শূন্য থেকে লক্ষপতি: অমৃতা দাসের Integrated Farming থেকে প্রতি মাসে ৩৫,০০০-৪০,০০০ টাকা আয় সাফল্যের কৃষি সূত্র

সমন্বিত কৃষি (Integrated farming) মডেল অমৃতা দাস success গল্প

হলদিবাড়ি ব্লকের এক সাধারণ গৃহবধূ থেকে জেলার সেরা নারী কৃষি উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প আজ অনেকের কাছে অনুপ্রেরণা। শ্রীমতী অমৃতা দাস বর্তমানে তাঁর পরিবেশবান্ধব সমন্বিত কৃষি খামার থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৩৫,০০০ – ৪০,০০০ টাকা নিট আয় করছেন। ২০১৭ সালে আনন্দধারা (CMSA) প্রকল্পের মাধ্যমে শুরু হওয়া তাঁর এই সফর আজ একটি সফল বিজনেস মডেলে পরিণত হয়েছে।

১. প্রেক্ষাপট ও জীবন সংগ্রামের শুরু

কোচবিহার জেলার হলদিবাড়ি ব্লকের উত্তর বড় হলদিবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের ‘দোলনচাঁপা’ স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্য অমৃতা দাস। স্বামী গোবিন্দ দাস ও দুই সন্তান নিয়ে ৪ জনের ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারে অর্থনৈতিক টানাপোড়েন ছিল নিত্যসঙ্গী। পড়াশোনা মাধ্যমিকের বেশি না এগোলেও, পশুপালনের প্রতি তাঁর ছোটবেলা থেকেই গভীর আগ্রহ ছিল। যখন তাঁর স্বামী কৃষিতে কিছুটা অনীহা প্রকাশ করছিলেন, ঠিক তখনই অমৃতা দেবী হাল ধরেন এবং সমন্বিত কৃষির মাধ্যমে নিজের ভাগ্য বদলানোর সংকল্প নেন।

২. সমন্বিত কৃষি খামার গড়ে তোলার ধাপসমূহ

অমৃতা দেবী মাত্র ৩ বিঘা জমিকে এমনভাবে সাজিয়েছেন যেন একটির বর্জ্য অন্যটির খাবারে পরিণত হয়। তাঁর এই সমন্বিত কৃষি মডেলে ৫টি স্তম্ভ রয়েছে:

  • মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা: রাসায়নিক সার বর্জন করে নিজের তৈরি জৈব সারের ব্যবহার।
  • পুষ্টি বাগান: পরিবারের দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে বিষমুক্ত সবজি এবং লেবু ও ফলের চাষ।
  • উন্নত পশুপালন: ১৭টি বাংলার কালো ছাগল (Black Bengal) দিয়ে শুরু করে আজ তাঁর খামারে ২টি শাহীওয়াল গরু এবং ৩৫টি বার্কশয়ার শুকর রয়েছে।
  • মাছ চাষ: নিজস্ব পুকুরে শিং ও কই মাছের নিবিড় চাষ।
  • বস্তায় আদা চাষ: জায়গার অভাব দূর করতে আধুনিক পদ্ধতিতে আদা ও হলুদ চাষ।

৩. সম্পদের খতিয়ান ও আয়ের হিসাব

বর্তমানে অমৃতা দাসের এই সমন্বিত কৃষি খামারের মোট সম্পদের মূল্য প্রায় ৮-১০ লক্ষ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের হিসাব অনুযায়ী তাঁর আয় নিচের টেবিলে দেওয়া হলো:

খামারের বিভাগ বার্ষিক উৎপাদননিট লাভ (টাকা)
শাহীওয়াল গরু ১৯৩৫ লিটার দুধ ৫৫,৭৫০
ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল ৯টি (৭০ কেজি মাংস) ৪৪,০০০
বার্কশয়ার শুকর১৬টি (১৩ কুইন্টাল মাংস) ২,২৩,৫০০
লেয়ার মুরগি ডিম  ৮৪০ টি ডিম ৬,৯০০
কই ও শিং মাছ ২০০ কেজি ২৪,০০০
লেবু বাগান 0.5 বিঘা  লেবু ১৬০০০ টি ৩৭,০০০
ভুট্টা ও অমন ধান চাষ২২ কুইন্টাল ২৯,২০০
বস্তায় আদা-হলুদ ও সবজি চাষ ২৮ কুইন্টাল ৩৫,০০০
পুষ্টি বাগান ৮,০০০
মোট ৪,৬৩,৩৫০

৪. সফল খামার ব্যবস্থাপনার বিশেষ দিক (Expert Tips)

অমৃতা দাসের এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে রয়েছে কিছু সঠিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। পাঠকদের জন্য তাঁর খামারের কিছু গোপন কৌশল নিচে দেওয়া হলো:

আধুনিক শুকর পালন: অমৃতা দেবী বার্কশয়ার ও ঘুঙরু প্রজাতির শুকর পালন করছেন। তিনি জানেন যে, শুকরের ঘর সবসময় শুকনো ও পরিষ্কার রাখা জরুরি (কারণ ঘর স্যাঁতসেঁতে থাকলে শুকরের নিউমোনিয়া ও এফএমডি রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাই নিয়মিত পটাশ জল দিয়ে মেঝে ধোয়া ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করা বাধ্যতামূলক)।

উন্নত ছাগল পালন: ছাগলের খাবারের ক্ষেত্রে তিনি শুধু চারণভূমির ওপর নির্ভর করেন না। তিনি ছাগলকে দানাদার খাদ্যের পাশাপাশি উন্নত জাতের নেপিয়ার ঘাস খাওয়ান (যা শুধু মাঠে চরানোর তুলনায় ছাগলের ওজন দ্রুত বৃদ্ধি করে এবং স্বাস্থ্য ভালো রাখে)।

মৎস্য চাষ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: তাঁর খামারে কোনো কিছুই অপচয় হয় না। তবে তিনি পশু-পাখির বর্জ্য বা গোবর সরাসরি পুকুরে না ফেলে প্রথমে সেটিকে গেঁজিয়ে বা জৈব পদ্ধতিতে শোধন করে পুকুরে প্রয়োগ করেন (কারণ সরাসরি কাঁচা বর্জ্য পুকুরে ফেললে অ্যামোনিয়া বেড়ে মাছের রোগ হতে পারে)।

আড়ও দেখুন ২৮ টি জটিল হাঁসের রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা পদ্ধতি: খামারির অভিজ্ঞতা ও প্রতিকার

বুদ্ধিদীপ্ত বাজারজাতকরণ: অমৃতা দাসের লাভের একটি বড় কারণ তাঁর সঠিক পরিকল্পনা। তিনি সব ফসল বা সবজি একবারে বাজারে না তুলে পর্যায়ক্রমে সারা বছর ধরে বিক্রি করেন (এটি তাঁর খামারের ‘ক্যাশ ফ্লো’ বা নগদ অর্থের জোগান সারাবছর ঠিক রাখতে সাহায্য করে)।

সমন্বিত কৃষি (Integrated farming) মডেল অমৃতা দাস success গল্প
অমৃতা দাস এর integrated Farming এর ছাগল,শুকর, কম্পোস্ট সার, দুগ্ধজাত গরু ও ভুট্টা চাষএর দৃশ্য

৫. কেন এটি একটি আদর্শ মডেল?

এই সমন্বিত কৃষি খামারে কোনো কিছুই অপচয় হয় না। শুকর ও গরুর গোবর থেকে জীবামৃত তৈরি হচ্ছে, যা সবজি বাগানে সার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আবার খামারের বাড়তি ভুট্টার কুঁড়ো শুকর ও হাঁসের খাবার হচ্ছে। এই চক্রাকার পদ্ধতির কারণেই তাঁর উৎপাদন খরচ অনেক কম।

৬. প্রাকৃতিক কৃষি ও জৈব উপকরণের সঠিক ব্যবহার (Expert Tips)

অমৃতা দাসের সমন্বিত কৃষি খামারে কোনো রাসায়নিকের স্থান নেই। তিনি নিজের বাড়িতেই তৈরি করেন অত্যন্ত শক্তিশালী কিছু জৈব তরল। পাঠকদের জন্য তাঁর বিশেষ পদ্ধতিগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

বীজামৃত ও চারা শোধন: তিনি যে কোনো বীজ বপন বা চারা রোপণের আগে বীজামৃত দিয়ে বীজ ও চারা শোধন করে নেন (এটি চারা অবস্থায় রোগ দমনের সঠিক ও কার্যকর পদ্ধতি)। [প্রস্তুত করতে এখানে ক্লিক করুন]

জীবামৃতের সঠিক প্রয়োগ: মাটির উর্বরতা ও গাছের বৃদ্ধির জন্য তিনি নিয়মিত জীবামৃত ব্যবহার করেন। এক্ষেত্রে তিনি একটি বিশেষ নিয়ম মেনে চলেন— তিনি জীবামৃত তৈরির [এখানে ক্লিক করুন] সাথে সাথেই জমিতে প্রয়োগ করেন না (কারণ জীবামৃত তৈরির পর অন্তত ৪-৭ দিন ছায়ায় রেখে গেঁজিয়ে নেওয়া জরুরি, এতে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে যায় যা মাটির প্রাণশক্তি ফেরাতে সাহায্য করে)। অমৃতা দেবী এই সময়সীমা নিখুঁতভাবে পালন করেন বলেই তাঁর ফলন অন্যদের চেয়ে ভালো হয়।

বিষমুক্ত কীটবিতাড়ক (অগ্নিঅস্ত্র ও নিমাস্ত্র): পোকা দমনে তিনি বাজারের বিষাক্ত কীটনাশকের ওপর নির্ভর করেন না। পরিবর্তে তিনি বাড়ির তৈরি নিমাস্ত্র ও অগ্নিঅস্ত্র ব্যবহার করেন [বাড়িতে প্রস্তুত করতে এখানে ক্লিক করুন]। তিনি পোকা লাগার অপেক্ষা না করে নির্দিষ্ট সময় অন্তর এই জৈব কীটনাশকগুলো স্প্রে করেন (যা রাসায়নিক বিষের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই ফসলকে রক্ষা করে)। এর ফলে তাঁর সমন্বিত কৃষি খামারের প্রতিটি ফসল হয় সম্পূর্ণ বিষমুক্ত এবং স্বাস্থ্যের জন্য শতভাগ নিরাপদ।

৭. বর্জ্য থেকে সম্পদ তৈরির কৌশল

অমৃতা দেবী তাঁর সমন্বিত কৃষি মডেলে সম্পদের চক্রাকার ব্যবহার নিশ্চিত করেছেন:

সার ব্যবস্থাপনা: তিনি গরুর গোবর ও শুকরের বর্জ্য দিয়ে উচ্চমানের কম্পোস্ট সার তৈরি করেন।

মৎস্য চাষে বর্জ্যের সঠিক ব্যবহার: অমৃতা দেবী তাঁর খামারের বর্জ্যকে অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক উপায়ে মাছেদের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করেন। এক্ষেত্রে একটি বিশেষ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন— তিনি কাঁচা গোবর বা পশুর বর্জ্য সরাসরি পুকুরে ফেলেন না (কারণ কাঁচা বর্জ্য সরাসরি পুকুরে ফেললে জলে অ্যামোনিয়া বেড়ে গিয়ে মাছের মড়ক বা বিভিন্ন রোগ হতে পারে)। অমৃতা দেবী প্রথমে এই বর্জ্যকে একটি নির্দিষ্ট গর্তে বা পাত্রে রেখে গেঁজিয়ে নেন বা ডিকম্পোজ করেন। এই পচানো বর্জ্য পুকুরে প্রয়োগ করলে তা মাছেদের জন্য চমৎকার প্রাকৃতিক খাবার (Plankton) হিসেবে কাজ করে এবং মাছের বৃদ্ধি দ্রুত হয়। [ বড়ো মাছ চাষ পদ্ধতি দেখতে এখানে ক্লিক করুন ]

বস্তায় আদা চাষ: জায়গার অভাব দূর করতে তিনি ১২০টি বস্তায় আদা ও হলুদ চাষ করে ৮৩,২০০ টাকা অতিরিক্ত নিট লাভ করেছেন।

৮. সংগ্রামের স্বীকৃতি: সাফল্যের শিখরে অমৃতা

কঠোর পরিশ্রম এবং আধুনিক সমন্বিত কৃষি পদ্ধতি অমৃতা দাসকে এনে দিয়েছে অনন্য সম্মান। তাঁর অর্জিত পুরস্কারের তালিকা:

  • ব্লকের প্রথম মহিলা কিষান: তিনি তাঁর ব্লকের নারী কৃষকদের পথপ্রদর্শক।
  • কৃষিরত্ন পুরস্কার: কৃষি ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি রাজ্য ও জেলা স্তরে ‘কৃষিরত্ন’ এবং ‘জেলার সেরা কৃষক’ পুরস্কারে ভূষিত হন।
  • জাতীয় স্তরের স্বীকৃতি: বর্তমানে তিনি ভারতীয় কৃষি অনুসন্ধান কেন্দ্র (ICAR) কৃষি প্রযুক্তি অ্যাপ্লিকেশন গবেষণা ইনস্টিটিউট(ATARI ) কোলকাতা কতৃপক্ষ নাবার্ড অর্থায়িত প্রকল্প এরিয়া ডেভলপমেন্ট স্কীম প্রনয়ণ এবং পশ্চিমবঙ্গের ৬ টি জলবায়ু অঞ্চলে জুড়ে মডেল  ইন্টিগ্রেটেড ফার্মিংয়ের জন্যে প্রজেক্ট মনিটরিং কমিটিতে(PMC) কৃষকদের প্রতিনিধি হিসেবে সরাসরি কাজ করছেন।

আড়ও দেখুন আনন্দধারা প্রকল্পের অধীনে মহিলা প্রোডিউসার গ্রুপ (PG) বা উৎপাদক গোষ্ঠী গঠনের পূর্ণাঙ্গ গাইড

৯. কেন নতুন প্রজন্মের জন্য এটি একটি পাঠশালা?

বর্তমান সময়ে যেখানে নতুন প্রজন্ম কৃষিতে অনীহা প্রকাশ করছে, সেখানে অমৃতা দাসের এই সমন্বিত কৃষি( Integrated Farming) মডেল একটি বৈপ্লবিক সমাধান। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, মাটির সাথে আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধন ঘটাতে পারলে গ্রাম থেকেই লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করা সম্ভব। কোচবিহার জেলা আনন্দধারা (CMSA) প্রকল্পের কারিগরি সহযোগিতা এবং অমৃতা দেবীর বুদ্ধিমত্তা আজ তাঁর ৩ বিঘা জমিকে একটি সম্পদে পরিণত করেছে।

সমন্বিত কৃষি সফল করার ৭টি মূল কৃষি সূত্র

অমৃতা দাসের খামারি জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা যে ৭টি শক্তিশালী সমন্বিত কৃষি সূত্র পাই, তা আপনার খামারকেও লাভজনক করে তুলবে:

  • ১. জিরো ওয়েস্ট মডেল: খামারের একটি উপাদানের বর্জ্য অন্যটির খাদ্য বা সার হিসেবে ব্যবহার করুন। যেমন—মাছের পুকুরের নিচে থাকা কাদা ও জল সবজি চাষে ব্যবহার করলে সারের খরচ অর্ধেক কমে যায়।
  • ২. বহুমুখী আয়ের উৎস: কেবল একটি মাছ বা একটি ফসলের ওপর নির্ভর না করে মাছ, হাঁস এবং সবজির সমন্বিত চাষ করুন। এতে একটিতে লোকসান হলেও অন্যটি আপনাকে রক্ষা করবে।
  • ৩. উন্নত জাত নির্বাচন: বাজারের চাহিদা বুঝে উচ্চফলনশীল মাছের পোনা এবং সবজির বীজ নির্বাচন করুন। বারোমাসি জাতের চাষ করাই হলো আধুনিক কৃষি সূত্র।
  • ৪. নিবিড় পর্যবেক্ষণ: প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে খামার পরিদর্শন করুন। মাছের বৃদ্ধি বা গাছের পাতায় কোনো রোগ দেখা দিলে সাথে সাথে ব্যবস্থা নিন। নিয়মিত তদারকিই বড় ক্ষতি আটকায়।
  • ৫. জৈব সারের প্রাধান্য: রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজের খামারেই ভার্মি কম্পোস্ট বা জৈব সার তৈরি করুন। এটি মাটির স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং উৎপাদন খরচ কমায়।
  • ৬. বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ: কেবল প্রথাগত জ্ঞান নয়, সরকারি কৃষি দপ্তর থেকে আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রশিক্ষণ নিন। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত খামারিরাই দীর্ঘমেয়াদে সফল হন।
  • ৭. পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও ধৈর্য: শুরুতেই বিশাল বিনিয়োগ না করে ছোট পরিসরে শুরু করুন। কৃষিতে ধৈর্যই আসল শক্তি। অন্তত ২-৩ বছর টিকে থাকতে পারলে বড় সাফল্যের মুখ দেখা সম্ভব।

উপসংহার ও উপদেশ

সফল উদ্যোক্তা স্টিভ জবস বলেছিলেন— “আপনার কাজ আপনার জীবনের একটি বড় অংশ পূর্ণ করবে, আর সেই কাজে সত্যিকারের সন্তুষ্টি পাওয়ার একমাত্র উপায় হলো আপনি যা করছেন তাকে ভালোবাসা।” অমৃতা দাস তার খামারকে ভালোবেসেছেন বলেই আজ তিনি সফল।

অমৃতা দাসের এই সমন্বিত কৃষি(Integrated Farming) বিপ্লব আমাদের বার্তা দেয় যে, পরিবেশ ঠিক রেখেও লাভজনক ব্যবসা করা সম্ভব। তাঁর এই সুস্থায়ী চাষ ব্যবস্থা [ দেখতে এখানে ক্লিক করুন ] কেবল তাঁর পরিবারের উন্নয়ন ঘটায়নি, বরং সারা বাংলার কৃষিজীবী নারীদের স্বনির্ভর হওয়ার সাহস জোগাচ্ছে।আপনিও যদি এই কৃষি সূত্র গুলো মেনে কাজ শুরু করেন, তবে আপনার খামারও একদিন সাফল্যের মুখ দেখবে।

সমন্বিত কৃষি নিয়ে কিছু সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)

১. সমন্বিত কৃষি বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: সমন্বিত কৃষি বা Integrated Farming হলো এমন একটি আধুনিক চাষ পদ্ধতি যেখানে একই জমিতে পরিকল্পিতভাবে ফসল চাষের পাশাপাশি পশুপালন, মৎস্য চাষ এবং হাঁস-মুরগি পালন করা হয়। এখানে একটির বর্জ্য অন্যটির পরিপূরক খাদ্য বা সার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যা উৎপাদন খরচ কমিয়ে লাভ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

২. সমন্বিত কৃষি খামার শুরু করতে নূন্যতম কতটা জমির প্রয়োজন?

উত্তর: এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি খুব অল্প জায়গাতেও করা যায়। অমৃতা দাসের মতো আপনি মাত্র ২-৩ বিঘা জমি দিয়েই আদর্শ সমন্বিত কৃষি মডেল শুরু করতে পারেন। এমনকি আপনার বাড়ির চারপাশের ফেলে রাখা জায়গাতেও বস্তায় আদা বা পুষ্টি বাগান দিয়ে এর সূচনা করা সম্ভব।

৩. রাসায়নিক সার ছাড়া কি ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব?

উত্তর: হ্যাঁ, একদম সম্ভব। অমৃতা দেবী তাঁর খামারে রাসায়নিক সারের বদলে জীবামৃত, বীজামৃত এবং ভার্মিকম্পোস্ট ব্যবহার করেন। প্রাকৃতিক কৃষির এই উপাদানগুলো মাটির উর্বরতা শক্তি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয় (তবে মনে রাখবেন, জীবামৃত তৈরির পর অন্তত ৪-৭ দিন গেঁজিয়ে নিয়ে প্রয়োগ করলে সবচেয়ে ভালো ফলাফল পাওয়া যায়)।

৪. সমন্বিত কৃষি খামারে রোগ দমনের উপায় কী?

উত্তর: বিষাক্ত রাসায়নিক কীটনাশকের বদলে নিমাস্ত্র, ব্রহ্মাস্ত্র বা অগ্নিঅস্ত্রের মতো জৈব উপাদান ব্যবহার করাই এই পদ্ধতির মূল বৈশিষ্ট্য। এছাড়া পশুপালনের ক্ষেত্রে ঘর পরিষ্কার ও শুকনো রাখা এবং বায়ো-সিকিউরিটি মেনে চললে রোগের প্রাদুর্ভাব অনেক কম হয়।

৫. এই পদ্ধতিতে মাসিক আয় কেমন হতে পারে?

উত্তর: আয় নির্ভর করে আপনার খামারের আকার ও ব্যবস্থাপনার ওপর। অমৃতা দাসের ৩ বিঘার সমন্বিত কৃষি মডেল থেকে সমস্ত খরচ বাদ দিয়ে মাসে প্রায় ৩৫,০০০ থেকে ৪০,০০০ টাকা নিট আয় করা সম্ভব। নিয়মিত ক্যাশ ফ্লো ঠিক রাখতে বিভিন্ন সময়ে তোলা যায় এমন ফসল নির্বাচনের পরামর্শ দেওয়া হয়।

তথ্য সুত্র

এই সাফল্যের গল্পটি নিম্নলিখিত উৎস এবং বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে সংকলিত হয়েছে:

  • সরাসরি সাক্ষাৎকার: এই কন্টেন্টের প্রধান তথ্যসমূহ অমৃতা দাস (সফল উদ্যোক্তা, কোচবিহার) এবং তার পরিবারের সাথে সরাসরি কথোপকথনের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছে।
  • প্রকল্পের তথ্য (WBSRLM): পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য গ্রামীণ জীবিকা মিশন বা ‘আন ন্দধারা’ (West Bengal State Rural Livelihoods Mission-WBSRLM) প্রকল্পের নির্দেশিকা কমিউনিটি ম্যানেজড সাস্টেইনেবল এগ্রিকালচার (CMSA) এর আওতায় বৈজ্ঞানিক উপায়ে সমন্বিত সুস্থায়ী চাষ ব্যবস্থাপনা তথ্য । হলদিবাড়ী ব্লক (B.D.O Office) আনন্দধারা বিভাগ।
  • বিভাগীয় স্বীকৃতি: জেলার সেরা কৃষক স্বীকৃতি ও PMC মেম্বার তথ্য-উত্তরবঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র (UBKVK) পুন্ডিবাড়ি এবং হলদিবাড়ী ব্লক কৃষি বিভাগ- কৃষি পুরস্কার প্রাপ্তি তথ্য, হলদিবাড়ী ব্লক উন্নয়ন দপ্তরের (BDO Office) ২০২৫ সালের নারী দিবসের সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানের রেকর্ড।
Spread the love

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top