কৃষি পরিকাঠামো তহবিল (AIF) স্কিম: সাবসিডি লোন ও আবেদন পদ্ধতি

কৃষি পরিকাঠামো তহবিল (AIF) স্কিম সাবসিডি ঋণ এর বিস্তারিত গাইড ও আবেদন পদ্ধতি ।
কৃষি পরিকাঠামো তহবিল (AIF) স্কিমে আধুনিক কৃষি পরিকাঠামো দৃশ্য।

১. কৃষি পরিকাঠামো তহবিল (AIF) কি ?

বর্তমানে কৃষিকে লাভজনক ব্যবসায় পরিণত করতে ভারত সরকারের একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হলো কৃষি পরিকাঠামো তহবিল (AIF) স্কিম বা Agriculture Infrastructure Fund। এটি মূলত ১ লক্ষ কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল, যা ২০২৫-২৬ সাল নাগাদ ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছে। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো ফসল কাটার পর যে ক্ষতি হয় তা রোধ করা এবং কৃষকদের আধুনিক পরিকাঠামো গড়তে আর্থিক সহায়তা দেওয়া। এআইএফ প্রকল্পের উদ্দেশ্য ও আবেদন পদ্ধতি সঠিকভাবে জানলে একজন সাধারণ কৃষকও আজ বড় উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারেন।

২. এআইএফ (AIF) প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য

কৃষি পরিকাঠামো তহবিল (AIF) স্কিম এর গভীরতা বুঝতে হলে এর উদ্দেশ্যগুলো বিস্তারিত জানা প্রয়োজন:

  • উন্নত বিপণন পরিকাঠামো: কৃষক, FPO, এবং সমবায় সমিতিগুলির জন্য এমন এক বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাতে তারা সরাসরি ভোক্তাদের কাছে পণ্য পৌঁছাতে পারে। এতে মধ্যস্বত্ব ভোগীদের দাপট কমে এবং কৃষকদের জন্য মূল্য বৃদ্ধি পায়।
  • লজিস্টিক পরিকাঠামোয় বিনিয়োগ: ফসল কাটার পর পরিবহনের অভাবে প্রচুর ফসল নষ্ট হয়। লজিস্টিক পরিকাঠামো উন্নত হলে এই ক্ষতি কমে আসবে এবং কৃষকরা অল্প সময়ে বাজারে পণ্য পাঠাতে পারবেন। এটি কৃষকদের স্বাধীন করতে সাহায্য করবে।
  • আধুনিক প্যাকেজিং ও কোল্ড স্টোরেজ: কোল্ড স্টোরেজ ব্যবস্থা থাকলে কৃষকরা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন তারা কখন ফসল বাজারে ছাড়বেন। যখন দাম বেশি থাকবে তখন তারা পণ্য বিক্রি করতে পারবেন।
  • জাতীয় খাদ্য অপচয় রোধ: ফসলোত্তর অবকাঠামো উন্নত হলে দেশের খাদ্য অপচয় কমবে, যা কৃষি খাতকে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।
  • পিপিপি (PPP) প্রকল্পের প্রসার: সরকারি ও স্থানীয় সংস্থা গুলি কৃষি পরিকাঠামোতে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য কার্যকরী প্রকল্প গঠন করতে পারবে।
  • ভোক্তাদের সুবিধা: অপচয় কমলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়বে, ফলে ভোক্তারা ভালো গুণমানের পণ্য সঠিক দামে পাবেন। এআইএফ প্রকল্পের উদ্দেশ্য ও আবেদন পদ্ধতি বাস্তবায়িত হলে পুরো সমাজ উপকৃত হবে।

আড়ও দেখুন l লাখপতি দিদি যোজনা আবেদন ও আনন্দধারা লাখপতি দিদি CRP নিয়োগ গাইড

৩. কৃষি পরিকাঠামো তহবিল (AIF) স্কিমে আবেদন যোগ্যতা

কৃষির আধুনিকীকরণ এবং ব্যবসাকে লাভজনক করতে এই বিশেষ স্কিমের আওতায় নিচের তালিকাভুক্ত ব্যক্তি, দল বা সংস্থাগুলি আবেদনের যোগ্য:

  • ব্যক্তিগত স্তর: সাধারণ কৃষক এবং নতুন কৃষি উদ্যোক্তা।
  • গ্রুপ বা গোষ্ঠী: স্বনির্ভর গোষ্ঠী (SHG), স্বনির্ভর গোষ্ঠীর ফেডারেশন এবং যৌথ দায়বদ্ধতা গ্রুপ JLG (Joint Liability Group)।
  • সমবায় ক্ষেত্র: বহুমুখী সমবায় সমিতি, বিপণন সমবায় সমিতি, সমবায়ের জাতীয় ফেডারেশন এবং সমবায় রাজ্য ফেডারেশনা।
  • কৃষক সংগঠন: কৃষক উৎপাদনকারী সংগঠন (FPO) এবং ফেডারেশন অফ ফার্মার প্রডিউস অর্গানাইজেশনস।
  • প্রাতিষ্ঠানিক ও সরকারি সংস্থা: প্রাথমিক কৃষি ঋণ সমিতি (PACS), কৃষিপণ্য বাজার কমিটি (APMC) এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলি।
  • স্টার্ট-আপ ও প্রাইভেট সেক্টর: এগ্রিকালচারাল স্টার্ট-আপ এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (PPP) প্রকল্পগুলি।

আড়ও দেখুন আনন্দধারা Producer Group (PG) গঠন পদ্ধতি: ২০২৬ সালের সম্পূর্ণ গাইডলাইন

৪. AIF প্রকল্পের সুবিধা ও ব্যয় এর পরিমাণ

কৃষি পরিকাঠামো তহবিল আবেদন পদ্ধতি-র মাধ্যমে মোট ১ লক্ষ কোটি টাকার একটি বিশাল অর্থায়ন সুবিধার আকার তৈরি করা হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো গ্রামীণ এলাকায় সেচের জল ব্যবস্থাপনা, কোল্ড স্টোরেজ এবং প্রসেসিং ইউনিট তৈরি করা।

ক. রাজ্যভিত্তিক তহবিল বরাদ্দ :

কৃষি পরিকাঠামো তহবিল (AIF) স্কিম এর বিশাল ফান্ডের মধ্যে AIF scheme West Bengal ও অন্য দুটি রাজ্য ভিত্তিক বরাদ্দ নিচে দেওয়া হলো:

  • পশ্চিমবঙ্গ: ৭,২৬০ কোটি টাকা।
  • আসাম: ২,০৫০ কোটি টাকা।
  • ত্রিপুরা: ৩৬০ কোটি টাকা।

খ. প্রকল্পের মূল বৈশিষ্ট্য ও আর্থিক সুবিধাগুলি এক নজরে:

একক উইন্ডো সুবিধা: অংশগ্রহণকারী ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় অনলাইন সিঙ্গল উইন্ডো সিস্টেমের মাধ্যমে আবেদন করা যায়।

  • সুদের সাবভেনশন (ভর্তুকি): বার্ষিক ৩% হারে সুদের ছাড় পাওয়া যাবে, যা এক জায়গায় প্রকল্প প্রতি সর্বোচ্চ ২ কোটি টাকা ঋণের ওপর সীমাবদ্ধ (ঋণের পরিমাণ বেশি হলেও ভর্তুকি ২ কোটি পর্যন্তই মিলবে)। এই সুবিধা সর্বোচ্চ ৭ বছরের জন্য পাওয়া যাবে।
  • ক্রেডিট গ্যারান্টি: ২ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের জন্য কোনো গ্যারান্টার লাগবে না, সরকার নিজেই ক্রেডিট গ্যারান্টি দেবে।
  • ঋণ পরিশোধের সময়সীমা: ঋণ পরিশোধের জন্য সর্বনিম্ন ৬ মাস থেকে সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত ছাড় পাওয়া যেতে পারে।
  • ঋণ প্রদানকারী সংস্থাসমূহ: বাণিজ্যিক ব্যাঙ্ক, সমবায় ব্যাঙ্ক, আরআরবি (RRB), স্মল ফিনান্স ব্যাঙ্ক, NCDC, NBFC ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান থেকে এই লোন নেওয়া যাবে। NABARD-এর নীতি অনুসারে সমবায় ব্যাঙ্ক এবং RRB-কে প্রয়োজন ভিত্তিক পুনঃঅর্থায়ন সহায়তা দেওয়া হবে।

গ. প্রকল্প স্থাপনের নিয়ম ও সীমাবদ্ধতা:

  • একাধিক প্রকল্প স্থাপন: একটি যোগ্য সত্তা বা সংস্থা যদি আলাদা আলাদা স্থানে প্রকল্প স্থাপন করে, তবে প্রতিটি প্রকল্পই ২ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবে।
  • সর্বোচ্চ প্রজেক্ট সীমা: কৃষক, কৃষি উদ্যোক্তা বা স্টার্ট-আপের মতো বেসরকারি সংস্থার জন্য সর্বোচ্চ ২৫টি প্রজেক্টের সীমা থাকবে।
  • সীমা ছাড়: রাষ্ট্রীয় সংস্থা, সমবায়ের জাতীয় ও রাজ্য ফেডারেশন, FPO ফেডারেশন এবং SHG ফেডারেশনের জন্য এই ২৫টি প্রকল্পের কোনো সীমাবদ্ধতা থাকবে না।
  • অবস্থানের সংজ্ঞা: এখানে অবস্থান বা আলাদা জায়গা বলতে একটি স্বতন্ত্র LGD (Local Government Directory) কোড সহ একটি গ্রাম বা শহরের ভৌত সীমানাকে বোঝাবে। প্রতিটি প্রকল্প আলাদা LGD কোড যুক্ত স্থানে হতে হবে।
  • APMC-এর সুবিধা: কৃষিপণ্য বাজার কমিটি গুলি (APMC) তাদের নির্ধারিত বাজার এলাকার মধ্যে একাধিক প্রকল্পের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই প্রকল্পের প্রস্তুতি ও বাস্তবায়নের জন্য একটি বিশেষ প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ইউনিট (PMU) কাজ করছে, যা আবেদনকারীদের হ্যান্ড হোল্ডিং বা সরাসরি প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করে। তাছাড়া এটি কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকারের অন্য সমস্ত প্রকল্পের সাথে একত্রিত (Convergence) হয়ে কাজ করতে সক্ষম।

আড়ও দেখুন ড্রোন দিদি কি? নমো ড্রোন দিদি যোজনা: ৮ লাখ টাকা ভর্তুকি পাবেন কিভাবে জানুন নিয়ম গুলি

৫. কোন কৃষি পরিকাঠামোতে AIF-এর সুবিধা পাবেন?

ফসল কাটার পরবর্তী ব্যবস্থাপনা এবং কমিউনিটি বা যৌথ চাষের পরিকাঠামো উন্নত করতে নিচের প্রকল্পগুলির জন্য লোন ও ভরতুকি পাওয়া যাবে:

  • জৈব ও আধুনিক ইনপুট: জৈব ইনপুট উৎপাদন ইউনিট, জৈব উদ্দীপক উৎপাদন ইউনিট (Bio-stimulant Unit), আধুনিক নার্সারি এবং টিস্যু কালচার ল্যাব।
  • বীজ ও সেচ ব্যবস্থাপনা: বীজ প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র এবং খামারে সেচের জল ও সার ব্যবস্থাপনার আধুনিক স্মার্ট সিস্টেম।
  • কৃষি যান্ত্রিকীকরণ: কাস্টম হায়ারিং সেন্টার (CHC) এবং ফার্ম বা হার্ভেস্ট অটোমেশন।
  • স্মার্ট ও নিখুঁত কৃষি: ড্রোন ক্রয়, চাষের মাঠে বিশেষ সেন্সর স্থাপন, কৃষিতে ব্লকচেইন এবং এআই (AI) প্রযুক্তির ব্যবহার।
  • রিমোট সেন্সিং ও আইওটি (IoT): স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া স্টেশন স্থাপন এবং জিআইএস (GIS) অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে খামার পরামর্শ পরিষেবা।
  • লজিস্টিক ও কোল্ড চেইন: রিফার ভ্যান ( রিফ্রিজারেটেড ভ্যান) ও ইনসুলেটেড যানবাহন, কোল্ড স্টোর, কোল্ড চেইন এবং লজিস্টিক সুবিধা।
  • সংরক্ষণ ও বিপণন: অ্যাসেয়িং ইউনিট (মান যাচাই কেন্দ্র), গুদাম ও সাইলোস, প্যাকেজিং ইউনিট এবং ই-মার্কেটিং প্ল্যাটফর্ম সহ সাপ্লাই চেইন পরিষেবা।
  • প্রাথমিক প্রক্রিয়াকরণ কার্যক্রম: ফসলের গুণগত মান বজায় রাখার জন্য বিভিন্ন প্রাথমিক প্রসেসিং ইউনিট।

৬. প্রাথমিক প্রক্রিয়াকরণের আওতাভুক্ত ফসল

কৃষি পরিকাঠামো তহবিল (AIF) স্কিম এর অধীনে শুধুমাত্র “প্রাথমিক প্রক্রিয়াকরণ” অনুমোদিত, কোনো প্রকার বাণিজ্যিক সেকেন্ডারি প্রক্রিয়াকরণ (যেমন চিপস, সস, বিস্কুট তৈরি) এই স্কিমে ছাড় পাবে না। নিচে অনুমোদিত ফসল এবং কার্যক্রমের তালিকা দেওয়া হলো:

ক. দানাদার শস্য ও বাজরা (Cereals & Millets)

  • ফসল: গম, চাল, জোয়ার, বার্লি, ভুট্টা, ওট ইত্যাদি।
  • অনুমোদিত কার্যক্রম: ময়দা, সুজি, ডালিয়া তৈরি, পাউন্ডিং, গ্রাইন্ডিং, টেম্পারিং, পারবোইলিং (ধান সেদ্ধ করা), ভিজানো, শুকানো, সিভিং (চালনা), বিকিরণ (Irradiation), প্যাকেজিং, ফ্লেকিং এবং স্টোরেজ (গুদাম, সাইলোস)।
  • যা যোগ্য নয়: রুটি, বিস্কুট, পাস্তা, চানাচুর বা অন্যান্য জল খাবার তৈরির প্রকল্প এই তহবিলে যোগ্য নয়।

খ. ফল এবং শাকসবজি

  • অনুমোদিত কার্যক্রম: ধোলাই, ক্লিনিং, শুকানো, শ্রেণীবিভাজন, গ্রেডিং, হিমায়িত করা (IQF এবং ব্লাস্ট ফ্রিজিং), প্রাথমিক প্রক্রিয়াকরণের জন্য ব্লেনচিং, কুলিং, ওয়াক্সিং, কন্ডিশনিং, প্যাকহাউস, হিমাগার, রিপেনিং চেম্বার (ফল পাকানোর ঘর), রিফার ভ্যান, বালতি লিফট (Bucket Elevators) এবং প্যাকেজিং।
  • যা যোগ্য নয়: ডিহাইড্রেটেড পণ্য, ঘনীভূত পণ্য, ক্যানিং (টিনজাতকরণ), রস নিষ্কাশন (Juice), সস, ক্যান্ডি, জ্যাম এবং জেলি তৈরির প্রকল্প গ্রহণ যোগ্য নয়।

গ. তৈলবীজ এবং তেল পাম

  • ফসল: চিনাবাদাম, রেপসিড ও সরিষা, সয়াবিন, সূর্যমুখী, তিল, কুসুম, তিসি, জলপাই, তেল পাম ইত্যাদি।
  • অনুমোদিত কার্যক্রম: তেল তৈরি করে প্যাকেজিং এবং খৈল বা কেক তৈরি করে বাজারজাত করা।

ঘ. ডাল শস্য

  • ফসল: যেকোনো প্রজাতির ডাল।
  • অনুমোদিত কার্যক্রম: ডাল ভাঙানো এবং বেসন তৈরি করে প্যাকেজিং সহ বাজারজাত করা।

ঙ. মশলা

  • ফসল: লাল মরিচ, জিরা, লবঙ্গ, ধনে, দারুচিনি, রসুন, আদা, হলুদ, মেথি, এলাচ ইত্যাদি।
  • অনুমোদিত কার্যক্রম: মশলা ভাঙিয়ে গুঁড়ো তৈরি এবং প্যাকেজিং করে বাজারজাত করা।

চ. তুলা

অনুমোদিত কার্যক্রম: তুলার বীজ থেকে তেল এবং কেক (খৈল) তৈরি ও প্যাকেজিং করে বাজারজাত করা।

ছ. আখ

অনুমোদিত কার্যক্রম: চিনি ও গুড় তৈরি করে স্টোরেজ এবং বাজারজাত করা।

জ. পাট

  • অনুমোদিত কার্যক্রম: বেলিং করে কাঁচা পাটের মোড়ক তৈরি।
  • যা যোগ্য নয়: পাট কাপড়ের গঠন, চট, ব্যাগ বা বস্তা তৈরিতে এই প্রকল্প থেকে লোন দেওয়া হবে না।

ঝ. নারকেল

অনুমোদিত কার্যক্রম: নারকেল শুকিয়ে নারকেল তেল তৈরি এবং তা বাজারজাত করা।

ঞ. তামাক

  • অনুমোদিত কার্যক্রম: তামাক পাতা শুকিয়ে, গ্রেডিং করে স্টোরেজ বা গুদামজাত করা।
  • যা যোগ্য নয়: জর্দা বা চিবানো তামাক, সিগার, বিড়ি, সিগারেট বা ডিপ তামাক তৈরি করাকে প্রকল্পে যুক্ত করা যাবে না।

ট. বাদাম ও ড্রাই ফ্রুটস

  • ফসল: কাজুবাদাম, আখরোট, পেস্তা, কাঠবাদাম ইত্যাদি।
  • অনুমোদিত কার্যক্রম: স্টোরেজ, প্যাকেজিং এবং কনভেয়িং বেল্ট স্থাপন।
  • যা যোগ্য নয়: কাজু ফলের রস, ভাজা বা রোস্টেড পণ্য, বাদাম ছড়ানো বা স্প্রেড (Nut Spreads), বাদামের দুধ এবং পাউডার তৈরির ক্ষেত্রে মান্যতা দেওয়া হবে না।

ঠ. ভেষজ, ঔষধি ও সুগন্ধি ফসল

  • ফসল: বারবেরি, লিকোরিস (বেল [যষ্টিমধু]), বেল, ইসাবগোল, গুগ্গাল, কের্থ, আওনলা (আমলকী), চন্দন, সেন্না, বাইবেরাং, ব্রাহ্মী, ইউক্যালিপটাস, জটামানসি ইত্যাদি।
  • অনুমোদিত কার্যক্রম: ভেষজ উদ্ভিদ থেকে তেল নিষ্কাশন করে স্টোরেজ এবং প্যাকেজিং করা।

ড. বাঁশ

অনুমোদিত কার্যক্রম: বাঁশের শীট গঠন, বাঁশের কাঠকয়লা , পাউডার, কণিকা (Granules), বাঁশ শোধনাগার, বাঁশের ডিপো ও গোডাউন তৈরি।

ঢ. পশুখাদ্য ফসল

  • ফসল: বেরসিম, চারার জোয়ার ইত্যাদি।
  • অনুমোদিত কার্যক্রম: ঘাস কাটিং , মিক্সিং এবং গ্রাইন্ডিং।
  • যা যোগ্য নয়: পশুখাদ্যের পিলেট বা দানা খাদ্য তৈরিকে এই প্রকল্পে যুক্ত করা যাবে না।

ণ. কন্দ ফসল

  • ফসল: মিষ্টি আলু, কাসাভা ইত্যাদি।
  • অনুমোদিত কার্যক্রম: কন্দ শুকানো, সিভিং (চালা), মিলিং এবং স্টোরেজ।

ত. সুপারি

  • অনুমোদিত কার্যক্রম: সুপারি ফুটিয়ে, শুকিয়ে এবং প্যাকেজিং করা।
  • যা যোগ্য নয়: সুপারি গাছের অংশ বা খোসা থেকে হার্ডবোর্ড, নিরোধক উল, কুশন, কাগজ বা পেপার বোর্ড ইত্যাদি প্রস্তুত করা এই প্রকল্পের আওতাভুক্ত নয়।

কৃষিসূত্র টিম পরামর্শ: আপনি যদি কৃষি পরিকাঠামো তহবিল (AIF) স্কিমে ওপরের যেকোনো একটি অনুমোদিত ফসলের প্রাথমিক প্রক্রিয়াকরণ বা কৃষি পরিকাঠামো নিয়ে ব্যবসা শুরু করতে চান, তবে আজই প্রয়োজনীয় নথিপত্র সহ কৃষি পরিকাঠামো তহবিল আবেদন পদ্ধতি মেনে অনলাইন পোর্টালে আবেদন করতে পারেন। এর মাধ্যমে ৩% সুদের ছাড় ও সরকারি ক্রেডিট গ্যারান্টির সুবিধা পাওয়া যাবে।

আড়ও দেখুন FPO কি ? FPO গঠন ও কার্যাবলী গাইড: কৃষক উৎপাদক সংস্থা রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি

৭. সাংগঠনিক ভাবে চাষের সম্পদ নির্মাণের যোগ্য প্রকল্পসমূহ

কৃষি পরিকাঠামো তহবিল (AIF) স্কিমে পূর্ববর্তী প্রাথমিক প্রক্রিয়াকরণ ছাড়াও, কৃষক গোষ্ঠীগুলি যেমন— FPO, PACS, SHGs, JLGs, সমবায় সমিতি, সমবায়ের জাতীয় ও রাজ্য স্তরের ফেডারেশন, FPOs ফেডারেশন, SHGগুলির ফেডারেশন এবং জাতীয় ও রাজ্য স্তরের বিভিন্ন সংস্থাগুলি নিম্নলিখিত আধুনিক কৃষি সম্পদ নির্মাণের জন্য এই তহবিলের আওতায় আবেদনের যোগ্য:

  • হাইড্রোপনিক ফার্মিং (মাটি ছাড়া জলে চাষের আধুনিক পদ্ধতি)
  • মাশরুম চাষ ইউনিট
  • ভার্টিকাল ফার্মিং / উল্লম্ব চাষ
  • এরোপনিক চাষ (বাতাসে ঝুলন্ত অবস্থায় শিকড়ে পুষ্টি দিয়ে চাষ)
  • পলি হাউস বা গ্রিনহাউস নির্মাণ
  • লজিস্টিক সুবিধা (নন-ফ্রিজ বা ইনসুলেটেড যানবাহন সহ পণ্য পরিবহনের ব্যবস্থা)

৮. লোন প্রদানকারী যোগ্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ

ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক ফর এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ডেভেলপমেন্ট (NABARD) এবং DAC&FW [DA&FW – Department of Agriculture & Farmers Welfare]-এর সাথে সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষর করার পর, নিম্নলিখিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলি এই অর্থায়ন সুবিধা প্রদানের জন্য অংশগ্রহণ করতে পারে:

  • সমস্ত তফসিলি বাণিজ্যিক ব্যাংক (Scheduled Commercial Banks)
  • তফসিলি সমবায় ব্যাঙ্ক (Scheduled Co-operative Banks)
  • আঞ্চলিক গ্রামীণ ব্যাঙ্ক বা আরআরবি (RRBs)
  • ছোট ফাইন্যান্স ব্যাংক (Small Finance Banks)
  • নন-ব্যাংকিং ফাইন্যান্সিয়াল কোম্পানি বা এনবিএফসি (NBFCs)
  • জাতীয় সমবায় উন্নয়ন কর্পোরেশন (NCDC)
  • PACS অ্যাফিলেশন সহ DCCBs [DCCBs with PACS affiliation]
  • [এখানে ক্লিক করুন] — কোন ব্যাংকে সুদের হার কত তা বিস্তারিত দেখার জন্য।

৯. AIF লোনের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র

কৃষি পরিকাঠামো তহবিল লোন নেওয়ার নিয়ম অনুযায়ী AIF-এর অধীনে ঋণের আবেদন মঞ্জুর করার জন্য আবেদনকারীকে নিম্নলিখিত নথিপত্রগুলি প্রস্তুত রাখতে হবে:

ক) প্রাথমিক আবেদন ও ছবি:

  • AIF ঋণের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ঋণের আবেদনপত্র বা গ্রাহকের অনুরোধ পত্র (যথাযথভাবে পূরণ এবং স্বাক্ষরিত)।
  • প্রবর্তক (Promoter), অংশীদার (Partner) বা পরিচালকের (Director) পাসপোর্ট সাইজের ছবি।

খ) পরিচয় ও ঠিকানার প্রমাণপত্র (KYC):

  • পরিচয় প্রমাণ: ভোটার আইডি কার্ড, প্যান কার্ড, আধার কার্ড [আধার কার্ডের মূল কপি বা শুধু নাম-পরিচয় যুক্ত মাস্কড কপি জমা দিতে হবে, কোনো অবস্থাতেই মূল ১২ সংখ্যার আধার নম্বর এখানে বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা যাবে না] অথবা ড্রাইভিং লাইসেন্স।
  • বাসস্থানের ঠিকানা প্রমাণ: ভোটার আইডি কার্ড, পাসপোর্ট, আধার কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স, বিদ্যুৎ বিল অথবা সর্বশেষ সম্পত্তি ট্যাক্স বিল।
  • নিবন্ধিত অফিসের ঠিকানা প্রমাণ: বিদ্যুৎ বিল, সর্বশেষ সম্পত্তি করের রসিদ, কোম্পানির ক্ষেত্রে ইনকর্পোরেশনের শংসাপত্র অথবা অংশীদারিত্ব সংস্থার ক্ষেত্রে সিএ (CA) দ্বারা প্রত্যয়িত নিবন্ধনের শংসাপত্র।

গ) নিবন্ধনের প্রমাণপত্র:

  • কোম্পানির ক্ষেত্রে: অ্যাসোসিয়েশনের ধারা (আর্টিক্যালস অফ অ্যাসোসিয়েশন)।
  • অংশীদারিত্ব বা পার্টনারশিপের ক্ষেত্রে: ফার্মের নিবন্ধকের (Registrar of Firms) কাছ থেকে পাওয়া নিবন্ধনের শংসাপত্র।
  • MSME-এর ক্ষেত্রে: জেলা শিল্প কেন্দ্র (DIC) বা উদ্যোগ আধারের (Udyam [উদ্যম আধার]) সাথে নিবন্ধনের শংসাপত্রের কপি।

ঘ) আর্থিক ও ট্যাক্স সংক্রান্ত নথি:

  • গত তিন বছরের আয়কর রিটার্ন (ITR), যদি উপলব্ধ থাকে।
  • গত ৩ বছরের নিরীক্ষিত ব্যালেন্স শীট (Audited Balance Sheet), যদি পাওয়া যায়।
  • জিএসটি (GST) শংসাপত্র, যদি প্রযোজ্য হয়।
  • প্রবর্তকের মোট সম্পদের বিবরণী (Net Worth Statement)।
  • গত এক বছরের ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্টের কপি এবং বিদ্যমান কোনো ঋণের পরিশোধের ট্র্যাক রেকর্ড (Loan Statement)।

ঙ) জমি ও প্রকল্প সংক্রান্ত নথিপত্র:

  • জমির মালিকানার রেকর্ড: শিরোনাম দলিল (Title Deed) বা লিজ দলিল (Lease Deed)। সম্পত্তিটি ইজারা বা লিজ নেওয়া হলে, ইজারাদারের কাছ থেকে স্থাবর সম্পত্তি বন্ধক রাখার অনুমতি পত্র।
  • কোম্পানির আরওসি (ROC [Registrar of Companies / রেজিস্টার অফ কোম্পানিজ]) অনুসন্ধান প্রতিবেদন।
  • বিস্তারিত প্রকল্প প্রতিবেদন (Detailed Project Report – DPR)।
  • স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি: লেআউট প্ল্যান বা আনুমানিক খরচ (Estimate), এবং বিল্ডিং নির্মাণের অনুমোদন (যদি প্রযোজ্য হয়)।

১০. AIF কৃষি ঋণ পরিশোধের সময়সীমা

ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রেও সরকার যথেষ্ট নমনীয়তা দেখিয়েছে। এই প্রকল্পের অধীনে ঋণের আসল টাকা পরিশোধ শুরুর আগে একটি স্থগিতাদেশ বা ‘মোরাটোরিয়াম’ পিরিয়ড পাওয়া যায়। এটি সর্বনিম্ন ৬ মাস থেকে সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত হতে পারে। এর ফলে নতুন ব্যবসা থিতু হওয়ার জন্য উদ্যোক্তারা পর্যাপ্ত সময় পান। কৃষিকাজে সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার মতোই এই সময়োচিত ঋণ সহায়তা কৃষকদের দীর্ঘমেয়াদী সফলতায় সাহায্য করবে।

১১. AIF লোনের আবেদন করার পদ্ধতি ২০২৬

বর্তমানে আবেদন প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ অনলাইন এবং স্বচ্ছ। এআইএফ (AIF) প্রকল্প পশ্চিমবঙ্গ থেকে সুবিধা নিতে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:

  • প্রথমে https://agriinfra.dac.gov.in/ পোর্টালে যান।
  • পেজের ডান দিকে ‘Beneficiary’ ট্যাবে ক্লিক করে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করুন।
  • পোর্টালে দেওয়া রেজিস্ট্রেশন ভিডিওটি [এখানে ক্লিক করুন] দেখে সহজেই ফরম পূরণ করুন
  • যোগ্য ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে যেকোনো তফসিলি বাণিজ্যিক ব্যাংক, গ্রামীণ ব্যাংক বা সমবায় ব্যাংক নির্বাচন করুন।

১২. উপসংহার

কৃষি পরিকাঠামো তহবিল (AIF) স্কিম সঠিকভাবে অনুসরণ করলে গ্রামীণ ভারতের কৃষি চিত্র বদলে যাওয়া সম্ভব। ফসল কাটা-পরবর্তী অদক্ষতা হ্রাস পেলে ভোক্তারা যেমন ভালো মানের পণ্য পাবেন এবং প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে কৃষকরা লাভবান হবেন। কৃষকরা নিজের পণ্য নিজে সঠিক সময়ে বিক্রয়ের জন্যে গুদামজাত করে রাখতে পারবেন।

তথ্য গুলি সংরক্ষিত করে রাখার জন্য AIF স্কিমের PDF ফাইলটি ডাউনলোড করুন নিচে ক্লিক করে।

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর (FAQ)

প্রশ্ন ১: কৃষি পরিকাঠামো তহবিল (AIF) স্কিমের আওতায় কী কী আর্থিক সুবিধা পাওয়া যায়?

উত্তর: এই স্কিমের অধীনে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের ওপর বার্ষিক ৩% হারে সুদের ছাড় বা ভর্তুকি পাওয়া যায়, যা সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকে। এর সাথে কোনো বন্ধক বা কোল্যাটারাল সিকিউরিটি ছাড়াই ২ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের জন্য সম্পূর্ণ সরকারি ক্রেডিট গ্যারান্টি (CGTMSE) সুবিধা মেলে। এছাড়াও ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ৬ মাস থেকে সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত কিস্তি বন্ধ রাখার (Moratorium) সুযোগ রয়েছে।

প্রশ্ন ২: এই স্কিমের আওতায় আবেদন করার জন্য কারা যোগ্য?

উত্তর: এই প্রকল্পের অধীনে এককভাবে সাধারণ কৃষক ও নতুন কৃষি উদ্যোক্তারা সরাসরি আবেদন করতে পারেন। সাংগঠনিকভাবে স্বনির্ভর গোষ্ঠী (SHG), যৌথ দায়বদ্ধতা গ্রুপ (JLG), কৃষক উৎপাদনকারী সংগঠন (FPO) এবং তাদের বিভিন্ন ফেডারেশনসমূহ এর সুবিধা পাবে। এছাড়াও প্রাথমিক কৃষি ঋণ সমিতি (PACS), বহুমুখী সমবায় সমিতি, কৃষিপণ্য বাজার কমিটি (APMC) এবং এগ্রিকালচারাল স্টার্ট-আপগুলিও আবেদনের যোগ্য।

প্রশ্ন ৩: কৃষি পরিকাঠামো তহবিল (AIF) স্কিমে লোন আবেদনের জন্যে কোথায় যোগাযোগ করব?

উত্তর: AIF লোনের জন্য সরাসরি সরকারের অফিসিয়াল পোর্টাল agriinfra.dac.gov.in-এ গিয়ে অনলাইনে প্রজেক্ট রিপোর্ট (DPR) সহ আবেদন করতে হবে। এছাড়া আপনার নিকটবর্তী যেকোনো রাষ্ট্রায়ত্ত, গ্রামীণ বা সমবায় ব্যাংকের শাখায় গিয়ে শাখা প্রবন্ধক (Branch Manager) বা কৃষি ঋণ আধিকারিকের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করা যাবে। যেকোনো প্রযুক্তিগত সাহায্য বা পরামর্শের জন্য স্থানীয় ব্লক স্তরের সহকারী কৃষি অধিকর্তা (ADA) বা আনন্দধারা অফিসের লাইভলিহুড টিমের সাথেও কথা বলতে পারেন।

প্রশ্ন ৪: AIF প্রকল্পে কত ভর্তুকি বা সাবসিডি পাওয়া যায়?

উত্তর: AIF প্রকল্পে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের ওপর বার্ষিক ৩% হারে সুদের ভর্তুকি (সাবসিডি) পাওয়া যায়।

Spread the love

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top