লাভজনক Galda Chingri চাষ পদ্ধতি: চারা মজুত থেকে রোগ বালাই দমন

দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভেরিতে আধুনিক গলদা চিংড়ি চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করে একদল গ্রামীণ নারী জালে প্রচুর গলদা চিংড়ি ধরে আনন্দ প্রকাশ করছেন।
আধুনিক গলদা চিংড়ি চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করে একদল গ্রামীণ নারী জালে প্রচুর গলদা চিংড়ি ধরে আনন্দ প্রকাশ করছেন।

বর্তমানে মাছ চাষের জগতে গলদা চিংড়ি চাষ পদ্ধতি (Macrobrachium rosenbergii) একটি অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা। সঠিক পরিকল্পনা এবং আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ করলে খুব কম সময়েই বিঘা প্রতি ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। আজকের ব্লগে আমরা গলদা চিংড়ি চাষের পুকুর প্রস্তুতি থেকে শুরু করে বাজারজাত করা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

১. গলদা চিংড়ি চাষের জন্য উপযুক্ত পুকুর নির্বাচন

গলদা চিংড়ি চাষ এর জন্য পুকুর নির্বাচন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

  • জলের প্রাপ্যতা: পুকুরে যেন সারা বছর পর্যাপ্ত জল থাকে এমন জায়গা বেছে নিন।
  • মাটি ও গভীরতা: পুকুরের তলদেশে কাদা বা পাঁক কম হওয়া ভালো। আদর্শ পুকুরের আয়তন ২৫ থেকে ১৫০ শতক এবং জলের গভীরতা ১.০ থেকে ১.৫ মিটারের মধ্যে রাখা বাঞ্ছনীয়।
  • পরিবেশ: পুকুরটি খোলা জায়গায় হওয়া উচিত যেখানে পর্যাপ্ত রোদ পড়ে এবং জল অবশ্যই কীটনাশক মুক্ত হতে হবে।

২. আধুনিক পুকুর প্রস্তুতি ও জৈব সারের ব্যবহার

গলদা চিংড়ি চাষ এর জন্য পুকুর প্রস্তুতির সময় খেয়াল রাখতে হবে যাতে চিংড়ি খুব সহজে ধরা যায়, তাই পুকুরটি সামান্য ঢালু হওয়া উচিত।

  • আগাছা ও রাক্ষুসে মাছ দমন: পুকুরে অবাঞ্ছিত বা রাক্ষুসে মাছ মারার জন্য বিঘা প্রতি নির্দিষ্ট হারে মহুয়া খোল প্রয়োগ করুন।
  • সার প্রয়োগ: পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্য বা ক্ষুদ্র প্রাণীকণা (Zooplankton) তৈরির জন্য মুরগির মল, শুকর এবং গবাদি পশুর মলমূত্র (কাঁচা নয়, পচানো সঠিক) দিয়ে জৈব সারের সুব্যবস্থা করতে হবে। নতুন পুকুরের ক্ষেত্রে গোবর সার অপরিহার্য।
  • চুন প্রয়োগ: মাটি ও জলের গুণাগুণ ঠিক রাখতে বিঘা প্রতি ২৮-৪০ কেজি চুন প্রয়োগ করা একান্ত প্রয়োজন, এবং পরবর্তীকালে প্রতিমাসে ৭-১৪ কেজি চুন প্রয়োগ করতে হয়। পোনা ছাড়ার ২ মাস পর থেকে মাসে একবার ৩ ফুট জলের গভীরতায় বিঘা প্রতি ৪ কেজি চুন এবং ১ কেজি মোলাসেস বা চিটে গুড় ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যায় রোগ বালাই কম হয়।

৩. জল ও মাটি পরীক্ষার প্রয়োজনীয় গুণাগুণ

চিংড়ি খুব সংবেদনশীল প্রাণী, তাই জলের (পানির নয়) মান নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে।

  • তাপমাত্রা: আদর্শ তাপমাত্রা ২৬-৩২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড।
  • pH মান: জলের pH সবসময় ৭-৮.৫ এর মধ্যে (ক্ষারীয়) রাখা উচিত।
  • অক্সিজেন: জলে অক্সিজেনের পরিমাণ (Do) অন্তত ৫ পিপিএম-এর উপরে থাকতে হবে। এর জন্য প্রয়োজনে এয়ারেটর বা বায়ু সঞ্চালন যন্ত্র ব্যবহার করুন।
  • গ্যাস নিয়ন্ত্রণ: মাঝে মাঝে পুকুরের জল পরিবর্তন করলে ক্ষতিকারক গ্যাসের ক্ষমতা কমে যায়।

৪. সুস্থ-সবল গলদা চিংড়ির চারা মজুত পদ্ধতি

গলদা চিংড়ি চাষে ভাল ফলনের জন্য ৫-৭ সেমি দৈর্ঘ্যের সুস্থ চারা নির্বাচন করুন।

  • মজুত ঘনত্ব: একক চাষের ক্ষেত্রে বিঘা প্রতি ৪০০০-৬০০০ চারা মজুত করা যেতে পারে।
  • ধাতস্থ করা: প্যাকেটসহ চারা পুকুরে ছাড়ার আগে অন্তত ১৫ মিনিট প্যাকেটটি পুকুরের জলে ভাসিয়ে রাখুন।
  • সতর্কতা: সরাসরি চারা পুকুরে ঢেলে দেওয়া ভুল পদ্ধতি, হঠাৎ তাপমাত্রার পরিবর্তনের কারণে চারা মারা যেতে পারে, তাই প্যাকেটটির ভেতর পুকুরের জল অল্প অল্প করে মিশিয়ে তাপমাত্রা সমান করে নিয়ে তবেই চারা ছাড়া সঠিক।

৫. গলদা চিংড়ির পুষ্টিকর খাদ্য তালিকা ও সার প্রয়োগ

চিংড়ি সর্বভুক প্রাণী। এদের দ্রুত বৃদ্ধির জন্য প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম—উভয় খাবারের প্রয়োজন।

  • খাদ্য উপাদান: ভাঙা চাল, সেদ্ধ ভাত, গম, ময়দা, বাদাম বা সরিষার খৈল এবং শুঁটকি মাছের গুঁড়ো মিশিয়ে খাবার তৈরি করুন।
  • খাদ্য প্রদানের সময়: প্রতিদিনের মোট খাবারের অর্ধেক সকালে এবং বাকি অর্ধেক বিকালে দিতে হবে।
  • সার প্রয়োগ: প্রতি ১৫ দিন অন্তর বিঘা প্রতি ৪০ কেজি গোবর সার এবং ৪ কেজি সিঙ্গেল সুপার ফসফেট প্রয়োগ করলে প্রাকৃতিক খাবারের যোগান ঠিক থাকে।
  • বিশেষ খাদ্য: পুকুরে বিঘা প্রতি ১০-১২ কেজি শুকনো খড় বা বিচালি বেঁধে দিলে তা থেকে প্রচুর প্রাকৃতিক খাবার তৈরি হয় যা ৪০% খাদ্যের যোগান দেয়।

চুন প্রয়োগ ও বিশেষ পরিচর্যা

চিংড়ির খোলস বদলানো এবং রোগমুক্ত রাখার জন্য চুনের ভূমিকা অপরিসীম।

  • প্রাথমিক চুন: শুরুতে বিঘা প্রতি ২৮-৪০ কেজি।
  • মাসিক পরিচর্যা: প্রতি মাসে ৭-১৪ কেজি চুন।
  • কৃষি সুত্র বিশেষ টিপস: পোনা ছাড়ার ২ মাস পর থেকে প্রতি মাসে ৩ ফুট জলের গভীরতায় বিঘা প্রতি ৪ কেজি চুন এবং ১ কেজি মোলাসেস বা চিটে গুড় প্রয়োগ ব্যাবহার করুন। চিটে গুড় জলে উপকারী ব্যাকটেরিয়া তৈরি করতে সাহায্য করে এবং রোগ বালাই কমায়।

৬. গলদা চিংড়ির সাধারণ রোগ ও তার প্রতিকার

গলদা চিংড়ি চাষে রোগ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই বড় সমাধান।

  • শ্যাওলা পড়া: চিংড়ির ফুলকার খোলসে শ্যাওলা জমা হয়। এর নামগুলি হল জুথামনিয়াম, এপিস্টাইলিস এবং ভার্টিসেল্লা। এর জন্য ১৫-২৫ পি.পি.এম. হারে ফর্মালিন জলে ছড়িয়ে দিতে হবে এবং জলে দ্রবীভূত অক্সিজেন ৮ পি.পি. এম এর বেশি হতে হবে।
  • নরম খোলস রোগ: অনুপযুক্ত খাদ্য প্রয়োগ ও মাটির কম পি. এইচ এর জন্য এই রোগ হয়। প্রতিকার হিসাবে পুকুরে চুন প্রয়োগ (আগের মতো পরিমাণে) এবং এর সাথে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস জাতীয় খাদ্য প্রয়োগ করা উচিত ।
  • বাদামী দাগ: এই রোগের কারণ হল সিউডোমোনাস জাতীয় ব্যাকটেরিয়া। প্রতিকার হিসাবে বেনজান ক্রোণিয়াম ক্লোরাইড (B.K.C.) ১-২ পি. পি. এম. হারে প্রয়োগ করতে হয় ।

কৃষি সুত্র পরামর্শ ও সতর্কতা

  • মাছ চাষ ও জল ব্যবস্থাপনা: গলদা চিংড়ি চাষে পুকুরে জলের রঙ গাঢ় কালো হয়ে যেতে দেখলে চুপ করে বসে থাকা ভুল পদ্ধতি, জল কালো হওয়ার অর্থ হলো তলায় পচন ধরেছে এবং গ্যাস হয়েছে। সাথে সাথে কিছু জল পরিবর্তন করে নতুন জল দেওয়া এবং চুন প্রয়োগ করা সঠিক যাতে চিংড়ি সুস্থ থাকে।
  • পশু-পাখি ও চাষ: খাদ্য হিসেবে শুধুমাত্র বাজারের সস্তা ফিড ব্যবহার করা ভুল পদ্ধতি, চিংড়ির দ্রুত বৃদ্ধির জন্য প্রাকৃতিক খাবারেরও প্রয়োজন। তাই পুকুরে পরিমিত সার দিয়ে জল সবুজ রাখা এবং সম্পূরক খাবার হিসেবে ভালো মানের ফিড দেওয়া সঠিক।
  • মৎস বিভাগের সাথে যোগাযোগ: গলদা চিংড়ি চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে বা মাছের কোন রোগ সম্পর্কে পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলে পরামর্শ নেওয়ার জন্যে ফিড বা পোনা ব্যবসায়ীদের কাছে যাওয়া ভুল পদ্ধতি, সমস্যা দেখা দিলে বা চাষের অভিজ্ঞতা না থাকলে নিকটবর্তী সরকারী মৎস বিভাগে যোগাযোগ করা সঠিক।

আড়ও দেখুন মাছের রোগের কারণ ও প্রতিকার: আধুনিক মাছ চাষের পূর্ণাঙ্গ গাইড

৭. উৎপাদন ও আহরণ

গলদা চিংড়ি চাষ পদ্ধতিতে সাধারণত ৫-৮ মাসের মধ্যে একেকটি চিংড়ির ওজন ৫০-১৫০ গ্রাম পর্যন্ত হয়। সঠিক পরিচর্যায় বিঘা প্রতি ১০০ থেকে ২০০ কেজি ফলন আশা করা যায়। চিংড়ি চাষে সফল হতে পুকুরে ছোট ছোট লুকানোর জায়গা (আশ্রয়) তৈরি করে দিন যাতে খোলস বদলানোর সময় তারা নিরাপদ থাকে।

উপসংহার (Conclusion)

গলদা চিংড়ি চাষ পদ্ধতি সঠিক ও বৈজ্ঞানিকভাবে অনুসরণ করলে এটি আপনার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। যদিও এটি একটি লাভজনক ব্যবসা, তবে পুকুর পরিচালনা এবং নিয়মিত জল পরীক্ষার বিষয়ে কোনো আপস করা যাবে না। মনে রাখবেন, আধুনিক পদ্ধতিতে ১ বিঘা পুকুরে গলদা চিংড়ি চাষ করে বছরে লক্ষাধিক টাকা আয় করা সম্ভব। নিয়মিত পরিচর্যা, সঠিক পরিমাণে সার ও পরিমিত জল রেখে চাষ করলে সাফল্য নিশ্চিত। এখন SHG নারীরা ঋণ ও গলদা চিংড়ি চাষ পদ্ধতি প্রশিক্ষণ নিয়ে লক্ষাধিক টাকা আয় করে পরিবারে হাসি ফুটাচ্ছেন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. গলদা চিংড়ি চাষের সবচেয়ে ভালো সময় কোনটি?

উত্তর: বাংলাদেশে গলদা চিংড়ি চাষের সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো চৈত্র মাস থেকে শুরু করে শ্রাবণ মাস পর্যন্ত। অর্থাৎ এপ্রিল থেকে আগস্ট মাসের মধ্যে চারা মজুত করা সবচেয়ে ভালো।

২. ১ বিঘা পুকুরে কতটি গলদা চিংড়ির চারা ছাড়া যায়?

উত্তর: আধা-নিবিড় পদ্ধতিতে চাষ করলে ১ বিঘা পুকুরে ৪০০০ থেকে ৬০০০টি সুস্থ সবল চারা ছাড়া যায়। তবে পুকুরে যদি অক্সিজেন সরবরাহ বা অ্যারিয়েটর থাকে, তবে সংখ্যা কিছুটা বাড়ানো সম্ভব।

৩. গলদা চিংড়ি কত দিনে বড় হয়?

উত্তর: সাধারণত ৫ থেকে ৭ মাসের মধ্যেই গলদা চিংড়ি বাজারজাত করার মতো ওজন (৫০-১৫০ গ্রাম) অর্জন করে। সঠিক খাদ্য ও জলের গুণাগুণ বজায় রাখলে ৫ মাসেই ভালো ফলন পাওয়া যায়।

৪. চিংড়ি চাষে চুন কেন দেওয়া হয়?

উত্তর: শুধুমাত্র জল পরিষ্কার করার জন্য চুন দেওয়া (ভুল পদ্ধতি; চুন শুধু জল পরিষ্কার করে না, চুন জলের pH নিয়ন্ত্রণ করে এবং চিংড়ির খোলস শক্ত হতে ও দ্রুত বদলাতে সাহায্য করে। তাই নিয়মিত প্রতি মাসে নির্দিষ্ট হারে ক্যালসিয়াম যুক্ত চুন দেওয়া সঠিক, তবে শুধুমাত্র জল পরিষ্কার করার জন্য চুন দেওয়া ভাব ভুল পদ্ধতি ।

৫. গলদা চিংড়ি ও বাগদা চিংড়ির মধ্যে পার্থক্য কী?

উত্তর: গলদা চিংড়ি মূলত মিষ্টি জলে বা সামান্য নোনা জলে চাষ হয়। অন্যদিকে, বাগদা চিংড়ি অধিক নোনা জলের প্রাণী। গলদা চিংড়ির মাথা তুলনামূলক বড় হয় এবং সামনের পা দুটি সাঁড়াশি বা দাড়ার মতো লম্বা হয়।

তথ্য সুত্র

মৎস বিভাগ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার।

Spread the love

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top