
১. সূচনা: আমাদের উঠোন কি কেবলই আগাছার আস্তরণ?
বন্ধুরা, আমরা কি কখনো আমাদের বাড়ির পেছনের বা সামনের অব্যবহৃত পড়ে থাকা জমিটার দিকে তাকিয়ে ভেবেছি—এটি আমাদের পরিবারের জন্য একটি ছোটখাটো হসপিটাল হতে পারত? আমি যখন প্রথম আমার এক বন্ধুর উঠোনে গিয়ে দাঁড়ালাম, দেখলাম সেখানে সজনে গাছ মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, লতায় ঝুলছে লাউ, আর মাটির নিচে লুকানো আদা-হলুদ। তখন বুঝলাম, আমরা আসলে কতটা ভুল করছি। আমরা ভাবি বাজার থেকে দামি চকচকে সবজি কিনে আনাই বুঝি আভিজাত্য। কিন্তু আজ আমরা জানব, কেন আমাদের প্রতিটি বাড়িতে একটি করে পুষ্টি বাগান মডেল থাকা জরুরি। এটি কেবল শখের বাগান নয়, বরং এই নিউট্রি গার্ডেন তৈরির নিয়ম জানা থাকলে আপনিও আপনার পরিবারকে একটি সুস্থ জীবনের লড়াইয়ে জয়ী করতে পারবেন।
কেন করব? বিষাক্ত থালা বনাম অপুষ্টির লড়াই
আমরা এখন একটি অদ্ভুত সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের কৃষকরা দিনরাত পরিশ্রম করছেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, বাজারে বিক্রির জন্য তারা যে ফসল উৎপাদন করছেন, তাতে দেদারসে রাসায়নিক সার ও বিষাক্ত কীটনাশক প্রয়োগ করছেন। আর সবচেয়ে কষ্টের কথা কি জানেন? সেই কৃষক নিজেও জানেন না যে তিনি নিজের পরিবারের পাতেও একই বিষ তুলে দিচ্ছেন।
আজ ভারতে ‘ক্যান্সার ট্রেন’-এর গল্প কারো অজানা নয়। পাঞ্জাব থেকে রাজস্থানগামী সেই ট্রেনের প্রতিটি যাত্রীই প্রায় রাসায়নিক কৃষির বলি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বারবার আমাদের সতর্ক করছে ‘লুকানো ক্ষুধা‘ বা মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতি নিয়ে। আমাদের শিশুরা অপুষ্টিতে ভুগছে, নারীরা রক্তাল্পতায় (Anemia) শেষ হয়ে যাচ্ছেন। আমরা কি এভাবেই হাত গুটিয়ে বসে থাকব? না। ভারত সরকারের NRLM (National Rural Livelihood Mission) এখন এই পুষ্টি বাগান মডেল বা নিউট্রি গার্ডেন-কে একটি সামাজিক আন্দোলন হিসেবে গ্রহণ করেছে। চলুন, আজ আমরা বন্ধু হিসেবে শিখি কীভাবে নিজের উঠোনকে একটি সুস্থ জীবনের ভাণ্ডার করে তোলা যায়।
কৃষি সুত্র পরামর্শ: বাড়িতে ছোট্ট একটি জায়গা থেকে নিয়মিত পুষ্টি বজায় রাখতে ও বাণিজ্যিক ভাবে চাষ করতে ঝিনুক মাশরুম চাষ করতে এখানে ক্লিক করুন।
২. পুষ্টি বাগান এর উদ্দেশ্য: আপনার উঠোন হোক আপনার ওষুধের দোকান
এতক্ষণ আমরা জানলাম কেন আমরা চিন্তিত, এবার আমরা জানব এই পুষ্টি বাগান মডেল করার আসল উদ্দেশ্যগুলো কী কী। শুধু গাছ লাগানোই এর কাজ নয়, এর পেছনে রয়েছে গভীর বৈজ্ঞানিক ও অর্থনৈতিক দর্শন। আমি নিজেও আমার উঠোনে একটি পুষ্টি বাগান মডেল করেছি।
- পুষ্টিগত স্বয়ংসম্পূর্ণতা: আপনার পরিবার যেন সারা বছর ভিটামিন ও খনিজে ভরপুর খাবার পায়।
- বাজার নির্ভরতা কমানো: বাজারে সবজির দাম বাড়লে যেন আপনার কপালে চিন্তার ভাঁজ না পড়ে।
- রক্তাল্পতা দূরীকরণ: বিশেষ করে গর্ভবতী মা ও শিশুদের রক্তে হিমোগ্লোবিন বাড়াতে দেশি ও পুষ্টিকর সবজির জোগান দেওয়া।
- বর্জ্য থেকে সম্পদ: রান্নাঘরের ফেলে দেওয়া জল ও আবর্জনাকে সারে রূপান্তরিত করা।
৩. পরিকল্পনা এবং কৌশলগত স্থান নির্বাচন: কোথায় শুরু করবেন?
আমরা শিখলাম কেন করব, এবার আমরা করব বাগান তৈরির প্রথম কাজ—স্থান নির্বাচন। বন্ধুর মতো পরামর্শ দিচ্ছি, হুট করে যেকোনো জায়গায় গর্ত খুঁড়বেন না।
- নৈকট্য: বাগানটি অবশ্যই বাড়ির কাছাকাছি হতে হবে। যাতে বাড়ির মা-বোনেরা রান্নার ফাঁকে বা অবসরে এর যত্ন নিতে পারেন।
- সূর্যালোক: দিনে অন্তত ৬ ঘণ্টা সরাসরি রোদ পায় এমন জায়গা বেছে নিন। বড় গাছের ছায়ায় শাকসবজি ভালো হয় না।
- আকার: সাধারণত ২৫-৩০ বর্গমিটার জায়গা একটি আদর্শ পুষ্টি বাগান মডেল-এর জন্য যথেষ্ট। তবে জায়গা কম থাকলেও চিন্তার কিছু নেই, আমরা ‘বহুস্তরীয় চাষ’ পদ্ধতিতে এগোব।
- বেড়া দেওয়া: আপনার কষ্ট করে লাগানো গাছ যেন গবাদি পশু নষ্ট না করে, তাই সীমানায় সজনে বা লেবু গাছ দিয়ে একটি ‘লাইভ বেড়া’ তৈরি করুন।
৪. বৈজ্ঞানিক ক্যানোপি ব্যবস্থাপনা ও দিকনির্দেশনা: রোদ-ছায়ার সমীকরণ
এখন আমরা জানব কীভাবে বিজ্ঞানসম্মতভাবে গাছ সাজাতে হয়। এটি না জানলে আপনার বাগানের ছোট গাছগুলো বড় গাছের ছায়ায় মরে যাবে।
- উত্তর-পশ্চিম ও পশ্চিম দিক: এই দিকে লাগান লম্বা ও স্থায়ী গাছ যেমন—সজনে, পেয়ারা বা আতা। এতে উত্তরের ঠান্ডা হাওয়া আটকাবে এবং ছোট সবজির ওপর দীর্ঘ ছায়া পড়বে না।
- পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব দিক: এই দিকটি ফাঁকা রাখুন বা ছোট গাছ যেমন—পেঁপে, লেবু বা কলা লাগান। সকালের নরম রোদ যেন বাগানের ভেতরে সরাসরি প্রবেশ করতে পারে।
৫. ফসলের বৈচিত্র্য এবং ঐতিহ্যবাহী বীজের জাদু
আমরা পুষ্টি বাগান মডেল সাজাতে শিখলাম, এবার আমরা জানব কী বীজ বপন করব। ভুলেও বাজার থেকে হাইব্রিড বা রাসায়নিক মেশানো বীজ আনবেন না। আমরা ব্যবহার করব আমাদের মা-ঠাকুরমাদের আমলের সেই ঐতিহ্যবাহী দেশি বীজ। আমরা মূলত পুষ্টি বাগান করতে গিয়ে ভারত সরকারের প্রাকৃতিক কৃষি মিশনের নির্দেশিকা অনুসরণ করে পুষ্টি কর খাদ্য উৎপাদন এর কৌশল অবলম্বন করব।
দেশি বীজে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি এবং পুষ্টিগুণ অনেক বেশি। একবার দেশি বীজ দিয়ে পুষ্টি বাগান মডেল শুরু করলে পরের বছরের জন্য আপনি নিজেই বীজ সংরক্ষণ করতে পারবেন। মনে রাখবেন, বীজের ওপর আপনার অধিকার থাকা মানেই হলো আপনার খাদ্যের ওপর আপনার সার্বভৌমত্ব।
৬. আদর্শ পুষ্টি বাগান মডেল এর নকশা বা লেআউট
এতক্ষণ আমরা পরিকল্পনা করেছি, এবার আমরা কাজে নামব। আপনার উঠোনের গঠন অনুযায়ী আমরা দুটি পুষ্টি বাগান মডেল অনুসরণ করতে পারি:
ক) আয়তক্ষেত্রাকার পুষ্টি বাগান মডেল (সাত-বেড পদ্ধতি)
যদি আপনার জায়গা লম্বাটে হয়, তবে সাতটি সমান্তরাল বেড তৈরি করুন। এই সাতটি বেড সপ্তাহের সাত দিনের প্রতীক। প্রতিদিন একটি করে বেড থেকে টাটকা সবজি আপনার রান্নাঘরে যাবে। একেকটি বেড ১০-২০ ফুট লম্বা এবং ৩-৪ ফুট চওড়া হতে পারে।
খ) মান্ডালা বা বৃত্তাকার মডেল (Mandala Model)
যাদের বাড়ির আশেপাশে জায়গা তুলনামূলক কম বা যারা রান্নাঘরের বর্জ্য জল এবং আবর্জনাকে সবচেয়ে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে চান, তাদের জন্য এই বৃত্তাকার বা মান্ডালা পুষ্টি বাগান মডেল-টি হলো সেরা সমাধান। এটি কেবল একটি বাগান নয়, এটি একটি জীবন্ত পুষ্টি চক্র।
১. কেন্দ্রীয় পুষ্টি-গর্ত (Nutri-Pit): এবার আমরা জানব এই পুরো ব্যবস্থার ‘ইঞ্জিন’ সম্পর্কে। একে বলা হয় পুষ্টি-গর্ত। এটি আপনার নিউট্রি গার্ডেন বা পুষ্টি বাগানের অর্থনৈতিক লাভবর্জ্য ব্যবস্থাপনার মূল কেন্দ্র।
- ধূসর-জল (Grey-water) পুনর্ব্যবহার: আমাদের বড় সমস্যা হলো জলের অভাব। কিন্তু আমরা করব বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। রান্নাঘরের বাসন ধোয়া জল সরাসরি ড্রেনে না ফেলে এই পুষ্টি-গর্তে প্রবাহিত করুন। এতে মাটির আর্দ্রতাও বজায় থাকবে এবং বর্জ্য দ্রুত পচবে।
- নির্মাণ: বাগানের মাঝখানে বা সুবিধাজনক স্থানে ৩x৩x৩ ফুটের একটি গর্ত খুঁড়ুন।
- বর্জ্যের স্তর: প্রতিদিনের রান্নার খোসা, শুকনো পাতা ও পশুর বিষ্ঠা এখানে স্তরে স্তরে জমা করুন। পচে গিয়ে এটি যে ‘হিউমাস‘ তৈরি করবে, তা বাজারের যেকোনো সারের চেয়ে হাজার গুণ শক্তিশালী।
২. আর্দ্রতা ও পুষ্টির স্বাভাবিক প্রবাহ: এই গর্তে থাকা বর্জ্য যখন ধীরে ধীরে পচতে শুরু করে, তখন এটি মাটির নিচ দিয়ে চারপাশের মাটিতে পুষ্টি এবং আর্দ্রতা ছড়িয়ে দেয়। ফলে গাছের গোড়ায় আলাদা করে সার দেওয়ার প্রয়োজন হয় না, গাছ নিজেই তার প্রয়োজনীয় খাবার গর্তের চারপাশ থেকে টেনে নেয়।
৩. রোপণ বলয়: গর্তটিকে কেন্দ্র করে বৃত্তাকারে ফসলের সারি সাজানো হয়। বিন্যাসটি হয় এমন:
সবচেয়ে ভেতরের বলয়: এখানে ছোট এবং নরম শাকসবজি (যেমন—পালং, লাল শাক বা ধনে পাতা) লাগানো হয়, যা গর্তের আর্দ্রতা সরাসরি পায়।
মাঝের বলয়: এখানে মাঝারি উচ্চতার সবজি (যেমন—টমেটো, লঙ্কা বা বেগুন) লাগানো হয়।
সবচেয়ে বাইরের বলয়: এখানে লম্বা ও স্থায়ী গাছ (যেমন—পেঁপে বা কলা) লাগানো হয়, যা পুরো বাগানের সীমানা রক্ষা করে।

৭. বহুস্তরীয় চাষ (Multilayer Farming): এক জমিতে পাঁচ রকমের ফসল
আমরা তো জায়গার অভাব নিয়ে ভাবছিলাম, তাই না? এবার আমরা করব এমন এক জাদু চাষ, যেখানে এক ইঞ্চি জমিও নষ্ট হবে না। একেই বলে বহুস্তরীয় পুষ্টি বাগান চাষ।
- স্তর ১ (ভূগর্ভস্থ): মাটির নিচে হবে আদা, হলুদ বা ওল। এরা ছায়া পছন্দ করে।
- স্তর ২ (ভূমি স্তর): মাটির ওপরে ছড়িয়ে থাকবে পালং শাক, লাল শাক বা ধনে পাতা। এরা মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখবে।
- স্তর ৩ (মাঝারি স্তর): একটু উঁচুতে থাকবে টমেটো, লঙ্কা, বেগুন বা ঢ্যাঁড়স।
- স্তর ৪ (উল্লম্ব স্তর): মাচায় বা বেড়া দিয়ে তুলে দিন লাউ, কুমড়ো বা শিম।
- স্তর ৫ (বহুবর্ষজীবী): সবার উপরে ডালপালা মেলবে পেঁপে ও সজনে।
এইভাবে একটি ছোট পুষ্টি বাগান মডেল থেকেই আপনি কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন এবং ভিটামিনের সমাহার পাবেন।
কখন কোন সবজি রোপণ করবেন তার জন্যে ১২ মাস সবজি চাষ তথ্য জানতে এখানে ক্লিক করুন ।
৮. আন্তঃ-বেড ব্যবস্থাপনা এবং সম্পদ সাইক্লিং
এতক্ষণ আমরা জানলাম কীভাবে রোপণ করতে হয়, এবার আমরা জানব কীভাবে এই বেডগুলোর যত্ন নিতে হয়। বেডের মাঝখানের পথগুলো কেবল হাঁটার জন্য নয়, এখান থেকেই আপনি আগাছা পরিষ্কার করবেন এবং গাছের গোড়ায় যত্ন নেবেন। যখন একটি ফসল তোলা হয়ে যাবে, সেই শূন্য জায়গায় সাথে সাথে অন্য একটি ফসলের চারা লাগিয়ে দিন। আপনার নিউট্রি গার্ডেন বা পুষ্টি বাগানের অর্থনৈতিক লাভ যেন বছরের একদিনও খালি না থাকে।
৯. কৃষি-পুষ্টি বাগানে সমন্বিত প্রাণিসম্পদ ও হাঁস-মুরগি ব্যবস্থাপনা
বন্ধুরা, আমরা তো শাকসবজি দিয়ে ভিটামিনের ব্যবস্থা করলাম, কিন্তু প্রোটিন ছাড়া কি শরীর বাঁচে? বিশেষ করে আমাদের দেশে শিশুদের অপুষ্টি ও মায়েদের রক্তাল্পতা দূর করতে পশু প্রোটিন অপরিহার্য। তাই আমরা শিখলাম শাকসবজি চাষ, এবার আমরা করব সমন্বিত কৃষি।
আপনার পুষ্টি বাগান মডেল তখনই পূর্ণতা পাবে যখন সেখানে ছোট ছোট মুরগি বা ছাগল থাকবে। এটি একটি ‘বৃত্তাকার জৈব-অর্থনীতি’। অর্থাৎ, বাগানের ফেলে দেওয়া পাতা মুরগি খাবে, আর মুরগির বিষ্ঠা হবে আপনার সবজির শ্রেষ্ঠ সার।
- পোল্ট্রি ব্যবস্থাপনা: বাগানের এক কোণে উঁচু ও শুষ্ক জায়গায় ছোট একটি মুরগির ঘর তৈরি করুন। দেশি উন্নত জাতের মুরগি পালন করুন যারা বাগান থেকে ক্ষতিকর পোকা ও লার্ভা খেয়ে আপনার বাগানকে প্রাকৃতিকভাবে সুরক্ষিত রাখবে।
- সার উৎপাদন: মুরগির বিষ্ঠা নাইট্রোজেন ও ফসফরাসের ভাণ্ডার। এটি সরাসরি প্রয়োগ না করে [কম্পোস্ট সার তৈরির নিয়ম] মেনে পচিয়ে প্রয়োগ করলে মাটির উর্বরতা জাদুর মতো বেড়ে যাবে।
- ছাগল পালন: যাদের একটু বেশি জায়গা আছে, তারা ছাগল পালন করতে পারেন। সীমানায় লাগানো সজনে বা সুবাবুল গাছের পাতা হবে এদের বিনা মূল্যের পুষ্টিকর খাদ্য।
১০. মালচিং (Mulching): মাটির ত্বক রক্ষা করা
আমরা জানলাম খাবার তৈরির কথা, এবার আমরা করব মাটির সুরক্ষা। রোদে মাটি ফেটে যাওয়া বা আগাছা হওয়া রুখতে আচ্ছন্ন পদ্ধতি বা মালচিং আমাদের পরম বন্ধু।
পদ্ধতি: শুকনো খড়, ঘাস বা কচুরিপানা দিয়ে গাছের গোড়ার মাটি ঢেকে দিন।
সুবিধা: এতে আপনার বাগানে জল দেওয়ার প্রয়োজন ৪০% কমে যাবে এবং মাটির উপকারি অণুজীবগুলো রোদে মারা যাবে না। অবশেষে এই মালচিং পচে গিয়ে মাটিতে জৈব কার্বন যোগ করবে।
১১. মাটির স্বাস্থ্য ও প্রাকৃতিক তরল সার (জীবামৃত ব্যাবহার)
বন্ধুরা, আমরা তো জানি সুস্থ মাটি মানেই সুস্থ শরীর। আমরা শিখলাম মাটির সুরক্ষা, এবার আমরা জানব মাটির ‘ইমিউনিটি’ বাড়ানোর উপায়। আমরা কোনো রাসায়নিক সার ব্যবহার করব না, কারণ এটি মাটি ও আমাদের শরীর উভয়কেই তিলে তিলে ধ্বংস করে।
- জীবামৃত: এটি একটি অলৌকিক তরল। গোবর, গোমূত্র, গুড় আর ডালের আটার এই মিশ্রণ আপনার বাগানের ফলন দ্বিগুণ করে দেবে।
- বীজমৃত: বীজ রোপণের আগে এটি দিয়ে শোধন করে নিলে চারা ধসা রোগ হবে না।
কৃষি সুত্র পরামর্শ: এই পদ্ধতিগুলো বিস্তারিত জানতে আমাদের [জীবামৃত ও বীজামৃত তৈরির গাইড] পড়তে পারেন।
১২. মৌসুমী ফসলের ক্যালেন্ডার ও কীটপতঙ্গ ব্যবস্থাপনা
আমরা চিন্তিত ছিলাম পোকা নিয়ে, তাই না? এবার আমরা করব প্রাকৃতিক উপায়ে বালাই নিয়ন্ত্রণ। রাসায়নিক বিষ প্রয়োগ মানেই নিজের পরিবারকে বিষ খাওয়ানো।
- ফাঁদ ফসল (Trap Crop): সবজি বিছানার চারপাশে গাঁদা গাছ লাগান। এতে ক্ষতিকর পোকা সবজিতে না গিয়ে গাঁদা ফুলে আটকে যাবে।
- বোটানিক্যাল নির্যাস: নিমাস্ত্র ও অগ্নিঅস্ত্রের কথা নিশ্চয়ই মনে আছে? নিম পাতা ও লঙ্কার এই মিশ্রণ স্প্রে করলে পোকা আপনার পুষ্টি বাগান থেকে ১০০ হাত দূরে থাকবে।
- ফসলের ক্যালেন্ডার: বর্ষায় (খরিফ) লাগান ঢ্যাঁড়স ও লতা জাতীয় সবজি। শীতে (রবি) হোক পালং, টমেটো ও গাজর। আর গ্রীষ্মে (জায়েদ) কুমড়ো ও শসা। আপনার বাগান যেন কখনোই খালি না থাকে।
কৃষি সুত্র পরামর্শ এই পদ্ধতিগুলো বিস্তারিত জানতে আমাদের [নিমাস্ত্র ও অগ্নিঅস্ত্র তৈরি গাইড] পড়তে পারেন।
১৩. প্লেটে “পুষ্টিগত বৈচিত্র্য” ও ফসল সংগ্রহ
এতক্ষণ তো পুষ্টি বাগান মডেল কাজ করলাম, এবার আমরা শিখব খাওয়ার বিজ্ঞান। আপনার দুপুরের থালায় অন্তত পাঁচটি রঙের সবজি থাকা চাই—সবুজ, হলুদ, লাল, সাদা এবং বেগুনি।
সবুজ পাতা থেকে পাবেন আয়রন, হলুদ ফল থেকে ভিটামিন-এ, আর ডাল জাতীয় শস্য থেকে প্রোটিন। আপনার নিউট্রি গার্ডেন আপনাকে এই সবকটি উপাদান একই সাথে সরবরাহ করতে সক্ষম।
১৪. ফসল কাটার পর ও বীজ সার্বভৌমত্ব: স্বনির্ভরতার স্বপ্ন
আমরা জানলাম চাষবাসের সব, এবার আমরা জানব আগামীর প্রস্তুতি। সবচেয়ে সুস্থ ও বড় ফলটি নিজের খাবারের জন্য না রেখে বীজের জন্য রেখে দিন। রোদে শুকিয়ে ছাই বা নিম পাতা দিয়ে মাটির পাত্রে সংরক্ষণ করুন। এতে আপনাকে আর কোনোদিন বীজের জন্য অন্যের মুখাপেক্ষী হতে হবে না। আপনার পুষ্টি বাগান মডেল (Nutri Garden) হবে আপনার স্বনির্ভরতার প্রতীক।
১৫. নিউট্রি গার্ডেন বা পুষ্টি বাগানের অর্থনৈতিক লাভ
বন্ধুরা, আমরা করব একটি ছোট হিসাব। একজন মধ্যবিত্ত পরিবার মাসে অন্তত ১,০০০ থেকে ১,৫০০ টাকার সবজি কেনে। এই টাকা যদি বাঁচে, তবে বছরে আপনার ১৫-২০ হাজার টাকা সাশ্রয় হবে। এই টাকা দিয়ে আপনি সন্তানের শিক্ষার খরচ জোগাতে পারেন। সবচেয়ে বড় লাভ হলো—লক্ষ টাকার চিকিৎসা খরচ বেঁচে যাবে, যা রাসায়নিক বিষ খাওয়ার ফলে হতে পারত।
১৬. উপসংহার: একটি নতুন পৃথিবীর অঙ্গীকার
আজ আমরা শিখলাম কীভাবে একটি অব্যবহৃত জমিকে প্রাণের ভাণ্ডারে রূপান্তর করা যায়। পুষ্টি বাগান মডেল বা নিউট্রি গার্ডেন তৈরির নিয়ম কেবল চাষাবাদ নয়, এটি একটি জীবন দর্শন। আমরা জানলাম কীভাবে প্রকৃতি আমাদের শেখায় একে অপরের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতে।
আমার বন্ধু হিসেবে আপনাকে অনুরোধ করব, আজই আপনার উঠোনের একটি কোণে অন্তত একটি সজনে বা পেঁপে চারা রোপণ করুন। মনে রাখবেন, আপনার সচেতনতাই পারে আপনার পরিবারকে বিষমুক্ত অন্ন আর সুন্দর স্বাস্থ্য উপহার দিতে। আসুন, আমরা অঙ্গীকার করি—নিজের অন্ন নিজেই উৎপাদন করব, সুস্থ থাকব এবং আগামীর প্রজন্মকে একটি সুন্দর পৃথিবী উপহার দেব।
কৃষি সুত্র পরামর্শ: কৃষি বিষয়ে যেকোন সমস্যা সমাধানের জন্যে নিকটবর্তী ব্লক কৃষি বিভাগ বা কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রে যোগাযোগ করুন। এছাড়াও যদি আপনি বাড়িতে বসেই ভারত সরকার কৃষি বিভাগের বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলতে চান তবে আপনি সকল ৯ টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত টোল ফ্রী নম্বরে ফোন করে নিজ ভাষাতে কথা বলেই আপনার সমস্যা সহজেই সমাধান করতে পারেন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
১. পুষ্টি বাগান মডেল করতে কত সময় লাগে?
উত্তর: পুষ্টি বাগান মডেল প্রতিদিন মাত্র ৩০ মিনিট সময় দিলেই আপনি একটি চমৎকার বাগান পরিচালনা করতে পারেন।
২. ছাদ বাগান আর পুষ্টি বাগানের তফাৎ কী?
উত্তর: ছাদ বাগান করা হয় ছাদে টবে, আর পুষ্টি বাগান মডেল সাধারণত বাড়ির উঠোনে বা মাটির ওপর করা হয় যেখানে পশুপালন ও সবজি চাষের এক চমৎকার সমন্বয় থাকে।
৩. আমার জমি খুব ছোট, আমি কিভাবে পুষ্টি বাগান করব?
উত্তর: জমি ছোট হলেও সমস্যা নেই। আপনি আমাদের ‘বহুস্তরীয় চাষ’ পদ্ধতি অনুসরণ করে অল্প জায়গায় অনেক বেশি ফলন পেতে পারেন।
৪. পুষ্টি বাগান বা নিউট্রি গার্ডেন আসলে কী?
উত্তর: পুষ্টি বাগান হলো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বাড়ির আশেপাশে বা উঠোনের অল্প জায়গায় পরিকল্পিতভাবে শাকসবজি, ফল এবং প্রয়োজনে হাঁস-মুরগি বা গবাদি পশু পালন করা। এর মূল লক্ষ্য হলো বাজার থেকে রাসায়নিক বিষযুক্ত সবজি না কিনে নিজের বাড়িতেই সারা বছরের প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ এবং প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবারের জোগান নিশ্চিত করা।
৫. পুষ্টি বাগান মডেল করতে কতটুকু জায়গার প্রয়োজন হয়?
উত্তর: আদর্শ পুষ্টি বাগান মডেল জন্য সাধারণত ২৫-৩০ বর্গমিটার জায়গা যথেষ্ট। তবে আপনার জায়গা কম থাকলে ‘বহুস্তরীয় চাষ’ (Multilayer Farming) পদ্ধতিতে উল্লম্বভাবে (Vertical) মাচা ব্যবহার করে অত্যন্ত ছোট জায়গাতেও একটি পরিবারের পুষ্টির চাহিদা মেটানো সম্ভব।
৬. একটি পরিবারের জন্য পুষ্টি বাগানে কী কী গাছ লাগানো জরুরি?
উত্তর: পুষ্টির বৈচিত্র্য বজায় রাখতে ৫টি রঙের সবজি লাগানো উচিত। যেমন—ভিটামিন-এ এর জন্য পেঁপে বা গাজর, আয়রনের জন্য পালং বা কচু শাক, প্রোটিনের জন্য শিম বা মটরশুঁটি এবং পুষ্টির ভাণ্ডার হিসেবে একটি সজনে গাছ অবশ্যই থাকা উচিত।
তথ্য সুত্র ও কৃতজ্ঞতা
- NRLM (National Rural Livelihood Mission)ভারত সরকার।
- ভারতীয় কৃষি অনুসন্ধান কেন্দ্র(ICAR)
- প্রাকৃতিক কৃষি মিশন (NMNF)



![বস্তায় আদা চাষ পদ্ধতি: ১টি বস্তায় ৩ কেজি আদা পাওয়ার ৭টি গোপন কৌশল [২০২৬ আপডেট] বস্তায় আদা চাষ পদ্ধতি ও মাটি তৈরির সঠিক নিয়ম - ১টি বস্তায় ৩ কেজি ফলন](https://krishisutra.com/wp-content/uploads/2026/02/bostay-ada-chash-podhati-krishi-sutra-300x169.webp)






