
বাংলার কৃষিতে ডাল শস্যের মধ্যে খেসারি এক সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। খেসারি ডাল খাওয়া নিয়ে অতীতে কিছু ভুল ধারণা ও সন্দেহ থাকলেও আধুনিক কৃষি বিজ্ঞান তা ভুল প্রমাণিত করেছে। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা ল্যাথাইরিন মুক্ত অনেক উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছেন। বিশেষ করে আমন ধান কাটার পর নিচু ও সেচবিহীন পতিত জমিতে খেসারি ডাল চাষ পদ্ধতি কৃষকদের জন্য একটি বড় আশীর্বাদ। এটি যেমন মানুষের খাদ্য হিসেবে জনপ্রিয়, তেমনি বর্তমানে উন্নত প্রাণীপালনের জন্য পশুখাদ্য হিসেবেও এর চাহিদা প্রচুর।
১. খেসারি ডাল চাষ পদ্ধতি অনুযায়ী উন্নত জাত নির্বাচন
সফলভাবে খেসারি ডাল চাষ পদ্ধতি শুরু করতে হলে উন্নত ও নিরাপদ জাত নির্বাচন করা জরুরি। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের মাটি ও জলবায়ুর জন্য উপযুক্ত কয়েকটি জাত হলো:
- নির্মল-১ ও ২: এই জাতের দানার রং ধূসর এবং আকারে বড়। ১২০-১৩০ দিনে এটি পাকে। আধুনিক খেসারি ডাল চাষ পদ্ধতি মেনে চললে পশ্চিমবঙ্গেই বিঘা প্রতি ১৮৫ কেজি পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব।
- পুষা ২৪-১: এই জাতটির উৎপাদন ক্ষমতা অনেক বেশি। এটি লালচে ধূসর রঙের হয় এবং ১৫০-১৬০ দিনে পাকে। বিঘা প্রতি এর ফলন ২০০-২৬০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে।
- B-১ ও বায়ো এল-২১২: এগুলো মাঝারি দানার উচ্চ ফলনশীল জাত। সঠিক খেসারি ডাল চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করলে ১০০-১২৫ কেজি দানা পাওয়া যায়।
২. খেসারি ডাল বপনের সঠিক সময়
যেকোনো রবি ফসলের মতো খেসারির ক্ষেত্রেও সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খেসারি ডাল চাষ পদ্ধতি অনুসারে অক্টোবর থেকে নভেম্বরের প্রথম পক্ষ (কার্তিকের মাঝামাঝি থেকে অগ্রহায়ণের প্রথম সপ্তাহ) বীজ বোনার উপযুক্ত সময়। সাধারণত আমন ধান কাটার সময় বা ধান কাটার কয়েক দিন আগেই জমিতে অবশিষ্ট রসের সুযোগ নিয়ে বীজ বুনে দেওয়া হয়। এই সময়োপযোগী বপনই খেসারি ডাল চাষ পদ্ধতি-র প্রধান চাবিকাঠি।
আড়ও দেখুন তিল চাষ পদ্ধতি: অধিক লাভের জন্য ১০টি উন্নত জাত ও চাষের আধুনিক কৌশল
৩. জমি ও মাটির গুরুত্ব এবং খেসারি ডাল চাষ পদ্ধতি
নিচু ও মাঝারি জমিতে যেখানে জল বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে না, সেখানে খেসারি ডাল চাষ সবচেয়ে ভালো ফল দেয়। রসালো দোঁয়াশ ও এঁটেল মাটি এই চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। তবে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, খেসারি গাছ গোড়ায় জল দাঁড়ানো একদম সহ্য করতে পারে না। তাই জমি নির্বাচনের সময় জল নিকাশের বিষয়টি খেসারি ডাল চাষ পদ্ধতি-তে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
৪. বীজের হার ও সঠিক দূরত্ব বজায় রাখা
বীজ বপনের পরিমাণ নির্ভর করে আপনি কোন পদ্ধতিতে চাষ করছেন তার ওপর। খেসারি ডাল চাষ পদ্ধতি-তে আপনি যদি জমি চষে চাষ করেন তবে বিঘায় ৬-৮ কেজি বীজ লাগবে। কিন্তু বাংলার জনপ্রিয় ‘পয়রা পদ্ধতিতে’ বীজ বুনলে বিঘা প্রতি ১০-১২ কেজি বীজের প্রয়োজন হয়। সারিতে লাগালে ১-১.৫ ইঞ্চি গভীরে বীজ পুঁততে হবে। আর ছিটিয়ে বোনার ক্ষেত্রে প্রতি বর্গ হাতে ৬-৭টি চারা রাখা হলো আদর্শ খেসারি ডাল চাষ পদ্ধতি।
৫. সার প্রয়োগ ও জৈব সার ব্যবহারের কৌশল
খেসারি ডাল চাষে অতিরিক্ত রাসায়নিক সারের তেমন প্রয়োজন হয় না। আধুনিক খেসারি ডাল চাষ পদ্ধতি-তে রাইজোবিয়াম লিগুমিনেসিরাম জাতের জীবাণুসার ব্যবহার করলে ফলন অনেক বাড়ে। যদি জীবাণুসার না পাওয়া যায়, তবে যে জমিতে নিয়মিত খেসারি চাষ হয় সেখান থেকে ১-২ বস্তা মাটি এনে নতুন জমিতে ছড়িয়ে দিলেও চমৎকার কাজ হয়। এই প্রাকৃতিক পদ্ধতিটি খেসারি ডাল চাষ পদ্ধতি-কে আরও সাশ্রয়ী করে তোলে।
কৃষি সুত্র পরামর্শ: চাষের পূর্বে নিকটবর্তী কৃষি বিভাগে মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে সঠিক পরিমাণে সার প্রয়োগ করে কম খরচে অধিক ফলন ঘরে তুলুন ও মাটির স্বাস্থ্য ভাল রাখুন ।
৬. জল সেচ ও পরিচর্যা পদ্ধতি
সাধারণত বিনা সেচেই খেসারি ডাল চাষ সফল হয়, কারণ এটি মাটির অবশিষ্ট রস ব্যবহার করে বেড়ে ওঠে। তবে যদি আবহাওয়া অতিরিক্ত শুষ্ক থাকে এবং ফুল আসা বা দানা পুষ্ট হওয়ার সময় জমিতে রসের অভাব দেখা দেয়, তবে ১-২টি হালকা সেচ দিলে ফলন অনেক বেড়ে যায়। পয়েন্ট বা পয়রা ফসলের ক্ষেত্রে এটি একটি উন্নত খেসারি ডাল চাষ পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃত।
৭. পশুখাদ্য ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব
বর্তমান সময়ে দুগ্ধ শিল্পের প্রসারের ফলে উন্নতমানের পশুখাদ্যের চাহিদা বেড়েছে। খেসারি ডাল চাষ পদ্ধতি-র মাধ্যমে কেবল ডাল নয়, বরং এর শুষ্ক গাছ ও ডালপালা পশুখাদ্য হিসেবে বিপুল পরিমাণে ব্যবহৃত হচ্ছে। আমদানিকৃত পশুখাদ্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে স্থানীয়ভাবে এই খেসারি ডাল চাষ পদ্ধতি প্রসারিত করা অত্যন্ত জরুরি। এটি বাজারে প্রচুর চাহিদাসম্পন্ন একটি ফসল।
৮. রোগ ও পোকা দমন: খেসারি ডাল চাষ পদ্ধতি
যদিও খেসারিতে রোগবালাই কম হয়, তবুও অধিক ফলনের জন্য সতর্ক থাকতে হবে। জাব পোকার উপদ্রব কমাতে নিমের নির্যাস স্প্রে করা যেতে পারে। ছত্রাকজনিত সমস্যা এড়াতে বীজ শোধন করে নেওয়া এই খেসারি ডাল চাষ এর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এছাড়া জমির আগাছা পরিষ্কার রাখলে পোকার আক্রমণ এমনিতেই কম হয়।
কৃষি সুত্র পরামর্শ: রোগপোকা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা কম থাকলে কৃষি ঔষধ বিক্রয়ের দোকানে নয় আগে কৃষি বিভাগে যোগাযোগ করুন । তারা আপনাদের পরিষেবা দেওয়ার জন্যেই নিয়োজিত ।
৯. ডাল চাষে ‘উপরি লাভ’ ও মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি
শস্যচক্রে একবার খেসারি ডাল চাষ করলে মাটির উর্বরতা শক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। খেসারির শিকড়ে থাকা রাইজোবিয়াম জীবাণু বাতাস থেকে নাইট্রোজেন সংগ্রহ করে মাটিতে যোগান দেয়। দেখা গেছে, একবার চাষ করলে বিঘা প্রতি প্রায় ৮-৯ কেজি ইউরিয়া সারের সমান জৈব নাইট্রোজেন মাটিতে জমা হয়। এছাড়া এটি মাটির গভীর স্তর থেকে খনিজ আহরণ করে উপরের স্তরে নিয়ে আসে, যা পরের ফসলের জন্য অত্যন্ত লাভজনক একটি খেসারি ডাল চাষ পদ্ধতি।
আড়ও দেখুন আধুনিক রাজমা চাষ পদ্ধতি: অর্থকরী ফসল হিসেবে রাজমা চাষের সম্পূর্ণ গাইডলাইন
১০. ফসল সংগ্রহ ও উৎপাদন সম্ভাবনা
সঠিক খেসারি ডাল চাষ পদ্ধতি মেনে চাষ করলে ১২০-১৩০ দিনের মধ্যে ফসল সংগ্রহ করা যায়। জাতভেদে বিঘা প্রতি ১০০ থেকে ২০০ কেজি পর্যন্ত দানা পাওয়া সম্ভব। পশুখাদ্য এবং ডাল—উভয় দিক থেকেই বিবেচনা করলে পতিত জমিতে এই চাষ কৃষকের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
উপসংহার
আমাদের মতে বিনা পুঁজিতে এবং সামান্য পরিচর্যায় খেসারি ডাল চাষ পদ্ধতি বাংলার কৃষকদের জন্য এক নতুন দিশা। এটি একদিকে যেমন জমির স্বাস্থ্য বজায় রাখে, অন্যদিকে মানুষের প্রোটিনের চাহিদা ও গবাদি পশুর খাদ্যের জোগান দেয়। উন্নত জাত এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করে আপনিও আপনার খালি পড়ে থাকা জমিতে খেসারি চাষ করে লাভবান হতে পারেন।
সচরাচর জিজ্ঞাস্য প্রশ্নাবলী (FAQ)
প্রশ্ন: খেসারি ডাল চাষ পদ্ধতি-তে শ্রেষ্ঠ জাত কোনটি?
উত্তর: বর্তমানে নির্মল-২ এবং পুষা ২৪-১ জাতগুলো ফলন ও পুষ্টিগুণের দিক থেকে সেরা।
প্রশ্ন: পয়রা পদ্ধতিতে চাষ করলে কি বাড়তি সেচের দরকার হয়?
উত্তর: সাধারণত দরকার হয় না, তবে দানা পুষ্ট হওয়ার সময় মাটিতে রসের অভাব হলে একটি হালকা সেচ ফলন বৃদ্ধি করে। এটি একটি আধুনিক খেসারি ডাল চাষ পদ্ধতি।
প্রশ্ন: খেসারি কি পশুখাদ্য হিসেবে নিরাপদ?
উত্তর: হ্যাঁ, খেসারির শুষ্ক ডালপালা গবাদি পশুর জন্য অত্যন্ত পুষ্টিকর ও সুস্বাদু খাদ্য।
তথ্য সুত্র
- ভারতীয় ডাল গবেষণা কেন্দ্র (ICAR-IIPR)
- বিধান চন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (BCKV)










