
শীতকালীন ডাল শস্যের মধ্যে মটরশুঁটি বা মটর অন্যতম জনপ্রিয় একটি ফসল। এটি কেবল সুস্বাদু ডাল হিসেবেই নয়, বরং কচি অবস্থায় সবজি হিসেবেও এর চাহিদা আকাশচুম্বী। ছোলার সাথে মটর মিশিয়ে তৈরি ঘুগনি যেমন বাঙালির প্রিয়, তেমনি মটর শাকের জনপ্রিয়তাও কম নয়। সঠিক মটরশুঁটি চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করে কৃষকরা শাক, কচি শুঁটি এবং শুকনো দানা—এই তিন পর্যায়েই ফসল বিক্রি করে বিপুল মুনাফা অর্জন করতে পারেন। আজকের ব্লগে আমরা জানব কীভাবে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে মটর চাষ করে লাভবান হওয়া যায়।
১.মটরশুঁটি চাষ পদ্ধতি ও উন্নত জাত নির্বাচন
সফলভাবে মটরশুঁটি চাষ পদ্ধতি শুরু করতে হলে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের আবহাওয়া উপযোগী এবং আপনার এলাকার বাজারের চাহিদা অনুযায়ী মটরশুঁটি জাত নির্বাচন করতে হবে।
তিঁ-৬৩: এই জাতটি ১৩৫-১৪০ দিনে পাকে। এর দানাগুলো উজ্জ্বল সাদা এবং আকর্ষণীয় বড় আকারের হয়। লতানো স্বভাবের এই গাছের পাতার রং হালকা সবুজ। বাণিজ্যিক ডাল উৎপাদনের জন্য এটি সেরা।
আর্কেল (Arkel): এটি পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের সমতল এলাকার কৃষকদের কাছে সবচাইতে জনপ্রিয় জাত। এটি দ্রুত ফলে এবং উভয় দেশের শীতকালীন আবহাওয়ার সাথে চমৎকারভাবে মানিয়ে নেয়। বিশেষ করে সবজি হিসেবে বিক্রির জন্য এটি এক নম্বর পছন্দ।
কাশী মুক্তি ও কাশী নন্দিনী: এই জাতগুলো ভারতের উত্তরপ্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হলেও, বর্তমানে বাংলাদেশের যশোর, বগুড়া এবং উত্তরবঙ্গ এলাকায় এর ব্যাপক চাষ হচ্ছে। এগুলো উচ্চফলনশীল এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি হওয়ায় কৃষকরা এতে বেশি লাভ পাচ্ছেন।
জওহর মটর (Jawahar Matar): পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন ডিস্ট্রিক্ট এবং বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়া এই জাতের জন্য খুব উপযোগী। এই মটরটি মিষ্টি হওয়ায় বাজারে সবজি হিসেবে এর আলাদা চাহিদা থাকে।
পুষা প্রগতি: এটি পশ্চিমবঙ্গের উপকূলীয় এলাকা (যেমন দক্ষিণ ২৪ পরগণা বা মেদিনীপুর) এবং বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লবণাক্ততা ও আর্দ্র আবহাওয়ায় ভালো ফলন দেয়।
BR ১২: এটি ১৩০-১৩৫ দিনে পাকে। দানা মাঝারি আকারের এবং দানার নাভি কালচে রঙের হয়। এটিও লতানো স্বভাবের জাত।
রচনা: এটি একটি উন্নত জলদি জাত। ফুল সাদা এবং ছোট ঝোপালো প্রকৃতির হয়। যারা দ্রুত ফসল তুলতে চান, তাদের জন্য এই মটরশুঁটি চাষ পদ্ধতি আদর্শ।
দেশি স্থানীয় জাত (ঘোসো বা মাঠ মটর): এই জাতটি খরা সহ্য করতে পারে এবং এর দানা ছোট ও ঘন সবুজ হয়। এটি সাধারণত জমি না চষে ‘পয়রা পদ্ধতিতে’ চাষ করা হয়।
আড়ও দেখুন উন্নত ছোলা চাষ পদ্ধতি: আমন পরবর্তী পতিত জমিতে লাভের নতুন দিশা
২. মটরশুঁটি চাষ পদ্ধতি-তে বপনের সঠিক সময়
মটর মূলত শীতল জলবায়ুর ফসল। সঠিক সময়ে বীজ বপন করা মটরশুঁটি চাষ পদ্ধতি-র অন্যতম প্রধান শর্ত। অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় পক্ষ থেকে নভেম্বরের প্রথম পক্ষ (অর্থাৎ পুরো কার্তিক মাস) বীজ বপনের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। সময়মতো বীজ বপন করলে কুয়াশা ও চরম শীতের আগেই গাছ মজবুত হয়ে ওঠে।
৩. জমি তৈরি ও মাটি নির্বাচন
উঁচু ও মাঝারি জমি যেখানে জল নিকাশের ব্যবস্থা ভালো, সেখানে মটরশুঁটি চাষ পদ্ধতি সবচেয়ে বেশি সফল হয়।
- মাটি: দোঁয়াশ ও পলি মাটি মটর চাষের জন্য আদর্শ। তবে মনে রাখবেন, ক্ষারধর্মী মাটিতে মটর চাষ ভালো হয় না।
- প্রস্তুতি: জমি চষে ঝুরঝুরে ও সরস করে বীজ বুনতে হয়। তবে আমন ধান কাটার পর নিচু জমিতে ‘পয়রা পদ্ধতিতে’ ঘোসো মটর চাষ করলে সময় ও খরচ—উভয়ই বাঁচে।
৪. বীজের হার ও সঠিক দূরত্ব বজায় রাখা
দানার আকারের ওপর বীজের পরিমাণ নির্ভর করে। সাধারণ মটরশুঁটি চাষ পদ্ধতি অনুযায়ী বিঘা প্রতি ১২-১৪ কেজি বীজের প্রয়োজন হয়।
- সারি পদ্ধতি: যদি সারিতে চাষ করেন, তবে এক সারি থেকে অন্য সারির দূরত্ব ৩০-৩৫ সেমি এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ১০ সেমি রাখা উচিত।
- ছিটানো পদ্ধতি: পয়রা পদ্ধতিতে সাধারণত বীজ ছিটিয়ে বপন করা হয়।
৫. সারের পরিমাণ ও বীজ শোধন কৌশল
মটর চাষে সারের সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি।
- বীজ শোধন: বপনের আগে বীজে রাইজোবিয়াম স্পেসিস প্রজাতির জীবাণুসার মাখিয়ে নিলে শিকড়ে নাইট্রোজেন গুটি ভালো হয় এবং ফলন বাড়ে।
- মূল সার: জমি তৈরির সময় বিঘা প্রতি ৫-৭ কুইন্টাল জৈব সার (গোবর সার) দিতে হবে। এর সাথে ১০-১২ কেজি সিঙ্গল সুপার ফসফেট বা রক ফসফেট অথবা ডলোমাইট প্রয়োগ করলে দানা পুষ্ট হয়। এটি একটি উন্নত মটরশুঁটি চাষ পদ্ধতি।
কৃষি সুত্র পরামর্শ: চাষের পূর্বে অবশ্যই মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে নিবেন কৃষি বিভাগ থেকে এবং প্রয়োজন অনুসারে সার প্রয়োগ করবেন । এতে খরচ কমবে ,উৎপাদন বাড়বে এবং মাটির উর্বর শক্তি বৃদ্ধি পাবে ।
৬. মটরশুঁটি চাষ পদ্ধতি-তে সেচের প্রয়োজনীয়তা
মটর গাছ অতিরিক্ত জল বা জল জমা সহ্য করতে পারে না। তবে ফলন বাড়াতে তিনটি হালকা সেচ দেওয়া প্রয়োজন:
- প্রথম সেচ: ২৫-৩০ দিনের মাথায়।
- দ্বিতীয় সেচ: ৫০-৬০ দিনের মাথায় (ফুল আসার সময়)।
- তৃতীয় সেচ: ৯০-৯৫ দিনের মাথায় (দানা পুষ্ট হওয়ার সময়)। যদি জলের অভাব থাকে, তবে অন্তত প্রথম দুটি সেচ দেওয়া অত্যাবশ্যক।
৭. ফসল সুরক্ষা ও পোকা দমন (প্রাকৃতিক ও রাসায়নিক)
মটরশুঁটি চাষে রোগপোকা দমনে বিশেষ নজর দিতে হয়।
ক) পোকা দমন (শুঁটি ছিদ্রকারী পোকা):
শুঁটি ধরার সময় থেকে ১০-১২ দিন অন্তর নিম পাতার নির্যাস (১৫%), নিম তেল (১.৫%) এবং সাবান জল মিশিয়ে স্প্রে করলে পোকা নিয়ন্ত্রণে থাকে। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে নিম পাতা, রসুন, লঙ্কা ও গোমূত্র দিয়ে তৈরি ‘অগ্নি অস্ত্র’ ব্যবহার করা অত্যন্ত কার্যকরী একটি মটরশুঁটি চাষ পদ্ধতি।
খ) ছত্রাক দমন (পাউডারি মিলডিউ):
পাতায় সাদা পাউডারের মতো আস্তরণ দেখা দিলে নিম তেলের মিশ্রণ ১৫, ৪০ ও ৫০ দিনের মাথায় স্প্রে করতে হবে। এটি পরিবেশবান্ধব এবং সাশ্রয়ী সমাধান।
কৃষি সুত্র পরামর্শ: রোগ পোকা বুঝতে অসুবিধা হলে রোগাক্রান্ত গাছটি শেকড় সহ তুলে নিয়ে গিয়ে নিকটবর্তী কৃষি বিভাগে গিয়ে কৃষি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করুন ।
৮. মটরশুঁটি চাষ পদ্ধতি থেকে উৎপাদন ও আয়
সঠিক পরিচর্যা করলে বিঘা প্রতি ২-৩ কুইন্টাল পর্যন্ত শুকনো দানা এবং ৩-৪ কুইন্টাল শুকনো গোখাদ্য পাওয়া যায়। যারা স্থানীয় মাঠ মটর চাষ করেন, তাদের ফলন সাধারণত ৮০-১২০ কেজি পর্যন্ত হয়। সবুজ মটরশুঁটি হিসেবে বিক্রি করলে বাজার মূল্য অনেক বেশি পাওয়া যায়, যা মটর চাষকে একটি সফল অর্থকরী ফসলে পরিণত করে।
৯. শস্যচক্রে মটর চাষের উপরি লাভ
নিবিড় চাষের ফলে জমির উর্বরতা কমে গেলে মটরশুঁটি চাষ পদ্ধতি মাটির জন্য সঞ্জীবনী হিসেবে কাজ করে।
- নাইট্রোজেন সঞ্চয়: মটরের শিকড় বাতাস থেকে নাইট্রোজেন সংগ্রহ করে মাটিতে জমা করে। ১ বিঘা মটর চাষে প্রায় ৪-৫ কেজি জৈব নাইট্রোজেন জমিতে জমা হয়, যা প্রায় ৮-৯ কেজি ইউরিয়া সারের সমান।
- মাটির স্বাস্থ্য: এটি মাটির গভীর স্তর থেকে পুষ্টি তুলে এনে ওপরের স্তরে জমা করে, ফলে পরবর্তী ফসলে সারের খরচ অনেক কমে যায়।
১০. উপসংহার
পরিশেষে আমারা বলতে পারি অল্প খরচে এবং বৈজ্ঞানিক মটরশুঁটি চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করে কৃষকরা খুব সহজেই নিজেদের ভাগ্যবদল করতে পারেন। মটর শাক থেকে শুরু করে কচি মটরশুঁটি এবং শুকনো মটর—প্রতিটি পর্যায়েই এটি একটি লাভজনক ফসল। তাই এই রবি মরশুমে পতিত জমিতে মটর চাষ শুরু করে মাটির উর্বরতা রক্ষার পাশাপাশি নিজের আয় নিশ্চিত করুন।
১১. সচরাচর জিজ্ঞাস্য প্রশ্নাবলী (FAQ)
প্রশ্ন: মটরশুঁটি চাষ পদ্ধতি-তে কোন সময়ে সেচ দেওয়া সবচেয়ে জরুরি?
উত্তর: ফুল আসার সময় এবং শুঁটিতে দানা পুষ্ট হওয়ার সময় সেচ দেওয়া সবচেয়ে জরুরি।
প্রশ্ন: মটর চাষে কি ইউরিয়া সার বেশি লাগে?
উত্তর: না, কারণ মটর গাছ নিজেই বাতাস থেকে নাইট্রোজেন সংগ্রহ করতে পারে। রাইজোবিয়াম জীবাণুসার ব্যবহার করলে ইউরিয়া ছাড়াই ভালো ফলন পাওয়া যায়।
প্রশ্ন: পাউডারি মিলডিউ রোগ চিনব কীভাবে?
উত্তর: গাছের পাতা বা ডাঁটায় যদি সাদা পাউডারের মতো আস্তরণ দেখা যায়, তবে বুঝবেন এটি পাউডারি মিলডিউ। এটি সঠিক মটরশুঁটি চাষ পদ্ধতি-র মাধ্যমে নিম তেল স্প্রে করে দমন করা যায়।
তথ্য সুত্র
- ভারতীয় ডাল গবেষণা কেন্দ্র (ICAR-IIPR) ভারত সরকার ।
- বিধান চন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (BCKV)










