সূর্যমুখী চাষ করার আধুনিক নিয়ম: অধিক লাভের সেরা ৫টি কৌশল

আধুনিক সূর্যমুখী চাষ পদ্ধতি ও উচ্চফলনশীল বীজ
আধুনিক পদ্ধতিতে উচ্চফলনশীল বীজে সূর্যমুখী চাষ

সূর্যমুখী চাষ বর্তমানে একটি অত্যন্ত লাভজনক কৃষি ব্যবসা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বর্তমান সময়ে তৈলবীজের বাজারে তেলের চাহিদা ক্রমাগত বেড়ে চলায় সূর্যমুখী তেলের বাজারমূল্য অনেক বেশি পাওয়া যায়। স্বাস্থ্যসম্মত এবং পুষ্টিগুণে ভরপুর হওয়ায় সাধারণ মানুষ এখন সরিষার তেলের পাশাপাশি সূর্যমুখী তেলকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তাই সঠিক জাত নির্বাচন এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগ করে যদি সূর্যমুখী চাষ করা যায়, তবে কৃষকরা অনেক বেশি মুনাফা অর্জন করতে পারেন।

১. সূর্যমুখী চাষে উচ্চফলনশীল জাত ও বৈশিষ্ট্য

ভারতে এবং বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে চাষের জন্য বেশ কিছু উন্নত প্রজাতি রয়েছে। সঠিক জাত নির্বাচনই হলো সূর্যমুখী চাষ এর সাফল্যের প্রথম ধাপ। নিচে কয়েকটি উচ্চফলনশীল জাতের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হলো:

ডি.আর.এস.এইচ-১ হাইব্রিড (DRSH-1):
এটি রবি ও খরিফ উভয় ঋতুতেই চাষ করা যায়। গাছের উচ্চতা ১৬০-১৭০ সেমি। এটি রবি মৌসুমে ৯৫-১০৫ দিনে ফলন দেয় এবং প্রতি একরে ১০-১১ কুইন্টাল উৎপাদন সম্ভব। এতে তেলের পরিমাণ ৪৪-৪৯%।

কে.বি.এস.এইচ-৪৪ হাইব্রিড (KBSH-44):
এটিও উভয় সিজনেই উপযোগী। খরিফ মৌসুমে এটি ৯৫-১০৫ দিনে পাকে। প্রতি একরে ১১-১২ কুইন্টাল ফলন পাওয়া যায় এবং তেলের পরিমাণ ৩৬-৩৮%।

মরডেন বেঁটে জাত (MORDEN):
যারা স্বল্প সময়ে ফলন চান তাদের জন্য এটি সেরা। এটি মাত্র ৮৫-৮৮ দিনে ফলন দেয়। এর উচ্চতা ৯০-১০০ সেমি। তবে এর তেলের পরিমাণ সামান্য কম (৩৪-৩৫%)।

গাউসুফ-১৫ (GAUSUF-15):
এটি প্রধানত রবি মৌসুমের জন্য উপযোগী। এর উৎপাদন ক্ষমতা প্রতি একরে ৫-৬ কুইন্টাল।

পশ্চিমবঙ্গে উপযোগী সূর্যমুখী চাষের জাত

পশ্চিমবঙ্গের জলবায়ু ও মাটির কথা মাথায় রেখে কৃষকরা সানফ্লাওয়ার সি-১২ (Sunflower C-12) বা পিএসএইচ-১ (PSH-1) এর মতো প্রজাতিগুলোও বেছে নিতে পারেন। এছাড়া এন এস এইচ-১ (NSH-1) এবং মডার্ন জাতটি পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া, মুর্শিদাবাদ এবং উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় অত্যন্ত জনপ্রিয়। নোনা মাটি বা উপকূলীয় অঞ্চলে সূর্যমুখী চাষ করার সময় লোনা সহ্য করতে পারে এমন হাইব্রিড জাত নির্বাচন করা শ্রেয়।

সূর্যমুখী চাষের আধুনিক গবেষণা ও জাত সম্পর্কে আরও জানতে ভারতীয় তৈল গবেষণা কেন্দ্র (ICAR) ভিজিট করুন।

বাংলাদেশে জনপ্রিয় সূর্যমুখী চাষের বীজ ও বৈশিষ্ট্য

বাংলাদেশে মূলত বারী (BARI) উদ্ভাবিত জাত এবং কিছু হাইব্রিড জাতের সূর্যমুখী চাষ সবথেকে বেশি সফল হয়েছে। নিচে এগুলোর বিস্তারিত বৈশিষ্ট্য দেওয়া হলো:

১. বারী সূর্যমুখী-২ (BARI Sarish-2):
বৈশিষ্ট্য: এটি একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় জাত। গাছের উচ্চতা সাধারণত ৯০-১১০ সেমি হয়।
সময়কাল: বীজ বপন থেকে ফসল কাটা পর্যন্ত ৯০-১০০ দিন সময় লাগে।
ফলন: হেক্টর প্রতি ১.৫ থেকে ১.৮ টন ফলন পাওয়া যায়। এই জাতের বীজে তেলের পরিমাণ ৪২-৪৪%।

২. বারী সূর্যমুখী-৩ (BARI Sarish-3):
বৈশিষ্ট্য: এটি একটি আধুনিক ও উচ্চফলনশীল জাত। গাছের উচ্চতা ১৪০-১৫০ সেমি পর্যন্ত হতে পারে।
সময়কাল: ফসল পাকতে ৯৫-১০৫ দিন সময় লাগে।
ফলন: এটি হেক্টর প্রতি ২.০ থেকে ২.৫ টন ফলন দিতে সক্ষম। এই জাতটি বর্তমানে উপকূলীয় অঞ্চলে সূর্যমুখী চাষ এর জন্য কৃষকদের প্রথম পছন্দ।

৩. হাইব্রিড জাত (যেমন- হাইসান-৩৩):
বৈশিষ্ট্য: এটি বেসরকারিভাবে আমদানিকৃত একটি অত্যন্ত উচ্চফলনশীল হাইব্রিড জাত।
সময়কাল: ১০০-১১০ দিন।
ফলন: সঠিক পরিচর্যায় হেক্টর প্রতি ৩ টনের বেশি ফলন পাওয়া যায়। এর ফুলের আকার অনেক বড় হয় এবং দানাগুলো বেশ পুষ্ট হয়।

৪. প্যাসিফিক-৬৬:
বৈশিষ্ট্য: এটি একটি বিদেশি হাইব্রিড প্রজাতি যা বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক বেশি।

বাংলাদেশে উচ্চফলনশীল সূর্যমুখীর জাতসমূহ উদ্ভাবন ও উন্নয়ন করে থাকে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) বিশেষ করে তাদের তৈলবীজ গবেষণা কেন্দ্র থেকে উদ্ভাবিত বারী সূর্যমুখী-২ ও ৩ জাতগুলো বর্তমানে মাঠ পর্যায়ে ব্যাপক সাফল্য পাচ্ছে।

আড়ও দেখুন তিল চাষ পদ্ধতি: অধিক লাভের জন্য ১০টি উন্নত জাত ও চাষের আধুনিক কৌশল

২. বীজ শোধন ও বপন পদ্ধতি

সূর্যমুখী চাষ করার আগে বীজ শোধন করা অত্যন্ত জরুরি। এটি চারা অবস্থায় রোগের আক্রমণ রোধ করে।

বীজ শোধন: প্রতি কেজি বীজের জন্য ৩ গ্রাম থাইরাম বা কার্বেন্ডাজিম মিশিয়ে বীজ শোধন করে নিতে হবে। এর ফলে শিকড় পচা রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
সারি ও দূরত্ব: সঠিক দূরত্ব বজায় রাখা গাছের বৃদ্ধির জন্য জরুরি। সারি থেকে সারির দূরত্ব ৪৫ সেমি (দেড় ফুট) এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ২০-২৫ সেমি (৮-১০ ইঞ্চি)। বীজ মাটির ১-১.৫ ইঞ্চি গভীরে লাগাতে হয়।

কৃষি সুত্র পরামর্শ: রোগ মুক্ত ফসল উত্পাদনের জন্যে অবশ্যই বীজ শোধন করবেন ।

৩. জমি নির্বাচন ও রোপণের সঠিক সময়

সূর্যমুখী চাষ বছরের যেকোনো সময় করা গেলেও ঋতুভেদে এর ফলাফল ভিন্ন হয়।

বর্ষাকাল: জুন-জুলাই মাস।
শীতকাল: অক্টোবর-নভেম্বর মাস (সবচেয়ে উপযুক্ত সময়)।
গ্রীষ্মকাল: ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাস।
মাটির ক্ষেত্রে উঁচু ও মাঝারি জমি যেখানে জল জমে থাকে না, এমন জমি নির্বাচন করুন। দোঁয়াশ ও বেলে-দোঁয়াশ মাটি সূর্যমুখী চাষ এর জন্য সবথেকে উপযোগী।

৪. সার ও জীবাণুসার প্রয়োগ ব্যবস্থাপনা

সূর্যমুখী গাছ মাটি থেকে প্রচুর পুষ্টি উপাদান সংগ্রহ করে। তাই জমিতে প্রচুর পরিমাণে জৈব সার দেওয়া প্রয়োজন।

জৈব সার: বিঘা প্রতি ১২০০-১৮০০ কেজি পচা গোবর বা কম্পোস্ট সার দিন।
রাসায়নিক সার: প্রয়োজনীয় জৈব সারের অভাবে বিঘা প্রতি ১৬ কেজি ইউরিয়া, ৫০ কেজি সিঙ্গল সুপার ফসফেট ও ৮ কেজি মিউরেট অফ পটাশ দিতে হবে।
বোরন ও সালফার: মনে রাখবেন, সূর্যমুখীর দানা পুষ্ট করতে সালফার এবং বোরনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিঘায় ২ কেজি বোরন ও ৩ কেজি সালফার দিলে ফলন ২০% পর্যন্ত বেড়ে যায়।

কৃষি সুত্র পরামর্শ: ফসল রোপনের পূর্বে মাটি পরীক্ষা করিয়ে নিন । আপনার নিকটবর্তী কৃষি বিভাগে যোগাযোগ করুন এবং মাটি পরীক্ষা করে জেনে নিন কত পরিমাণ সার এর প্রয়োজন আছে । সঠিক পরিমাণ সার প্রয়োগ করলে আপনার খরচ কমবে এবং উৎপাদন বাড়বে সেই সাথে মাটির স্বাস্থ্য ভাল থাকবে ।

৫. সেচ ও আগাছা দমন কৌশল

সূর্যমুখী চাষ এ ফলন বাড়াতে সেচ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সেচ: সূর্যমুখী চাষে সাধারণত তিনটি প্রধান সেচ প্রয়োজন। প্রথমটি চারা গজানোর ২০ দিন পর, দ্বিতীয়টি ফুল আসার ঠিক আগে এবং তৃতীয়টি দানা বাঁধার সময়। দানা বাঁধার সময় জলের অভাব হলে বীজে তেলের পরিমাণ কমে যায়।
আগাছা: চারা গজানোর ২১ দিনের মধ্যে অবশ্যই আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। অন্যথায় চারার বৃদ্ধি ব্যাহত হবে এবং ফলন অর্ধেকে নেমে আসতে পারে।

৬. সূর্যমুখী চাষে রোগ ও পোকা দমন

সাফল্যের সাথে সূর্যমুখী চাষ করতে হলে পোকা ও রোগ নিয়ন্ত্রণ করা শিখতে হবে।

বিছা পোকা: এটি পাতার সবুজ অংশ খেয়ে ফেলে। দমনে ডাইক্লোরভস বা কুইনালফস জাতীয় ওষুধ স্প্রে করতে হবে।
পাতা ঝলসানো রোগ: এটি ছত্রাকজনিত রোগ। দমনে ম্যানকোজেব (২.৫ গ্রাম প্রতি লিটার জলে) স্প্রে করতে হবে।
পাখির উপদ্রব: সূর্যমুখী যখন পাকতে শুরু করে, তখন তোতা পাখির উপদ্রব বাড়ে। এর জন্য রঙিন প্লাস্টিক বা জালের ব্যবহার করতে হবে।

কৃষি সুত্র পরামর্শ: রোগ পোকা আক্রমণ করলে নিকটবর্তী কৃষি অফিসে গিয়ে পরামর্শ নিন এবং প্রয়োজনীয় ঔষধ অফিসে পর্যাপ্ত থাকলে বিনা মূল্যে পেতে পারেন । মনে রাখবেন আপনার শারীরিক সমস্যা হলে যেমন আগে ডাক্তার এর কাছে যান এবং ডাক্তার এর পরামর্শ অনুযায়ী প্রেসক্রিপশন নিয়ে ঔষধের দোকানে যান ঠিক একইভাবে ফসলের রোগ হলে আগে ফসল বিশেষজ্ঞ(কৃষি বিভাগ) এর কাছে গিয়ে পরামর্শ নিন ।

৭. সাথি ফসল ও আন্তঃচাষ

অতিরিক্ত আয়ের জন্য কৃষকরা সাথী ফসল হিসেবে সূর্যমুখীর সাথে গম, ভুট্টা বা তিসি চাষ করতে পারেন। বিশেষ করে ৬ সারি চীনাবাদামের পর ২ সারি সূর্যমুখীর চাষ করলে আর্থিক লাভ অনেক বেশি হয়। এটি মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতেও সাহায্য করে।

আড়ও দেখুন – সরিষা চাষ পদ্ধতি: উন্নত জাত নির্বাচন এবং আধুনিক জৈব চাষের সম্পূর্ণ নির্দেশিকা

৮. উৎপাদন ও ফলন সংগ্রহ

সেচযুক্ত এলাকায় সূর্যমুখী চাষ করলে বিঘায় গড়ে ২-৩ কুইন্টাল বীজ এবং ৩ কুইন্টাল পর্যন্ত জ্বালানি পাওয়া সম্ভব। হেক্টর প্রতি বীজের উৎপাদন হয় প্রায় ১৫ কুইন্টাল। বীজে ৪০-৫০% তেল পাওয়া যায় যা অত্যন্ত উন্নতমানের ভোজ্য তেল। সূর্যমুখীর মাথা যখন হলদেটে বাদামী রঙ ধারণ করবে, তখনই ফসল কাটার সঠিক সময়।

৯. ভোজ্য তেল হিসেবে সূর্যমুখীর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা

বর্তমানে তৈলবীজের বাজারে সূর্যমুখীর চাহিদা শীর্ষে। এর তেলের মূল্য অন্যান্য ভোজ্য তেলের চেয়ে অনেক বেশি। সামান্য নোনা মাটিতেও এর চাষ করা যায় বলে এটি সুন্দরবন এলাকাতেও অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কৃষকরা এখন সরকারি ভর্তুকিও পাচ্ছেন এই চাষের জন্য।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উন্নতমানের জাত নির্বাচন করলে সূর্যমুখী চাষ দেশের ভোজ্য তেলের অভাব পূরণ করার পাশাপাশি কৃষকদের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিতে পারে। পরিশ্রম এবং সঠিক বীজ পরিচর্যাই হলো এই চাষের মূল সাফল্যের চাবিকাঠি।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন ১: সূর্যমুখী চাষের উপযুক্ত সময় কোনটি?

উত্তর: সূর্যমুখী সারা বছর চাষ করা গেলেও অক্টোবর থেকে নভেম্বর (রবি মৌসুম) সবথেকে উপযুক্ত সময়। এছাড়া গ্রীষ্মকালে ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসেও চাষ করা যায়।

প্রশ্ন ২: এক বিঘা জমিতে কতটুকু সূর্যমুখী বীজ লাগে?

উত্তর: লাইনে বপন করলে বিঘা প্রতি ৭০০-৭৫০ গ্রাম এবং ছিটিয়ে বপন করলে প্রায় ১ কেজি বীজের প্রয়োজন হয়।

প্রশ্ন ৩: সূর্যমুখী গাছে কয়টি সেচ দিতে হয়?

উত্তর: সাধারণত ২-৩টি সেচের প্রয়োজন হয়। প্রথমটি চারা অবস্থায়, দ্বিতীয়টি ফুল আসার আগে এবং শেষটি দানা বাঁধার সময়।

প্রশ্ন ৪: সূর্যমুখী বীজে তেলের পরিমাণ কত?

উত্তর: জাত ভেদে সূর্যমুখী বীজে প্রায় ৪০-৫০% পর্যন্ত উন্নত মানের ভোজ্য তেল পাওয়া যায়।

তথ্য সুত্র

  • ভারতীয় তৈল গবেষণা কেন্দ্র (ICAR-IIOR)
  • বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI)
Spread the love

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top