টাকা খরচ | ১৮০০+ টাকা সরাসরি লাভ |
| মাটির গুণমান | রাসায়নিকের ফলে উপকারী ব্যাকটেরিয়া মরে | মাটি আরও উর্বর ও সজীব হয় |
উপসংহার
নিমাস্ত্র (Nimastra) হলো আপনার জমির জন্য এক নিরাপদ রক্ষা কবচ। এটি ব্যবহার করলে চাষের খরচ কমে লাভের ১০০ শতাংশ টাকাই আপনার পকেটে থাকবে। সুস্থ মাটি আর সুস্থ মানুষের জন্য জৈব পদ্ধতির কোনো বিকল্প নেই। আজই আপনার বাড়িতে নিমাস্ত্র তৈরি করুন এবং কৃষিতে নতুন বিপ্লব আনুন।
কৃষি সুত্র পরামর্শ: হাতে কলমে প্রশিক্ষণের জন্যে নিকটবর্তী কৃষি বিভাগে যোগাযোগ করুন, তারা আপনাকে প্রশিক্ষণ করিয়ে দিবেন দিবেন ।
সচরাচর জিজ্ঞাস্য প্রশ্নাবলী (FAQ)
১. নিমাস্ত্র কি সব ধরণের পোকা মারতে পারে?
উত্তর: নিমাস্ত্র (Nimastra) মূলত একটি ‘কিটবিতাড়ক’ (Repellent)। এটি শোষক পোকা, জাব পোকা এবং সাদা মাছির বিরুদ্ধে দারুণ কাজ করে। তবে বড় লেদা পোকা বা শুঁটি ছিদ্রকারী পোকার জন্য ব্রহ্মাস্র বেশি কার্যকর।
২. নিমাস্ত্র কতদিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়?
উত্তর: নিমাস্ত্র (Nimastra) তৈরির পর ছায়াযুক্ত স্থানে বায়ুরোধী পাত্রে রাখলে পরবর্তী ৩ মাস পর্যন্ত অনায়াসে ব্যবহার করা যায়।
৩. স্প্রে করার কতক্ষণ পর ফসল তোলা যাবে?
উত্তর: যেহেতু নিমাস্ত্র (Nimastra) সম্পূর্ণ জৈব এবং এতে কোনো বিষাক্ত রাসায়নিক নেই, তাই স্প্রে করার ৪৮ ঘণ্টা পরেই ফসল ধুয়ে বাজারজাত করা বা খাওয়া সম্ভব। তবে সাধারণত ৩-৪ দিন অপেক্ষা করা ভালো।
৪. নিমাস্ত্র কি গাছের কোনো ক্ষতি করতে পারে?
উত্তর: সঠিক মাত্রায় (প্রতি লিটার জলে ৫০ মিলি) ব্যবহার করলে কোনো ক্ষতি হয় না। তবে খুব কচি চারা গাছে নিমাস্ত্র (Nimastra) ব্যবহারের আগে একবার পরীক্ষা করে নেওয়া ভালো।
তথ্যসূত্র ও বৈজ্ঞানিক রেফারেন্স
এই কন্টেন্টের প্রতিটি তথ্য সরকারি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র ও স্বীকৃত প্রাকৃতিক কৃষি নির্দেশিকা থেকে সংগৃহীত। বিস্তারিত জানতে নিচের লিঙ্কগুলো দেখতে পারেন:
- NCOF (National Centre of Organic Farming): জৈব সার ও কিটবিতাড়ক তৈরির সঠিক নির্দেশিকা ও এসওপি (SOP)
- ICAR-Indian Agricultural Research Institute: নিমের আজাদিরাকটিন এবং ভেষজ নির্যাসের বৈজ্ঞানিক কার্যকারিতা সংক্রান্ত গবেষণাপত্র।










