ধানের বীজ রোপণ পদ্ধতি: ধানের বীজতলা তৈরির নিয়ম

ধানের বীজ রোপণ পদ্ধতি এবং ৪টি ভিন্ন নিয়মে ধানের বীজতলা তৈরির নিয়ম ও বাস্তব ছবি।
বাস্তব মাঠের দৃশ্যে ধানের বীজতলা তৈরির নিয়ম আধুনিক ও সনাতন ৪টি পদ্ধতি।

ভূমিকা: বাঙালির প্রধান খাদ্যশস্য হলো ধান। এই ধান উৎপাদনের জন্য আমরা নানান কৌশল অবলম্বন করলেও, প্রধান বিষয়টির সঠিক পরিচর্যা অনেক সময়ই করা হয় না। বীজতলার ভুলের প্রভাব পরবর্তীতে মূল জমির ফসলের ওপর পড়ে এবং আমরা কাঙ্ক্ষিত ফলন থেকে বঞ্চিত হই। একটি গাছের সুস্থতা এবং ভালো ফলন প্রধানত নির্ভর করে সঠিক জাত নির্বাচন, রোগমুক্ত পুষ্ট বীজ এবং রোগমুক্ত সুস্থ-সবল চারার ওপর। সঠিক বয়সের চারা যদি মূল জমিতে রোপণ করা যায়, তবেই ধানের বাম্পার ফলন আশা করা সম্ভব হবে। আজকের প্রতিবেদনে আমরা ধানের বীজ রোপণ পদ্ধতি এবং বৈজ্ঞানিক উপায়ে ধানের বীজতলা তৈরির নিয়ম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

ধানের বীজতলা করার সময় ও জাত

ধান চাষকে লাভজনক করে তুলতে হলে প্রথম কাজ জমির ভৌগোলিক অবস্থান এবং জমির জল ধারণ ক্ষমতা নির্ধারণ করে উপযুক্ত জাত নির্বাচন করা। এর পাশাপাশি লক্ষ্য রাখতে হবে যে গাছের আয়ুষ্কাল কত এবং তার ওপর নির্ভর করে বীজতলাতে কত দিন চারা রাখা হবে। উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড বীজ হলে সারের পরিমাণ বেশি দিতে হবে এবং দেশি বীজ হলে জৈব সারের পরিমাণ বাড়াতে হবে। নিচে আমন ও বোরো ধানের বীজতলার সময়কাল এবং উন্নত জাতের তালিকা দেওয়া হলো:

১. আমন ধান

আমন ধান সাধারণত রোপণ থেকে পাকা পর্যন্ত প্রায় ১৫০-১৭০ দিন সময় নেয়। রবি মরসুমের ফসল সঠিক সময়ে ধরতে চাষি ভাইদের কম সময়ের জাত নির্বাচন করা উচিত।

  • বীজতলার সময়কাল: মে থেকে জুন মাস (জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়)।
  • কম জলের নিচু জমির জন্য জাত (১০টি): অন্নদা, পারিজাত, বিধান-১, শতাব্দী, ক্ষিতিশ, এমটিইউ-১০১০, স্বর্ণমাসুরি, মাশুরি, নীলাঞ্জনা এবং যমুনা। এদের গড় উৎপাদন সময়কাল ১১৫ থেকে ১৫০ দিন।

২. বোরো ধান

শীতকালীন এই ধানের চারা তৈরির সময় ঠান্ডা থেকে রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।

  • বীজতলার সময়কাল: নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাস (কার্তিক-অগ্রহায়ণ)।
  • উন্নত জাত (১০টি): আইআর-৩৬, ললাট, গোবিন্দ, বোরো-১, বোরো-২, ব্রি ধান-২৮, ব্রি ধান-২৯, বিধান-২, শতাব্দী (বোরো মরসুমের জন্য) এবং সুফলা। এদের গড় উৎপাদন সময়কাল ১৪০ থেকে ১৬০ দিন।

ধান বীজ জাগ দেওয়ার নিয়ম

বীজতলা তৈরির আগে সঠিক উপায়ে ধান বীজ জাগ দেওয়ার নিয়ম মেনে অঙ্কুরোদগম করা অত্যন্ত জরুরি।

  • বীজ শোধন: ধানের বাম্পার ফলন ও রোগ মুক্ত চারা ও ভাল জারমিনেশন বা অঙ্কুর বের হওয়ার জন্যে বীজ শোধন আবশ্যিক ( বীজ শোধন পদ্ধতি দেখতে এখানে ক্লিক করুন )
  • পদ্ধতি: প্রথমে পুষ্ট বীজ লোনা জলে বাছাই করে ধুয়ে নিতে হবে। এরপর শোধিত ভেজা বীজগুলো থেকে অতিরিক্ত জল ঝরিয়ে চটের বস্তা বা খড়ের ভেতরে রাখতে হবে।
  • তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ: বস্তার ভেতর যেন ২৫-৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা থাকে, তার জন্য ওপর থেকে বাড়তি খড় বা কাঁথা দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সুন্দর ও শক্তিশালী অঙ্কুর বের হবে। অঙ্কুর যেন খুব বেশি লম্বা না হয়ে যায়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

আড়ও দেখুন SRI বা শ্রী পদ্ধতিতে ধান চাষ: আধুনিক পদ্ধতিতে ধান চাষের নিয়ম

ধানের বীজতলা প্রকারভেদ

উপযুক্ত জায়গা এবং জাত নির্বাচনের পর চার প্রকার পদ্ধতিতে বীজতলা তৈরি করা হবে। প্রতিটি ক্ষেত্রে ধানের বীজতলা তৈরির নিয়ম বিস্তারিত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:

শুকনা বেড পদ্ধতি

  • মাটির ধরণ: হালকা দোআঁশ বা বেলে দোআঁশ মাটি, যেখানে জল জমে থাকে না।
  • চারার রেডি সময়কাল: ২১ থেকে ২৫ দিন।
  • বীজের পরিমাণ: বিঘা প্রতি (১ বিঘা মূল জমির জন্য) ২ কাঠা বীজতলায় ৫-৬ কেজি বীজ লাগবে। তবে শ্রী (SRI) পদ্ধতিতে করলে বিঘা প্রতি মাত্র ৮00 গ্রাম বীজ লাগবে।
  • তৈরির নিয়ম: কাঠা প্রতি ২ কুইন্টাল গোবর, ৪০০ গ্রাম পটাশ এবং ২ কেজি সিঙ্গল সুপার ফসফেট মিশিয়ে ৪ ফুট চওড়া বেড তৈরি করতে হবে। পাশে ১ ফুট চওড়া জল নিকাশি নালা রাখতে হবে।

কাদা পদ্ধতি

  • মাটির ধরণ: এঁটেল বা দোআঁশ মাটি, যেখানে সহজে কাদা করা যায়।
  • চারার রেডি সময়কাল: ২৫ থেকে ৩০ দিন।
  • বীজের পরিমাণ: বিঘা প্রতি ৫-৬ কেজি বীজ (২ কাঠা বীজতলার জন্য)।
  • তৈরির নিয়ম: জমি ভালো করে চাষ দিয়ে কাদা করতে হবে। এরপর ৪ মিটার চওড়া বেড তৈরি করে পাশে ১ ফুট চওড়া নালা রাখতে হবে। কাঠা প্রতি ৬০০ গ্রাম ইউরিয়া, ২ কেজি সিঙ্গল সুপার ফসফেট ও ৫০০ গ্রাম পটাশ ব্যবহার করা হবে। বীজ ফেলার পর ওপরে ছাই ছড়িয়ে দিলে চারা সতেজ হবে।

ট্রে পদ্ধতি

  • মাটির ধরণ: ঝুরঝুরে দোআঁশ মাটির সাথে কেঁচো সার ও জৈব সার চালনি দিয়ে চেলে নিতে হবে।
  • চারার রেডি সময়কাল: ২০ থেকে ২২ দিন।
  • বীজের পরিমাণ: প্রতি ট্রে-তে ১০০-১২০ গ্রাম বীজ লাগে। ১ বিঘা জমির জন্য ২০-২২টি ট্রে অর্থাৎ প্রায় ২-২.৫ কেজি বীজ লাগবে।
  • তৈরির নিয়ম: এই পদ্ধতিটি মূলত ‘প্যাডি ট্রান্সপ্লান্টার’ মেশিনের সাহায্যে চারা রোপণের জন্য ব্যবহৃত হয়। ট্রের ৪ ভাগের ৩ ভাগ মাটি দিয়ে ভরে হাত দিয়ে বা সিডার মেশিনের সাহায্যে বীজ ফেলে গুঁড়ো মাটি দিয়ে ঢেকে ৩ দিন জল স্প্রে করতে হবে। এটি বিভিন্ন মহিলা স্বনির্ভর দল এবং কৃষি সহায়ক সংগঠনগুলির জন্য অত্যন্ত লাভজনক।

ম্যাট পদ্ধতি (মাদুর বীজতলা)

  • মাটির ধরণ: কেঁচো সার ও পুরোনো গোবর মিশ্রিত ঝুরঝুরে কাদা বা শুকনো মাটি।
  • চারার রেডি সময়কাল: ২০-২২ দিন।
  • বীজের পরিমাণ: বিঘা প্রতি ২ থেকে ২.৫ কেজি বীজ।
  • তৈরির নিয়ম: যেখানে বীজ ফেলা হবে, সেখানে পলিথিন বিছিয়ে তার ওপর মাটি দিতে হবে। কাঠের রেলিং দিয়ে ১ ইঞ্চি উচ্চতার খোপ তৈরি করে তাতে অঙ্কুরিত বীজ ফেলে হালকা মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হবে। প্রথমে ৩ দিন জল স্প্রে করতে হবে, পরে নালাতে জল দিতে হবে।

আড়ও দেখুন বিষমুক্ত জীবনের সন্ধানে: জৈব পদ্ধতিতে ধান চাষের সম্পূর্ণ গাইড

ধানের বীজতলা পরিচর্যা

সুস্থ ও সবল চারা পেতে হলে ধানের বীজতলা পরিচর্যা সঠিকভাবে করতে হবে।

  • চারা তোলার ৮ দিন আগে কাঠা প্রতি ২০০ গ্রাম ফিপ্রনিল প্রয়োগ করলে মূল জমিতে মাজরা পোকার আক্রমণ অনেক কমে যাবে।
  • শ্রী (SRI) পদ্ধতিতে বীজতলা করলে নিয়মিত সকাল-বিকেল ঝাড়ি দিয়ে হালকা জল দিতে হবে।

ধান বীজতলায় সার প্রয়োগ

সঠিক নিয়মে ধান বীজতলায় সার প্রয়োগ করলে চারার বৃদ্ধি দ্রুত হবে। কাদা পদ্ধতিতে চারা রোপণের ২ সপ্তাহ পরে গাছের বৃদ্ধি অনুযায়ী কাঠা প্রতি আরও ৫০০ গ্রাম ইউরিয়া উপরি প্রয়োগ করা যেতে পারে। শুকনো বীজতলার ক্ষেত্রে চারা লাগানোর ১০ দিন আগে জল দেওয়ার পর শতক প্রতি ৪০০ গ্রাম নাইট্রোজেন দেওয়া উত্তম। তবে সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতিতে চাষ করলে ঘন জীবামৃত এবং জীবামৃত ব্যবহার করাই সবচেয়ে ভালো।

ধান বীজতলায় রোগ পোকা নিয়ন্ত্রণ

বীজতলাকে রোগমুক্ত রাখতে নিচে দেওয়া নিয়মগুলি মেনে চলতে হবে:

  • পোকামাকড় দমন: বীজতলায় পোকার আক্রমণ কমাতে এসিফেট ০.৭৫ গ্রাম প্রতি লিটার জলে অথবা কার্টাপ হাইড্রোক্লোরাইড ১ গ্রাম প্রতি লিটার জলে গুলে স্প্রে করতে হবে।
  • রোগ নিয়ন্ত্রণ: চারার পাতায় বাদামি দাগ দেখা দিলে ট্রাইসাইক্লাজোল ০.৫ মিলি প্রতি লিটার জলে গুলে স্প্রে করলে ভালো ফল পাওয়া যাবে।
  • শোষক ও মাজরা পোকা: আক্রমণ বেশি হলে দানাদার ঔষধ কার্টাপ হাইড্রোক্লোরাইড ৪% জি প্রতি শতকে ১৫০ গ্রাম প্রয়োগ করে বীজতলায় ৩ দিন জল ধরে রাখতে হবে। জৈব উপায়ে দমনের জন্য নিয়মিত গোবর জল নির্যাস এবং নিম তেল ব্যবহার করা হবে।

আড়ও দেখুন জৈব কীটনাশক তৈরির পদ্ধতি: জৈব পদ্ধতিতে পোকা দমনের ২০টি উপায়

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, ধান চাষের মূল ভিত্তি হলো একটি সুস্থ ও রোগমুক্ত বীজতলা। আধুনিক ধানের বীজতলা তৈরির নিয়ম এবং সঠিক পরিচর্যা মেনে চারা তৈরি করলে মূল জমিতে চারার শিকড় দ্রুত মাটির সাথে লেগে যায় এবং গাছ পাশকাঠি ছাড়ার বেশি সময় পায়। সঠিক নিয়মে ধান বীজ জাগ দেওয়ার নিয়ম মেনে চাষ শুরু করলে এবং বীজতলায় সঠিক সময়ে সার ও রোগ পোকা নিয়ন্ত্রণ করলে কৃষকদের উৎপাদন খরচ কমবে এবং ধানের বাম্পার ফলন সুনিশ্চিত হবে।

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর (FAQ)

১. ধানের বীজতলা কাকে বলে?

মূল জমিতে ধান রোপণের পূর্বে, যে ছোট এবং নিবিড়ভাবে পরিচর্যা করা নির্দিষ্ট স্থানে ধানের বীজ বুনে সুস্থ, সবল ও রোগমুক্ত চারা তৈরি করা হয়, তাকে ধানের বীজতলা বলা হয়।

২. ধানের বীজতলা কেন করা হয়?

ধানের বীজ সরাসরি মূল জমিতে বুনে দিলে পাখির উপদ্রব, আগাছা এবং আবহাওয়ার কারণে অনেক বীজ নষ্ট হয়ে যায়। বীজতলায় অল্প জায়গায় বৈজ্ঞানিক উপায়ে নিবিড় পরিচর্যা করা যায়, যার ফলে কম খরচে রোগমুক্ত, সুষম এবং শক্তিশালী চারা তৈরি করে মূল জমিতে রোপণ করা সম্ভব হয়।

৩. আমন ধানের বীজতলা করার সঠিক সময় কোনটি?

আমন ধানের বীজতলা তৈরির সঠিক সময় হলো মে থেকে জুন মাস (বাংলা জ্যৈষ্ঠ থেকে আষাঢ় মাস)। তবে জাতভেদে এবং স্থানীয় আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বীজ ফেলা যেতে পারে।

৪. ধানের বীজতলা করার জন্য কিরূপ জমি নির্বাচন করা প্রয়োজন?

বীজতলার জন্য উর্বর, আলো-বাতাসযুক্ত এবং তুলনামূলকভাবে উঁচু জমি নির্বাচন করতে হবে, যেখানে সহজে বন্যা বা বৃষ্টির জল জমে থাকে না। জমির কাছাকাছি পরিষ্কার জল সেচ এবং প্রয়োজনে অতিরিক্ত জল দ্রুত বের করে দেওয়ার (নিকাশি) ভালো ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত জরুরি।

৫. ধানের বীজতলা লাল হয়ে গেলে কি করণীয়?

ধানের চারা লাল বা হলুদ হয়ে যাওয়া সাধারণত পুষ্টির অভাব (বিশেষ করে নাইট্রোজেন বা দস্তা/জিঙ্ক) অথবা শীতের তীব্রতার কারণে হয়।
করণীয়: এক্ষেত্রে চারা গজানোর পর প্রতি শতক বীজতলায় ১৫০-২০০ গ্রাম ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে। জিপসাম বা জিঙ্ক সলফেট স্প্রে করলেও ভালো ফল পাওয়া যায়। এছাড়া কাদা পদ্ধতিতে বীজতলায় রাতে সামান্য জল ধরে রেখে সকালে তা বের করে দিলে শীতের হাত থেকে চারা রক্ষা পায়।

তথ্য সূত্র

  • উত্তরবঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদিয়ালয় (UBKV)
  • ন্যাশনাল রাইস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (NRRI)
  • বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কেন্দ্র (BARI)
Spread the love

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top