মাশরুমের সকল জনপ্রিয় প্রজাতি ও তাদের বৈশিষ্ট্য: আপনার এলাকার জন্য সঠিক জাতটি বেছে নিন

বিভিন্ন রঙের ভোজ্য মাশরুমের জাত
বিভিন্ন রঙের ভোজ্য মাশরুমের জাত

ক. ভূমিকা: মাশরুমের জাত নির্বাচন কেন গুরুত্বপূর্ণ?

মাশরুম চাষে সাফল্যের প্রথম ধাপ হলো সঠিক জাত নির্বাচন। বিশ্বের প্রায় ১৪০০০ প্রজাতির মধ্যে অনেক প্রজাতি বিষাক্ত, আবার অনেকগুলো ঔষধি গুণে ভরপুর। মাশরুমের প্রতিটি প্রজাতির আবহাওয়া এবং ঘরোয়া পরিবেশের চাহিদা ভিন্ন হয়। আপনি যদি আপনার এলাকার জলবায়ু ও তাপমাত্রা অনুযায়ী সঠিক মাশরুমটি বেছে নিতে না পারেন, তবে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে।আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা আপনার তথ্যের ওপর ভিত্তি করে মাশরুমের প্রধান জাতগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। সঠিকভাবে মাশরুমের জাত নির্বাচন করতে পারলে উৎপাদনের ঝুঁকি অনেক কমে যায়।

খ. জনপ্রিয় মাশরুমের জাত ও বৈশিষ্ট্য

সাধারণত বর্তমান বিশ্বে ভোজ্য মাশরুম চাহিদার ৯০% সাদা বোতাম মাশরুম পূরণ করলেও, অন্যান্য জাতগুলোর বাণিজ্যিক প্রসারতাও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিচে মাশরুমের জাত গুলি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. সাদা বোতাম মাশরুম (White Button Mushroom)

  • বৈজ্ঞানিক নাম: Agaricus bisporus
  • বৈশিষ্ট্য: এটি বিশ্বের সবথেকে জনপ্রিয় জাত। এটি দেখতে সাদা এবং টুপির মতো গোল।
  • চাষের পরিবেশ: এর মাইসেলিয়াম বৃদ্ধির জন্য ২২-২৫°C এবং ফল দেওয়ার জন্য ১৪-১৮°C তাপমাত্রার প্রয়োজন। বাতাসে আর্দ্রতা ৮০-৮৫% থাকা বাঞ্ছনীয়। এটি উৎপাদনে প্রায় ৮০-৯০ দিন সময় লাগে।

বাণিজ্যিক চাষের জন্য এটি বিশ্বের এক নম্বর জাত হিসেবে পরিচিত।

২. ওয়েস্টার বা ঝিনুক মাশরুম

১. গোলাপি ঝিনুক: রঙ আকর্ষণীয় গোলাপি। ২২-২৫°C তাপমাত্রায় ভালো হয়।

২. কালো ধূসর ঝিনুক (P. sajor−caju): এটি ২৫-৩০°C তাপমাত্রায় চাষযোগ্য।

৩. সাদা ঝিনুক (P. florida): এটি চেপ্টা ও সাদা। ১৫-২২°C তাপমাত্রা প্রয়োজন।

৪. হলুদ ঝিনুক: রঙ হলুদ, ১৮-২৮°C তাপমাত্রায় ভালো জন্মে।

৫. রাজা ঝিনুক (P. eryngii): এর জীবনকাল দীর্ঘ এবং ১০-২৫°C তাপমাত্রা প্রয়োজন।

৩. মিল্কি বা দুধ মাশরুম

  • বৈজ্ঞানিক নাম: Calocybe indica
  • বৈশিষ্ট্য: এটি মূলত গরমকালের মাশরুম। যারা গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলে থাকেন তাদের জন্য এটি সেরা।
  • পরিবেশ: এটি ২৮-৩৮°C তাপমাত্রায় অনায়াসে চাষ করা যায়। এটি সাদা এবং বোতাম মাশরুমের চেয়ে আকারে অনেক বড় ও মাংসল হয়।

৪. প্যাডি স্ট্র বা খড় মাশরুম

  • বৈজ্ঞানিক নাম: Volvariella volvacea
  • বৈশিষ্ট্য: এটি মূলত মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে চাষ করা হয়। এটি অত্যন্ত দ্রুত বর্ধনশীল।
  • পরিবেশ: ২৫-৩৫°C তাপমাত্রায় এটি মাত্র ১০-১২ দিনের মধ্যে উৎপাদন দিতে শুরু করে।

অল্প সময়ে ফলন পেতে চাইলে এই জাত চাষ করা সবথেকে বুদ্ধিমানের কাজ।

৫. শীতকে মাশরুম

  • বৈজ্ঞানিক নাম: Lentinula edodes
  • বৈশিষ্ট্য: এটি স্বাদে ও গন্ধে অনন্য এবং উৎপাদনে বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে।
  • পরিবেশ: ১২-২৫°C তাপমাত্রা এবং ৮০% আর্দ্রতা প্রয়োজন। এর জীবনকাল ১১০-১২০ দিন এবং ৩-৪ বার ফসল তোলা যায়।

৬. কালো পপলার মাশরুম

  • বৈজ্ঞানিক নাম: Agrocybe aegerita
  • বৈশিষ্ট্য: এটি অত্যন্ত সুস্বাদু মাশরুম। বসন্ত থেকে শরৎকাল পর্যন্ত উইলো কাঠে এটি বেশি জন্মায়। এর জন্য ২৫-২৮°C তাপমাত্রা ও ৮৫% আর্দ্রতা প্রয়োজন।

৭. ঋষি মাশরুম

  • বৈজ্ঞানিক নাম: Ganoderma lucidum
  • বৈশিষ্ট্য: এটি মূলত ঔষধি কাজের জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি শুকিয়ে গুঁড়ো করে দীর্ঘ ৬ মাস রাখা যায়।
  • পরিবেশ: ৩০-৩২°C তাপমাত্রা এবং ৮০-৮৫% আর্দ্রতা প্রয়োজন। এর চাষের জীবনকাল ১২০-১৫০ দিন।
ঔষধি গুণ সম্পন্ন মাশরুম জাত ঋষি।
ঔষধি গুণ সম্পন্ন ঋষি মাশরুম।

৮. শীতকালীন মাশরুম

  • বৈজ্ঞানিক নাম: Flammulina velutipes
  • বৈশিষ্ট্য: এটি আকারে ১৪-১৮ সে.মি. পর্যন্ত হয়। টুপিগুলো সাদা-হলুদ বর্ণের।
  • পরিবেশ: ১০-২৫°C তাপমাত্রা ও পর্যাপ্ত আলোর প্রয়োজন। এটি মূলত যকৃতের রোগ ও আলসার নিরাময়ে কাজ করে।

৯. কালো কানের মাশরুম

  • বৈশিষ্ট্য: এটি দেখতে কানের মতো এবং বিশ্বের ৪র্থ জনপ্রিয় মাশরুম। এটি রক্তস্বল্পতা ও গলার ব্যথা দূর করতে ওষুধের মতো কাজ করে। ২৫-২৬°C তাপমাত্রায় এটি ভালো বাড়ে।

কৃষি সুত্র পরামর্শ: চাষ শুরু করার পূর্বে আপনার নিকটস্থ উদ্যান পালন বা কৃষি বিভাগে উক্ত এলাকায় চাষের জন্যে উপযোগী সঠিক জাত ও চাষ সম্পর্কিত পরামর্শ এবং বাজার বিশ্লেষণ করে চাষ শুরু করলে উপকৃত হবেন ।

১০. মাশরুম স্পন (Mushroom Spawn) কী?

মাশরুম চাষের প্রধান উপকরণ হলো স্পন, যাকে সাধারণ ভাষায় মাশরুমের বীজ বলা হয়। এটি মূলত জীবাণুমুক্ত শস্যদানা (যেমন: গম বা ধান) বা কাঠের গুঁড়োর উপর জন্মানো মাশরুমের জীবন্ত মাইসেলিয়াম। ভালো ফলন পেতে হলে অবশ্যই সাদা ও সতেজ মাইসেলিয়াম যুক্ত স্পন ব্যবহার করতে হয়।

সতর্কতা: স্পন প্যাকেটে কোনো কালো বা সবুজ দাগ থাকলে তা চাষের জন্য ব্যবহার করবেন না।

গ. ঋতু অনুযায়ী সঠিক মাশরুমের জাত নির্বাচন করবেন কীভাবে?

মাশরুম চাষের পরিকল্পনা করার সময় আপনার অঞ্চলের ঋতু বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি।

  • শীতকাল (নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি): এ সময় সাদা বোতাম মাশরুম এবং শীতকালীন মাশরুম চাষের জন্য উপযুক্ত।
  • গ্রীষ্মকাল (মার্চ-জুন): এ সময় মিল্কি মাশরুম বা খড় মাশরুম চাষ করা সবথেকে লাভজনক।
  • বর্ষাকাল ও সারা বছর: ঝিনুক বা ওয়েস্টার মাশরুম সারা বছরই নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে চাষ করা যায়।

আড়ও দেখুন মাশরুম চাষ পদ্ধতি ও লাভ: জাত, রোগ দমন এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পূর্ণাঙ্গ গাইড ২০২৬

ঘ. জনপ্রিয় মাশরুমের জাত ও আবহাওয়া সারণি

নিচের সারণিটি আপনাকে সঠিক মাশরুমের জাত বেছে নিতে সাহায্য করবে।:

মাশরুমের নামতাপমাত্রা (ডিগ্রি সে.)আর্দ্রতা (%)উৎপাদনের সময়কাল
সাদা বোতাম মাশরুম১৪ – ১৮৮০ – ৮৫%৮০ – ৯০ দিন
ঝিনুক (ওয়েস্টার)২০ – ৩০৫৫ – ৭০%৩০ – ৬০ দিন
মিল্কি মাশরুম২৮ – ৩৮৮০ – ৯০%৪৫ – ৬০ দিন
খড় (প্যাডি স্ট্র)২৫ – ৩৫৮০ – ৯০%১০ – ১২ দিন
ঋষি মাশরুম৩০ – ৩২৮০ – ৮৫%১২০ – ১৫০ দিন
শীতকে মাশরুম১২ – ২৫৮০%১১০ – ১২০ দিন

ঙ. উপসংহার

মাশরুমের জাত বা প্রজাতি ভিন্ন হলেও প্রতিটি জাতই কোনো না কোনোভাবে মানুষের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির জন্য উপকারী। আপনি যদি বাণিজ্যিকভাবে চাষ করতে চান, তবে প্রথমেই ওয়েস্টার বা মিল্কি মাশরুম দিয়ে শুরু করা ভালো। পরবর্তীতে অভিজ্ঞতা বাড়লে ঋষি বা শীতকে মাশরুমের মতো দামী প্রজাতি চাষ করতে পারেন। পরিশেষে বলা যায়, নিজের এলাকার আবহাওয়া বুঝে মাশরুমের জাত নির্বাচন করাই হলো সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।

চ. সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন: বাড়িতে চাষের জন্য সবথেকে সহজ মাশরুম কোনটি?

উত্তর: ঝিনুক বা ওয়েস্টার বাড়িতে চাষের জন্য সবথেকে সহজ এবং এটি খুব কম সময়ে ফলন দেয়।

প্রশ্ন: আমি কি একই ঘরে সব ধরণের মাশরুম চাষ করতে পারি?

উত্তর: না, কারণ প্রতিটি প্রজাতির তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার চাহিদা ভিন্ন। তবে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থা থাকলে ভিন্ন ভিন্ন ঋতুতে ভিন্ন ভিন্ন মাশরুমের চাষ করা সম্ভব।

ছ. তথ্য সুত্র (Sources)

  • জাতীয় মাশরুম গবেষণা কেন্দ্র, হিমাচল প্রদেশ সোনাল (ICAR-DMR)
  • ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ হর্টিকালচার রিসার্চ (IIHR)
Spread the love

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top