টমেটো চাষ করার পদ্ধতি: উন্নত জাত, চারা তৈরি ও সার ব্যবস্থাপনা

আধুনিক ও শীতকালীন টমেটো চাষ করার পদ্ধতি (tomato chas korar poddhoti), উন্নত জাত, উপযুক্ত সময়, মাটি, বীজ নির্বাচন, বেড ও প্রো-ট্রে চারা তৈরি, মালচিং, সার প্রয়োগ ও উচ্চ উৎপাদন পরিচর্যা - Krishisutra
আধুনিক পদ্ধতিতে উন্নত জাতের টমেটো চাষ।

টমেটো আমাদের দেশের অন্যতম প্রধান ও লাভজনক একটি সবজি ফসল। সঠিক প্রযুক্তি, উর্বর মাটি এবং উন্নত জাত নির্বাচন করে চাষ করলে বিঘা প্রতি প্রচুর উৎপাদন পাওয়া সম্ভব। আজ আমরা টমেটো চাষ করার পদ্ধতি ( tomato chas korar poddhoti ) এবং এর আধুনিক পরিচর্যা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

২. টমেটো চাষের উপযুক্ত সময় ও জলবায়ু

সবজি হিসেবে টমেটো সারা বছর চাষ করা গেলেও শীতকালীন টমেটো চাষ পদ্ধতি সবচেয়ে সফল ও লাভজনক।

  • উপযুক্ত সময়: চারা রোপণের প্রধান তিনটি মরশুম হলো— জুলাই-আগস্ট (বর্ষাকালীন), অক্টোবর-নভেম্বর (শীতকালীন) এবং ফেব্রুয়ারি-মার্চ (গ্রীষ্মকালীন)।
  • তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা: টমেটো চাষের জন্য ২০° থেকে ২৫° সেলসিয়াস তাপমাত্রা আদর্শ।

৩. টমেটো চাষের জন্য কোন মাটি উপযোগী?

টমেটো যেকোনো মাটিতে জন্মালও ভালো ফলনের জন্য মাটি নির্বাচনের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় নজর দেওয়া দরকার:

  • মাটির ধরণ: ভালো জলনিকাশি ব্যবস্থাযুক্ত উর্বর দোআঁশ, বেলে-দোআঁশ বা এটেল-দোআঁশ মাটি সবচেয়ে উপযুক্ত।
  • মাটির pH মান: মাটির pH মান ৬.০ থেকে ৭.০-এর মধ্যে থাকা আদর্শ।

৪. টমেটো উন্নত জাত (ভারত ও বাংলাদেশের উচ্চফলনশীল জাত)

tomato chas korar poddhoti তে ভাল ফলন পেতে রোগপ্রতিরোধী ও উচ্চফলনশীল টমেটো উন্নত জাত নির্বাচন করা জরুরি।

ক. ভারতের প্রচলিত ও উচ্চফলনশীল জাত:

  • অর্ক রক্ষক ও অর্ক সম্রাট: এই জাতগুলি ট্রিপল ডিজিজ রেজিস্ট্যান্ট (টমেটো লিফ কার্ল ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়াল উইল্ট এবং আর্লি ব্লাইট প্রতিরোধে সক্ষম)।
  • অন্যান্য হাইব্রিড জাত: নামধারী (NS-501, NS-585), অভিনাশ-২, সিঞ্জেন্টা (TO-1458), স্বর্ণা ও ট্রিশুল।

খ. বাংলাদেশের প্রচলিত ও উচ্চফলনশীল জাত:

  • সরকারি ও উদ্ভাবিত জাত: বারি টমেটো-২ (রতন), বারি টমেটো-১৪, বারি টমেটো-১৫, বারি হাইব্রিড টমেটো-৫।
  • বেসরকারি ও হাইব্রিড জাত: বিজলী, সুন্দরবন, টাইটান, ইউএস-১৪৫।

৫. বীজ নির্বাচন পদ্ধতি ও শোধন

  • বীজ নির্বাচন: ভালো ফলনের জন্য লিফ কার্ল ও ভাইরাস রেজিস্ট্যান্ট (Leaf Curl & Virus Resistant) বীজ লাগানো চাষের জন্য উত্তম। এতে জমিতে ভাইরাসের আক্রমণ অনেকাংশে কম হয়।
  • বীজের পরিমাণ ও ওজন: ১ একর জমির জন্য প্রায় ২০ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয় (১০০০টি বীজের ওজন প্রায় ৪.০ গ্রাম)।

আড়ও পড়ুন ১ বিঘা জমিতে কতগুলি টমেটো চারা লাগবে কি দুরুত্ব লাগালে তার সুত্র জানুন।

৬. টমেটো চারা তৈরি পদ্ধতি (বেড পদ্ধতি ও প্রো-ট্রে পদ্ধতি)

সুস্থ ও সবল চারা হলো ভালো ফলনের মূল ভিত্তি। চারা প্রধানত দুটি উপায়ে তৈরি করা যায়:

১. ঐতিহ্যবাহী বেড পদ্ধতি:

জমি ভালোভাবে চাষ দিয়ে ৩ ফুট চওড়া ও ১০-১৫ সেমি উঁচু বেড তৈরি করে বীজ বপন করা হয়। ২৫-৩০ দিন পর চারা রোপণের উপযুক্ত হয়।

২. আধুনিক প্রো-ট্রে পদ্ধতি (Pro-Tray Method):

  • পদ্ধতি: প্লাস্টিকের প্রো-ট্রেতে সাবস্ট্রেট হিসেবে কোকোপিট ব্যবহার করে রক্ষিত বা প্রটেক্টেড নার্সারিতে চারা তৈরি করা হয়।
  • সুবিধা: এতে চারা নিখুঁত ও রোগমুক্ত থাকে। সাধারণত ২৪ থেকে ২৮ দিনের মধ্যে চারা মূল জমিতে রোপণের উপযোগী হয়ে যায়। গরমের দিনে প্লাস্টিক মালচিং পেপারে চারা লাগানোর ১৫ দিন আগে চারাকে শক্ত বা মজবুত করে নেওয়া দরকার।

৭. জমি তৈরি ও টমেটো চাষের আধুনিক পদ্ধতি

উচ্চ ফলন পেতে টমেটো চাষের আধুনিক পদ্ধতি এবং টমেটো চাষের উন্নত পদ্ধতি অনুসরণ করে জমি প্রস্তুত করা প্রয়োজন।

  • বেড তৈরি: মূল জমিতে ১০-১৫ সেমি উঁচু এবং ৯০ সেমি চওড়া বেড তৈরি করতে হবে। দুটি বেডের মাঝে ৪৫-৬০ সেমি গলি বা নালা রাখতে হবে। ৫০ মিটারের বেশি লম্বা বেড না করাই ভালো।

দূরত্ব ও রোপণ:

টমেটো চারা রোপণ দুরুত্ব টমেটোর জাত অনুসারে নির্ধারন করে কোম্পানী গুলি প্যাকেট এর গায়ে নির্দেশ করে থাকে সেই অনুসারে রোপণ করলে ভাল ফলন পাওয়া যায়। নিচে অর্ক রক্ষক ও অর্ক সম্রাট দুটি রোগ প্রতিরোধী উচ্চফলনশীল টমেটো জাতের রোপণ দুরুত্ব দেওয়া হল-

  • সারি থেকে সারির দূরত্ব: ৪.৫ থেকে ৫.০ ফুট।
  • গাছ থেকে গাছের দূরত্ব: বর্ষাকালে ২.৫ ফুট এবং খরিফ ও রবি মরশুমে ৩.০ ফুট রাখতে হবে।
  • বিঘা প্রতি প্রায় ১,১০০-১,৩০০ টি এবং একরে ৩,০০০-৩,৯৫০ টি চারা প্রয়োজন হয়।

৮. মালচিং পদ্ধতিতে টমেটো চাষ করার পদ্ধতি

বর্তমানে জল সাশ্রয় ও আগাছা নিয়ন্ত্রণের জন্য মালচিং পদ্ধতিতে টমেটো চাষ করার পদ্ধতি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও কার্যকরী।

  • মালচিং পেপার নির্বাচন: ১.২ মিটার চওড়া এবং ৩০ মাইক্রন পুরুত্বের সিলভার/ব্ল্যাক প্লাস্টিক মালচিং পেপার বেডের ওপর ভালোভাবে বিছিয়ে দিতে হয়।
  • রোপণ নিয়ম: মালচিং পেপারের ঠিক মাঝখানে ২৫ সেমি পর পর ফুটো করে ২৪-২৮ দিনের সুস্থ চারা রোপণ করতে হবে।
  • সুবিধা: মাটিতে আর্দ্রতা বজায় থাকে, আগাছা জন্মায় না এবং মাটির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে।

৯. টমেটো চাষ সার প্রয়োগ পদ্ধতি ও ফার্টিগেশন তালিকা

সুষ্ঠু পুষ্টি ব্যবস্থাপনার জন্য টমেটো চাষ সার প্রয়োগ পদ্ধতি নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো (১ একর বা প্রায় ৩ বিঘা জমির হিসাবে):

ক. জমি তৈরির সময় জৈব ও মূল সার:

  • পচা গোবর সার: প্রতি একরে ১ টন পচা গোবরের সাথে ১ কেজি ট্রাইকোডার্মা হারজিয়ানাম/সুডোমোনাস মিশিয়ে ছায়ায় ২১ দিন রেখে বেড তৈরির সময় ২৫০ কেজি প্রয়োগ করতে হবে।
  • মূল রাসায়নিক সার (NPK ৬০:৪৮:৬০ কেজি/একর): বেড তৈরির সময় ১৫-১৬-১৫ কেজি NPK (যেমন: ৬০ কেজি ক্যালসিয়াম অ্যাগ্রো/অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট অথবা ৭৫ কেজি অ্যামোনিয়াম সালফেট + ১০০ কেজি সিঙ্গেল সুপার ফসফেট + ২৫ কেজি মিউরেট অফ পটাশ) মাটিতে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে।

খ. ড্রিপ সেচ ও ফার্টিগেশন (জলদ্রবণীয় সার প্রয়োগ):

১৬ মিমি ইন-লাইন ড্রিপ পাইপ বিছিয়ে রোপণের ২১ দিন পর থেকে ১২৯ দিন পর্যন্ত মোট ৩৭ বার ড্রিপের মাধ্যমে সার (Fertigation) দিতে হবে। নিচে এক একর হিসেব ডোজ দেওয়া হল-

  • ২১ থেকে ৩৬ দিন (৬ বার): প্রতিবারে ২.০ কেজি NPK ১৯-১৯-১৯।
  • ৩৭ থেকে ৫৯ দিন (৭ বার): প্রতিবারে ৩.০ কেজি NPK ১৯-১৯-১৯ + ১.০ কেজি পটাশিয়াম নাইট্রেট (১৩-০-৪৫) + ১.০ কেজি ক্যালসিয়াম নাইট্রেট।
  • ৬০ থেকে ১২৯ দিন (২৪ বার): প্রতিবারে ৫.০ কেজি NPK ১৯-১৯-১৯ + ১.৫ কেজি পটাশিয়াম নাইট্রেট + ২.৫ কেজি ক্যালসিয়াম নাইট্রেট।
  • অণুখাদ্য স্প্রে: রোপণের ৪৫ দিন পর থেকে ১৫ দিন পর পর মোট ৩ বার অণুখাদ্য (যেমন: ‘সবজি স্পেশাল’) ৫ গ্রাম/লিটার জলে গুলে পাতায় স্প্রে করতে হবে।

১০. স্ট্যাকিং বা খুঁটি বাঁধার নিয়ম

  • পদ্ধতি: গাছ কিছুটা বড় হলে খুঁটি ও তার বা সুতলি দিয়ে গাছকে বেঁধে ওপরের দিকে তুলে দিতে হবে।
  • উপকারিতা: এতে গাছে পর্যাপ্ত বাতাস ও সূর্যালোক পৌঁছায়, ফল মাটিতে ঠেকে পচে যায় না, রোগব্যাধি কমে এবং ফলন বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।

১১. টমেটো চাষে রোগ-পোকা দমন ও ফসল সুরক্ষা নির্দেশিকা

টমেটো গাছে ফল ছিদ্রকারী পোকা, সাদা মাছি, পাতা সুড়ঙ্গকারী পোকা এবং নাবি ধসা বা পাতা কোঁকড়ানো (Leaf Curl) ভাইরাসের মতো রোগ-পোকার আক্রমণ হলে ফলন অনেকটাই কমে যেতে পারে। তাই শুরু থেকেই জমি পর্যবেক্ষণ করা, জৈব ও রাসায়নিক উপায়ে সঠিক সময়ে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (IPM) গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। টমেটো গাছকে সম্পূর্ণ রোগমুক্ত রাখা এবং সঠিক কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক প্রয়োগের সম্পূর্ণ নিয়ম জানতে নিচের আর্টিকেলটি পড়ুন:

আরও পড়ুন: টমেটো চাষে প্রধান রোগ ও পোকা দমনের সহজ উপায়

১২. ফসল সংগ্রহ ও সামগ্রিক উৎপাদন

  • ফসল সংগ্রহ: চারা রোপণের ৬০-৭০ দিন পর থেকে টমেটো তোলার উপযোগী হয় এবং একটানা ৩-৪ মাস পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়।
  • মোট উৎপাদন: আধুনিক প্রিসিশন ও ড্রিপ ফার্টিগেশন পদ্ধতি মেনে চাষ করলে প্রতি গাছে গড়ে ৫-৮ কেজি এবং একর প্রতি ২৫-৩৫ টন পর্যন্ত উচ্চমানের টমেটো উৎপাদন পাওয়া সম্ভব।

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর (FAQ)

প্রশ্ন ১: গ্রীষ্মকালে টমেটো চাষের সময় কখন?

উত্তর: প্রাক-গ্রীষ্ম বা গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষের জন্য চারা তৈরির সেরা সময় হলো মাঘ থেকে ফাল্গুন মাস (জানুয়ারি মাসের শেষ থেকে মার্চের মাঝামাঝি)। এই সময়ে বীজতলায় বা প্রো-ট্রেতে বীজ বপন করে চারা তৈরি করে মূল জমিতে রোপণ করা হয়।

প্রশ্ন ২: টমেটো চাষ করার পদ্ধতি কী?

উত্তর: টমেটো চাষের জন্য প্রথমে উর্বর দোআঁশ মাটিতে উঁচু বেড তৈরি করতে হবে, অতঃপর সুষম সার ও জৈব পদার্থ মিশিয়ে ২৫-৩০ দিনের সুস্থ চারা সারি বেঁধে রোপণ করতে হয়। এর পাশাপাশি মাটিতে আর্দ্রতা ধরে রাখতে প্লাস্টিক মালচিং পেপার ব্যবহার করা এবং গাছ বড় হলে খুঁটি ও তার দিয়ে বেঁধে দিয়ে নিয়মিত ড্রিপ সেচ ও সারের সুষম ব্যবহার করাই হলো টমেটো চাষের সঠিক পদ্ধতি।

প্রশ্ন ৩: টমেটো গাছ লাগানোর সবচেয়ে ভালো সময় কখন?

উত্তর: আমাদের দেশে টমেটো গাছ লাগানোর সবচেয়ে ভালো ও উপযুক্ত সময় হলো শীতকালের সূচনা অর্থাৎ কার্তিক থেকে অগ্রহায়ণ মাস (অক্টোবরের শেষ থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি)। তবে সঠিক জাত নির্বাচন করে গ্রীষ্মকালের জন্য জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি এবং বর্ষাকালের জন্য জুলাই-আগস্ট মাসেও সফলভাবে টমেটো গাছ লাগানো যায়।

তথ্য সুত্র

  • ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ হর্টিকালচার রিসার্চ ব্যাঙ্গালোর (IIHR)
  • বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কেন্দ্র (BARI)
Spread the love

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top