
ফেব্রুয়ারি(February) মাস বা মাঘ-ফাল্গুনের কৃষি কাজ এর এই সন্ধিক্ষণে রবি ফসলের যত্ন এবং গ্রীষ্মকালীন ফসলের প্রস্তুতির জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ সময়। নিচে ছবির প্রতিটি তথ্যের সাথে ‘কৃষি সূত্র’-এর বিশেষ জৈব পরামর্শ এবং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপারিশগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. বোরো ধান ও গম চাষের সঠিক পরিচর্যা
বোরো ধানের ফলন বৃদ্ধিতে নিচের মাঘ-ফাল্গুনের কৃষি কাজ নির্দেশিকা অনুযায়ী পদক্ষেপ নিন:
- রোপণ পদ্ধতি: ধানের ফলন বৃদ্ধিতে ‘শ্রী’ পদ্ধতি গ্রহণ করুন। সারিতে চারা লাগানো নিশ্চিত করুন এবং এ কাজে ‘এজোলা’ ব্যবহার করুন। রোয়া জমিতে মড়ক চারা লাগিয়ে খালি স্থান পূরণ করুন।
- সার ও জল: রোয়া লাগানোর ২০-২৫ দিন পর চাপান সার দিয়ে মাটি ছোট করুন। জমির মাটি খুব ফেটে গেলে সেচ দিন।
- গম চাষ: এই মাসে গম চাষে ‘হলুদ মরিচা’ (Yellow Rust) রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটতে পারে। নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন করুন।
কৃষি সূত্র পরামর্শ: চারা লাগানোর সাথে সাথেই ইউরিয়া প্রয়োগ করবেন না এতে গোড়া পচে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। রাসায়নিক সারের বদলে সেচের জলের সাথে প্রতি বিঘাতে ২০০ লিটার জীবামৃত প্রয়োগ করুন। এটি মাটির উর্বরতা বাড়াবে। পোকা দমনে রাসায়নিকের বিকল্প হিসেবে অগ্নিঅস্ত্র বা ব্রহ্মাস্ত্র ব্যবহার করুন।
আড়ও দেখুন জৈব কীটবিতারক(কীটনাশক) অগ্নিঅস্ত্র (Agniastra) কি? কিভাবে তৈরি করবেন ও ব্যবহার করবেন?
২. ভুট্টা চাষ ও পরিচর্যা:
সঠিক উৎপাদন পেতে নিচের মাঘ-ফাল্গুনের কৃষি কাজ গাইড দেখুন:
- সার প্রয়োগ: চারা গাছ হলে N:P:K ১৯:১৯:১৯ স্প্রে করুন ৭ দিন পর পর দুইবার । গাছ হাঁটু সমান উচ্চতায় পৌঁছালে বিঘা প্রতি ১০-১২ কেজি ইউরিয়া চাপান সার হিসেবে দিন এবং জিংক ও বোরন স্প্রে করুন।
- সেচ: মোচা আসার আগে এবং দানায় দুধ আসার সময় জমিতে অবশ্যই পর্যাপ্ত রস বা সেচ নিশ্চিত করুন।
- পোকা নিয়ন্ত্রণ: বর্তমানে ফল আর্মিওয়ার্ম (Fall Armyworm) দমনে বিশেষ নজর দিন। আক্রান্ত গাছের মাঝখানে বা ভেপুতে প্রথমে জৈব উপায়ে অগ্নিঅস্ত্র অথবা প্রয়োজনে অনুমোদিত কীটনাশক প্রয়োগ করুন।
কৃষি সূত্র পরামর্শ: ভালো ফলন ও দানার পুষ্টি বাড়াতে সেচের সাথে জীবামৃত প্রয়োগ করুন । ভুট্টা ক্ষেতে জল জমিয়ে রাখা যাবে না, ভুট্টা জল সইতে পারে না। জমিতে জল জমে থাকলে গোড়া পচা রোগ হতে পারে, তাই জল নিকাশির সুব্যবস্থা রাখা জরুরি। ভুট্টা গাছের কচি ডগার ওপর বা পাতার ভেতরে সার সরাসরি ছিটানো যাবে না, এতে পাতা পুড়ে গাছ মারা যেতে পারে। সার সবসময় গাছের গোড়া থেকে ৩-৪ ইঞ্চি দূরে নালা করে দেওয়া উচিত।
৩. তৈলবীজ, ডাল শস্য ও আলু চাষ
- সরিষা: উঁচু জমির সরিষা ঘরে তোলার সময়। ছবি হলুদ হয়ে শুকোতে শুরু করলে ফসল কাটুন। দেরিতে লাগানো সরিষার জাব পোকা দমনে হলুদ আঠালো বোর্ড (Yellow Trap) এবং নিম তেল বা নিমের নির্যাস ব্যবহার করুন।
- তিল চাষ: ফাল্গুনের শুরুতে তিল বোনার জন্য জমি তৈরি করুন।
- মুগ চাষ: ধান কাটার পর ফাঁকা জমিতে মাঘের শেষে মুগ ডাল রোপণের উপযুক্ত সময়। এতে জমিতে নাইট্রোজেন বাড়ে।
- কলাই: ফুল ও গুটি আসার সময় ১ বার সেচ দিন। পোকা দমনে ফেরোমন ট্র্যাপ ব্যবহার করুন।
- পোকামাকড়: সরিষা ও ডাল শস্যে এই সময় জাব পোকার আক্রমণ তীব্র হয়। সরিষার পোকা দমনে আঠালো হলুদ ফাঁদ ব্যবহার করুন। ভোরে বা বিকেলে তামাক পাতা ভেজানো জল বা নিমাস্ত্র নিম তেল ,অগ্নিঅস্ত্র স্প্রে করার পরামর্শ দেওয়া হয়ছে মাঘ-ফাল্গুনের কৃষি কাজ এ।
- আলু: ৬০-৬৫ দিনের মাথায় শেষ সেচ দিন। আলু তোলার ১৮-২০ দিন আগে সেচ বন্ধ রাখুন। ত্বক শক্ত করতে গাছের গোড়া থেকে ডগা বা ‘হলম’ কেটে দিন।
কৃষি সূত্র পরামর্শ: জাব পোকা দমনে খুব কড়া কেমিক্যাল স্প্রে করবেন না এতে মৌমাছি মারা যায়।
৪. শীতকালীন ও গ্রীষ্মকালীন সবজি চাষ
- শীতকালীন সবজি: কপি ও ওলকপি তোলা এবং পরিচর্যা করুন। পেঁয়াজের বয়স ৪০ দিন হলে চাপান ও সেচ দিন। কন্দ পচা রোধে ট্রাইকোডার্মা ব্যবহার করুন।
- গ্রীষ্মকালীন সবজি: জাঁতি, শসা, চিচিঙ্গা, ঝিঙ্গা ও করলা চাষের প্রস্তুতি নিন। করলা ও পটল চাষে প্রতি মাথায় ১.৫ কেজি গোবর সার ও ৫০-৬০ গ্রাম ডি এ পি দিয়ে সেচ দিন।
কৃষি সূত্র পরামর্শ: সবজির বীজ রোপণের আগে অবশ্যই বীজামৃত দিয়ে শোধন করুন। ছত্রাক দমনে দই সাঁচ (পচানো দইয়ের জল) ব্যবহার করুন
৫. মাঘ-ফাল্গুনের কৃষি কাজ আদা, হলুদ ও গোলমরিচ চাষ
- আদা ও হলুদ: এই মাসে জমি তৈরি করে জৈব সার প্রয়োগ করে রাখুন। যারা বাণিজ্যিকভাবে করতে পারছেন না, তারা বস্তায় আদা ও হলুদ চাষ করতে পারেন। বস্তায় মাটি, বালু ও পচা গোবর সমান ভাগে মিশিয়ে চাষ করলে কম জায়গায় বেশি ফলন সম্ভব।
- গোলমরিচ: গোলমরিচের চারা গাছে সেচ দিন ও আবশ্যিকভাবে নাড়িয়ে ওঠার (Support) ব্যবস্থা করুন।
কৃষি সুত্র পরামর্শ: আদা রোপনের পূর্বে মাটিতে ট্রাইকোডারমা ভীরিডী এবং গোবরে জীবনু সার ১৫ দিন আগে মিশিয়ে নিবেন এবং বীজ শোধন করে ছায়া জায়গায় শুকিয়ে লাগাবেন । মুখ বেরিয়েছে এমন কন্দ বীজ হিসাবে রোপনের জন্যে ব্যাবহার করবেন।
৬. ফল চাষের বিশেষ যত্ন ও রোপণ
মাঘ-ফাল্গুনের কৃষি কাজ এ ফলের বাগানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ থাকে:
- আম ও লিচু বাগানের যত্ন: মুকুল আসার সময় হালকা সেচ দিন। বিঘা প্রতি ১ কেজি ইশকো বোরন প্রয়োগ করলে ফলন বাড়ে।
- কৃষি সূত্র পরামর্শ: মুকুলে শোষক পোকা দমনে কড়া বিষ এড়িয়ে নিমাস্ত্র ব্যবহার করুন।
- উদ্যানপালন বিভাগ: ড্রাগন ফ্রুট বা ক্যাকটাস জাতীয় ফলের কাটিং বা চারা তৈরির জন্য মাঘ মাসের শেষ দিক অত্যন্ত উপযোগী।
- পেঁপে ও কলা: এই মাসের শেষ দিকে অর্থাৎ ফাল্গুনের শুরুতে পেঁপে এবং কলার চারা রোপণের উপযুক্ত সময়। পেঁপে চারা রোপণের আগে গর্ত তৈরি করে সেখানে বীজামৃত দিয়ে শোধন করা মাটি ব্যবহার করুন।
কৃষি সূত্র পরামর্শ: পেঁপে চারা রোপণের গর্তে কাঁচা গোবর দেওয়া দেবেন না, এতে উইপোকার আক্রমণ হতে পারে এবং শিকড় পচে চারা মারা যেতে পারে। সবসময় পচা শুকনো গোবর বা ভার্মিকম্পোস্ট ব্যবহার করা করবেন । বড় পেপে গাছ থাকলে গাছের দুই ফুট দূরত্বে গোল করে জীবামৃত প্রয়োগ করুন এবং খড় বা শুকনো আগাছা দিয়ে আচ্ছাদন দিয়ে ঢেকে দিন ও গাছের গড়ে যেন আদ্রতা থাকে সেই দিকে নজর রাখুন । পোকা ও ভাইরাস রোগ আটকাতে জৈব কিট বিতারক নিমাস্ত্র (৭ দিন পর পর ) এবং দই ছাঁচ ব্যাবহার করুন ।
- লেবু ও পেয়ারা: লেবু জাতীয় গাছে এই সময় নতুন পাতা ও ফুল আসে। এই সময় ‘লিফ মাইনার’ পোকা দমনে নিমাস্ত্র স্প্রে করা খুব কার্যকর।
- তরমুজ ও ফুটি: নদী সংলগ্ন বা চরাঞ্চলে তরমুজ ও ফুটি চাষের বীজ বপনের এটিই শেষ সুযোগ।
- মৌমাছি পালন: বসন্তের এই সময়ে ফসলে পরাগায়নের সুবিধার্থে বাগানের পাশে ‘মধু মক্ষিকা’ বা মৌমাছি পালনের প্রশিক্ষণ থাকলে পালন শুরু করবেন এতে ফলের উৎপাদন বাড়বে মধু থেকে আলাদা আয় বাড়বে।
কৃষি সূত্র পরামর্শ: ফলের গাছ রোপণের জন্য যারা জমির অভাব বোধ করছেন, তারা বড় ড্রামে বা বস্তায় লেবু ও পেয়ারা চাষ করতে পারেন। বস্তার মাটির উর্বরতা বাড়াতে প্রতি মাসে একবার জীবামৃত প্রয়োগ করুন।
আড়ও দেখুন জীবামৃত (Jeevamrut): প্রাকৃতিক কৃষির মহাবিজ্ঞান ও মাটির হারানো সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের সূত্র
৭. মাশরুম চাষ ও পরিচর্যা
মাঘ-ফাল্গুনের কৃষি কাজ এর পরিচর্যায় শীতের শেষে এবং বসন্তের শুরুতে মাশরুম চাষের ক্ষেত্রে নিচের বিষয়গুলো মাথায় রাখুন:
- ঝিনুক মাশরুম (Oyster Mushroom): মাঘ মাসের শেষে তাপমাত্রার সামান্য বৃদ্ধির সাথে সাথে ঝিনুক মাশরুমের ফলন বাড়ে। তবে ঘরে আর্দ্রতা বজায় রাখতে হবে।
- খড় শোধন: মাশরুমের স্পন (বীজ) বসানোর আগে খড় শোধন করার সময় কেমিক্যালের বদলে গরম জল ব্যবহার করা পরিবেশবান্ধব।
- পরিচ্ছন্নতা: মাশরুম ঘরে কোনো ছত্রাক আক্রমণ করলে দই সাঁচ বা হালকা নিম জল স্প্রে করে প্রাকৃতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করুন।
কৃষি সুত্র পরামর্শ: মাশরুম ঘরে সরাসরি খুব কড়া ছত্রাকনাশক স্প্রে করবেন না , এতে মাশরুমের পুষ্টিগুণ নষ্ট হয় এবং খাবারের অযোগ্য হতে পারে। প্রাকৃতিক উপায়ে ঘর পরিষ্কার রাখা উচিত।
৮. মৎস্য পালন বিভাগের নির্দেশিকা
- পুকুরের গ্যাস নিয়ন্ত্রণ: শীতের শেষে পুকুরের জল কমে যায় এবং তলায় গ্যাস জমে। জাল টেনে তলার জল নাড়িয়ে দিন।
- চুন প্রয়োগ: ফাল্গুনের শুরুতে চুন প্রয়োগ করুন যাতে নতুন সিজনে মাছের সংক্রমণ না হয়।
- নতুন পোনা: মাঘ-ফাল্গুনের কৃষি কাজ এ নতুন সিজনের জন্য পুকুর শুকিয়ে মাটি শোধন করার উপযুক্ত সময় এটিই।
৯. প্রাণী পালন (পশুপাখি) বিভাগের নির্দেশিকা
- বসন্ত রোগের টিকা: মুরগির ক্ষেত্রে রানীক্ষেত এবং গবাদি পশুর ক্ষেত্রে বসন্ত রোগের টিকা দেওয়ার সঠিক সময় এটি।
- খাবার: এই সময় গরু-ছাগলকে সবুজ ঘাসের সাথে দানাদার খাবার দিন। এখন দিনে গরম রাতে ঠান্ডা ভাব চলবে তাই ছাগলের সর্দি কাশি লাগার ভয় থকবে তাই সতর্ক থাকুন ।
- কৃমি নাশক: ঋতু পরিবর্তনের এই সময়ে ডাক্তারী পরামর্শে কৃমির ওষুধ বা ‘কৃমি নাশক’ প্রয়োগ করা জরুরি।
১০. বাজারজাতকরণ ও বিপণন (Marketing Strategy)
আপনার উৎপাদিত ফসল সঠিক দামে বিক্রির জন্য ফেব্রুয়ারি মাসে এই কৌশলগুলো কাজে লাগান:
- গ্রেডিং ও সর্টিং: এই মাসে আলু ও সরিষার ফলন ওঠে। আলু সরাসরি বিক্রি না করে আকার অনুযায়ী ছোট, মাঝারি ও বড়—এই তিন ভাগে ভাগ করে বিক্রি করলে বাজারে ভালো দাম পাওয়া যায়।
- সরাসরি বিপণন: বর্তমানে ‘কৃষি সূত্র’ বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সরাসরি ক্রেতার কাছে সবজি পৌঁছে দিতে পারেন। এতে মধ্যসত্বভোগীদের হাত থেকে বাঁচা যায়।
- সঞ্চয় ও হিমাগার: আলুর ক্ষেত্রে বাজার দর কম থাকলে সরাসরি হিমাগারে (Cold Storage) মজুত করার পরিকল্পনা করুন, যা আপনি ছবিতেও দেখেছেন (হলম কাটার কারণ)।
কৃষি সুত্র পরামর্শ: উৎপাদিত পণ্য সরাসরি বিক্রয়ের জন্যে FPO/FPC তে যুক্ত হয়ে আথবা পরিবারের দিদিরা আনন্দধারা স্বনির্ভর গোষ্ঠী(SHG)তে যুক্ত থাকলে একই ধরনের ফসল/প্রাণী/মৎস উৎপাদকরা কম পক্ষে ২৫ জন একত্রিত হয়ে উৎপাদক গোষ্ঠী বা প্রোডিউসার গ্রুপ (Producer Group-PG) গঠন করুন এতে সরকারী আর্থিক সহযোগিতা ও ঋণ এবং প্রশিক্ষণ পাওয়া যায় ।
FAQ (সচরাচর জিজ্ঞাস্য প্রশ্ন)
১. বোরো ধানে কখন ফাঁকা স্থান পূরণ করব?
রোপণের ১০ দিনের মধ্যে চারা মরলে নতুন চারা দিয়ে পূরণ করতে হবে।
২. আলুর হলম কেন কাটা হয়?
আলুর চামড়া শক্ত করার জন্য এবং দীর্ঘসময় সংরক্ষণের উপযোগী করার জন্য।
৩. আমের মুকুলে কখন স্প্রে করা যাবে না?
মুকুল পুরোপুরি ফোটা অবস্থায় কড়া রাসায়নিক স্প্রে পরাগায়নে বাধা দেয়, তাই এড়িয়ে চলুন।










