আধুনিক রাজমা চাষ পদ্ধতি: অর্থকরী ফসল হিসেবে রাজমা চাষের সম্পূর্ণ গাইডলাইন

রাজমা চাষ পদ্ধতি
রাজমা চাষ

শীতকালীন ডাল শস্যের মধ্যে রাজমা চাষ পদ্ধতি বর্তমানে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও লাভজনক। রাজমা কেবল পারিবারিক পুষ্টির চাহিদাই মেটায় না, বরং এটি একটি অত্যন্ত দামী অর্থকরী ফসল। বাংলার আবহাওয়া ও মাটি রাজমা চাষের জন্য খুবই উপযুক্ত। সঠিক নিয়ম জানলে এই চাষ থেকে সাধারণ ডালের তুলনায় অনেক বেশি মুনাফা অর্জন করা সম্ভব।

১. রাজমা পরিচিতি ও বৈশিষ্ট্য

রাজমা হলো একটি মরশুমি শুঁটি জাতীয় ঝোপালো উদ্ভিদ। এটি দেখতে অনেকটা দানা জাতের বরবটির মতো।

  • গাছের গঠন: গাছগুলো সাধারণত ৬০-১০০ সেমি পর্যন্ত লম্বা হয়।
  • পাতা ও শুঁটি: এর পাতা হালকা সবুজ রঙের হয়। শুঁটিগুলো ১০-১৫ সেমি লম্বা এবং কিছুটা চ্যাপ্টা ধরণের হয়।
  • দানার গুণাগুণ: প্রতিটি শুঁটিতে ৮-১০টি লম্বাটে দানা থাকে। এই দানাগুলো সাদা ছাড়াও বিভিন্ন আকর্ষণীয় রঙের হয়ে থাকে।

২. রাজমার উন্নত জাত নির্বাচন

সফলভাবে রাজমা চাষ পদ্ধতি শুরু করতে হলে সঠিক জাত বেছে নেওয়া জরুরি। জনপ্রিয় কিছু জাত হলো:

  • PDR-14: এটি সমতলের জন্য আদর্শ।
  • উদয় ও জ্বালা: এই জাতগুলো উচ্চ ফলনশীল এবং মাত্র ১০০-১১০ দিনের মধ্যেই ফসল ঘরে তোলা যায়।

আড়ও দেখুন উন্নত খেসারি ডাল চাষ পদ্ধতি: পতিত জমিতে লাভের নতুন সম্ভাবনা

৩. জমি তৈরি ও মাটি নির্বাচন

রাজমা চাষ পদ্ধতি এর একটি বিশেষ অংশ চাষের জন্য জমি নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

  • মাটি: মাঝারি উঁচু জমি এবং দোঁয়াশ মাটি রাজমা চাষের জন্য সবচেয়ে ভালো।
  • সতর্কতা: মাটি যদি অতিরিক্ত ক্ষারধর্মী হয়, তবে ফলন ভালো হয় না। এছাড়া জমিতে অবশ্যই জল নিকাশের সুব্যবস্থা থাকতে হবে।

৪. বীজ বপনের সঠিক সময় ও হার

  • সময়: ১৫ অক্টোবর থেকে ১৫ নভেম্বর (পুরো কার্তিক মাস) রাজমা বীজ বোনার উপযুক্ত সময়।
  • বীজের হার: ছিটিয়ে বোনার ক্ষেত্রে বিঘা প্রতি (৩৩ শতক) প্রায় ৮-১০ কেজি বীজ লাগে। তবে আধুনিক সারিতে বোনার পদ্ধতিতে ৬-৮ কেজি বীজেই চমৎকার ফলন পাওয়া যায়।

৫. রোপণ দূরত্ব ও পদ্ধতি (সারি পদ্ধতি)

রাজমা চাষ পদ্ধতি ভালো ফলনের জন্য নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে রাজমা চাষ করা উচিত।

  • সারির দূরত্ব: এক সারি থেকে অন্য সারির দূরত্ব হবে ২৫-৩০ সেমি (বা ১০-১২ ইঞ্চি)।
  • গাছের দূরত্ব: সারিতে একটি বীজ থেকে অন্য বীজের দূরত্ব হবে ১০ সেমি (বা ৪ ইঞ্চি)।
  • গভীরতা: বীজ মাটির ৫-৭ সেমি (বা ২-৩ ইঞ্চি) গভীরে পুঁততে হবে।

৬. সুষম সার প্রয়োগ ও বীজ শোধন

রাজমা চাষে সারের সঠিক ব্যবহার ফলন বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

  • বীজ শোধন: বপনের আগে রাজমার জন্য নির্দিষ্ট ‘রাইজোবিয়াম’ জীবাণুসার মাখিয়ে নেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন।
  • মূল সার: রাজমা চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করে জমি তৈরির সময় প্রথম চাষে বিঘা প্রতি ৫-৭ কুইন্টাল জৈব সার (গোবর সার) এবং ১০-১২ কেজি সিঙ্গেল সুপার ফসফেট বা রক ফসফেট বা ডলোমাইট প্রয়োগ করতে হবে।

৭. সেচ ব্যবস্থাপনা

রাজমা চাষ পদ্ধতিতে জল জমানো যাবে না, তবে মাটিতে রস থাকা জরুরি।

সেচ পর্যায়: সাধারণত ঝুরঝুরে সরস মাটিতে বীজ বুনতে হয়। এরপর মোট তিনটি হালকা সেচের প্রয়োজন হয়:

  • প্রথম সেচ: বীজ বোনার ২৫-৩০ দিনের মাথায়।
  • দ্বিতীয় সেচ: ৫০-৬০ দিনের মাথায় (ফুল আসার আগে)।
  • তৃতীয় সেচ: ৯০-১০০ দিনের মাথায় (দানা পুষ্ট হওয়ার সময়)।

৮. রোগ ও পোকা দমন (প্রাকৃতিক ও রাসায়নিক ট্রিটমেন্ট)

রাজমায় রোগপোকা খুব একটা হয় না, তবে সতর্কতা হিসেবে রাজমা চাষ পদ্ধতিতে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া উচিত:

ক) প্রাকৃতিক বা জৈব পদ্ধতি (Natural Treatment):

নিমের নির্যাস: শুঁটি ছিদ্রকারী পোকা দেখা দিলে ১৫ শতাংশ নিম পাতার নির্যাস ব্যবহার করুন। ৭-১০ দিন অন্তর ২-৩ বার বিকেলের দিকে এটি স্প্রে করলে পোকার উপদ্রব কমে যায়।
ছাঁই প্রয়োগ: প্রাকৃতিকভাবে ছত্রাক রুখতে পাতায় কাঠের ছাঁই ছিটানো যেতে পারে।

খ) রাসায়নিক পদ্ধতি (Chemical Treatment):

যদি জাব পোকা বা মাকড়ের আক্রমণ তীব্র হয়, তবে ইমিডাক্লোপ্রিড (Imidacloprid) ১ লিটার জলে ০.৫ মিলি গুলে স্প্রে করুন।
গোড়া পচা বা ছত্রাক রুখতে ম্যানকোজেব (Mancozeb) ২ গ্রাম প্রতি লিটার জলে গুলে ব্যবহার করা যায়।

৯. সাথি ফসল হিসেবে রাজমা

রাজমা চাষের সাথে অন্যান্য রবি ফসল চাষ করে বাড়তি আয় করা সম্ভব। আলুর সাথে রাজমা চাষ অত্যন্ত জনপ্রিয়। এছাড়া তিসি, ধনে বা মেথির সাথেও রাজমা সাথি ফসল হিসেবে ভালো হয়।

আড়ও দেখুন বাকলা চাষ পদ্ধতি: গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন দিশা ও আধুনিক নির্দেশিকা

১০. উৎপাদন ও অর্থনৈতিক লাভ

  • ফলন: সঠিক পরিচর্যায় বিঘা প্রতি ১৫০-২০০ কেজি (১.৫ – ২ কুইন্টাল) শুকনো রাজমা দানা পাওয়া যায়।
  • বাজার মূল্য: বাজারে রাজমার চাহিদা প্রচুর। প্রতি কুইন্টাল রাজমা বর্তমানে ১০,০০০ থেকে ১২,০০০ টাকায় বিক্রি হয়। অর্থাৎ ১ বিঘা থেকে প্রায় ২০,০০০ – ২৪,০০০ টাকার দানা বিক্রি করা সম্ভব। এছাড়া কচি শুঁটি সবজি হিসেবে বিক্রি করেও আলাদা লাভ করা যায়।

১১. শুঁটি জাতীয় ফসল চাষে অতিরিক্ত সুবিধা (Soil Health)

শস্যচক্রে একবার রাজমার মতো শুঁটি জাতীয় ফসল চাষ করলে মাটির প্রভূত উন্নতি হয়:

  • নাইট্রোজেন জোগান: রাজমা চাষ পদ্ধতিতে রাজমার শিকড়ে থাকা রাইজোবিয়াম জীবাণু বাতাস থেকে নাইট্রোজেন সংগ্রহ করে মাটিতে জমা করে। দেখা গেছে, একবার চাষ করলে বিঘায় প্রায় ৪-৫.৫ কেজি নাইট্রোজেন মাটিতে জমা হয়, যা প্রায় ৮-৯ কেজি ইউরিয়া সারের সমান।
  • মাটির বিশ্রাম: নিবিড় চাষের ফলে মাটির উপরের স্তর দুর্বল হয়ে পড়ে। রাজমা মাটির গভীর স্তর থেকে খাদ্য সংগ্রহ করে, ফলে উপরের স্তরের মাটি বিশ্রাম পায় এবং পরের ফসলের জন্য উর্বর হয়ে ওঠে।

কৃষি সুত্র পরামর্শ

অল্প পরিশ্রমে এবং বিজ্ঞানসম্মত রাজমা চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করে যে কোনো কৃষক স্বাবলম্বী হতে পারেন। এটি কেবল মাটির স্বাস্থ্য ফেরায় না, বরং উচ্চ বাজার মূল্যের কারণে কৃষকের আর্থিক সমৃদ্ধিও নিশ্চিত করে। তাই এই রবি মরশুমে আপনার জমিতে রাজমা চাষ করে বাড়তি লাভ সুনিশ্চিত করুন।

চাষের পূর্বে আপনার নিকটবর্তী কৃষি বিভাগে কৃষি বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলে মাটি পরীক্ষা করিয়ে সার প্রয়োগ করুন এবং রোগ পোকা আক্রমণ হলে পরামর্শ নিয়ে ঔষধ প্রয়োগ করুন এতে কম খরচে উৎপাদন ভাল হবে এবং মাটির স্বাস্থ্য ভাল থাকবে ।

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

১. রাজমা বীজ কতদিন সংরক্ষণ করা যায়?

উত্তর: রাজমা বীজ পরবর্তী বছরের জন্য রাখা যায়, তবে বেশিদিন রাখলে এর অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা কমে যায়। তাই প্রতি বছর ফ্রেশ বীজ ব্যবহার করাই ভালো।

২. রাজমা কি সবজি হিসেবে খাওয়া যায়?

উত্তর: হ্যাঁ, রাজমার কচি শুঁটি অত্যন্ত পুষ্টিকর সবজি হিসেবে খাওয়া যায়।

৩. রাজমা চাষে জল জমে গেলে কী হবে?

উত্তর: রাজমা গাছ জল জমা একদম সহ্য করতে পারে না। জল জমে থাকলে গাছের গোড়া পচে যাবে এবং ফলন নষ্ট হবে।

৪. রাজমা চাষে ইউরিয়া সার কি খুব বেশি লাগে?

উত্তর: না, যেহেতু এটি নিজেই মাটিতে নাইট্রোজেন তৈরি করে, তাই ইউরিয়া সারের চাহিদা খুব কম থাকে।

তথ্য সুত্র

Spread the love

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top