সুস্থায়ী কৃষি ব্যবস্থাপনা ও কর্ম পরিকল্পনা পদ্ধতি প্রয়োজনীয়তা ২০২৬

 সুস্থায়ী কৃষি ব্যবস্থাপনার একটি দৃশ্য।
সুস্থায়ী কৃষি ব্যবস্থাপনার একটি দৃশ্য।

টেকসই বা সুস্থায়ী কৃষি কাকে বলে ? টেকসই বা সুস্থায়ী কৃষি হলো এমন এক চাষাবাদ পদ্ধতি যা প্রকৃতির ক্ষতি না করে বর্তমানের খাদ্যের চাহিদা মেটায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মাটির উর্বরতা ও উৎপাদন শক্তি অক্ষুণ্ণ রাখে। এই পদ্ধতিতে রাসায়নিক বিষ ও সারের বদলে জৈব সার, পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং প্রাকৃতিক পোকা দমন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এটি মূলত চাষের খরচ কমিয়ে কৃষকের দীর্ঘমেয়াদী লাভ নিশ্চিত করে এবং আমাদের বিষমুক্ত নিরাপদ খাদ্য উপহার দেয়। সহজ কথায়, পরিবেশ বাঁচিয়ে লাভজনকভাবে যুগ যুগ ধরে চাষবাস চালিয়ে যাওয়ার বিজ্ঞানসম্মত প্রক্রিয়াই হলো সুস্থায়ী কৃষি

১. সুস্থায়ী কৃষি ব্যবস্থাপনা কি?

মাটি, জল এবং আঞ্চলিক প্রাণসম্পদ নষ্ট না করে, প্রকৃতির স্বাভাবিক শক্তিকে ব্যবহার করে এবং তাকেই আরও মজবুত করে যে চাষবাস বা পশুপালন করা হয়, তাকেই বলা হয় সুস্থায়ী কৃষি ব্যবস্থাপনা। এটি কেবল একটি চাষ পদ্ধতি নয়, এটি একটি সামগ্রিক জীবন দর্শন। সুস্থায়ী কৃষি ব্যবস্থাপনা এ কৃষক প্রধানত তাঁর নিজের খামারে এবং আশপাশের প্রকৃতি-পরিবেশে পাওয়া যায় এমন উপাদানগুলো ব্যবহার করেন। বিভিন্ন প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে বা সরাসরি এগুলো চাষে প্রয়োগ করা হয়। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—চাষের খরচ খুব কম থাকে এবং এই ক্ষেত্রে যা কিছু ব্যবহার হয় সব কিছুই জৈবিক উৎস থেকে প্রাপ্ত। ফলে সুস্থায়ী কৃষি ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করলে বাজার থেকে আলাদা করে চড়া মূল্যে কোনো উপকরণ ক্রয় করতে হয় না।

২. টেকসই বা সুস্থায়ী কৃষির গুরুত্ব

একটি চাষ ব্যবস্থাকে তখনই ‘টেকসই‘ বা ‘স্থায়ী‘ বলা যাবে, যখন এক চাষের অবশিষ্টাংশ বা উচ্ছিষ্ট পরবর্তী চাষে সার হিসেবে পুনরায় জমিতে ফিরে আসে। সুস্থায়ী কৃষি ব্যবস্থাপনা-এ ফসলের অবশিষ্টাংশ মাটিতে পচে গাছের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের জোগান বজায় রাখে। এর ফলে:

  • বাইরের উপাদানের ওপর নির্ভরতা হ্রাস: জমিতে প্রাকৃতিকভাবে পুষ্টি তৈরি হওয়ায় বাইরে থেকে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার বা দামী ইনপুট কেনার প্রয়োজন হয় না।
  • চাষ লাভজনক হওয়া: উৎপাদন খরচ কমে যাওয়ায় চাষাবাদ অনেক বেশি লাভজনক হয়ে ওঠে, যা দীর্ঘমেয়াদে কৃষকের আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করে।
  • মাটির আর্দ্রতা রক্ষা: জৈব উপাদানের কারণে মাটি বেশি পরিমাণ জল ধরে রাখতে পারে, ফলে সেচের খরচ ও জলের অপচয় উভয়ই কমে।
  • জৈব সারের ভূমিকা: এই লক্ষ্য অর্জনে এবং সঠিক সুস্থায়ী কৃষি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে খামারজাত সার, ভার্মিকম্পোস্ট বা সবুজ সারের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

৩. সুস্থায়ী কৃষি ব্যবস্থাপনা-এর ৪ টি প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মতো আমাদের পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষের কৃষকেরা যুগ যুগ ধরে পরম্পরাগত ও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত জ্ঞানের সমন্বয় ঘটিয়ে সুস্থায়ী কৃষি ব্যবস্থাপনা-এর মাধ্যমে আয়ের নতুন পথ বের করেছেন। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

  • ১. মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও উর্বরতা বৃদ্ধি: প্রাচীনকাল থেকেই বাংলার কৃষকেরা গোবর সার, খামারজাত সার এবং পুরনো পুকুরের পাঁক ব্যবহার করে মাটির প্রাণ ফিরিয়ে আনছেন। এটি রাসায়নিক মুক্ত চাষবাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। (মনে রাখবেন, মাটিতে শুধু গোবর সার দিলেই হবে না, তার সাথে ট্রাইকোডার্মা ভিরিডি মিশিয়ে নিলে মাটিতে থাকা ক্ষতিকারক ছত্রাক দমন করা সহজ হয়)।
  • ২. প্রাকৃতিক শত্রু-মিত্র পোকা চিহ্নিতকরণ: ফসলের বন্ধু পোকা ও শত্রু পোকাকে চিনে নিয়ে বন্ধু পোকার বংশবৃদ্ধি ঘটানোর মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব উপায়ে পোকা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। যেমন—ধান পাকার সময় ইঁদুরের উপদ্রব কমাতে বাংলার কৃষকেরা ধান খেতে পেঁচা বসার উপযোগী বাঁশের খুঁটি বা ডাল পুঁতে দেন, যা একটি কার্যকর জৈব পদ্ধতি।
  • ৩. ভেষজ ও জৈব প্রযুক্তির ব্যবহার: মাঠের ফসলের রোগ-পোকা নিয়ন্ত্রণে নিম, নিশিন্দা বা কুর্চি গাছের পাতার নির্যাস দিয়ে তৈরি নিমাস্ত্র, ব্রহ্মাস্ত্র এবং অগ্নিঅস্ত্র ব্যবহার করা হয়। এছাড়া ক্ষতিকারক রাসায়নিক বর্জন করে আলোর ফাঁদ, ফেরোমন ফাঁদ বা হলুদ আঠালো প্লেট ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষা করে নিরাপদ ফলন নিশ্চিত করা হচ্ছে।
  • ৪. জলের সাশ্রয়ী ব্যবহার: সুস্থায়ী কৃষি ব্যবস্থাপনায় সেচের পানির অপচয় রোধ করতে মালচিং পদ্ধতি বা বিন্দু সেচ (Drip Irrigation) ব্যবহার করা হয়। এটি মাটির আর্দ্রতা বজায় রাখে এবং গাছের শিকড়ে সরাসরি পানি পৌঁছাতে সাহায্য করে।

৪. টেকসই কৃষি বৈজ্ঞানিক ভিত্তি:

সুস্থায়ী কৃষি ব্যবস্থাপনা এর আসল সাফল্য নির্ভর করে গাছের পুষ্টির উৎস বোঝার ওপর। গাছ কি মাটি থেকে সব খাবার নেয়? আধুনিক বিজ্ঞান বলছে:

  • প্রকৃতি থেকে পুষ্টি (৯৮%): একটি গাছের প্রয়োজনীয় পুষ্টির সিংহভাগ (কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন) আসে বাতাস, জল এবং সূর্যালোক থেকে।
  • মাটি থেকে পুষ্টি (২%): মাটি থেকে গাছ গ্রহণ করে মাত্র দেড় থেকে দুই শতাংশ খনিজ উপাদান।
  • সুস্থায়ী কৃষি ব্যবস্থাপনা এই ৯৮% প্রাকৃতিক শক্তিকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে শেখায়। যখন আমরা মাটিতে জৈব সার প্রয়োগ করি, তখন মাটির অণুজীবেরা এই প্রাকৃতিক শক্তির সাথে মাটির খনিজের সংযোগ ঘটিয়ে দেয়।

৫. টেকসই কৃষি মাটির কার্বন বৃদ্ধি

মাটির স্বাস্থ্যের মূল মাপকাঠি হলো জৈব কার্বন। বর্তমানে রাসায়নিক সারের অত্যাধিক ব্যবহারের ফলে আমাদের মাটির কার্বন স্তর আশঙ্কাজনক ভাবে কমে গেছে, যা সুস্থায়ী কৃষি ব্যবস্থাপনা এর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

  • আদর্শ মাত্রা: মাটিতে কার্বনের পরিমাণ ১ শতাংশের উপরে থাকা জরুরি। যদি এটি ১ শতাংশের উপরে থাকে, তবে আপনার চাষে বর্তমানের তুলনায় ২৫% সার কম প্রয়োজন হবে।
  • ভয়াবহ পরিস্থিতি: যদি মাটির কার্বন ০.০৫ শতাংশের নিচে নেমে যায়, তবে চাষে সারের চাহিদা ও খরচ ২৫% এর বেশি বেড়ে যায়।

তাই মাটি পরীক্ষা করে কার্বন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়া সুস্থায়ী কৃষি ব্যবস্থাপনা এর প্রথম কাজ। মাটির কার্বন বৃদ্ধি পেলে সারের বাজারজাত নির্ভরতা কমে এবং চাষ লাভজনক হয়।

৬. সুস্থায়ী কৃষির অপরিহার্য উপাদান ও সঠিক পদ্ধতি

চাষ করতে হলে প্রধান যে উপাদানগুলো লাগে তা হলো—মাটি, জল, বায়ু, চাষের শ্রম এবং সঠিক পদ্ধতি। সুস্থায়ী কৃষি ব্যবস্থাপনা এর জন্য নিজের সম্পদগুলোকে চিনে নিতে হবে:

  • জৈব সম্পদ ব্যবহার: নিজের খামারে যা আছে তাকেই সার ও কীটনাশক হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।
  • অণুজীবের সক্রিয়তা: মাটির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধির জন্যে কেঁচো সার, সবুজ সার এবং জীবাণু সারের প্রচলন বাড়ানো।
  • জীবামৃত ও বীজামৃত: মাটির জীবনীশক্তি বাড়াতে এবং বীজ শোধন করতে এগুলোর ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি। বীজামৃত বীজকে রোগমুক্ত রাখে এবং জীবামৃত মাটিতে অণুজীবের এক বিশাল ভাণ্ডার তৈরি করে, যা সুস্থায়ী কৃষি ব্যবস্থাপনা কে সফল করে তোলে।
  • পশুপালন: গরুর চনা ও গোবর হলো কেঁচো সার এই চাষের মূল চালিকাশক্তি।

৭. জৈব সার ও রাসায়নিক সারের মৌলিক পার্থক্য

চাষি কেন সুস্থায়ী কৃষি ব্যবস্থাপনা এর পথে ফিরে আসবে, তা বুঝতে হলে এই পার্থক্যগুলো জানা জরুরি:

  • স্থায়িত্ব: জৈব সারের কার্যকারিতা ধীরে শুরু হলেও ফসলের স্থায়িত্ব ও মান অনেক বেশি হয়। অন্যদিকে রাসায়নিক সারের কাজ সাময়িক এবং ব্যবহারের পর দ্রুত এর গুণাগুণ কমে যায়।
  • মাটির গঠন: জৈব সার মাটিতে কার্বন ও উপকারী জীবাণু বাড়ায়। বিপরীতে, রাসায়নিক সার মাটির গঠন নষ্ট করে তাকে ‘টক্সিক’ বা বিষাক্ত করে তোলে, ফলে ধীরে ধীরে সারের চাহিদা বাড়তে থাকে, যা সুস্থায়ী কৃষি ব্যবস্থাপনা এর পরিপন্থী।
  • অর্থনীতি: জৈব পদ্ধতিতে চাষের প্রায় সব উপকরণ প্রকৃতি থেকে পাওয়া যায় বলে খরচ শূন্যের কোঠায়। কিন্তু রাসায়নিক চাষ সম্পূর্ণ বাজার-নির্ভর এবং ব্যয়বহুল।
  • কীটবিতারক বনাম কীটনাশক: জৈব পদ্ধতিতে পোকা মরে না কিন্তু তাড়ানো হয়, ফলে উপকারী পোকা ও পরাগায়ন ব্যাহত হয় না। রাসায়নিক বিষে উপকারী-অপকারী সব পোকা মারা যায়, যা বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করে। সঠিক সুস্থায়ী কৃষি ব্যবস্থাপনা এই বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষা করে।

আড়ও দেখুন চাষের খরচ কমিয়ে লাভ দ্বিগুণ করুন: জৈব কৃষি শংসাপত্র ও প্রাকৃতিক চাষের পূর্ণাঙ্গ গাইড

৮. সুস্থায়ী কৃষির প্রয়োজনীয়তা : পাঞ্জাবের শিক্ষা

অত্যাধিক রাসায়নিক ব্যবহারের চরম পরিণতি আজ আমাদের চোখের সামনে। এক সময় সবুুুু বিপ্লবের কেন্দ্রে থাকা পাঞ্জাব আজ তার মাটির উৎপাদন শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝাতে নিচের বিষয়গুলো লক্ষ্য করুন:

  • মাটির বিষাক্ততা: অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে আজ পাঞ্জাবের জমির ওপরের এক-দেড় ফুট মাটি বিষাক্ত হয়ে গেছে। এখন সেই বিষাক্ত মাটি কেটে সরিয়ে ফেলে আবার জৈব সার দিয়ে সুস্থায়ী কৃষি ব্যবস্থাপনা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
  • ভয়াবহ স্বাস্থ্য ঝুঁকি (ক্যান্সার ট্রেন): অত্যাধিক কীটনাশকের প্রভাবে সেখানে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা আকাশচুম্বী। পরিস্থিতি এতটাই শোচনীয় যে, ভাতিন্ডা থেকে বিকানের পর্যন্ত একটি বিশেষ ট্রেন চলে যা মূলত ক্যান্সার রোগীদের যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত হয়। সাধারণ মানুষের কাছে এটি এখন ‘ক্যান্সার ট্রেন’ নামে পরিচিত।
  • জলের দূষণ: অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে মাটির নিচের জলও আজ বিষাক্ত হয়ে পড়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি।

পাঞ্জাবের এই করুণ দশা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, কেন রাসায়নিক মুক্ত জৈব ও সুস্থায়ী কৃষির প্রয়োজনীয়তা আজ অপরিহার্য। এটি শুধুমাত্র ভালো ফলনের জন্য নয়, বরং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবন বাঁচাতেও জরুরি। এই লক্ষ্যেই ‘সুসংহত সুস্থায়ী চাষ ব্যবস্থাপনা (CMSA), লাখপতি দিদি এবং ইন্টিগ্রেটেড ফার্মিং ক্লাস্টার (IFC)-এর মতো প্রকল্প গুলো সুস্থায়ী কৃষিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

৯. সুস্থায়ী কৃষি কর্মপরিকল্পনা কৌশল

আপনার কৃষি জীবনকে টেকসই করতে নিচের ব্যবস্থাপনাগুলো ধাপে ধাপে গ্রহণ করা উচিত:

ক. প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক পরিকল্পনা

নিজের জমি, গাছপালা, প্রাণী এবং পুকুরকে স্রেফ জিনিস নয়, বরং ‘সম্পদ’ হিসেবে দেখতে হবে। সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এই সম্পদগুলোর ব্যবহার করলে চাষের খরচ অবিশ্বাস্যভাবে কমে আসবে। এটিই সুস্থায়ী কৃষি ব্যবস্থাপনা এর মূল ভিত্তি।

খ. মাটির স্বাস্থ্য ও জৈব প্রয়োগ:

  • সবুজ সার ও জীবাণু সার: মাটিতে নাইট্রোজেন ও উর্বরতা বাড়াতে ধঞ্চে বা এজোলার মতো সবুজ সার এবং এ্যাজোস্পাইরিলিয়াম বা এ্যাজোটোব্যাকটরের মতো জীবাণু সারের ব্যবহার বাড়ানো।
  • মালচিং পদ্ধতি: আগাছা নাশক বিষ ব্যবহার না করে খড় বা ফসলের উচ্ছিষ্ট দিয়ে জমি ঢেকে রাখা। এতে মাটির আর্দ্রতা ঠিক থাকে, অণুজীবের সংখ্যা বাড়ে এবং অবশেষে মাটির কার্বন শক্তি বৃদ্ধি পায়।

গ. বৈজ্ঞানিক শস্য বিন্যাস ও মিশ্র চাষ:

  • সাথি ও ফাঁদ ফসল: টমেটো বা লঙ্কার চারপাশ দিয়ে ভুট্টার বেড়া দেওয়া (পোকা প্রতিরোধী বেড়া হিসেবে)। বেগুনের সাথে পেঁয়াজ বা গাঁদা ফুলের চাষ করা, যা মাটিবাহিত রোগ কমায়। এটি সুস্থায়ী কৃষি ব্যবস্থাপনা এর একটি উন্নত কৌশল।
  • পয়রা পদ্ধতি ও ফসল চক্র: ধান কাটার আগে ডাল বা মটর ছড়িয়ে দেওয়া (বিনা চাষে ফলন)। ডালের চাষ জমিতে রাইবোজিয়াম বাড়ায়, যা মাটির জন্য প্রাকৃতিক সার এবং একই জমিতে প্রতি বছর একই ফসল চাষ না করে অন্য ফসল চাষ করা।

ঘ. সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (IPM):

  • কীটবিতারকের ব্যবহার: বাজারজাত বিষ নয়, বরং বাড়ির তৈরি নিমবীজ, নিমপাতা বা তিতা জাতীয় গাছের নির্যাস ব্যবহার করা।
  • প্রাকৃতিক ফাঁদ: পোকার চরিত্র অনুযায়ী ফেরোমন ট্র্যাপ, আলোক ফাঁদ বা আঠালো হলুদ কার্ড ব্যবহার করা। (যেমন: শ্যামা বা কারেন্ট পোকা আলোর প্রতি আকৃষ্ট হয়, তাই রাতে আলোর নিচে জল রেখে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যায়)।

ঙ. পশুপালন ও পরিবেশ রক্ষা:

পশু পালনের ওপর জোর দিতে হবে কারণ পশুর বর্জ্যই জৈব সারের মূল উৎস। পাশাপাশি জমির আলে নিমগাছ লাগানো উচিত; এর পাতা মাটিতে পচে নিমাটোড ও ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া রোধে কাজ করে, যা সুস্থায়ী কৃষি ব্যবস্থাপনা কে আরও মজবুত করে।

চ. সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ:

চিরাচরিত অভিজ্ঞতার সাথে নতুন প্রযুক্তির মেলবন্ধন ঘটাতে হবে। পরিবারের শিক্ষিত তরুণদের কৃষি প্রশিক্ষণে শামিল করতে হবে। মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, বীজ শোধন এবং প্রাণীদের নিয়মিত প্রতিষেধক দেওয়ার মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিলে বাড়তি অর্থব্যয় হবে না।

আড়ও দেখুন আনন্দধারা প্রকল্পের অধীনে মহিলা প্রোডিউসার গ্রুপ (PG) বা উৎপাদক গোষ্ঠী গঠনের পূর্ণাঙ্গ গাইড

১০. মতামত ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

আজ বিশ্বব্যাপী বিজ্ঞানীরা সুস্থায়ী কৃষি ব্যবস্থাপনা এর প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে নিয়েছেন। ভারত সরকারের ‘প্রাকৃতিক কৃষি মিশন‘ বা পশ্চিমবঙ্গের ‘আনন্দধারা’ প্রকল্পের মাধ্যমে নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বিষমুক্ত কৃষি প্রসারের কাজ চলছে। সুভাষ পালকর বা লোকোকল্যাণ পরিষদের মতো সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে এই কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য হতে হবে—পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সুস্থ মাটি ও বিষমুক্ত পরিবেশ রেখে যাওয়া।

লেখকের শেষ কথা: সুস্থায়ী কৃষি ব্যবস্থাপনা মানে হলো নিজের সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার। একটি দেশি গরু ও সঠিক কর্মপরিকল্পনা আপনার কৃষি জীবনকে কেবল লাভজনক নয়, বরং গৌরবময় করে তুলবে।

সাধারণ কিছু প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন: সুস্থায়ী কৃষি ব্যবস্থাপনা আসলে কী?

উত্তর: সুস্থায়ী কৃষি ব্যবস্থাপনা হলো এমন একটি আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক চাষ পদ্ধতি যেখানে রাসায়নিক সার বা বিষ ব্যবহার না করে প্রাকৃতিক সম্পদ (যেমন- গোবর, গোমূত্র, ফসলের অবশেষ) ব্যবহার করে চাষ করা হয়। এর মূল লক্ষ্য হলো মাটির উর্বরতা বজায় রেখে কম খরচে দীর্ঘমেয়াদী এবং বিষমুক্ত ফসল উৎপাদন করা।

প্রশ্ন: রাসায়নিক সারের বদলে জৈব সার কেন ব্যবহার করা উচিত?

উত্তর: রাসায়নিক সার সাময়িকভাবে ফলন বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে মাটির গঠন নষ্ট করে এবং পরিবেশের ক্ষতি করে (যেমন- পাঞ্জাবের মাটির টক্সিসিটি)। অন্যদিকে, জৈব সার মাটির গঠন উন্নত করে, উপকারী অণুজীব ও কেঁচোর সংখ্যা বাড়ায় এবং উৎপাদিত ফসলকে পুষ্টিগুণে ভরপুর ও বিষমুক্ত রাখে।

প্রশ্ন: সুস্থায়ী কৃষি বা প্রাকৃতিক কৃষি কি আদতেও লাভজনক?

উত্তর: হ্যাঁ, এটি অত্যন্ত লাভজনক। কারণ এই পদ্ধতিতে চাষের উপকরণগুলো (যেমন- বীজ, সার, কীটবিতারক) কৃষকের নিজের কাছেই থাকে। ফলে বাজার থেকে দামী রাসায়নিক কিনতে হয় না, যা চাষের খরচ প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনে এবং উৎপাদিত বিষমুক্ত ফসলের বাজারমূল্যও অনেক বেশি পাওয়া যায়।

তথ্য সুত্র

  • ন্যাশনাল মিশন ফর সাস্টেনেবল এগ্রিকালচার (NMSA) – ভারত সরকার
  • ন্যাশনাল সেন্টার ফর অর্গানিক অ্যান্ড ন্যাচারাল ফার্মিং (NCONF), ভারত সরকার ।
  • গুরুকুল কুরুক্ষেত্র (Gurukul Kurukshetra) হরিয়ানা ।
  • ন্যাশনাল পোর্টাল অন ন্যাচারাল ফার্মিং (National Portal on Natural Farming) ভারত সরকার ।
  • পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ জীবিকা ও সুস্থায়ী চাষ (আনন্দধারা- WBSRLM)
Spread the love

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top