
মাশরুম দিয়ে খাদ্য পণ্য তৈরির পদ্ধতি-টি সহজ একটি প্রক্রিয়া । মাশরুম প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং পুষ্টিকর খাবার হিসেবে পরিচিত। এতে প্রায় ৯০% আর্দ্রতা থাকার পাশাপাশি এটি প্রোটিনের একটি চমৎকার উৎস, কারণ এতে মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের অ্যামিনো অ্যাসিড বিদ্যমান। বর্তমানে ভারত ও বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাশরুম একটি প্রধান অর্থকরী ফসল হিসেবে উঠে আসছে। তবে মাশরুমের একটি বড় সমস্যা হলো এর উচ্চ আর্দ্রতা। দ্রুত বাদামি হয়ে যাওয়া এবং উচ্চ শোষণ ক্ষমতা থাকার কারণে কাঁচা মাশরুম স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ২৪ ঘণ্টার বেশি রাখা যায় না। যার কারণে অনেক সময় সাধারণ কৃষক সঠিক মূল্য পায় না এবং ফসল নষ্ট হয়।
এই বিষয়গুলোর কথা মাথায় রেখে ড. যশবন্ত সিং পারমার ইউনিভার্সিটি অফ হর্টিকালচার এন্ড ফরেষ্ট্রী-এর গবেষকরা মাশরুম দিয়ে খাদ্য পণ্য তৈরির পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। এর মাধ্যমে মাশরুমকে প্রক্রিয়াজাত করে দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ এবং বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করা সম্ভব হচ্ছে।
১. মাশরুমের পুষ্টিগুণ ও রাসায়নিক উপাদান
মাশরুম শুধু সুস্বাদুই নয়, এটি খনিজ এবং প্রোটিনের ভাণ্ডার। মাশরুম দিয়ে খাদ্য পণ্য তৈরির পদ্ধতি জানার আগে এর রাসায়নিক গঠন সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। একটি আদর্শ মাশরুমে সাধারণত নিচের উপাদানগুলো থাকে:
- আর্দ্রতা: ৯০.২০% (প্রায় ০.০৩ তারতম্য হতে পারে)
- মোট দ্রবণীয় উপাদান: ৫.৬৪%
- মোট শক্তি: ০.৬৩%
- মোট খনিজ লবণ: ১০.০৮%
- মোট দ্রবণীয় প্রোটিন: ২.৮১%
২. মাশরুম প্রক্রিয়াকরণ: শুকনো মাশরুম ও পেস্ট তৈরির নিয়ম
সরাসরি কাঁচা মাশরুম থেকে পণ্য তৈরি করলে তার গুণমান এবং স্বাদ বজায় থাকে না। তাই বাণিজ্যিক উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রধানত দুটি প্রাথমিক পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। এই ধাপগুলো অনুসরণ করা মাশরুম দিয়ে খাদ্য পণ্য তৈরির পদ্ধতি-র অন্যতম প্রধান অংশ।
২.১ শুকনো মাশরুম তৈরির বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি
মাশরুম ধুয়ে ছোট টুকরো করে ৫ মিনিট গরম জলে সেদ্ধ করতে হবে। এরপর ১ লিটার জলে ০.০৫% পটাশিয়াম মেটাবাইসালফাইট, ০.১% সাইট্রিক অম্ল এবং ১২৫ ppm ইডিটিএ (EDTA) মিশিয়ে সেই জলে ১০ মিনিট ডুবিয়ে রাখতে হবে। এরপর মাশরুমগুলো শুকিয়ে নিয়ে গুঁড়ো করে পাউডার তৈরি করা হয়। এই পাউডারই বিভিন্ন বেকারি পণ্যে ব্যবহৃত হয়।
২.২ মাশরুম পেস্ট তৈরির সহজ উপায়
মাশরুম দিয়ে খাদ্য পণ্য তৈরির পদ্ধতি-তে প্রথম কাজ সাধারণ জলে ধুয়ে সমান আকারে কেটে নিয়ে ফুটন্ত জলে ৫ মিনিট সেদ্ধ করে নিতে হবে। এরপর সেই টুকরোগুলোকে ব্লেন্ডার বা পেষণ যন্ত্রে পিষে মসৃণ পেস্ট তৈরি করতে হয়। এই পেস্ট বড়ি বা পাঁপড় তৈরির জন্য আদর্শ।

৩. মাশরুম ডাল বড়ি তৈরির পদ্ধতি ও উপকরন
বাঙালি খাদ্যতালিকায় ডাল বড়ি একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। গবেষণায় দেখা গেছে, ডালের সাথে মাশরুম মেশালে বড়ির পুষ্টিগুণ অনেক বেড়ে যায়। নিচে ৫ কেজি মাশরুম ডাল বড়ি তৈরির মিশ্রণের বিবরণ দেওয়া হলো:
- মাশরুম পেস্ট: ১ কেজি
- বিউলি ডাল বা চালের পেস্ট: ৪ কেজি
- গোলমরিচ: ২৫ গ্রাম এবং লবণ: ২৫০ গ্রাম
- প্রস্তুত প্রণালী: সারারাত ভেজানো ডাল পেস্ট করে তার সাথে মাশরুম পেস্ট ও মশলা ভালো করে মিশিয়ে নিন। এরপর চাটাইয়ের ওপর ছোট ছোট বড়ি দিয়ে রোদে শুকিয়ে প্যাকেজিং করুন।
বড়ি থেকে প্রাপ্ত পুষ্টিগুণ (রাসায়নিক বিশ্লেষণ):
মাশরুম বড়িতে আর্দ্রতা থাকে ১১.২৫%, প্রোটিন ১৯.৭৩%, চর্বি ০.৫০%, কার্বোহাইড্রেট ৬৪.৫২% এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ১৮.৬৫%। এর প্রতি ১০০ গ্রামে প্রায় ৩৪৯.৯৮ ক্যালরি শক্তি থাকে।
আড়ও দেখুন ওয়েস্টার বা ঝিনুক মাশরুম চাষ পদ্ধতি-1
৪. প্রোটিন সমৃদ্ধ মাশরুম পাঁপড় তৈরির কৌশল
বর্তমানে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের কাছে মাশরুম পাঁপড়ের চাহিদা ব্যাপক। মাশরুম দিয়ে খাদ্য পণ্য তৈরির পদ্ধতি গুলোর মধ্যে এটি নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সবথেকে লাভজনক।
পাঁপড়ের উপকরণ (৫ কেজি মিশ্রণ):
মাশরুম পেস্ট (১ কেজি), বিউলি বা উরদ ডাল (৪ কেজি), জিরা (২৫০ গ্রাম), কালোমরিচ (১২৫ গ্রাম), লবণ (১০০ গ্রাম), তেল (৫০০ মিলি), খাওয়ার সোডা (৫০ গ্রাম), হিং (৫ গ্রাম) এবং সাইট্রিক অম্ল (০.২৫ গ্রাম)।
প্রস্তুতি: সব উপকরণ একসাথে মিশিয়ে মণ্ড তৈরি করে মেশিনে বা হাতে পাঁপড় বেলতে হয়। মাশরুম পাঁপড়ে প্রোটিন থাকে ১৭.৫০% এবং ক্যালরি থাকে ৪০৫.৭৪%।

৫. স্বাস্থ্যকর মাশরুম বিস্কুট তৈরির বিস্তারিত পদ্ধতি
বিস্কুট তৈরিতে মাশরুম পাউডার ব্যবহার করলে তা ভিটামিন সমৃদ্ধ হয়। ৫ কেজি মিশ্রণ তৈরির জন্য আপনার লাগবে:
- মাশরুম পাউডার: ৭৫০ গ্রাম
- গমের আটা: ২ কেজি এবং ময়দা: ২.২৫ কেজি
- চিনি: ২.৫ কেজি এবং রিফাইন তেল: ৩.২৫ কেজি
- নারকেল কোড়া: ১ কেজি
- প্রস্তুতি: সবকিছু একত্রে মিশিয়ে ভালো করে ছেনে নিন। এরপর ডাইসের মাধ্যমে আকার দিয়ে মাইক্রোওয়েভ ওভেনে ১৮০°C তাপমাত্রায় বেক করুন। ঠান্ডা করে প্যাকেজিং করলে এটি ৩-৪ মাস পর্যন্ত ভালো থাকে। বিস্কুটে প্রায় ৭৩.৮১% কার্বোহাইড্রেট এবং ১৮.৭৩% অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট বিদ্যমান থাকে।
৬. মাশরুম পণ্যের ব্যবসা ও নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি
মাশরুম চাষের সাথে যুক্ত বিশেষ করে মহিলারা দলগতভাবে এই প্রক্রিয়াজাত পণ্য তৈরির ব্যবসা শুরু করতে পারেন। মাশরুম দিয়ে খাদ্য পণ্য তৈরির পদ্ধতি ব্যবহার করে পাঁপড়, বড়ি বা বিস্কুট উৎপাদন করলে কাঁচা মাশরুম নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে না এবং আয়ের পরিমাণও বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে অনলাইন মার্কেটিং এবং ই-কমার্স সাইটে এই পণ্যগুলোর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
আড়ও দেখুন মাশরুম চাষ পদ্ধতি ও লাভ: জাত, রোগ দমন এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পূর্ণাঙ্গ গাইড ২০২৬
উপসংহার (Conclusion)
পরিশেষে আমরা বলতে পরি, মাশরুমের বহুমুখী ব্যবহারই এই সেক্টরে সাফল্যের চাবিকাঠি। শুধুমাত্র কাঁচা মাশরুম বিক্রির ওপর নির্ভর না করে মাশরুম দিয়ে খাদ্য পণ্য তৈরির পদ্ধতি অনুসরণ করলে অপচয় যেমন কমে, তেমনি আয়ের নতুন পথ প্রশস্ত হয়। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী উদ্যোক্তাদের জন্য মাশরুমের বড়ি, পাঁপড় ও বিস্কুট উৎপাদন একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ তৈরি করতে পারে। সঠিক পুষ্টিমান বজায় রেখে বাজারজাত করতে পারলে এই পণ্যগুলো স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাবে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: মাশরুম দিয়ে খাদ্য পণ্য তৈরির পদ্ধতিতে কোন মাশরুম সেরা?
উত্তর: সাধারণত পাউডার ও পেস্ট তৈরির জন্য বাটন মাশরুম এবং ওয়েস্টার মাশরুম সবথেকে বেশি ব্যবহৃত হয়।
প্রশ্ন ২: মাশরুম বড়ি ও পাঁপড় কতদিন পর্যন্ত ভালো থাকে?
উত্তর: এয়ার টাইট কন্টেনারে বা প্রপার প্যাকেজিংয়ে রাখলে এই পণ্যগুলো ৬ মাস থেকে ১ বছর পর্যন্ত ভালো থাকে।
প্রশ্ন ৩: মাশরুম বিস্কুট কি ডায়াবেটিস রোগীরা খেতে পারেন?
উত্তর: মাশরুম বিস্কুট অত্যন্ত পুষ্টিকর, তবে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য চিনি ছাড়া (Sugar-free) ভার্সন তৈরি করা হলে তা স্বাস্থ্যের জন্য আরও উপকারী হবে।
তথ্য সুত্র
- ড. যশবন্ত সিং পারমার ইউনিভার্সিটি অফ হর্টিকালচার এন্ড ফরেষ্ট্রী , নাউনি , সোলানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগ










