মাছের ডিম পোনা চাষ পদ্ধতি: পুকুর প্রস্তুতি থেকে রেণু পোনার পরিচর্যার সঠিক নিয়ম

মাছের ডিমপোনা চাষ পদ্ধতিতে স্বনির্ভর গোষ্ঠী  দিদিরা গামছা দিয়ে  রেণু পোনা সংগ্রহের দৃশ্য
মাছের ডিমপোনা চাষ পদ্ধতিতে স্বনির্ভর গোষ্ঠী দিদিরা গামছা দিয়ে রেণু পোনা সংগ্রহের দৃশ্য।

মাছ চাষের আসল আনন্দ এবং লাভ লুকিয়ে আছে এর শুরুর ধাপে—অর্থাৎ মাছের ডিম পোনা চাষ পদ্ধতি বা আতুর পুকুর ব্যবস্থাপনায়। বন্ধুরা, আমরা যখন বাজার থেকে বড় মাছ কিনি, তখন কি একবারও ভেবেছি এই ছোট্ট প্রাণের যাত্রাটা কেমন ছিল? আজ আমি আর আপনি মিলে আমাদের সেই অব্যবহৃত পুকুর বা ডোবাটিকে একটি আদর্শ নার্সারি পুকুরে রূপান্তর করব। চলুন, হাতে কলমে শিখি কীভাবে একটি ছোট্ট ডিম পোনা থেকে রেণু পোনা উৎপাদন করে রুপোলি ফসলের স্বপ্ন বোনা যায়।

১. আতুর পুকুর বা নার্সারি পুকুর প্রস্তুতি

একটি ছোট্ট শিশুকে যেমন আগলে রাখতে হয়, মাছের ডিম পোনা ছাড়ার আগে পুকুরটিকেও ঠিক তেমনিভাবে তৈরি করতে হয়। মনে রাখবেন, ডিম পোনা থেকে রেণু পোনা উৎপাদনের জন্য প্রথম ধাপই হলো সঠিক পুকুর প্রস্তুতি ও চুন প্রয়োগ।

ক. পুকুরের কাঠামো ও পরিচ্ছন্নতা

আমাদের পুকুরটির চারপাশ আগে ভালো করে দেখে নিন। কোনো আগাছা বা জঙ্গল থাকলে তা পরিষ্কার করে ফেলুন, কারণ ওখানেই লুকিয়ে থাকে পোনা খেকো প্রাণীরা। পুকুরের পাড়ে কোনো গর্ত থাকলে তা ভরাট করে দিন। একটি জরুরি বিষয় হলো পুকুরের ঢাল; এটি ৬০ ডিগ্রি এঙ্গেলে থাকা আবশ্যক। এতে মাছ তার প্রয়োজন অনুসারে জলে চলাচল ও বিশ্রাম নিতে পারে। পুকুরের গভীরতা ৪ থেকে ৬ ফুট এবং জলে সব সময় ৩.৫ ফুটের উপরে থাকা জরুরি।

খ. অবাঞ্ছিত মাছ ও পোকা নিধন

মাছের ডিম পোনা চাষ পদ্ধতি-তে ডিম পোনা ছাড়ার আগে পুকুরটি পুরোপুরি ‘শত্রুমুক্ত’ করতে হবে। পুকুরে যদি রাক্ষুসে মাছ থাকে, তবে তারা আপনার সব ডিম পোনা খেয়ে ফেলবে। যদি সেচ ব্যবস্থা থাকে, তবে জল১ ফুটে নামিয়ে আনুন। এরপর মাছ নিধনের জন্য নিচের যেকোনো একটি পদ্ধতি বেছে নিতে পারেন:

হুয়া খৈল: প্রতি শতকে ১ ফুট গভীর জলের জন্য ৩.৫০০ কেজি মহুয়া খৈল দিন। এটি প্রয়োগ করলে জলে বিষক্রিয়া তৈরি হয় যা ২১ দিন পর কেটে যায়।
গ্যাস ট্যাবলেট (অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড): ৩ গ্রাম ওজনের ট্যাবলেট প্রতি শতকে ১ ফুট গভীরতার জন্য ১টি এবং ৩ ফুট গভীরতার জন্য ৩টি দিতে হবে।
ব্লিচিং পাউডার: প্রতি শতকে ১ ফুট জলের জন্য ৯০০ গ্রাম। (মনে রাখবেন, ব্লিচিং দিলে আলাদা করে চুন প্রয়োগের প্রয়োজন নেই)

গ. চুন ও সার প্রয়োগ (প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরি)

মাছ নিধনের ৭ দিন পর প্রতি শতকে ১-২ কেজি চুন প্রয়োগ করে জল ভালো করে ঘেঁটে দিন। চুন প্রয়োগের পরের দিনই আমাদের জৈব সার দিতে হবে। মহুয়া খৈল ব্যবহার করলে প্রতি শতকে ১৫ কেজি কাঁচা গোবর এবং মহুয়া ব্যবহার না করলে পুকুর প্রস্তুতির সময় প্রতি শতকে ২০-২৫ কেজি কাঁচা গোবর এবং ৫-৭ দিন পর ২ কেজি সরিষার খৈল ও ৫০০ গ্রাম ফসফেট ছড়িয়ে দিতে হবে। সার প্রয়োগের ১৫ দিন পর যখন জলে পর্যাপ্ত ‘প্রাণী কণা’ বা প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরি হবে, তখনই পুকুরটি ডিম পোনা মজুতের জন্য তৈরি হবে।

২. পোকা মারা ও জল ব্যবস্থাপনা

মাছের ডিম পোনা চাষ পদ্ধতি-তে ডিম পোনা ছাড়ার ঠিক ২৪ ঘণ্টা আগে পুকুরের উপরিভাগের ভাসমান হাঁস পোকা বা কাঠি পোকা মারতে হবে। কারণ এই পোকাগুলো ডিম পোনার প্রধান শত্রু।

ঘরোয়া পদ্ধতি: ৩ ফুট গভীরতার জন্য প্রতি শতকে ৮০ গ্রাম কাপড় কাঁচা সাবান গুঁড়ো গরম জলে গুলে তার সাথে ২.২০ গ্রাম সর্ষের তেল মিশিয়ে ছড়িয়ে দিন।
রাসায়নিক পদ্ধতি: সাইপার মেথ্রিন গ্রুপের সুপার কিলার ০.৮ এম.এল প্রতি শতকে ৩ ফুট গভীরতার জন্য ব্যবহার করুন। ডিম ছাড়ার আগে নেট টেনে সব মরা পোকা পরিষ্কার করে নিতে ভুলবেন না।

৩. মাছের ডিম পোনা মজুতের পরিমাণ ও সঠিক নিয়ম

পুকুর রেডি, এবার আমাদের স্বপ্নের রেণু পোনা ছাড়ার নিয়ম জানার পালা। মনে রাখবেন, পোনা কেনার সময় সব সময় ভালো হ্যাপা বা নির্ভরযোগ্য হ্যাচারি থেকে সংগ্রহ করবেন। সামান্য টাকা বাঁচাতে গিয়ে খারাপ মানের পোনা আনলে আপনার পুরো পরিশ্রম বিফলে যেতে পারে।

  • মজুত ঘনত্ব: প্রতি শতকে ২০ থেকে ৩০ গ্রাম ডিম পোনা মজুত করা যেতে পারে। গড়ে ১৪ গ্রাম ডিম পোনা থেকে প্রায় ১০,০০০ পোনা পাওয়া যায়। যদি আপনি দ্রুত বৃদ্ধি চান, তবে প্রতি শতকে ১৫ গ্রাম ছাড়াই ভালো।
  • পোনা ছাড়ার কৌশল: পলিথিন ব্যাগটি পুকুরের জলে ১০-১৫ মিনিট ভাসিয়ে রাখুন যাতে দুই জায়গার তাপমাত্রা সমান হয়।
  • সঠিক সময়: সকাল ৯টার আগে অথবা বিকেলে রোদ পড়ে গেলে পোনা ছাড়ুন। কড়া রোদে বা বৃষ্টির সময় কখনোই পোনা ছাড়বেন না।

বন্ধুরা, আমরা আমাদের পুকুর প্রস্তুত করলাম এবং পোনাও ছাড়লাম। কিন্তু গল্পের এখানেই শেষ নয়! এই ছোট্ট প্রাণগুলোকে বড় করে তোলার জন্য প্রয়োজন সঠিক খাদ্য এবং দিনরাত পরিচর্যা।

৪. খাদ্য ব্যবস্থাপনা: রেণু পোনা সঠিক পুষ্টি

বন্ধুরা, আমরা জানি একটি শিশুর বাড়ন্ত বয়সে যেমন বেশি প্রোটিন লাগে, মাছের ক্ষেত্রেও তাই। রেণু পোনা-র খাবার দেওয়ার নিয়ম জানা না থাকলে পোনা বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে। আমাদের লক্ষ্য থাকবে খাবারে অন্তত ৩০% প্রোটিন নিশ্চিত করা।

  • প্রথম ২ সপ্তাহ: যেদিন ডিম পোনা ছাড়লেন, সেদিন থেকেই খাবার শুরু হবে। প্রথম ৭ দিন পোনার মোট ওজনের ৪ গুণ খাবার দিতে হবে। পরের ৭ দিন দিতে হবে ওজনের ৮ গুণ। এই খাবারটিকে সমান ৩ ভাগে ভাগ করে দিনে তিনবার (সকাল, দুপুর ও বিকেল) পুকুরে ছড়িয়ে দিতে হবে।
  • খাদ্য প্রস্তুত পদ্ধতি: ডিম পোনা ছাড়ার ৩ দিন পর থেকে প্রতি শতকের জন্য ১৫০ গ্রাম খৈল ৩ গুণ জলে অন্তত ৪৮ ঘণ্টা পচিয়ে প্রতিদিন ছিটিয়ে দিন। এতে জলের রঙ ঠিক থাকে এবং প্রচুর প্রাকৃতিক খাবার (জুপ্ল্যাঙ্কটন) তৈরি হয়।
  • ধানি পোনার পর্যায়: ১৫ দিন পর যখন পোনাগুলো ০.৩ থেকে ০.৫ গ্রাম ওজনের হয়ে যাবে, তখন থেকে সাধারণ ধানি পোনার মতো খাবার দিতে হবে। সঠিক নিয়মে খাওয়ালে আপনি অন্তত ৫০-৬০% পোনা টিকিয়ে রাখতে পারবেন।

৫. পুকুর পরিচর্যা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা

পুকুরে পোনা থাকা অবস্থায় আমাদের চোখ কান খোলা রাখতে হবে। রেণু পোনা- নার্সারি পুকুর ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে নিচের পরিচর্যাগুলো নিয়মিত করুন:

পোনা স্থানান্তর: সম্ভব হলে ১৫ দিন পর রেণু পোনাগুলোকে বড় ধানি পুকুরে সরিয়ে ফেলুন। যদি তা সম্ভব না হয়, তবে মোট পোনার ওজনের ২০% হারে পরিপূরক খাদ্য দিতে হবে।

ওজন চেক করার সহজ উপায়: পোনার ওজন বোঝা খুব সহজ। একটি গামছা বা ছোট জাল টেনে ১০০ গ্রাম পোনা ধরুন। এবার গুনে দেখুন কয়টি পোনা আছে। ১০০-কে সংখ্যা দিয়ে ভাগ করলেই একটি মাছের গড় ওজন বেরিয়ে আসবে। যেমন: ১০০ গ্রামে যদি ৩০০টি মাছ থাকে, তবে একটি মাছের ওজন ০.৩৩ গ্রাম।

শ্যাওলা ও গ্যাস নিয়ন্ত্রণ: অতিরিক্ত খাবার বা সারের কারণে জল খুব বেশি সবুজ হয়ে গেলে খাবার দেওয়া বন্ধ রাখুন। শ্যাওলা বেশি হলে পোনা তাতে জড়িয়ে মারা যেতে পারে। (জলে শ্যাওলা বা সবুজ স্তর বেশি হলে প্রতি শতকে ১২-১৫ গ্রাম তুঁতে বা কপার সালফেট পাতলা কাপড়ে বেঁধে পুকুরের বিভিন্ন জায়গায় টাঙিয়ে দিলে দ্রুত ফল পাওয়া যায়)।

তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ: গ্রীষ্মকালে বা কড়া রোদে জল গরম হয়ে গেলে পোনা মারা যেতে পারে। তাই পুকুরের পাড়ে তালপাতা, খেজুর পাতা বা কিছু কচুরিপানা রেখে ছায়ার ব্যবস্থা করুন।

জাল টানা: প্রথম ৭ দিন পর একবার গামছা টেনে মাছের উপস্থিতি দেখুন। এরপর প্রতি ৭ দিন অন্তর একবার জাল টানুন। এতে পুকুরের তলার বিষাক্ত গ্যাস বেরিয়ে যাবে এবং মাছের ব্যায়াম হবে, যা তাদের দ্রুত বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে।

আড়ও দেখুন মাছের রোগের কারণ ও প্রতিকার: আধুনিক মাছ চাষের পূর্ণাঙ্গ গাইড

উপসংহার

বন্ধুরা, নিয়মানুবর্তিতা আর সঠিক পরিচর্যা থাকলে মাছের পোনা চাষে লস হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম মাছের ডিম পোনা চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করলে। এই গাইডটি অনুসরণ করে আপনিও হয়ে উঠতে পারেন একজন সফল মৎস্য চাষি।

কৃষি সুত্র পরামর্শ ও সতর্কতা: মাছের ডিম পোনা বা ডিম উৎপাদন চাষ কার্য শুরু করার পূর্বে, পুকুরে কোন কিছু প্রয়োগের পূর্বে আপনার নিকটবর্তী মৎস বিভাগ থেকে মাছের ডিম পোনা চাষ পদ্ধতি প্রশিক্ষণ বা পরামর্শ নিয়ে করুন । পুকুরের পরিবেশ পরিস্থিতির উপর অনেক সময় আমাদের বলা ব্যবহারিক জিনিস গুলির মাত্রা পরিবর্তন হতে পারে, তাই মৎস বিশেষজ্ঞ এর সাথে পরামর্শ করে প্রয়োগ করুন ।

বাড়িতে বসেই নিজ ভাষায় মৎস বিভাগ ভারত সরকারের এর মৎস বিজ্ঞানীদের সাথে পরামর্শ নিতে টোল ফ্রী নম্বরে ফোন করুন ।

৬. সাধারণ কিছু প্রশ্ন (FAQ)

১. পুকুরে পোনা ছাড়ার আগে জল পরীক্ষা করার উপায় কী?

উত্তর: পোনা ছাড়ার আগে একটি গামছা দিয়ে পুকুরের জল ছেঁকে দেখুন তাতে প্রচুর পোকা বা প্রাণী কণা আছে কি না। এছাড়া একটি বালতিতে পুকুরের জল নিয়ে তাতে ১০-২০টি পোনা ছেড়ে ১ ঘণ্টা দেখুন তারা সুস্থ আছে কি না।

২. মাছের পোনার খাবার তালিকা কেমন হওয়া উচিত?

উত্তর: শুরুতে কুঁড়ো ও খৈল পচানো জল সেরা। এছাড়া ভালো মানের স্টার্টার ফিড (৩০% প্রোটিন) ব্যবহার করা যেতে পারে।

তথ্য সুত্র ও কৃতজ্ঞতা

  • পশ্চিমবঙ্গ সরকার মৎস বিভাগ
  • সেন্ট্রাল ইনস্টিটিউট অফ ফ্রেশওয়াটার অ্যাকুয়াকালচার (ICAR-CIFA) ভারত সরকার।
Spread the love

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top