লাখপতি দিদি যোজনা: উদ্দেশ্য লক্ষ্য, যোগ্যতা, সুবিধা আবেদন প্রক্রিয়া ও CRP নিয়োগ নিয়ম দেখুন।

লাখপতি দিদি যোজনা পরিকল্পনার রূপরেখা গাইড: উদ্দেশ্য, লক্ষ্য, যোগ্যতা, সুবিধা আবেদন প্রক্রিয়া। ছবিটিতে SHG সদস্যদের চিহ্নিতকরণ, ট্রেনিং, আর্থিক সহায়তা, ব্যবসা শুরু, বাজারজাতকরণ এবং  Lakhpati Didi Yojana এর মাধ্যমে লাখপতি দিদি তৈরি ধাপগুলো দেখানো হয়েছে।
লাখপতি দিদি যোজনা পরিকল্পনার ৬টি ধাপে স্বনির্ভর নারীদের আয়ের দিশা।

সূচিপত্র

১. লাখপতি দিদি যোজনা প্রেক্ষাপট ও লক্ষ্যসমূহ

Lakhpati Didi yojana: লাখপতি দিদি যোজনা হলো ভারত সরকারের গ্রামোন্নয়ন বিভাগের একটি বিশেষ প্রকল্প, যার লক্ষ্য DAY_NRLM এর স্বনির্ভর গোষ্ঠীর (SHG) মহিলাদের বার্ষিক আয় ন্যূনতম ১ লক্ষ টাকা নিশ্চিত করা। ২০২২ সালে সমীক্ষা শুরু করে এবং ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরে ২ কোটি লাখপতি দিদি তৈরির লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করে। বর্তমানে দেশের ৬ কোটি নারীকে লাখপতি দিদি করে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে।

২. লাখপতি দিদি যোজনা কি ?

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, লাখপতি দিদি যোজনা-র আওতায় স্বনির্ভর গোষ্ঠীর (SHG) সেই সমস্ত সদস্যদের ‘লাখপতি দিদি‘ বলা হয়, যাদের পরিবারের বার্ষিক আয় অন্তত ১ লক্ষ টাকা বা তার বেশি।

তবে এই আয় কেবল এককালীন হলে চলবে না। এই আর্থিক সচ্ছলতা অন্তত ৪টি কৃষি মৌসুম বা ব্যবসায়িক চক্রের জন্য স্থায়ী হতে হবে। অর্থাৎ, তাদের গড় মাসিক আয় ১০,০০০ টাকার বেশি হওয়া নিশ্চিত করা হয়। এই দিদিরা কেবল নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করছেন না, বরং Day-NRLM লাখপতি দিদি যোজনা পশ্চিমবঙ্গ পুরো গ্রামীণ সম্প্রদায়ের জন্য এক টেকসই জীবিকার অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করছেন।

আরও দেখুন পশ্চিমবঙ্গে লাখপতি দিদি প্রকল্পে টার্গেট ও তৈরির কৌশল

৩. লাখপতি দিদি যোজনা-র প্রধান উদ্দেশ্য কি?

Day-NRLM এর লাখপতি দিদি যোজনার মূল লক্ষ্য কেবল টাকা দেওয়া নয়, বরং দিদিদের আত্মনির্ভরশীল করা। এর উদ্দেশ্যগুলি নিচে দেওয়া হলো:

  • সফল উদ্যোক্তা তৈরি: দিদিদের কেবল সামাজিক অন্তর্ভুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাদের দক্ষ ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা।
  • আয়ের নিশ্চয়তা: বিচিত্র ধরনের কাজের মাধ্যমে পরিবারের বার্ষিক আয় ১ লক্ষ টাকার উপরে নিশ্চিত করা।
  • বিভাগীয় সমন্বয়: সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন খাতের সহায়তায় দিদিদের জন্য উন্নত বাজার ও নতুন সুযোগ তৈরি করা।
  • মানসম্মত জীবনযাপন: সম্পদের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে গ্রামীণ নারীদের একটি উন্নত ও মার্জিত জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করা।

লাখপতি দিদি যোজনা: এক নজরে তথ্য ও পরিসংখ্যান

নিচে লাখপতি দিদি যোজনা অফিসিয়াল সাইট Lokos ৩১ মার্চ ২০২৬ শেষ আপডেট তথ্য অনুসারে দেওয়া হয়েছে।

বিষয়কেন্দ্র( Day-NRLM)
প্রকল্পের নামLakhpati Didi Yojana
প্রথম ঘোষণা১৫ আগষ্ট ২০২৩ সাল
প্রথম টার্গেট২ কোটি দিদি
বর্তমান টার্গেট (২০২৬)৬ কোটি দিদি
সূচনা ও লক্ষ্যমাত্রা২০২৪-২০২৯
মোট SHG সংখ্যা ৯৪.৩১ লক্ষ
মোট SHG সদস্যা ১০.১৪ কোটি
সম্ভাব্য লাখপতি (PLDs)৩.৯০ কোটি
সফল লাখপতি৩.৪৪ কোটি
CRP কর্মী সংখ্যা ৪,৪২,২৯৭ জন
মাস্টার ট্রেইনার ৬,৬১১ জন

৪. লাখপতি দিদি যোগ্যতা ও আবেদন

এই বিশেষ উদ্যোগের সুবিধা পাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ড রয়েছে। মূলত স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্য থেকেই ‘লাখপতি দিদি’ হিসেবে গড়ে তোলা হয়। বিশেষ গুরুত্ব পান তারা:

  • যারা কমপক্ষে ২ বছর ধরে কোনো স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সক্রিয় সদস্য।
  • যারা ইতিমধ্যে ‘কমিউনিটি ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড’ (CIF) বা ‘রিভলভিং ফান্ড’ গ্রহণ করে ছোট কোনো কাজ শুরু করেছেন।
  • যারা কৃষি বা অ-কৃষি ক্ষেত্রের অন্তত দুটি ভিন্ন জীবিকা পদ্ধতির সাথে যুক্ত।

নির্বাচন পদ্ধতি:DAY-NRLM-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর দিদিদের বার্ষিক আয়কে মূলত চারটি শ্রেণীতে ভাগ করে চিহ্নিত করা হয়—২৫,০০০ টাকার নিচে, ৬০,০০০ টাকার নিচে, ১,০০,০০০ টাকার নিচে এবং ১ লক্ষ টাকার উপরে। প্রতি অর্থবর্ষে (এপ্রিল-মার্চ) লাখপতি দিদি যোজনা-র লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে SRLM একটি বিশেষ অনুপাত অনুসরণ করে; যেখানে মোট লক্ষ্যমাত্রার ৭৫% সদস্যকে বেছে নেওয়া হয় ১ লক্ষ টাকার কম আয়ের যেকোনো একটি ক্যাটাগরি থেকে এবং বাকি ২৫% রাখা হয় এমন দিদিদের যাদের আয় ইতিমধ্যে ১ লক্ষ টাকার কাছাকাছি বা সামান্য বেশি, যাতে প্রয়োজনীয় সহায়তার মাধ্যমে তাদের এই আয়কে আরও টেকসই ও স্থায়ী করা সম্ভব হয়।

নির্বাচন বিশেষ সুযোগ : SRLM ২০২৬-২০২৭ নির্দেশিকা অনুসারে সম্ভাব্য লাখপতি দিদি চিহ্নিতকরণের সময় প্রথমে যারা PGs (প্রডিউসার গ্রুপ), PGEs ( প্রডিউসার এন্টারপ্রাইজ), IFCs (intigreted farming cluster), PMFME/SVEP,/OSF/MED ঋণ গ্রহণ ও গ্রুপ বিষয় গুলির সাথে যুক্ত আছে তাদের কে আগে সম্ভাব্য লাখপাতি দিদি তালিকার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

৫. লাখপতি দিদি প্রশিক্ষণ ও সুবিধা নিশ্চিত

শুধুমাত্র সরকারি সাহায্য নয়, বরং দিদিদের স্বাবলম্বী করতে একটি সুনির্দিষ্ট ‘মাস্টার প্ল্যান’ অনুসরণ করা হয়:

পারিবারিক জীবিকা পরিকল্পনা: প্রথমে ডিজিটাল টুলের বা সার্ভে ফর্মের সাহায্যে পরিবারের বিগত আর্থিক বছরের আয়, ব্যয় ও নিট লাভের তথ্য সংগ্রহ করবে এবং বর্তমান সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যাবহার ও আয়ের উৎস বিশ্লেষণ করে ৪ টি কোয়াটার ভিত্তিক আয় বৃদ্ধির একটি ব্যক্তিগত ‘লাখপতি পরিকল্পনা’ তৈরি করবে সাথে স্টেক হোল্ডার গুলির প্রকল্প সহায়তা তুলে ধরেন।

জীবিকার বৈচিত্র্যকরণ: প্রতিটি দিদিকে অন্তত দুটি ভিন্ন ধরনের আয়ের উৎসের (যেমন: উন্নত কৃষি এবং এর পাশাপাশি হাঁস-মুরগি পালন বা হস্তশিল্প) সাথে যুক্ত হতে উৎসাহিত করা হয়।

হাতে-কলমে কারিগরি শিক্ষা: প্রশিক্ষণ মডিউল অনুযায়ী সিআরপি-রা নিয়মিত দিদিদের বাড়িতে গিয়ে পরিবেশ বান্ধব, আধুনিক এবং সমন্বিত চাষাবাদ পদ্ধতি বা ব্যবসার নতুন কৌশলগুলো হাতে-কলমে শেখান ও স্টেক হোল্ডার গুলির সাথে Convergence নিশ্চত করেন।

ফান্ড নিশ্চিত: আয় বৃদ্ধির জন্যে সম্ভাব্য লাখপতি দিদি পরিবারগুলির চাহিদা মত DAY-NRLM ঋণ নিশ্চত করেন এবং ভর্তুকিতে সরকারি স্কিম গুলির সুবিধা নিশ্চিত করেন।

প্রগতি পর্যবেক্ষণ: CRP রা সম্ভাব্য লাখপতি দিদি দের আয়ের প্রোফাইল তৈরি করে ত্রৈমাসিক আয় লিপিবদ্ধ করেন। e-CRP রা আজীবিকা রেজিস্টারের Lokos APP এ ডিজিটালাইস এন্ট্রি করেন প্রতি ৩ মাস অন্তর এবং ব্লক মিশন যাচাই করে অনুমোদন দিলে জেলা মিশন (DRDC) অনুমোদন করে দিদির আয় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বাড়ছে কি না দেখে। রাজ্য মিশন SRLM ভিত্তিক আয় বৃদ্ধি রিপোর্ট DAY-NRLM তথ্য কেন্দ্রে জমা হয়।

৬. লাখপতি দিদি জীবিকার ক্ষেত্রসমূহ

স্বনির্ভর গোষ্ঠীর দিদিরা বিভিন্ন ধরণের লাভজনক কাজের সাথে যুক্ত হতে পারেন:

  • কৃষি ও পশুপালন: সবজি চাষ, মৎস্যচাষ, দুগ্ধ উৎপাদন বা ছাগল পালন।
  • উৎপাদন ও শিল্প: হস্তশিল্প, তাঁত শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ (আচার, পাপড় তৈরি) বা ক্ষুদ্র কুটির শিল্প।
  • সেবামূলক কাজ: পরিবহন সেবা, আর্থিক সেবা (ব্যাঙ্ক সখী), বা গ্রামীণ পর্যটনের মতো ব্যবসায়িক উদ্যোগ।

৭. সরকারি বিভাগ গুলোর সমন্বয় কৌশল

লাখপতি দিদিদের প্রযুক্তিগত সহায়তা, আর্থিক সংস্থান এবং দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সাথে সমন্বয় (Convergence) করা হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে গ্রামীণ উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বে একটি স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। একইভাবে রাজ্য, জেলা এবং ব্লক পর্যায়েও এই কার্যক্রম পর্যালোচনার জন্য কমিটি গঠন করা হচ্ছে।

নিচে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রকল্প গুলোর তালিকা দেওয়া হলো যেখান থেকে দিদিরা সহায়তা পাবেন:

মন্ত্রণালয়/বিভাগপ্রকল্পের নাম ও সহায়তার ধরণ
গ্রামীণ উন্নয়ন মন্ত্রণালয় (MoRD)১. VB-GRAMG গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা প্রকল্প
২. দীনদয়াল উপাধ্যায় গ্রামীণ কৌশল যোজনা (DDU-GKY)
৩. গ্রামীণ স্ব-নিযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান (RSETI)
৪. প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা-গ্রামীণ (PMAY-G)
কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MoA&FW)১. উদ্যানপালনের সমন্বিত উন্নয়নের মিশন (MIDH)
২. কৃষি যান্ত্রিকীকরণ সাব-মিশন (SMAM)
৩. জাতীয় বাঁশ মিশন
৪. জাতীয় মৌমাছি পালন ও মধু মিশন
৫. মিলেট (পুষ্টিকর শস্য) প্রচার
৬. প্রধানমন্ত্রী কৃষি সিঞ্চাই যোজনা (PMKSY)
৭. ১০ হাজার এফপিও (FPO) গঠন এবং এগ্রি ইনফ্রা ফান্ড (AIF)
৮. প্রাকৃতিক কৃষি এবং সিআরপি-দের মাধ্যমে সম্প্রসারণ সেবা প্রদান
পশুপালন ও দুগ্ধ বিভাগ (DAHD)১. পশুপালন স্বাস্থ্য ও সম্প্রসারণের জন্য স্বীকৃত এজেন্ট (A-HELP)
২. জাতীয় পশুপালন মিশন
৩. অ্যানিম্যাল হাজব্যান্ড্রি ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফান্ড
৪. রাষ্ট্রীয় গোকুল মিশন
খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প মন্ত্রণালয় ১. প্রধানমন্ত্রী ক্ষুদ্র খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ এন্টারপ্রাইজ ফরম্যালাইজেশন প্রকল্প (PMFME)
মৎস্য বিভাগপ্রধানমন্ত্রী মৎস্য সম্পদ যোজনা
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প মন্ত্রণালয় ১. ঐতিহ্যবাহী শিল্পসমূহের পুনর্জীবনের জন্য তহবিল প্রকল্প (SFURTI)

৮. আর্থিক সহায়তা ঋণের ধাপ সমূহ

দিদিরা যাতে পুঁজির অভাবে পিছিয়ে না পড়েন, সেজন্য লাখপতি দিদি যোজনা-র অধীনে সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে:

  • ১. রিভলভিং ফান্ড (RF): স্বনির্ভর গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ লেনদেন সচল রাখতে প্রাথমিক অবস্থায় ২০,০০০ থেকে ৩০,০০০ টাকা পর্যন্ত পুঁজি সহায়তা দেওয়া হয়।
  • ২. সিআইএফ (CIF) লোন: ব্যবসা বড় করার জন্য গোষ্ঠী প্রতি সর্বোচ্চ ২.৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত লোন পাওয়া সম্ভব।
  • ৩. জামানতবিহীন ব্যাংক লোন: দিদিরা যাতে বড় বিনিয়োগ করতে পারেন, সেজন্য কোনো গ্যারান্টি বা জামানত ছাড়াই ২০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ব্যাংক লোনের সুযোগ রয়েছে।
  • ৪. সুদ ভর্তুকি: সময়মতো ৩ লক্ষ টাকা পর্যন্ত লোন পরিশোধ করলে সুদের ওপর বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়, যার ফলে কার্যকরী সুদের হার অনেক কমে আসে।
  • ৫. ওভারড্রাফ্ট সুবিধা: প্রধানমন্ত্রী জন-ধন অ্যাকাউন্টধারী দিদিদের জন্য ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত জরুরি ওভারড্রাফ্ট সুবিধা রাখা হয়েছে।
  • ৬. এন্টারপ্রাইজ ফান্ড: ব্যক্তিগতভাবে ব্যবসা করতে ইচ্ছুক দিদিদের জন্য ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ক্রেডিট গ্যারান্টি এবং অতিরিক্ত ২% সুদ ভর্তুকির সুবিধা রয়েছে।

৯. বড় ব্যবসায়িক কাঠামোয় যুক্ত করা

ব্যক্তিগত আয়ের পাশাপাশি দিদিদের বড় ব্যবসায়িক কাঠামোয় যুক্ত করতে নিচের উদ্যোগগুলো নেওয়া হয়েছে:

  • ড্রোন দিদি যোজনা : কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে নির্বাচিত দিদিদের ড্রোন চালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে দিদিরা জমিতে সার ও কীটনাশক ছিটানোর কাজ করে বড় অংকের আয় করতে পারছেন। ( ড্রোন দিদি যোজনা কি ক্লিক করুন )
  • প্রডিউসার গ্রুপ (PG) ও এন্টারপ্রাইজ (PE): ছোট ছোট উৎপাদকদের নিয়ে ‘প্রডিউসার গ্রুপ'(গঠন দেখতে ক্লিক করুন) তৈরি করা হয়, যাতে তারা একসাথে বেশি পণ্য উৎপাদন ও বিক্রি করতে পারেন।
  • FPO (Farmer Producer Organization): বড় মাপের কৃষি ব্যবসার জন্য দিদিদের FPO-র (গঠন পদ্ধতি দেখতে ক্লিক করুন) সাথে যুক্ত করা হয়। এর ফলে তারা সরাসরি বাজারের বড় ক্রেতাদের কাছে পণ্য বিক্রি করতে পারেন এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য থেকে মুক্তি পান।
  • ইন্টিগ্রেটেড ফার্মিং ক্লাস্টার (IFC): এই প্রকল্পের সুবিধা নিয়ে প্রশিক্ষণ ও LSC এর মাধ্যমে কৃষি যন্ত্রাংশ ও বিক্রয়ের সুবিধা দিয়ে থাকেন। ( ইন্টিগ্রেটেড ফার্মিং ক্লাস্টার কি জানতে ক্লিক করুন )

১০. লাখপতি দিদি প্রকল্পে ক্লাস্টার ভিত্তিক উন্নয়ন

নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় একই ধরণের কাজ করা দিদিদের নিয়ে ‘ক্লাস্টার’ গঠন করা হয়।

  • পরিকাঠামো উন্নয়ন: প্রতিটি ক্লাস্টারের জন্য সরকার ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ করে থাকে। এই অর্থ দিয়ে পণ্য সংগ্রহ কেন্দ্র , গুদামঘর, প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট এবং প্যাকিং সেন্টার তৈরি করা হয়।
  • ভ্যালু চেইন তৈরি: শুধু কাঁচামাল বিক্রি না করে সেটিকে প্রক্রিয়াজাত করে (যেমন ধান থেকে চাল বা আম থেকে আচার) উন্নত মানের ব্র্যান্ডিং-এর মাধ্যমে বাজারে পাঠানো হয়। এটি দিদিদের লভ্যাংশ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

১১. পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন পদ্ধতি

লাখপতি দিদি যোজনার প্রতিটি ধাপ সঠিকভাবে সম্পন্ন হচ্ছে কি না তা দেখার জন্য নিচের ব্যবস্থাগুলো কার্যকর রয়েছে:

  • উচ্চপর্যায়ের কমিটি: জাতীয় স্তরে গ্রামীণ উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বে একটি ‘স্টিয়ারিং কমিটি’ পলিসি ও কৌশলের তদারকি করেন। রাজ্য ও জেলা স্তরেও একই ধরনের কমিটি নিয়মিত কাজের পর্যালোচনা করে।
  • মাঠ পর্যায়ের তদারকি: গ্রাম সংগঠন (VO) এবং ক্লাস্টার লেভেল ফেডারেশন (CLF) স্তরে ‘জীবিকা উপ-কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। এরা সরাসরি দিদিদের কাজের মাঠ পরিদর্শন করেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন।
  • ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড: আয়ের অগ্রগতি ট্র্যাক করার জন্য একটি বিশেষ MIS ড্যাশবোর্ড ব্যবহার করা হয়।
  • নিরপেক্ষ যাচাই: তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে সরকার নিয়মিত বিরতিতে তৃতীয় পক্ষ বা থার্ড-পার্টি ইভ্যালুয়েশন করিয়ে থাকে।

১২. অভিজ্ঞতা বিনিময় ও পিয়ার লার্নিং

একে অপরের থেকে শেখার মাধ্যমে দিদিদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে:

  • এক্সপোজার ভিজিট: আন্তঃরাজ্য এবং আন্তঃজেলা সফরের আয়োজন করা হয় যাতে দিদিরা অন্য এলাকার সফল লাখপতি দিদিদের কাজের পদ্ধতি সরাসরি দেখে শিখতে পারেন।
  • লার্নিং এক্সচেঞ্জ: নিয়মিত কর্মশালা ও আলোচনার মাধ্যমে দিদিরা তাদের সমস্যা ও সফলতার গল্প একে অপরের সাথে শেয়ার করেন।

১৩. প্রশিক্ষক ও তদারকি স্তরসমূহ

প্রশিক্ষণ কার্যক্রমটি মূলত একটি ‘ক্যাসকেড’ মডেলে চলে, যা নিচের স্তরগুলো অনুসরণ করে:

১৩.১. প্রশিক্ষক কাজ সমূহ

  • NRP (ন্যাশনাল রিসোর্স পারসন): জাতীয় পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ যারা মাস্টার ট্রেইনারদের তৈরি করেন।
  • মাস্টার ট্রেইনার (MT): এরা রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের প্রধান প্রশিক্ষক।
  • CRP ও e-CRP: এরা মাঠ পর্যায়ে দিদিদের সরাসরি প্রশিক্ষণ ও ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহের কাজ করেন।

১৩.২. মনিটরিং বা তদারকিতে যারা থাকছেন

  • জাতীয় স্তরে : এনএমএমইউ (NMMU – National Mission Management Unit) এই পুরো প্রক্রিয়ার মডিউল তৈরি এবং জাতীয় স্তরের তথ্যের তদারকি করবে।
  • রাজ্য স্তরে : এসআরএলএম (SRLM – State Rural Livelihood Mission) বা আমাদের রাজ্যে ‘আনন্দধারা’ মিশন এই প্রকল্পের মূল তদারকি কর্তৃপক্ষ। রাজ্য স্তরের মিশন ডিরেক্টর এবং সংশ্লিষ্ট আধিকারিকরা সিআরপি ও মাস্টার ট্রেইনারদের কাজের অগ্রগতি মনিটর করবেন। জেলা ও ব্লক মিশন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে আয়ের সত্যতা যাচাই করে কোয়াটারলি বর্ধিত আয় নিশ্চিত করবে।

১৪. কর্মী নিয়োগ, যোগ্যতা ও তাদের কাজ

লাখপতি দিদি তৈরি করতে ফিল্ড লেবেলে কাজ করার জন্য বিশাল সংখ্যায় কর্মী প্রয়োজন হয় যেমন মাস্টার ট্রেইনার, CRP ও A- CRP (আজীবিকা রেজিস্টার)। নিচে তাদের যোগ্যতা ও কাজ আলোচিত হয়েছে :

১৪.১. মাস্টার ট্রেইনার (MT): যোগ্যতা ও কাজ

লাখপতি দিদি উদ্যোগকে সফল করতে মাস্টার ট্রেইনারদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামীণ মহিলাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে যারা প্রশিক্ষণ দেবেন, তাদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ড ও দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে।

১৪.১.ক. মাস্টার ট্রেইনার কারা হতে পারবেন?

একজন মাস্টার ট্রেইনার হিসেবে মনোনীত হতে হলে তাকে অবশ্যই অভিজ্ঞ পেশাদার হতে হবে এবং নিচের ক্ষেত্রগুলোতে দক্ষতা থাকতে হবে:

  • অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র: প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গঠন , আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং খামার বা অ-খামার ভিত্তিক জীবিকা উন্নয়নে দক্ষ হতে হবে।
  • বিশেষ দক্ষতা: কৃষক উৎপাদক সংগঠন (FPO) বা উৎপাদক এন্টারপ্রাইজ (PE) এর প্রচার, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরি এবং ভ্যালু চেইন প্রমোশনে বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকা আবশ্যক।
  • প্রশিক্ষণ দক্ষতা: প্রশিক্ষণ মডিউল তৈরি, হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ পরিচালনা এবং অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতিতে শিক্ষাদানে পারদর্শী হতে হবে।
  • বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান: উপরোক্ত বিষয়গুলোতে গভীর এবং উন্নত স্তরের জ্ঞান থাকা জরুরি।
  • পরিবেশ তৈরি: শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সুন্দর ও কার্যকর শেখার পরিবেশ তৈরি এবং তা পরিচালনা করার দক্ষতা থাকতে হবে।
  • অভিজ্ঞতার সময়সীমা: অন্তত ৫ বছর বা তার বেশি সময় এই ধরণের কাজের অভিজ্ঞতা থাকা প্রয়োজন।
  • কারা আবেদনযোগ্য: সহযোগী সংস্থা বা টেকনিক্যাল সাপোর্ট অর্গানাইজেশনের (TSA) অভিজ্ঞ কর্মী এবং ভিও-সিএলএফ স্তরের বর্তমান রিসোর্স পারসনরা (যেমন: SRP, DRP, BRP যারা VPRP বা SVEP-তে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত) এই পদের জন্য যোগ্য।
  • প্রশিক্ষণ: মনোনীত মাস্টার ট্রেইনারদের NMMU-এর মডিউল অনুযায়ী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিশেষজ্ঞরা বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান করবেন।

১৪.১.খ. মাস্টার ট্রেইনারদের থেকে প্রত্যাশিত দায়িত্বসমূহ

মাস্টার ট্রেইনারদের প্রকল্পের সফলতায় নিম্নলিখিত দায়িত্বগুলো পালন করতে হবে:

  • ১. সিআরপি (CRP) প্রশিক্ষণ: নির্ধারিত মডিউল অনুযায়ী কমিউনিটি রিসোর্স পারসনদের (CRP) প্রশিক্ষণ দেবেন, যারা পরবর্তীতে লাখপতি দিদিদের হাতে-কলমে কাজ শেখাবেন।
  • ২. সময়সীমা: সংশ্লিষ্ট রাজ্যে নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী প্রশিক্ষণগুলো সফলভাবে পরিচালনা করতে হবে।
  • ৩. দীর্ঘমেয়াদী প্রতিশ্রুতি: এই কাজের জন্য তাদের দীর্ঘমেয়াদী অঙ্গীকার থাকতে হবে কারণ এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
  • ৪. মাঠ পর্যায়ের সহায়তা: সিআরপি-দের কাজের তদারকি করা এবং মাঝে মাঝে তাদের পরিচালিত প্রশিক্ষণে উপস্থিত থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ বা ফিডব্যাক দেওয়া।
  • ৫. রিমোট মেন্টরিং: সরাসরি উপস্থিত না থাকলেও দূর থেকে প্রযুক্তি ব্যবহার করে সিআরপি-দের সঠিক পথপ্রদর্শন ও সহায়তা প্রদান করতে হবে।
  • ৬. ভবিষ্যৎ ব্যাচ: পরবর্তী সময়ে যখনই নতুন ব্যাচের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হবে, তখন তাদের উপস্থিত থাকতে হবে।

১৪.২. সিআরপি (CRP) যোগ্যতা ও কাজ

লাখপতি দিদি উদ্যোগের মূল চালিকাশক্তি হলো কমিউনিটি রিসোর্স পারসন বা (CRP)। তারা মাঠ পর্যায়ে সরাসরি কাজ করে গ্রামীণ মহিলাদের স্বপ্ন পূরণে সহায়তা করেন। সিআরপি-দের যোগ্যতা এবং তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত দায়িত্ব গুলো নিচে আলোচনা করা হলো।

১৪.২.ক. সিআরপি (CRP) কারা হতে পারবেন?

নিম্নলিখিত ব্যক্তিবর্গ লাখপতি দিদি যোজনার সিআরপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন:

  • সফল জীবিকা সিআরপি: খামার (Farm) বা অ-খামার (Non-farm) ভিত্তিক জীবিকায় সফল এবং যারা ইতিমধ্যে নিজেরা অন্তত দুটি জীবিকা পরিচালনা করে ‘লাখপতি’ হয়েছেন ।
  • সক্রিয় কর্মী: যারা ভিআরপি (VPRP) বা জীবিকা ও অধিকার সংক্রান্ত কাজে সক্রিয়ভাবে যুক্ত । BLT/CRP নিয়োগ হয় (SRLM প্রয়োজন অনুসারে )
  • প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদ ব্যক্তি: গ্রাম সংগঠন (VO) বা ক্লাস্টার লেভেল ফেডারেশনে (CLF) কর্মরত মানবসম্পদ বা রিসোর্স পারসনরা ।
  • আর্থিক সহযোগী: এফএল সিআরপি (FL CRP), ব্যাংক সখী এবং বিমা সখীরাও এই প্রশিক্ষণের জন্য মনোনীত হতে পারেন ।
  • এলাকা ভিত্তিক অবস্থান: সিআরপি-দের অবশ্যই সেই সব গ্রামগুলোতে সহায়তা প্রদান করতে হবে যেখানে সম্ভাব্য লাখপতি দিদিদের চিহ্নিত করা হয়েছে ।

১৪.২.খ. সিআরপি-দের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য

সিআরপি-দের থেকে নিম্নলিখিত দায়িত্বগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করার প্রত্যাশা করা হয়:

  • ১. প্রশিক্ষণ গ্রহণ: মাস্টার ট্রেইনারদের দ্বারা পরিচালিত সকল প্রশিক্ষণ সেশনে নিয়মিত অংশগ্রহণ করা ।
  • ২. পরিকল্পনা প্রণয়ন: লাখপতি দিদিদের চিহ্নিত করতে এবং তাদের সহায়তার জন্য গ্রাম সংগঠন (VO) ও ক্লাস্টার (CLF)-এর সাথে মিলে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা ।
  • ৩. উপ-কমিটি গঠন: গ্রাম সংগঠন ও ক্লাস্টার স্তরের উপ-কমিটিগুলোকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া ।
  • ৪. মাঠ পর্যায়ে সময়দান: প্রশিক্ষণের পরবর্তী সহায়তার জন্য মাসে অন্তত ১৫ দিন লাখপতি দিদি উদ্যোগের জন্য উৎসর্গ করা ।
  • ৫. পরামর্শ ও ট্র্যাকিং: নিয়মিতভাবে মাস্টার ট্রেইনারদের পরামর্শ নেওয়া এবং আয়ের অগ্রগতির তথ্য আপডেট করা ।
  • ৬. আয় নিশ্চিত করা: নির্বাচিত দিদিদের চিহ্নিত করা থেকে শুরু করে তাদের বার্ষিক আয় ১ লক্ষ টাকা বা তার বেশি নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষণ ও বিমা সংক্রান্ত সহায়তা দেওয়া ।
  • ৭. হাতে-কলমে শিক্ষা: প্রতিটি সিআরপি অন্তত ৫০-৭৫ জন স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যকে প্রশিক্ষণ দেবেন এবং তাদের বার্ষিক আয় বৃদ্ধিতে সরাসরি সাহায্য করবেন ।
  • ৮. ব্যবসায়িক পরিকল্পনা: দিদিরা যে জীবিকা বেছে নেবেন, তার জন্য একটি সঠিক ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরি করতে সাহায্য করা ।
  • ৯. আয় জরিপ: নির্দিষ্ট সময় অন্তর লাখপতি দিদিদের আয়ের জরিপ করা এবং ডাটাবেস সংরক্ষণ করা ।
  • ১০. ব্যাংক ও বিমা সহায়তা: প্রয়োজনীয় মূলধনের জন্য ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা এবং জীবন ও স্বাস্থ্য বিমার সুবিধা পেতে সহায়তা করা ।
  • ১১. অতিরিক্ত দায়িত্ব: গ্রাম সংগঠন বা ক্লাস্টার লেভেল ফেডারেশন কর্তৃক অর্পিত অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করা ।

১৪.৩. এ-সিআরপি (A-CRP): ডিজিটাল দক্ষতা ও দায়িত্ব

যোগ্যতা:

  • প্রযুক্তিগত জ্ঞান: গ্রাম সংগঠন (VO) থেকে নির্বাচিত এমন সদস্য যার নিজস্ব স্মার্টফোন আছে এবং ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারে সাবলীল।
  • প্রশিক্ষণ: ডিজিটাল ডেটা সংগ্রহ এবং অ্যাপ ব্যবহারে প্রাথমিক সরকারি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হতে হবে।

প্রধান কাজ:

  • ডিজিটাল আজীবিকা রেজিস্টার-এ দিদিদের আয়ের তথ্য নির্ভুলভাবে নথিভুক্ত করা।
  • প্রতিটি কৃষি মরসুম শেষে আয়ের অগ্রগতি অনলাইন পোর্টালে আপডেট করা এবং প্রোগ্রেস ট্র্যাকিং নিশ্চিত করা।

১৪.৪. ডিজিটাল আজীবিকা রেজিস্টার আসলে কি?

লাখপতি দিদি যোজনার এটি এমন একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যেখানে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যদের সমস্ত জীবিকা এবং উপার্জনের তথ্য নথিভুক্ত থাকে। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হলো:

  • আয় ট্র্যাকিং: প্রতিটি পরিবার বছরে ১ লক্ষ টাকার দিকে কতটা এগিয়েছে, তা এই Lokos App টুলের মাধ্যমে বোঝা যায়।
  • পরিকল্পনা: মিশনের কর্মকর্তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ বা প্রয়োজনীয় সহায়তা নির্ধারণে এটি পথ দেখায়।
  • নিয়মিত হালনাগাদ: ফসল কাটা বা ব্যবসায়িক চক্র শেষে প্রতি ৩ মাস অন্তর গ্রাম সংগঠন (VO) পর্যায়ে বছরে ৪ বার এই রেজিস্টার আপডেট করা হয়।

১৪.৫. আয় নির্ধারণ ও তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রসমূহ

রেজিস্টারে তথ্য নথিভুক্ত করার সময় নিট আয় (মোট আয় থেকে খরচ বাদ দিয়ে যা থাকে) গণনা করা হয়। আয়ের প্রধান ক্ষেত্রগুলি হলো:

  • কৃষি ও আনুষঙ্গিক খাতের আয়: শস্য চাষ, পশুপালন (গরু, ছাগল পালন), মৎস্যচাষ বা বনজ সম্পদ থেকে অর্জিত প্রকৃত লাভ।
  • ব্যবসা ও উৎপাদন: ক্ষুদ্র কুটির শিল্প, হস্তশিল্প বা ছোট দোকান থেকে আসা নিট মুনাফা।
  • পারিশ্রমিক ও বেতন: কোনো চাকরিতে যুক্ত থাকলে তার বেতন বা ক্যাডার হিসেবে কাজ করে প্রাপ্ত সরকারি সাম্মানিক।
  • মজুরি ও রেমিট্যান্স: কৃষি বা শিল্প কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করে অর্জিত মজুরি এবং পরিবারের কোনো সদস্য বাইরে থেকে যে আর্থিক সাহায্য পাঠান।

১৪.৬. ডিজিটাল আজীবিকা রেজিস্টার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া

তথ্য সংগ্রহের পুরো কাজটি একটি সুশৃঙ্খল ধাপ অনুসরণ করে সম্পন্ন করা হয়:

  • কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ: ব্লক ও জেলা পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রথমে এই ডিজিটাল সিস্টেম সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
  • অজীবিকা-সিআরপি (A-CRP) নিয়োগ: গ্রাম সংগঠন থেকে উপযুক্ত শিক্ষিত সদস্যদের বেছে নিয়ে ‘ডেটা এন্ট্রি সখী’ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
  • ডেটা এন্ট্রি: ই-সিআরপি দিদিরা সদস্যদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে বছরে দুইবার সরাসরি MIS পোর্টালে তথ্য আপলোড করেন।
  • সততা যাচাই: তথ্যের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে মাঝেমধ্যে থার্ড-পার্টি বা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে তথ্যের সঠিকতা যাচাই করা হয়।

১৫. সান্মানিক প্রদান ও কাজের সময়সীমা

লাখপতি দিদি যোজনা আওতায় থাকা ট্রেইনারদের পরিশ্রমের মূল্যায়ন করতে রাজ্য জীবিকা মিশন (SRLM) নির্দিষ্ট হারে সান্মানিক প্রদান করে:

  • কাজের সময়কাল: লাখপতি তৈরির এই সেশনগুলো সাধারণত প্রতি বছর এপ্রিল থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত চলে।
  • কর্মদিবস: একজন সিআরপি (CRP) বা মাস্টার ট্রেইনারকে মাসে গড়ে ১৫ দিন এবং বছরে মোট ১৮০ দিন নিবিড়ভাবে কাজ করতে হয়।
  • জাতীয় রিসোর্স পারসন (NRP): যে সকল বিশেষজ্ঞ বা ট্রেইনার এনআরএলএম-এর জাতীয় তালিকায় অন্তর্ভুক্ত আছেন, তাদের সাম্মানিক বা পারিশ্রমিক NIRD PR-এর অনুমোদিত নিয়ম ও মানদণ্ড অনুযায়ী প্রদান করা হবে।
  • SRP/DRP/BRP-দের ক্ষেত্রে: যারা মাস্টার ট্রেইনার হিসেবে কাজ করবেন, তাদের সাম্মানিক প্রদান করবে সংশ্লিষ্ট SRLM (State Rural Livelihood Mission)। এক্ষেত্রে প্রতিটি রাজ্য বা স্টেট মিশন তাদের নির্দিষ্ট পদের জন্য যে সাম্মানিক নিয়ম আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছে, সেই হারেই পারিশ্রমিক দেওয়া হবে।
  • সহযোগী সংস্থার রিসোর্স পারসন (RPPO): যে সকল প্রশিক্ষক বা বিশেষজ্ঞ বিভিন্ন সহযোগী সংস্থার পক্ষ থেকে এই প্রকল্পে যুক্ত হবেন, তাদের ক্ষেত্রে যাতায়াত খরচ এবং থাকা-খাওয়ার খরচ সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলো বহন করবে।
  • মাস্টার ট্রেইনার ও CRP-দের পারিশ্রমিক: সরকারি গাইডলাইন অনুযায়ী, এদের দৈনিক প্রায় ৫৫০ টাকা পর্যন্ত সান্মানিক দেওয়া হয় (তবে সঠিক হার সংশ্লিষ্ট রাজ্য মিশন SRLM নির্ধারণ করে)।
  • এ-সিআরপি (A-CRP) সাম্মানিক: ডিজিটাল ডেটা এন্ট্রির জন্য ই-সিআরপি-দের প্রতি কোয়ার্টারে প্রতিটি নির্ভুল তথ্যের জন্য প্রায় ১৫-২০ টাকা হারে পারিশ্রমিক দেওয়া হয় (তবে সঠিক হার সংশ্লিষ্ট রাজ্য মিশন SRLM নির্ধারণ করে)।

উপসংহার

লাখপতি দিদি যোজনা কেবল একটি সরকারি পরিসংখ্যান নয়, এটি কোটি কোটি গ্রামীণ নারীর স্বপ্ন পূরণের চাবিকাঠি। সঠিক প্রশিক্ষণ, আর্থিক সহায়তা এবং ডিজিটাল আজীবিকা রেজিস্টারের মাধ্যমে নিয়মিত তদারকি—এই তিনে মিলেই গড়ে উঠছে স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ ভারত।

DAY-NRLM নির্দেশিকা অনুসারে লাখপতি দিদি যোজনা গাইড PDF ডাউনলোড করুন।

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর (FAQ)

১. কারা লাখপতি দিদি যোজনার সুবিধা পাবেন?

উত্তর: মূলত স্বনির্ভর গোষ্ঠীর (SHG) সেই সমস্ত সদস্যারা, যারা অন্তত ২ বছর ধরে গোষ্ঠীতে সক্রিয় এবং যাদের বর্তমান আয় বছরে ১ লক্ষ টাকার কম।

২. লাখপতি দিদি হতে গেলে অনলাইনে আবেদন করার নিয়ম কি?

উত্তর: লাখপতি দিদি আবেদনের জন্য কোনো সরাসরি অনলাইন পোর্টাল নেই। আপনাকে আপনার স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে গ্রাম সংগঠন (VO) বা ব্লক অফিসে যোগাযোগ করে আবেদন করতে হবে।

৩. লাখপতি দিদি সার্ভে ফর্ম বা তালিকাভুক্ত হওয়ার উপায় কি?

উত্তর: এলাকাভিত্তিক নিযুক্ত অজীবিকা-সিআরপি (A-CRP) দিদিরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ডিজিটাল আজীবিকা রেজিস্টারের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করেন। এই সার্ভের মাধ্যমেই তালিকায় নাম ওঠে।

৪. লাখপতি দিদি CRP (সিআরপি) কিভাবে নিয়োগ করা হয়?

উত্তর: প্রতিটি ব্লকের BMMU বা আনন্দধারা অফিস থেকে এই নিয়োগ করা হয়। সাধারণত অভিজ্ঞ স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্য থেকে শিক্ষাগত যোগ্যতা, কাজের অভিজ্ঞতা এবং ইন্টারভিউয়ের ভিত্তিতে আনন্দধারা BLT/CRP নিয়োগের জন্য নির্বাচন করা হয়।

তথ্য সূত্র

  • দীনদয়াল অন্ত্যোদয় যোজনা – জাতীয় গ্রামীণ জীবিকা মিশন (DAY-NRLM)
Spread the love

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top