
আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় ছোলার গুরুত্ব অপরিসীম। ডাল হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি অঙ্কুরিত ছোলা বা ছোলার শাক অত্যন্ত পুষ্টিকর। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের অনেক জায়গায় আমন ধান কাটার পর জমি পতিত পড়ে থাকে। অথচ সঠিক ছোলা চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করে কৃষকরা খুব সহজেই এই জমি থেকে বাড়তি আয় করতে পারেন। এই পদ্ধতিতে অল্প পরিশ্রমে এবং প্রায় বিনা সেচে বাম্পার ফলন পাওয়া সম্ভব।
১. ছোলা চাষ পদ্ধতি অনুযায়ী উন্নত জাত নির্বাচন
সফলভাবে ছোলা চাষ শুরু করতে হলে প্রথমে উন্নত মানের জাত বেছে নিতে হবে। আমাদের দেশে সাধারণত দুই ধরণের ছোলা চাষ হয়— দেশি এবং কাবুলি।
দেশি জাত: পুষা ২৫৬, মহামায়া-১ (বি-১১৫), বি.আর-৭৭ এবং জ্যাকি ৯২১৮ এই চাষের জন্য সেরা। এর মধ্যে জ্যাকি ৯২১৮ জাতটি বর্তমানে কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় কারণ এটি বিঘা প্রতি ২০০ কেজির বেশি ফলন দেয়।
কাবুলি জাত: বড় দানার কাবুলি ছোলার ক্ষেত্রে আই.সি.সি.ভি-৫ এবং কে-৫ জাতগুলো অত্যন্ত কার্যকরী। আধুনিক ছোলা চাষ পদ্ধতি-তে এই জাতগুলো মাত্র ১০০ দিনের মধ্যে ঘরে তোলা যায়।
আড়ও দেখুন আধুনিক মটরশুঁটি চাষ পদ্ধতি: শীতকালীন অর্থকরী ফসল চাষের পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা
২. সঠিক সময়ে ছোলা চাষ ও বপন কৌশল
যেকোনো ফসলের ফলন নির্ভর করে তার সঠিক সময়ে বপনের ওপর। ছোলা চাষ নভেম্বর থেকে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ হলো বীজ বোনার শ্রেষ্ঠ সময়। অগ্রহায়ণের তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যে বীজ বুনে ফেললে ফলন সবচেয়ে ভালো হয়। তবে যারা ধানের জমিতে ‘পয়রা পদ্ধতিতে’ চাষ করতে চান, তাদের ধান কাটার ১০ দিন আগেই বীজ ছড়িয়ে দিতে হবে। এই আধুনিক ছোলা চাষ পদ্ধতি অবলম্বন করলে বীজের খরচ ছাড়া অতিরিক্ত কোনো খরচ হয় না।
৩. ছোলা চাষ পদ্ধতি-তে জমি ও মাটি প্রস্তুতি
মাটির প্রকারভেদের ওপর ছোলার ফলন অনেকখানি নির্ভর করে। সাধারণত উঁচু এবং মাঝারি জমি যেখানে জল নিকাশের সুব্যবস্থা আছে, সেখানে ছোলা চাষ পদ্ধতি সবচেয়ে বেশি সফল হয়। দোয়াশ বা বেলে-দোয়াশ মাটি এই চাষের জন্য আদর্শ। তবে এই পদ্ধতির একটি বিশেষত্ব হলো, এতে মাটি খুব বেশি মিহি করে তৈরির প্রয়োজন পড়ে না। এমনকি আমন কাটার পর কাদা মাটিতেও খুপি করে বীজ বপন করে ভালো ফলন পাওয়া যায়।
৪. বীজের পরিমাণ ও সঠিক দূরত্ব বজায় রাখা
ছোলা চাষ পদ্ধতি অনুসারে বীজের পরিমাণ নির্ভর করে দানার আকারের ওপর। বড় দানা বা কাবুলি জাতের জন্য বিঘা প্রতি ৮.৫ থেকে ১০.৫ কেজি বীজ লাগে। আবার দেশি ছোট দানার ছোলার ক্ষেত্রে ৮-১০ কেজি বীজই যথেষ্ট। যদি আপনি সারিতে বীজ বপন করেন, তবে সারি থেকে সারির দূরত্ব হবে ১ ফুট (৩০ সেমি) এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব হবে ৪ ইঞ্চি। আধুনিক ছোলা চাষ পদ্ধতি-তে সারিতে লাগালে প্রতিটি গাছ পর্যাপ্ত আলো-বাতাস পায় এবং ফলন বাড়ে।
৫. সারের ব্যবহার ও আধুনিক ছোলা চাষ
অন্যান্য ফসলের তুলনায় এই ডাল চাষে রাসায়নিক সারের প্রয়োজনীয়তা অনেক কম। ছোলা চাষ পদ্ধতি-তে জমি তৈরির সময় বিঘা প্রতি ৬-৭ কুইন্টাল কম্পোস্ট বা জৈব সার দেওয়া উচিত। সাথে ১০-১২ কেজি সিঙ্গেল সুপার ফসফেট প্রয়োগ করলে গাছের শিকড় মজবুত হয়। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাইজোবিয়াম জীবাণুসার দিয়ে বীজ শোধন করা। এটি ছোলা চাষ পদ্ধতি-র এমন একটি কৌশল যা সরাসরি বাতাস থেকে নাইট্রোজেন টেনে মাটির উর্বরতা বাড়াতে সাহায্য করে।

৬. সেচ ব্যবস্থাপনা ও আর্দ্রতা রক্ষা
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিনা সেচে ছোলা চাষ সম্পন্ন করা যায়। তবে যদি জমিতে রসের অভাব দেখা দেয়, তবে ফুল আসার আগে বা দানা পুষ্ট হওয়ার সময় একটি হালকা সেচ দেওয়া যেতে পারে। পয়েন্ট বা পয়রা পদ্ধতিতে চাষ করলে কেবল দানা পুষ্ট হওয়ার সময় একটি সেচই যথেষ্ট। মনে রাখবেন, অতিরিক্ত জল কিন্তু এই চাষের ক্ষতি করতে পারে, তাই জমিতে যাতে জল না জমে সেদিকে নজর রাখাই হলো সঠিক ছোলা চাষ পদ্ধতি।
৭. সাথি ফসল ও আন্তঃফসল চাষের গুরুত্ব
কৃষক ভাইদের মুনাফা বাড়াতে ছোলা চাষে সাথি ফসলের ভূমিকা অনস্বীকার্য। গমের সাথে বা সরষের সাথে ছোলা চাষ করলে জমির ব্যবহার বাড়ে। বিশেষ করে তিসির সাথে ছোলা চাষ করলে এক বিশেষ উপকার পাওয়া যায়। প্রতি কেজি ছোলা বীজের সাথে ২০-৩০ গ্রাম তিসি মিশিয়ে বুনলে ছোলার গোড়া পচা বা ঢলে পড়া রোগের উপদ্রব অনেক কমে যায়। এই মিশ্র ছোলা চাষ পদ্ধতি বর্তমানে অনেক কৃষি বিজ্ঞানী সুপারিশ করছেন।
আড়ও দেখুন আধুনিক রাজমা চাষ পদ্ধতি: অর্থকরী ফসল হিসেবে রাজমা চাষের সম্পূর্ণ গাইডলাইন
৮. রোগ ও পোকা দমন: আধুনিক ছোলা চাষ পদ্ধতি
ছোলার প্রধান শত্রু হলো শুঁটি ছিদ্রকারী পোকা। সঠিক ছোলা চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করে জৈব উপায়ে পোকা দমন করা যায়। যেমন— জমিতে ডাল পুঁতে দিলে পাখিরা সেখানে বসে পোকা খেয়ে ফেলে। তবে পোকার উপদ্রব বেশি হলে নিম পাতার নির্যাস বা রাসায়নিক ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। ছত্রাকজনিত রোগ থেকে বাঁচতে বীজ শোধন করাই হলো এই ছোলা চাষ পদ্ধতি-র মূল রক্ষা কবচ।
৯. ফসল উৎপাদন ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
বিজ্ঞানসম্মত ছোলা চাষ পদ্ধতি মেনে চাষ করলে বিঘা প্রতি ১২০-১৫০ কেজি পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। যদি উচ্চফলনশীল জাত যেমন জ্যাকি ৯২১৮ ব্যবহার করা হয়, তবে ফলন ২০০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। বর্তমান বাজারে ছোলার চাহিদা প্রচুর এবং এর বাজার মূল্যও ভালো। ফলে আমন পরবর্তী পতিত জমি ব্যবহার করে এই ছোলা চাষ পদ্ধতি-র মাধ্যমে কৃষকরা খুব সহজেই বড় অঙ্কের লাভ ঘরে তুলতে পারেন।
১০. মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় ডাল চাষের উপরি লাভ
নিবিড় চাষের ফলে মাটির উর্বরতা কমে যায়, কিন্তু শস্যচক্রে একবার ডাল জাতীয় ফসল রাখলে মাটির স্বাস্থ্য ফিরে আসে। ছোলা চাষ এর অন্যতম বড় সুবিধা হলো এটি মাটিতে প্রচুর পরিমাণে নাইট্রোজেন জমা করে। ১ বিঘা জমিতে ছোলা চাষ করলে প্রায় ৮-৯ কেজি ইউরিয়া সারের সমান নাইট্রোজেন জমিতে ফিরে আসে। তাই কৃষকের সারের খরচ কমাতে এবং জমির টেকসই উর্বরতা বজায় রাখতে একবার এই ছোলা চাষ পদ্ধতি প্রয়োগ করা প্রতিটি চাষির জন্য জরুরি।
কৃষি সুত্র পরামর্শ: চাষের পূর্বে মাটি পরীক্ষা করুন নিকটবর্তী কৃষি বিভাগে এবং প্রয়োজনীয়তা অনুসারে সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করুন । ফসল চক্র পদ্ধতি মেনে চাষ করুন । মাটির উন্নত স্বাস্থ্য আপনার পরিবারের ভবিষ্যত ।
উপসংহার
পরিশেষে আমরা বলতে পারি অল্প খরচে, কম পরিশ্রমে এবং প্রায় বিনা সেচে বাংলার মাটিতেছোলা চাষ পদ্ধতি একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় কৃষি ক্ষেত্র। এটি কেবল চাষির আর্থিক স্বচ্ছলতা আনে না, বরং আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা ও মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী ভূমিকা পালন করে। সঠিক জাত ও আধুনিক কৌশল প্রয়োগ করে আপনিও এই শীতকালীন ডাল চাষে সফল হতে পারেন।
সচরাচর জিজ্ঞাস্য প্রশ্নাবলী (FAQ)
প্রশ্ন: ছোলা চাষ পদ্ধতি অনুযায়ী শ্রেষ্ঠ জাত কোনটি?
উত্তর: দেশি জাতের মধ্যে জ্যাকি ৯২১৮ এবং কাবুলি জাতের মধ্যে এল-৫৫০ বর্তমানে সেরা ফলন দেয়।
প্রশ্ন: জমি না চষে কি ছোলা চাষ সম্ভব?
উত্তর: হ্যাঁ, পয়রা পদ্ধতিতে ধান কাটার আগে বীজ ছড়িয়ে দিলে জমি না চষেই ভালো ফলন পাওয়া যায়। এটি একটি সাশ্রয়ী ছোলা চাষ পদ্ধতি।
প্রশ্ন: ছোলা চাষে কি প্রচুর নাইট্রোজেন সারের প্রয়োজন হয়?
উত্তর: না, কারণ ছোলার শিকড়ে থাকা জীবাণু বাতাস থেকে নাইট্রোজেন সংগ্রহ করে মাটিতে জমা করে।
তথ্য সুত্র
- বিধান চন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (BCKV)
- ভারতীয় ডাল গবেষণা কেন্দ্র (ICAR-IIPR) ভারত সরকার ।










