বাকলা চাষ পদ্ধতি: গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন দিশা ও আধুনিক নির্দেশিকা

বাকলা চাষ পদ্ধতি
বাকলা চাষ

পশ্চিমবঙ্গের কৃষি ব্যবস্থায় ডাল জাতীয় শস্যের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে রবি মরশুমে যখন অন্যান্য ফসলে অনেক ঝুঁকি থাকে, তখন বাকলা চাষ পদ্ধতি কৃষকদের জন্য একটি নিরাপদ এবং লাভজনক বিকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাকলা বা ‘ব্রড বিন’ (Broad Bean) এমন একটি ফসল যা প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে।

১. বাকলা চাষের গুরুত্ব ও পরিচিতি

বাকলা মূলত একটি ডাল জাতীয় শস্য। গ্রাম বাংলায় এর পরিচিতি থাকলেও বাকলা চাষ পদ্ধতি বাণিজ্যিক স্তরে এর সম্ভাবনা এখনো অনেকের অজানা। এই ফসলের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এর পাতা বা গাছ গরু-ছাগলে সাধারণ খায় না, ফলে মাঠ পাহারা দেওয়ার দুশ্চিন্তা কম থাকে।

  • গাছের গঠন: এটি একটি ৬০-৭০ সেমি লম্বা, খাড়া এবং ঝোপালো প্রকৃতির উদ্ভিদ।
  • ফুল ও ফল: এর ফুলের পাপড়ি দেখতে বেশ সুন্দর; বাইরের দিক সাদা এবং কেন্দ্রে বেগুনি আভা থাকে। শুঁটিগুলো ৫-৭ সেমি লম্বা এবং নলাকার হয়।
  • দানার বৈশিষ্ট্য: প্রতিটি শুঁটিতে ৫ থেকে ৯টি দানা থাকে। দেশি মটরের মতো এই গোল দানাগুলোর খোসা অত্যন্ত শক্ত, যা একে দীর্ঘকাল পোকা ছাড়াই সংরক্ষণ করতে সাহায্য করে।

২. কেন বাকলা চাষ করবেন? (সুবিধা সমূহ)

অন্যান্য ডাল যেমন মুসুরি বা ছোলার তুলনায় বাকলা চাষের বেশ কিছু বিশেষ সুবিধা রয়েছে:

  • প্রতিকূলতা সহনশীল: রবি মরশুমে হঠাৎ অসময়ের বৃষ্টিতে মুসুরি বা ছোলা নষ্ট হয়ে গেলেও বাকলা অনেকটা সহ্য করতে পারে।
  • কম খরচ: এটি চাষে খুব সামান্য সার এবং সেচের প্রয়োজন হয়।
  • রোগপ্রতিরোধী: প্রাকৃতিকভাবেই এই গাছে রোগপোকা খুব কম হয়।
  • সংরক্ষণ সুবিধা: দানা শক্ত হওয়ায় এটি দীর্ঘকাল ঘরে রাখা যায়, বাজারে দাম বাড়লে তখন বিক্রি করা সম্ভব।

৩. মাটি ও জলবায়ু নির্বাচন

বাকলা চাষ পদ্ধতি-র সফলতার জন্য সঠিক জমি নির্বাচন জরুরি।

  • মাটির ধরন: বাকলা চাষ পদ্ধতি-তে যে কোনো রসালো মাটি উপযোগী। তবে দোঁয়াশ মাটি এবং পলি দোঁয়াশ মাটিতে এর বৃদ্ধি সবচেয়ে ভালো হয়। খুব কম উর্বর বা পতিত জমিতেও এটি আশানুরূপ ফলন দেয়।
  • জলবায়ু: এটি শীতল ও শুষ্ক জলবায়ুর ফসল। তাই অক্টোবর-নভেম্বর মাসের আবহাওয়া এর জন্য আদর্শ।

৪. জমি তৈরি ও বীজ বপন

আমন ধান কাটার পরপরই যখন জমিতে সামান্য রস থাকে, তখনই জমি তৈরি শুরু করতে হবে বাকলা চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করে।

  • বীজ বপনের সময়: কার্তিক মাস (অক্টোবর থেকে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ) হলো বীজ বোনার শ্রেষ্ঠ সময়।
  • বীজ শোধন: বীজ বোনার আগে ‘রাইজোবিয়াম’ (Rhizobium) জীবাণুসার দিয়ে বীজ শোধন করে নিলে শিকড়ে গুটি ভালো হয় এবং ফলন বাড়ে।
  • বীজের পরিমাণ: ছিটিয়ে বোনার ক্ষেত্রে বিঘা প্রতি (৩৩ শতকে) ৫ কেজি এবং সারিতে বুনলে ২-২.৫ কেজি বীজ প্রয়োজন।

৫. রোপণ পদ্ধতি: সারি বনাম ছিটানো

কৃষক ভাইদের জন্য দুই ধরণের পদ্ধতিই প্রচলিত আছে বাকলা চাষ পদ্ধতিতে :

  • ছিটানো পদ্ধতি: সাধারণত ধান কাটার পর জমি চাষ দিয়ে বীজ ছিটিয়ে মই দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। এটি সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি।
  • সারি পদ্ধতি (আধুনিক): সারিতে বুনলে পরিচর্যা সহজ হয়। এক্ষেত্রে সারি থেকে সারির দূরত্ব হবে ২০-২৫ সেমি এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব হবে ১২-১৫ সেমি।

৬. বাকলা চাষ পদ্ধতিতে সুষম সার ব্যবস্থাপনা

বাকলা একটি লিগিউম জাতীয় ফসল হওয়ায় এর শিকড় বাতাস থেকে নাইট্রোজেন সংগ্রহ করতে পারে। তাই জমিতে বাড়তি ইউরিয়া দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। বাকলা চাষ পদ্ধতিতে যে সার গুলি দেবেন –

  • প্রাথমিক সার: জমি তৈরির সময় বিঘায় ৫-১০ কুইন্টাল গোবর সার মিশিয়ে দিতে হবে।
  • রাসায়নিক সার: বিঘা প্রতি ১০-১৫ কেজি সিঙ্গেল সুপার ফসফেট বা রক ফসফেট দিলে দানার গঠন ও পুষ্টি ভালো হয়। যদি মাটি খুব বালুকাময় হয়, তবে সামান্য পটাশ সার ব্যবহার করা যেতে পারে।

কৃষি সুত্র পরামর্শ: চাষের পূর্বে মাটি পরীক্ষা করিয়ে সার প্রয়োগ করুন এবং নিকটবর্তী কৃষি বিভাগে গয়ে নিয়মিত পরামর্শ নিন এতে কম খরচে উৎপাদন বেশি হবে এবং লাভবান হবেন ।

৭. সেচ ও আগাছা দমন

  • সেচ: স্বাভাবিকভাবে বৃষ্টি না হলে এবং মাটি খুব শুকিয়ে গেলে ১-২টি হালকা সেচ প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে ফুল আসার সময় এবং শুঁটি পুষ্ট হওয়ার সময় জমিতে রস থাকা অত্যন্ত জরুরি।
  • নিড়ানি: বীজ বোনার ৩০-৪০ দিন পর একবার আগাছা পরিষ্কার করে দিলে গাছের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়।

৮. রোগ ও পোকা দমন: প্রাকৃতিক ও রাসায়নিক গাইড

যদিও বাকলায় পোকা কম হয়, তবুও অধিক ফলনের জন্য সতর্ক থাকতে হবে।

ক) প্রাকৃতিক ও জৈব পদ্ধতি (Organic Treatment):

১. নিমের তেল: জাব পোকা (Aphids) দমনে ১ লিটার জলে ৫ মিলি নিম তেল ও সামান্য সাবান জল মিশিয়ে স্প্রে করুন।

২. হলুদ ও গুঁড়ো সাবান: বাড়িতে তৈরি ভেষজ কীটনাশক ব্যবহারে পরিবেশের ক্ষতি হয় না।

৩. ছাঁই ছিটানো: ভোরের শিশিরে পাতায় কাঠের ছাঁই ছিটিয়ে দিলে ছোট ছোট পতঙ্গ আক্রমণ করতে পারে না।

৪। ছত্রাকজনিত রোগ: গাছের গোড়া পচা বা পাতা ঝলসানো রোগ রোধে ট্রাইকোডারমা ভিরিডি (Trichoderma viride) ২ গ্রাম প্রতি লিটার জলে মিশিয়ে স্প্রে করুন।

খ) রাসায়নিক পদ্ধতি (Chemical Treatment):

১. জাব পোকা ও শোষক পোকা: যদি আক্রমণ মারাত্মক হয়, তবে ইমিডাক্লোপ্রিড (Imidacloprid) ০.৫ মিলি প্রতি লিটার জলে মিশিয়ে স্প্রে করুন।

২. ছত্রাকজনিত রোগ: গাছের গোড়া পচা বা পাতা ঝলসানো রোগ রোধে ম্যানকোজেব (Mancozeb) বা কার্বেন্ডাজিম (Carbendazim) ২ গ্রাম প্রতি লিটার জলে গুলে ব্যবহার করুন।

৯. সাথি ফসল ও শস্যচক্রের গুরুত্ব

বাকলা চাষ পদ্ধতির একটি চমৎকার দিক হলো এটি অন্য ফসলের সাথে চমৎকার মানিয়ে নেয়।

  • মিশ্র চাষ: আলুর সঙ্গে বাকলা চাষ করলে কৃষকের লাভ দ্বিগুণ হয়। এছাড়াও গম, যব, সরষে বা তিসির সাথেও এটি সফলভাবে চাষ করা যায়।
  • মাটির স্বাস্থ্য: ডাল শস্য হিসেবে এটি মাটির গভীরে খনিজ পাঠায় এবং বায়ুমণ্ডল থেকে নাইট্রোজেন নিয়ে মাটিতে জমা করে। দেখা গেছে, একবার বাকলা চাষ করলে বিঘা প্রতি প্রায় ৮-৯ কেজি ইউরিয়া সারের কাজ মাটিতেই হয়ে যায়, যা পরের ফসলের জন্য অত্যন্ত উপকারী।

আড়ও দেখুন আধুনিক রাজমা চাষ পদ্ধতি: অর্থকরী ফসল হিসেবে রাজমা চাষের সম্পূর্ণ গাইডলাইন

১০. উৎপাদন ও ফসল সংগ্রহ

১২৫ থেকে ১৩০ দিনের মধ্যে শুঁটিগুলো পরিপক্ক হয়। দানাগুলো শক্ত হলে এবং শুঁটির রঙ পরিবর্তন হলে ফসল সংগ্রহ করতে হবে।

  • ফলন: উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে বিঘা প্রতি ২ থেকে ৩ কুইন্টাল শুকনো ডাল পাওয়া সম্ভব।
  • ব্যবহার: বাকলার ডাল অত্যন্ত সুস্বাদু ও পুষ্টিকর। কচি অবস্থায় এর শুঁটি সবজি হিসেবে বাজারে বিক্রি করা যায়। শুষ্ক ডালপালা উন্নতমানের পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়।

উপসংহার

সব শেষে বলা যায় অল্প জলে, কম খরচে এবং বিনা পাহারায় বাকলা চাষ পদ্ধতি বর্তমানে কৃষকদের কাছে একটি বাড়তি আয়ের উৎস। এটি কেবল অর্থনৈতিকভাবেই লাভজনক নয়, বরং মাটির উর্বরতা শক্তি ফিরিয়ে আনতেও অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তাই আধুনিক কৃষি কৌশলে বাকলা চাষ আপনার খামারে যোগ করতে পারে নতুন সমৃদ্ধি।

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন: বাকলা গাছে কি খুব বেশি সেচের প্রয়োজন হয়?

উত্তর: না, বাকলা মূলত বৃষ্টির অভাবেও টিকে থাকতে পারে। তবে দানা পুষ্ট হওয়ার সময় হালকা সেচ দিলে ফলন অনেক বেড়ে যায়।

প্রশ্ন: বাকলা চাষের জন্য সবথেকে ভালো বীজের জাত কোনটি?

উত্তর: সাধারণত স্থানীয় উন্নত মানের দেশি বীজ সবচেয়ে ভালো ফলন দেয়। তবে কৃষি দপ্তরের অনুমোদিত সংকর জাতের বীজও ব্যবহার করা যেতে পারে।

প্রশ্ন: বাকলা ডাল খেলে কি কোনো বিশেষ উপকার হয়?

উত্তর: হ্যাঁ, বাকলা প্রোটিনের একটি বড় উৎস। এটি মটর ডালের মতো সুস্বাদু এবং এতে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার ও খনিজ থাকে।

প্রশ্ন: আমন ধানের পর কি বাকলা চাষ সম্ভব?

উত্তর: হ্যাঁ, আমন ধান কাটার পর জমিতে যে অবশিষ্ট আর্দ্রতা থাকে, তা ব্যবহার করেই বাকলা চাষ করা যায়।

তথ্য সুত্র

বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (BCKV)

আড়ও দেখুন

Spread the love

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top