
আধুনিক কলা চাষ পদ্ধতি বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে একটি প্রধান ও জনপ্রিয় বিষয়। কলার পুষ্টিগুণ ও কম দামের কারণে এটি ভারতের আম পরবর্তী দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ফসল। কলাতে প্রচুর পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট এবং ভিটামিন বি থাকে। এছাড়াও ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়াম ও ফসফরাস সমৃদ্ধ এই ফলটি চর্বি ও কোলেস্টেরল মুক্ত। এই বিশেষ গুণাগুণের কারণেই কলাকে গুঁড়ো করে শিশুদের প্রথম খাবার তৈরি করা হয়েছিল।
১. কলাচাষ পটভূমি ও ইতিহাস
বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ১২০টি দেশে কলা জন্মে। আর্দ্র গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চল ও ভারতে এর উৎপত্তি। আধুনিক ভোজ্য কলার জাত সমূহ মূলত Musa acuminata এবং Musa balbisiana নামক দুটি প্রজাতি থেকে বিবর্তিত। পরবর্তীতে ইজরায়েল টিস্যু কালচার কলা চাষ জি নাইন কলার উদ্ভাবন করে যা বিশ্বে কলা চাষ ব্যবস্থাপনা ও রপ্তানির ক্ষেত্রে বিপ্লব এনেছে। দিল্লির আজাদপুর বাজারের মতো বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্র গুলোতে জি নাইন কলা চাষ পদ্ধতি-তে উৎপাদিত কলার আমদানি ও মধ্যপ্রাচ্যে এর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।
২. কলা চাষের উপযোগী জলবায়ু ও মাটি
কলা মূলত একটি গ্রীষ্মমন্ডলীয় ফসল। এটি ৭৫-৮৫% আপেক্ষিক আর্দ্রতার সাথে ১৫ºC – ৩৫ºC তাপমাত্রায় ভাল জন্মে। কলা চাষে উপযুক্ত মাটি হিসেবে উর্বর দোআঁশ মাটি সেরা। আধুনিক কলা চাষ পদ্ধতি বা টিস্যু কালচার কলা চাষে কোন ধরনের মাটি উত্তম তা বিচার করলে দেখা যায়, যেখানে জল দাঁড়ায় না এমন উঁচু জমি সবথেকে ভালো। কলার বৃদ্ধি ও ফলনের জন্য সঠিক জল সেচ ও নিকাশি ব্যবস্থা থাকা একান্ত প্রয়োজন।
তাপমাত্রা খুব কম বা খুব বেশি হওয়া ছাড়া বাজারের চাহিদা অনুযায়ী টিস্যু কালচার কলা চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করে সারা বছরই আবাদ করা যায়। উৎপাদনের দিক থেকে ‘শ্রীমন্তি‘ জাত হেক্টরে ৭০ টন দিলেও, বাণিজ্যিক জনপ্রিয়তায় জি৯ (নাইন) কলা হেক্টরে ৬৫ টন সবার উপরে। বর্তমানে ভারতের মহারাষ্ট্র এবং পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া, হুগলি, মুর্শিদাবাদ, কোচবিহারে এই কলার চাষ ব্যাপক বাড়ছে। এমনকি বাংলাদেশের রাজশাহীতেও পরীক্ষামূলকভাবে জি নাইন কলা চাষ পদ্ধতি কৃষকদের ভাগ্য বদলে দিচ্ছে।
৩. জি নাইন কি ও টিস্যু কালচার কলা চাষ পদ্ধতি
অনেকেই প্রশ্ন করেন জি নাইন কলা কি? গ্র্যান্ড নাইন (Grand Naine) কলার সংক্ষিপ্ত রূপই হলো জি নাইন। এটি ইজরায়েল থেকে আসা একটি উন্নত টিস্যু কালচার কলার জাত।
জি নাইন কলার বৈশিষ্ট্য:
- কেন এটি সেরা: এর অ্যাবায়োটিক চাপ সহনশীলতা এবং আকর্ষণীয় হলুদ রঙের জন্য এটি ব্যবসায়ীদের প্রথম পছন্দ।
- সময়কাল: এটি লাগানোর মাত্র ৮ মাসে থোড় আসে এবং ১১ মাসে কলা পরিপক্ক হয়।
- ফলন: ভালো ব্যবস্থাপনায় প্রতিটি কাঁদিতে ১৩ থেকে ১৫টি ছড়ি পাওয়া যায়। এক একটি কাঁদির ওজন ৩৫ থেকে ৪০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে।
টিস্যু কালচার কলার গুরুত্ব
আধুনিক কলা বাগান করার পদ্ধতি-তে টিস্যু কালচার চারার কোনো বিকল্প নেই। টিস্যু কালচার কি বা টিস্যু কালচার বলতে কি বুঝো—সহজ কথায় এটি ল্যাবরেটরিতে উৎপাদিত সম্পূর্ণ রোগমুক্ত ও উচ্চ ফলনশীল চারা। এই চারাগুলো খাটো জাতের হয়, ফলে ঝড়-বৃষ্টিতে গাছ ভেঙে পড়ার ভয় কম।
জি নাইন ও টিস্যু কালচার কলার চারা কোথায় পাওয়া যায়?
অনেকেই জানতে চান জি নাইন কলার চারা কোথায় পাওয়া যায়। পশ্চিমবঙ্গে বারাসাত ও দুর্গাপুরের বিভিন্ন ল্যাব-যুক্ত নার্সারিতে এই চারা পাওয়া যায় এবং নদীয়া, হুগলি ও বর্ধমান, কোচবিহারের সরকারি কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র (KVK) ও অন্যান্য জেলার KVK গুলিতে পাওয়া যাচ্ছে।
এছাড়া সরকারিভাবে হর্টিকালচারের মাধ্যমেও চারা প্রদান করা হয়। বাংলাদেশে মাদারীপুর উদ্যানপালন গবেষণা কেন্দ্রে এবং রাজশাহীর নির্দিষ্ট কিছু নার্সারিতে উন্নত টিস্যু কালচার কলার চারা সুলভ মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে।
জাতের ভিন্নতা ও চাষিদের অভিজ্ঞতা
পশ্চিমবঙ্গে চম্পা, মর্তমান (মর্টম্যান), কাঁথালি, সিঙ্গাপুরি ও বাগদা কলার চাষ হলেও বর্তমানে সিঙ্গাপুরি কলা চাষ, সাগর কলা চাষ পদ্ধতি, মালভোগ কলা চাষ পদ্ধতি এবং সবরী কলা চাষ পদ্ধতি-র তুলনায় জি নাইন অধিক লাভজনক হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। কলার উন্নত জাত হিসেবে জি নাইন চাষ করে নদীয়া ও হুগলির কৃষকরা ২ বছরে ৩ বার ফলন নিচ্ছেন।
বাংলাদেশের রাজশাহী জেলাতেও এই জাতের চাষ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন এবং সঠিক কলা বাগান করার পদ্ধতি জানা থাকলে এক একরে ১২০০ চারা লাগিয়ে বিপুল লাভ করা সম্ভব। কলা চাষের জন্য কোন ধরনের চারা উপযোগী—এই তর্কে টিস্যু কালচার চারাই সবসময় এগিয়ে থাকে কারণ এটি খাটো জাতের এবং ঝড়ে ক্ষতির আশঙ্কা কম থাকে।
৪. টিস্যু কালচার কি এবং টিস্যু কালচার কলা বলতে কি বুঝো?
আধুনিক কৃষি বিজ্ঞানে টিস্যু কালচার কি তা জানা অত্যন্ত জরুরি। এটি গবেষণাগারে সম্পূর্ণ কৃত্রিম পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রিত আবহাওয়ায় চারা তৈরির একটি বিশেষ প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত যন্ত্রাংশগুলি অটোক্লেভ মেশিনে জীবাণুমুক্ত করে নেওয়া হয়।
এরপর সুস্থ ও সবল মাতৃ কলা গাছ থেকে এক বা একাধিক কোষ অথবা গাছের একটি নির্দিষ্ট টিস্যু সংগ্রহ করা হয়। সংগৃহীত অংশটি জল, সাবান ও এন্টিসেপ্টিক দ্রবণে ধুয়ে পুনরায় হাইপোক্লোরাইড ঘোল দিয়ে জীবাণুমুক্ত করা হয়। এরপর কাঁচের পাত্রে বিশেষ পুষ্টির মাধ্যমে যে চারা তৈরি হয় তাকেই মূলত টিসু কালচার কলা চারা বলা হয়। টিসু কালচার পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন করা হয় বলেই এই চারাগুলি রোগমুক্ত ও উচ্চ ফলনশীল হয়।
৫. টিস্যু কালচার কলা চাষ ও চারা রোপণের লাভ
টিস্যু কালচার কলা চাষ করার প্রধান সুবিধা হলো এই চারাগুলি সম্পূর্ণ রোগপোকা ও ভাইরাস মুক্ত। এছাড়া টিসু কালচার কলা চারা কি এবং কেন এটি সেরা, তার কিছু বিশেষ কারণ নিচে দেওয়া হলো:
- সমফলন: সব গাছে একই বয়সের ও একই সাইজের তাজা চারা পাওয়া যায়, ফলে ফলন আসে একই সময়ে।
- বিপণন সুবিধা: সমস্ত গাছে একসাথে ফল আসায় দূরবর্তী বাজারে বড় আকারে বিক্রি করা সহজ হয়।
- জমি ব্যবস্থাপনা: চাষের জমি একবারে ফাঁকা হয়, যা পরবর্তী ফসল রোপণে বিশেষ সুবিধা দেয়।
- মায়ের গুণাগুণ: চারাগুলি হুবহু উন্নত প্রজাতির মাতৃগাছের গুণাগুণ সম্পন্ন হয়।
৬. টিস্যু কালচার কলার চারা ক্রয়ে সচেতনতা
আধুনিক জি নাইন কলা চাষ পদ্ধতি -তে কলা চাষের জন্য কোন ধরনের চারা উপযোগী তা নির্বাচন করতে হলে ক্রয়ের সময় কিছু বিষয়ে লক্ষ্য রাখা জরুরি:
- চারাগুলিতে ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের কোনো লক্ষণ থাকবে না।
- অন্তত ২ মাস হার্ডেনিং করা চারার উচ্চতা ১ ফুট এবং গোড়া ২ ইঞ্চি মোটা হওয়া বাঞ্ছনীয়।
- জি নাইন কলা চাষ পদ্ধতি বা এক্সপোর্টের জন্য গবেষকরা সবসময় গ্র্যান্ড নাইন জাতের সুস্থ চারা কেনার পরামর্শ দেন।
৭. জি নাইন কলা চাষের উপযুক্ত পরিবেশ ও মাটি
কলা চাষে প্রচুর জল লাগে, তাই বর্ষার শুরু অর্থাৎ জুন, জুলাই বা আগস্ট মাসে চাষ শুরু করা সবচেয়ে ভালো। কলা চাষে উপযুক্ত মাটি হিসেবে ৬.৫ থেকে ৭.৫ pH সম্পন্ন দোআঁশ মাটি সেরা। কলার জন্য মাটিতে ভালো নিষ্কাশন ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত উর্বরতা ও আর্দ্রতা থাকা চাই। লবণাক্ত, শক্ত বা চুনযুক্ত মাটি মোটেও কলা চাষের জন্য সঠিক নয়।
বিশেষ সতর্কতা: কলার সবল বৃদ্ধির জন্য প্রচুর জল প্রয়োজন হলেও গাছের গোড়ায় যেন এক মুহূর্তের জন্যও জল দাঁড়িয়ে না থাকে। উচ্চ নাইট্রোজেন, পর্যাপ্ত ফসফরাস এবং প্রচুর পটাশযুক্ত মাটিই হলো কলা চাষে কোন ধরনের মাটি উত্তম তার সঠিক উত্তর।
৮. জি নাইন কলা চাষে জমি প্রস্তুত ও গর্ত তৈরি
কলা বাগান করার পদ্ধতি শুরু হয় জমি প্রস্তুতির মাধ্যমে। ২-৪ বার জমি চষে সমতল করে নিতে হবে। চারা রোপণ দূরত্ব এক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ।
- দূরত্ব: বিঘা প্রতি ৪০০ এবং একর প্রতি ১২০০ চারা বসানোর জন্য সাধারণত ৬ ফুট বাই ৬ ফুট দূরত্ব বজায় রেখে গর্ত করতে হয়।
- সার প্রয়োগ: প্রতিটি গর্তে ১০ কেজি পুরোনো গোবর সার বা ৩ কেজি ভার্মিকম্পোস্ট দিতে হয়। সাথে ট্রাইকোডার্মা ভিরিডি ৫ গ্রাম, ২৫০ গ্রাম নিম কেক এবং কার্বফুরান ১০ গ্রাম মিশিয়ে উপরের মাটি দিয়ে গর্ত ভরাট করতে হবে।
- সতর্কতা: গর্তগুলি অন্তত ১৫-২০ দিন খোলা রাখা দরকার যাতে কড়া রোদে মাটিবাহিত জীবাণু মারা যায় এবং এর পর ২ লিটার জীবামৃত দিয়ে ৭ দিন রেখে চারা রোপণ করলে বেশি কার্যকর হয়। পিএইচ ৮-এর উপরে হলে জিপসাম ব্যবহার করতে হবে।
কৃষি সূত্র পরামর্শ: শূন্য খরচে বাড়িতে জীবামৃত তৈরি পদ্ধতি এবং ব্যাবহার ও উপকার জানুন [এখানে ক্লিক করুন]
৯. চারা রোপণ পদ্ধতি ও সার ব্যবস্থাপনা
আধুনিক কলা চাষ পদ্ধতিতে রোপণের আগে গর্তে ৫০ গ্রাম ইউরিয়া, ৫০ গ্রাম পটাশ এবং ১০০ গ্রাম ফসফেট সার ভালোভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে নিতে হবে। চারা রোপণের পূর্বে ০.৫% মনোক্রোটোফস এবং ব্যাভিস্টিন (০.১%) এর দ্রবণে চারাগুলি ডুবিয়ে শোধন করে নিতে হবে। এরপর মাটি দিয়ে চারাটি বসিয়ে হালকা জল সেচ দিয়ে জমি ভিজিয়ে দিতে হবে। জি৯ কলা কি তা বুঝতে হলে রোপণের এই আধুনিক কৌশল অনুসরণ করা আবশ্যক।
কৃষি সূত্র পরামর্শ:: চারা শোধনের সময় শূন্য খরচে বাড়িতে বীজামৃত তৈরি করে করে চারা ৩০ মিনিট ভিজিয়ে রোপণ করলে ভাল ফল পাবেন [তৈরি পদ্ধতি জানতে এখানে ক্লিক করুন ]
১০. জি নাইন কলা চাষের পরিচর্যা ও সঠিক যত্ন
জি নাইন কলা চাষ পদ্ধতি-তে চারা রোপণের পর সঠিক পরিচর্যাই ফলনের মূল চাবিকাঠি। চারা রোপণের পর প্রাথমিক অবস্থায় কলা বাগানে মিশ্র ফসল হিসেবে কোন ফসল করা যায়—তা নিয়ে অনেকেই ভাবেন, তবে শেকড়ের ক্ষতির আশঙ্কায় আন্তঃফসল না লাগানোই ভালো। কলা চাষে প্রচুর পুষ্টির প্রয়োজন হয়, তাই সঠিক সময়ে কলার সার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
ক. জি নাইন কলা চাষে সার ব্যবস্থাপনা
জি নাইন বা জি৯ কলা কি তা বুঝতে হলে এর নিবিড় খাদ্য চাহিদাকে গুরুত্ব দিতে হবে। কলার ফলন বাড়াতে ৩টি পর্যায়ে সার প্রয়োগ করা উচিত:
- চারা রোপণের ২ মাস পর: গাছের গোড়া থেকে ১ ফুট দূরত্বে ১০-১২ কেজি পুরোনো গোবর সার বা ৩ কেজি ভার্মিকম্পোস্ট দিতে হবে। সাথে ৩০ গ্রাম ইউরিয়া, ১০০ গ্রাম ফসফেট এবং ৫০ গ্রাম পটাশ প্রয়োগ করতে হবে।
- গাছের বয়স ৩ মাস হলে: পুনরায় ১০-১২ কেজি গোবর সার বা ৩ কেজি ভার্মিকম্পোস্টের সাথে ৩০ গ্রাম ইউরিয়া, ১০০ গ্রাম ফসফেট এবং ৫০ গ্রাম পটাশ দিতে হবে।
- গাছের বয়স ৪ মাস হলে: ১০-১২ কেজি গোবর সার বা ৩ কেজি ভার্মিকম্পোস্টের সাথে ৩০ গ্রাম ইউরিয়া এবং ৬০ গ্রাম পটাশ প্রয়োগ করতে হবে।
খ. মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টস ও ফলিয়ার স্প্রে
টিস্যু কালচার কলা চাষে গাছের ৩ ও ৫ মাস বয়সে ফলন ও গুণমান বাড়াতে বিশেষ স্প্রে প্রয়োজন। ZnSO4 (০.৫%), FeSO4 (০.২%), CuSO4 (০.২%) এবং H3BO3 (০.১%) এর সম্মিলিত ফলিয়ার প্রয়োগ কলার পুষ্টি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
গ. কলা চাষে লাভজনক ও আধুনিক জৈব পদ্ধতি
আপনি যদি কম খরচে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, কলার গুণমান বৃদ্ধি এবং দীর্ঘস্থায়ী সুস্বাদু ফলন পেতে চান, তবে নিচের জৈব আধুনিক কলা চাষ পদ্ধতি-টি অনুসরণ করুন:
১. শক্তিশালী জৈব সার তৈরি ও প্রয়োগ
- জীবামৃত ব্যবহার: পচা গোবর বা ভার্মিকম্পোস্টের সাথে জীবামৃত মিশিয়ে ৩ দিন ঢেকে রাখুন। এরপর এই মিশ্রণটি গাছের গোড়ায় প্রয়োগ করুন। এটি মাটির উর্বরতা ও উপকারী জীবাণুর সংখ্যা দ্রুত বাড়িয়ে দেয়।
- মাছ পচা সার: একটি ড্রামে জল দিয়ে চিটা গুড় ও পচা মাছ ৭ দিন পচিয়ে নিন। এরপর সমপরিমাণ জলের সাথে এই নির্যাসটি মিশিয়ে গাছে প্রয়োগ করলে অভাবনীয় ফল পাওয়া যায় (গাছের গোড়া থেকে দূরে দিবেন নয়তো গোড়া পচে যেতে পারে) ।
২. মালচিং বা আচ্ছাদন পদ্ধতি:
- চারা রোপণের পর গাছের গোড়ার চারপাশ খড়, বিচালি বা ফসলের অবশিষ্ট অংশ (আগাছা) দিয়ে ঢেকে দিন। এতে মাটির আর্দ্রতা বজায় থাকে এবং আগাছা কম হয়।
৩. নিয়মিত সেচ ও রক্ষণাবেক্ষণ:
- প্রতি ২১ দিন অন্তর সেচের জলের সাথে বীজামৃত মিশিয়ে প্রয়োগ করুন। এটি গাছকে রোগমুক্ত রাখতে এবং কলার স্থায়ীত্ব (Shelf Life) বাড়াতে সাহায্য করবে।
গ. কলার রোগ ও পোকা নিয়ন্ত্রণ
কলার রোগ ও পোকা দমনে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ জরুরি। কলার পোকা দমন-এর জন্য রাইজোম উইভিল, স্টেম বোরর এবং থ্রিপস আক্রমণ করলে ০.০৪% এন্ডোসালফান বা ০.০৫% মনোক্রোটোফস ব্যবহার করা হয়। এছাড়া কলার বিটল পোকা দমন ও কলার উইভিল পোকা দমন-এর জন্য স্বাস্থ্যকর চারা নির্বাচন এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কলা বাগান করার পদ্ধতি অনুসরণ করা কার্যকর।
কৃষি সূত্র পরামর্শ: কলা চাষে পোকা দমনের জন্যে প্রথমে জৈব কীটনাশক ব্যাবহার করুন। টেকসই আধুনিক কলা চাষ পদ্ধতি-তে খরচ কমিয়ে ভাল ফলন, দাম ও ট্রান্সপোর্টিং সুবিধার জন্যে বাড়িতেই শূন্য খরচে অগ্নিঅস্ত্র কীটনাশক [ এখানে ক্লিক করুন ] তৈরি প্রয়োগ করুন।
ঘ. কলা গাছের প্রধান রোগ নিয়ন্ত্রণ
কলার পানামা রোগ: এটি একটি মাটিবাহিত ছত্রাকজনিত রোগ। কলার পানামা রোগ প্রতিরোধ-এর জন্য কার্বেন্ডাজিম (১ গ্রাম/লিটার) অথবা কপার অক্সিক্লোরাইড (২ গ্রাম/লিটার) জলের সাথে গাছের গোড়ায় ব্যবহার করতে হবে।
কলার সিগাটোকা রোগ: পাতায় দাগ হয়ে শুকিয়ে যাওয়া এই রোগের লক্ষণ। এর জন্য প্রপিকোনাজোল বা টেবুকোনাজোল (২ মিলি/লিটার) জল-এ মিশিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। এটি কলার ছত্রাক রোগ দমনে দারুণ কার্যকর।
ঙ. জি নাইন কলা বাগানে জল সেচ ও নিকাশি ব্যবস্থা
কলা গাছ প্রচুর জল চায়। গাছের গোড়া স্যাঁতসেঁতে রাখার জন্য গ্রীষ্মকালে ৭ দিন অন্তর এবং বর্ষায় বৃষ্টি না থাকলে ১৫ দিন অন্তর জল সেচ দিতে হবে। ড্রিপ ইরিগেশন বা বিন্দু সেচ পদ্ধতি ব্যবহার করলে জল ও সারের অপচয় কম হয়। মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে গমের খড় বা ধানের খড় দিয়ে মালচিং করা মাটির জন্য খুবই উপকারী।
চ. চারা অপসারণ ও অন্যান্য পরিচর্যা
- চুষক চারা অপসারণ: মূল গাছের পুষ্টির ভাগ যেন অন্য চারা না পায়, তাই ৬-৭ মাস পর্যন্ত নিয়মিত ছোট চোষক বা শাকার সরানো হয়।
- শীতকালীন যত্ন: তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির নিচে নামলে রাতে সেচ দিতে হবে বা ধোঁয়া তৈরি করতে হবে। প্রতি গাছের গোড়ায় ৩-৪ বারে ১ কেজি নিম খৈল দিলে কাদি বা গুচ্ছ গঠন ভালো হয়।
- খুঁটি দেওয়া: ফলের ভারে বা বাতাসে গাছ যেন না পড়ে, তার জন্য বাঁশের খুঁটি বা দড়ি দিয়ে বেঁধে সাপোর্ট দিতে হবে।
- গুচ্ছ ঢাকা (Sleeving): প্রখর সূর্যলোক ও পোকা থেকে ফল বাঁচাতে স্বচ্ছ পলিথিন বা শুকনো পাতা দিয়ে কলার কাদি ঢেকে দেওয়া লাভজনক। এতে কলার রং আকর্ষণীয় হয়।
১১. জি নাইন কলা সংগ্রহ এবং স্টোরেজ ব্যবস্থাপনা
জি নাইন কলা চাষ পদ্ধতি-র অন্যতম বড় সুবিধা হলো এর ফলন সংগ্রহের সময়কাল। রোপণের ১১ থেকে ১২ মাসের মধ্যে প্রথম প্রধান ফসল সংগ্রহ করা যায়। এই জাতটি থেকে ২৪-২৫ মাসের মধ্যে মোট তিনটি ফলন (একটি প্রধান ও দুটি রেটুন) পাওয়া সম্ভব।
- সংগ্রহের সময়: স্থানীয় বাজারের জন্য ফল সম্পূর্ণ পরিপক্ক হলে কাটা হয়, তবে দীর্ঘ দূরত্বের পরিবহনের জন্য ৭৫-৮০% পরিপক্কতায় ফসল কাটা উচিত।
- গ্রেডিং: সংগ্রহের পর ফলের আকার, রঙ ও পরিপক্কতার ভিত্তিতে গ্রেডিং করা হয়। রোগাক্রান্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত ফলগুলো আলাদা করে ফেলা হয় যাতে সুস্থ ফলগুলো নষ্ট না হয়।
- পাকানোর পদ্ধতি: কলার গুণমান ও স্বাদ অটুট রেখে দ্রুত ও সমানভাবে পাকানোর জন্য ইথিলিন বা ইথ্রেল (Ethrel) ব্যবহার করা হয়। নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় ১৫-১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে এটি ধীরে ধীরে পাকে।
- সংরক্ষণ: পরিপক্ক সবুজ কলা ইথিলিন মুক্ত বাতাসে ৩ সপ্তাহ এবং ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে প্রায় ৬ সপ্তাহ পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়।
১২. জি নাইন কলা প্যাকিং এবং মার্কেটিং কৌশল
আধুনিক কলা চাষ পদ্ধতি-তে উচ্চমানের জি নাইন কলা রপ্তানির জন্য বৈজ্ঞানিক প্যাকিং অপরিহার্য। কলার চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এর বিপণন ব্যবস্থা এখন অনেক আধুনিক।
- পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা: প্রথমে কাদি থেকে কলা সরিয়ে পরিষ্কার জল দিয়ে ধুয়ে ফেলা হয়।
- জীবাণুমুক্তকরণ: কলার লেটেক্স বা আঠা অপসারণের জন্য পাতলা সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইড দ্রবণে ধুয়ে ০.১% কার্বেন্ডাজিম দ্রবণে ডুবিয়ে অবশেষে বাতাসে শুকানো হয়।
- প্যাকিং: কলার দৈর্ঘ্য ও ঘের অনুযায়ী গ্রেড করে ১৩ থেকে ১৪.৫ কেজি ধারণক্ষমতা সম্পন্ন প্লাস্টিকের বা ফাইবার বোর্ড (CFB) কার্টনে প্যাক করা হয়।
- পরিবহন: কোল্ড চেইন বজায় রেখে রেফ্রিজারেটেড ভ্যানের মাধ্যমে ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এটি দেশের বাইরে রপ্তানি করা হয়।
১৩. বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সফল চাষিদের গল্প
আমরা যখন টিস্যু কালচার কলা চাষ বা আধুনিক কলা চাষ পদ্ধতি-তে এক বিঘা জমিতে কলা চাষের আয়-ব্যয় নিয়ে আলোচনা করি, তখন মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের অভিজ্ঞতা দেখা জরুরি।
নদীয়া জেলার হাবিবপুরের পরিতোষ মন্ডল: তিনি ২ বিঘা জমিতে প্রায় ১.৫ লক্ষ টাকা খরচ করে ২ বছরে ৪ লক্ষ টাকার বেশি আয় করেছেন। শুরুতে জল সেচ নিয়ে সমস্যায় পড়লেও এখন তিনি একজন সফল চাষি।
কোচবিহারের দিনেশ রায়: তিনি উত্তরবঙ্গের জলবায়ুর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে জি নাইন কলার চারা রোপণ করেন। ঝোড়ো বাতাসে গাছ হেলে পড়ার সমস্যায় তিনি খুঁটি ব্যবহারের সমাধান পান এবং এখন বিপুল লাভ করছেন।
রাজশাহীর পুঠিয়ার আশরাফুল ইসলাম: তিনি ১ একর জমিতে জি-নাইন চাষ শুরু করেন। সঠিক সার ব্যবস্থাপনা ও পটাশ সারের প্রয়োগের মাধ্যমে তিনি প্রতিটি কান্দি বা ঘাউড় ৩০ কেজির উপরে ওজন পাচ্ছেন।
১৪. এক বিঘা ও এক একর জমিতে কলা চাষের আয়-ব্যয় ও লাভ
আধুনিক কলা চাষ পদ্ধতি-তে বিঘা প্রতি টিস্যু কালচার কলা চাষে লাভ কত তা নির্ভর করে সঠিক পরিচর্যার ওপর। জি নাইন কলা চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করে তিনবার ফলন নিলে লাভের অংকটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়। ৩টি ফলন নিতে ২৬-২৭ মাস লাগে যদি সঠিক খাদ্য ও সেচ এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, টিস্যু কালচার চারা হয় তবে। নিচে গড়ে ২ বছর ফলন হিসাবে আয় ব্যয়ের টেবিল দেওয়া হল:
| জমি ও কাদি সংখ্যা ২ বছরে | আয় (গড়ে ৪০০ টাকা কাদি) | মোট খরচ ২ বছরে | ২ বছরে লাভ | আনুমানিক বার্ষিক লাভ |
|---|---|---|---|---|
| একরে প্রতি ৩৬০০টি | ১৪,৪০,০০০ | ২,১০,০০০ | ১২,৩০,০০০ | ৬,১৫,০০০ |
| ১ বিঘা ১২00টি | ৪,৮০,০০০ | ৭০,০০০ | ৪,১০,০০০ | ৩,৪০,০০০ |
কোন কলা চাষে লাভ বেশি—এই প্রশ্নের উত্তরে বর্তমান বাণিজ্যিক প্রেক্ষাপটে জি নাইন- টিস্যু কালচার কলা চাষ সবার উপরে। প্রথম ফলনের পর খরচ কমে যাওয়ায় পরবর্তী ফলনগুলোতে মুনাফা বেশি থাকে। এটি মূলত একটি উচ্চমূল্যের ফসল যা কৃষকের আয় দ্বিগুণ করার ক্ষমতা রাখে
উপসংহার
কলা চাষের তথ্য গুলি টিস্যু কালচার কলা চাষ নিয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও যারা কলা চাষ করছে তাদের জি নাইন কলা চাষ পদ্ধতি অভিজ্ঞতা নিয়ে তুলে ধরা হয়েছে। আপনি যদি আধুনিক কলা চাষ পদ্ধতি এবং বিশেষ করে জি নাইন কলা চাষ শুরু করতে চান, তবে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া, কোচবিহার বা বাংলাদেশের রাজশাহীর সফল চাষিদের মতো আপনিও লাভবান হতে পারেন। টিস্যু কালচার কলার চারা ব্যবহার করে এবং সঠিক সার ব্যবস্থাপনা ও জল সেচ নিশ্চিত করলে আপনার কলা বাগান হবে রোগমুক্ত ও সমৃদ্ধ।
কৌতূহলী প্রশ্নের সমাধান (FAQs)
প্রশ্ন: কলা কেন বাঁকা হয়?
উত্তর: কলা মূলত ‘নেগেটিভ জিওট্রপিজম’ (Negative Geotropism) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাড়ে। কলার ফল শুরুতে নিচের দিকে থাকলেও বড় হওয়ার সময় সূর্যের আলোর দিকে অর্থাৎ উপরের দিকে বাড়তে চায়, যার ফলে এটি বাঁকা হয়ে যায়।
প্রশ্ন: কলা কেন জোড়া বা যমজ হয়?
উত্তর: গাছের টিস্যু বিভাজনের সময় বা ফুলের গঠনের সময় যদি দুটি ডিম্বকোষ একসাথে যুক্ত হয়ে যায়, তবে জোড়া বা যমজ কলা তৈরি হয়। এটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক এবং সাধারণ বিষয়।
প্রশ্ন: কলার বৈজ্ঞানিক নাম ও উৎপাদনকারী দেশ কোনটি?
উত্তর: কলার বৈজ্ঞানিক নাম হলো Musa acuminata। বিশ্বে কলা উৎপাদনে ভারত শীর্ষে রয়েছে এবং অনেক দেশে এটি প্রধান জাতীয় ফল হিসেবে বিবেচিত।
প্রশ্ন: কলা চাষের জন্য সরকারি লোন বা ব্যাংক ঋণ পাওয়ার উপায় কি?
উত্তর: বাণিজ্যিকভাবে জি নাইন কলা চাষ করার জন্য কিষাণ ক্রেডিট কার্ড (KCC) বা বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া যায়। সরকারি নিয়মানুযায়ী NHM (National Horticulture Mission) এবং NABARD কলা চাষে উৎসাহিত করতে মোট খরচের ৪০% থেকে ৫০% পর্যন্ত ভর্তুকি বা সাবসিডি প্রদান করে। এই সুবিধা পেতে হলে জমির খতিয়ান, পরিচয়পত্র এবং একটি প্রজেক্ট রিপোর্ট নিয়ে নিকটস্থ উদ্যানপালন দপ্তর বা কৃষি ব্যাংকে যোগাযোগ করতে হয়। বিশেষ করে টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে চাষ করলে ঋণের অনুমোদন পাওয়া অনেক সহজ হয়।
তথ্য সুত্র
- উদ্যানপালন বিভাগ ,পশ্চিমবঙ্গ
- উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, আসাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, PO কাহিকুচি, গুয়াহাটি-781017,
- আঞ্চলিক গবেষণা কেন্দ্র, মহাত্মা ফুলে কৃষি বিদ্যাপীঠ, নিমখেদা রোড, জলগাঁও, মহারাষ্ট্র
- টিস্যু কালচার অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল সার্ভিসেস, জৈন ইরিগেশন সিস্টেমস Ltc., জলগাঁও-, মহারাষ্ট্র,
- মহাবেনানা কৃষি উৎপন্না বাজার সমিতি, জলগাঁও-425003, মহারাষ্ট্র
- ন্যাশনাল সেন্টার ফর রিসার্চ অন ব্যানানা (ICAR-), তামিলনাড়ু,
- বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI-ais)










