
আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, আমাদের প্রতিদিনের ভাতের থালায় আমরা আসলে কী খাচ্ছি? আমরা জানি কি, যে অন্ন আমাদের প্রাণ বাঁচানোর কথা ছিল, আজ আমাদের অজান্তেই তা আমাদের শরীরে বিষ ঢেলে দিচ্ছে? চলুন, আজ আমরা এক নতুন অভিযানে নামি। এমন এক যাত্রা, যেখানে আমরা জানব কীভাবে আমাদের মাটিকে বিষমুক্ত করে সোনার ফসল ফলানো যায়।
১. কেন আমরা জৈব চাষের পথে হাঁটব? (আমাদের মাটির কান্না)
আমরা দীর্ঘকাল ধরে অতিরিক্ত ফলনের আশায় মাটিকে রাসায়নিক সারে ভরিয়ে দিয়েছি। ফলস্বরূপ, মাটি আজ তার জীবনীশক্তি হারিয়ে ফেলছে। মাটিতে যে উপকারী বন্ধু জীবাণু এবং কেঁচোরা আমাদের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করত, রাসায়নিকের প্রভাবে তারা আজ মৃতপ্রায়। যারা গাছের শিকড়ে খাবার পৌঁছে দেওয়ার জন্য দিনরাত রান্না করত, সেই জীবাণুগুলো আজ নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।
পাঞ্জাবের সেই ভয়াবহ শিক্ষা: আমরা কি জানি পাঞ্জাবের সেই ‘ক্যান্সার ট্রেন’-এর কথা? সবুজ বিপ্লবের নামে সেখানে এত রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়েছে যে আজ ঘরে ঘরে ক্যান্সার। অবস্থা এমন হয়েছে যে, ভাটিন্ডা থেকে বিকানের পর্যন্ত একটি ট্রেনই চলে শুধু ক্যান্সার রোগীদের জন্য। আমাদের সুন্দর বাংলাতেও সেই একই পরিস্থিতি শুরু হয়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, আমাদের শরীরের বেশিরভাগ রোগের মূল কারণ এই রাসায়নিক সার ও কীটনাশক মিশ্রিত বিষাক্ত খাদ্য। তাই আমরা স্থির করেছি, এই বিষচক্র থেকে আমরা বেরিয়ে আসব। আমাদের মাটিকে আবার ভালোবাসব এবং পরিবারকে সুস্থভাবে বাঁচাব।
২. বিকল্প পথ: জৈব ও প্রাকৃতিক কৃষি
আমরা অনেকে ভাবি জৈব পদ্ধতিতে ধান চাষ মানেই অনেক খরচ বা অনেক পরিশ্রম। কিন্তু আমরা জানলে অবাক হব যে, পদ্মশ্রী ড: সুভাষ পালেকরজীর দেখানো পদ্ধতিতে নামমাত্র খরচে আমরা ১ একর বা ৩ বিঘা জমিতে সফলভাবে ধান চাষ করতে পারি। ভারত ও বাংলাদেশ—উভয় দেশের হাজার হাজার কৃষক আজ এই পথে আমাদের পথ দেখাচ্ছেন। চলুন, আমরাও সেই পথে পা বাড়াই।
৩. শুরুটা হোক বীজতলা থেকে (সুস্থ চারাই সফলতার চাবিকাঠি)
জৈব পদ্ধতিতে ধান চাষে আমরা যদি একটি সুস্থ গাছ পেতে চাই, তবে আমাদের চারা হতে হবে নিরোগ। বীজতলা তৈরির সময় আমরা বিশেষ কিছু পদ্ধতি গ্রহণ করব:
জীবাণু মুক্ত মাটি: বীজতলার মাটি তৈরির সময় আমরা প্রতি কাঠায় ২০০ গ্রাম ট্রাইকোডার্মা ভিরিডি এবং ২ কেজি নিম খৈল মেশাব।
সতর্কতা: [জীবাণুনাশক না মিশিয়ে সরাসরি বীজ বোনা ভুল পদ্ধতি, (এতে চারার গোড়া পচা রোগ হওয়ার ভয় থাকে। তাই ট্রাইকোডার্মা মিশিয়ে মাটি শোধন করা সঠিক)]।
মাটি তৈরি ও ঘন জীবামৃত: শুকনো মাটিতে বীজতলা করলে আমরা কাঠা প্রতি ৪ কেজি ঘন জীবান্মৃত প্রয়োগ করব। [কিভাবে ঘন জীবান্মৃত তৈরি করবেন? বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন]। আর কাদা করে বীজতলা করলে কাদা করার সময় কাঠা প্রতি ২ লিটার জীবান্মৃত জলের সাথে মিশিয়ে দেব।
৪. চারার পরিচর্যা ও রোগ প্রতিরোধ
চারা যেন মূল জমিতে যাওয়ার আগেই শক্তিশালী হয়, তার জন্য আমরা ১০ দিন অন্তর প্রতি লিটার জলে ১০০ গ্রাম টাটকা কাঁচা গোবর গুলিয়ে বিকেলে স্প্রে করব।
নিমাস্ত্রের সুরক্ষা: পোকা আক্রমণ যেন না হয় তার জন্য আমরা নিমাস্ত্র তৈরি করে প্রয়োগ করব। এটি চারার জন্য একটি প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ। [নিমাস্ত্র তৈরির সঠিক পদ্ধতিটি দেখে নিন এই লিঙ্কে]।
৫. আমরা কীভাবে বীজ বাছাই ও শোধন করব?
আমরা জানি, সব বীজ থেকে ভালো চারা হয় না। তাই পুষ্ট বীজ বেছে নেওয়া আমাদের প্রথম কাজ।
বীজ শোধন ও বীজামৃত: ধান বাছাই করার পর সেটিকে শোধন করা বাধ্যতামূলক। বীজ বাহিত রোগ যেমন—গোড়াপচা বা বাদামি দাগ রুখতে আমরা বীজামৃত দিয়ে বীজ ভিজিয়ে অঙ্কুরোদ্গম করে নেব। [বীজামৃত তৈরির সহজ নিয়মটি পড়তে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন]। এই পদ্ধতিটি গ্রহণ করলে আমাদের বীজের অংকুরোদগম হবে চমৎকার এবং চারা হবে শক্তিশালী।
৬. মূল জমি প্রস্তুতি: আমরা যেভাবে মাটিকে পুনরুজ্জীবিত করব
চারা তো বীজতলায় ডগমগ করছে, কিন্তু যে মাটির বুকে তারা বেড়ে উঠবে, তাকে আমরা কীভাবে প্রস্তুত করেছি? আমরা জানি, রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে আমাদের জমির মাটির উপরের স্তর এখন অনেকটা শক্ত হয়ে গেছে। তাই আমরা এবার জমি তৈরিতে কোনো তাড়াহুড়ো করব না।
আমরা যদি হাতে অন্তত দুই মাস সময় পাই, তবে জৈব পদ্ধতিতে ধান চাষের আগে জমিতে ধঞ্চে চাষ করব। যখন ধঞ্চে গাছে ফুল আসার উপক্রম হবে (প্রায় ৪৫-৫০ দিন পর), তখন আমরা সেটিকে লাঙল দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেব। এটি মাটির জন্য সেরা ‘সবুজ সার’ যা মাটির বুনট পরিবর্তন করে দেয়। আর যদি আমাদের হাতে সময় কম থাকে? চিন্তার কিছু নেই! আমরা প্রথম চাষের সময় বিঘা প্রতি ৭০ লিটার জীবামৃত সারা জমিতে মগ দিয়ে ছড়িয়ে দেব। তবে মনে রাখবেন, জমিতে কিন্তু পর্যাপ্ত জল থাকা আবশ্যক, যাতে অণুজীবগুলো দ্রুত মাটিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। [বাড়িতেই সাশ্রয়ী উপায়ে জীবামৃত বানানোর বিস্তারিত পদ্ধতি দেখে নিন এই লিঙ্কে ক্লিক করে]।
রোপণের ঠিক আগের চাষের সময় আমরা বিঘা প্রতি ৫০ কেজি ঘন জীবান্মৃত দিয়ে কাদা করব। সেই সঙ্গে বিঘা প্রতি ১ কেজি ট্রাইকোডার্মা ভিরিডি মাটিতে মিশিয়ে দিতে আমরা ভুলব না। এটি মাটির গভীরে থাকা ক্ষতিকারক ছত্রাক ধ্বংস করে আমাদের ধান গাছকে গোড়াপচা বা ব্লাস্ট রোগের হাত থেকে শুরু থেকেই রক্ষা করবে।
৭. চারা রোপণের সেই রক্ষাকবচ (BPH বা কারেন্ট পোকা থেকে মুক্তির কৌশল)
এবার আসি সেই অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়ে, যা গত কয়েক বছরে আমাদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। আমরা আমাদের নিজেদের জমিতে বা প্রতিবেশী কৃষকের জমিতে এক ভয়াবহ দৃশ্য দেখেছি—ফসল পাকার ঠিক আগে ধান জমির মাঝে মাঝে যেন কে বা কারা আগুন লাগিয়ে দিয়েছে! চোখের সামনে বিঘার পর বিঘা জমি পুড়ে ছাই হয়ে গেল কারেন্ট পোকা বা BPH (Brown Plant Hopper) এর আক্রমণে। আমরা অনেকেই এই সমস্যায় পড়েছি এবং তখন হাজার হাজার টাকার রাসায়নিক বিষ দিয়েও ফসল বাঁচাতে পারিনি। কারণ, পোকাগুলো গাছের একদম গোড়ায় আক্রমণ করে যেখানে বিষ পৌঁছায় না।
আমরা কি এই ভুল আবার করব? একদম না। আমরা এবার এই শত্রুর বিরুদ্ধে বুদ্ধির সাথে লড়াই করব। আমরা রোপণের সময় ১০-১২ ইঞ্চি দূরত্বে লাইন করে চারা লাগাব এবং প্রতি ১০ লাইন পর পর এক লাইন ফাঁকা রাখব।
কেন এই ফাঁকা রাস্তা? বিপিএইচ বা কারেন্ট পোকা মূলত গুমোট, অন্ধকার এবং স্যাঁতসেঁতে জায়গা পছন্দ করে। আমরা যখন ১০ লাইন পর পর ফাঁকা দেব, তখন সূর্যের আলো সরাসরি গাছের গোড়ায় পৌঁছাবে এবং বাতাস চলাচল করবে। পোকা সেখানে বাসা বাঁধতেই পারবে না। এছাড়া এই ফাঁকা রাস্তা দিয়ে আমরা খুব সহজে স্প্রে করতে বা আগাছা পরিষ্কার করতে পারব কোনো গাছ নষ্ট না করেই। আমরা নিজেরাই তো দেখেছি, আলো-বাতাস যেখানে খেলে, সেখানে রোগবালাই অনেক কম হয়।
৮. রোপণ পদ্ধতি: একটি করে চারা এবং ‘শ্রী’ পদ্ধতির যাদু
আমাদের প্রথাগত ধারণা হলো গুছি ভরে অনেকগুলো চারা একসাথে লাগালে বুঝি ফলন বেশি হয়। কিন্তু আমরা এবার সেই ভুল ভাঙব। আমরা মাত্র একটি করে সুস্থ চারা লাইন করে লাগাব। যখন একটি চারা পর্যাপ্ত জায়গা পায়, তখন তার প্রতিটি গুছি অনেক বেশি মোটা হয় এবং প্রচুর পাশকাঠি ছাড়ার সুযোগ পায়।
বিশেষ করে আমাদের উঁচু জমিগুলোতে, যেখানে জল খুব বেশি সময় ধরে জমা থাকে না, সেখানে আমরা ‘শ্রী‘ (SRI) পদ্ধতিতে ধান চাষ করব। এই পদ্ধতিতে ধানের ফলন যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনি বীজের খরচও অনেক কমে যায়। এটি মূলত কম জলে অধিক ফলন পাওয়ার এক আধুনিক জৈব কৌশল যা আমরা দুজনে মিলে আমাদের জমিতে প্রয়োগ করব।
৯. চারা রোপণের পূর্বে গোড়া শোধন: আমাদের শক্তিশালী টিকা
আমরা অনেক সময় হুটহাট করে বীজতলা থেকে চারা তুলে সরাসরি জমিতে বসিয়ে দিই। কিন্তু আমরা এবার সেই ঝুঁকি নেব না। চারা রোপণের ঠিক আগে আমরা একটি ড্রামে বা গামলায় ১০ লিটার জলে ২০০ গ্রাম ট্রাইকোডার্মা ভিরিডি মিশিয়ে একটি দ্রবণ তৈরি করব। চারা রোপণের ঠিক আগে তার গোড়াগুলো ১০ মিনিট এই দ্রবণে ডুবিয়ে নেব। এটি জৈব পদ্ধতিতে ধান চাষের চারার জন্য এক শক্তিশালী প্রাকৃতিক ভ্যাকসিনের কাজ করবে, যা মূল জমিতে চারাকে পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে সাহায্য করবে।
১০. সার ব্যবস্থাপনা ও উপরি প্রয়োগ (গাছের পুষ্টির জোগান)
রোপণের পর আমাদের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। চারা লাগানোর ঠিক ২১ দিন পর আমরা পুনরায় জমিতে জীবামৃত এবং ২৫ দিন পর ঘন জীবান্মৃত প্রয়োগ করব ঠিক আগের পরিমাণে। এর ফলে গাছে কুশির সংখ্যা বা পাশকাঠি অনেক বেড়ে যাবে।
গাছ যখন বাড়তে শুরু করবে, তখন আমরা নিয়মিতভাবে (১৫ দিন অন্তর) টাটকা গোবর গুলানো জল স্প্রে করব।
সতর্কতা: [সরাসরি সকালে গোবর জল স্প্রে করা ভুল পদ্ধতি,(গোবর জল সবসময় সকালে টাটকা অবস্থায় রোদে গুলিয়ে রাখতে হবে এবং বিকেলে ভালো করে ছেঁকে নিয়ে স্প্রে করা সঠিক। কারণ রোদ ও বাতাসের সংস্পর্শে আসার ফলে এর মধ্যস্থ উপকারী অণুজীবরা সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং বিকেলে স্প্রে করলে তারা সারারাত পাতায় কাজ করার সময় পায়)]। বিঘা প্রতি ৬০ লিটার গোবর জল নির্যাস একবার স্প্রে করার জন্য আমাদের প্রয়োজন হবে।
১১. আগাছা নিয়ন্ত্রণ: আমাদের বিনা মূল্যের শ্রমিক (হাঁস ও এজলা)
ধান চাষে আগাছা পরিষ্কার করা আমাদের জন্য সবসময়ই এক বড় মাথাব্যথার কারণ এবং এতে প্রচুর খরচও হয়। আমরা যারা জৈব পদ্ধতিতে চাষ করছি, তারা রাসায়নিক ঘাসমারা বিষ ব্যবহার করব না। তবে আমাদের কাছে রয়েছে এমন এক বুদ্ধিদীপ্ত সমাধান যা কেবল আগাছা দমন করবে না, আমাদের পকেটে বাড়তি টাকাও এনে দেবে।
হাঁস পালন পদ্ধতি: আমাদের উঁচু জমি যেখানে জল কম সময় থাকে, সেখানে আমরা চারা রোপণের ২১ দিন পর ৫-১০ টি পূর্ণবয়স্ক হাঁস ছেড়ে দেব। আমরা যখন জমির মাঝে মাঝে সামান্য ধান ছড়িয়ে দেব, হাঁসগুলো সেই লোভে সারা জমি ঘুরে বেড়াবে। তাদের চলাফেরার ফলে ধানের গোড়ায় বায়ু চলাচল বাড়বে এবং আগাছাগুলো তাদের পায়ের চাপে ও খাবার হিসেবে পরিষ্কার হয়ে যাবে। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, এই দু-তিন মাসে হাঁস পালন করে আমরা যে ডিম পাব, তা বিক্রি করে আমাদের ধান কাটার খরচ অনায়াসেই উঠে আসবে।
এজলা (Azolla) পদ্ধতি: আমাদের নিচু বা জলা জমিতে আমরা এজলা নামক এক বিশেষ শৈবাল ছেড়ে দেব। এটি খুব দ্রুত সারা জমি ঢেকে ফেলে। ফলে সূর্যালোক মাটির নিচে পৌঁছাতে পারে না এবং আগাছা জন্মানোর সুযোগ পায় না। শুধু তাই নয়, এজলা জমি থেকে তোলার পর বা পচনের পর মাটিতে প্রচুর পরিমাণে নাইট্রোজেন যোগ করে, যা জৈব পদ্ধতিতে ধান চাষে আমাদের ধানের ফলন বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
১২. শত্রু ও বন্ধু পোকা: প্রকৃতির ভারসাম্য
আমরা অনেক সময় জমিতে দু-একটা পোকা দেখলেই আতঙ্কিত হয়ে রাসায়নিক বিষ স্প্রে করি। কিন্তু আমরা কি জানি, আমাদের অজান্তেই আমরা আমাদের পরম বন্ধুদের মেরে ফেলছি? ধান জমিতে মূলত দুই ধরনের পোকা থাকে—শত্রু পোকা (যারা ফসল নষ্ট করে) এবং বন্ধু পোকা (যারা শত্রু পোকাদের খেয়ে আমাদের ফসল রক্ষা করে)।
আমরা যখন রাসায়নিক বিষ দিই, তখন শত্রু পোকার চেয়ে বন্ধু পোকারাই আগে মারা যায়। আমরা এবার তা করব না। আমরা আমাদের জমিতে মাকড়শা, ফড়িং, লেডি বার্ড বিটল এবং বিভিন্ন উপকারি বোলতাদের বংশবৃদ্ধি করতে দেব। এরা মাজরা পোকা, শোষক পোকা এবং পাতামোড়া পোকার ডিম ও কীড়া খুঁজে খুঁজে খেয়ে আমাদের ফসলকে পাহারা দেয়। আমরা এবার শুধু নজর রাখব যে ক্ষতির সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে কি না।
১৩. পোকা দমনে আমাদের ব্রহ্মাস্ত্র: ‘অগ্নিঅস্ত্র’ ও ‘বার্ড পাচার’
যদি কখনো দেখি শত্রু পোকার আক্রমণ বেড়ে গেছে, তবে আমাদের হাতে আছে জৈব উপায়ে তৈরি করা ‘অগ্নিঅস্ত্র’। তামাক, রসুন, কাঁচা লঙ্কা এবং নিম পাতার নির্যাস থেকে তৈরি এই ওষুধটি পোকাদের যম। [অগ্নিঅস্ত্র তৈরির সঠিক নিয়ম এবং ব্যবহারের মাত্রা জানতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন]।
এছাড়াও আমরা জমিতে ‘বার্ড পাচার’ পদ্ধতি ব্যবহার করব। আমরা বিঘা প্রতি ৪০-৫০টি ধঞ্চে গাছ বা বাঁশের কঞ্চি পুঁতে দেব। এতে পাখিরা এসে বসবে এবং তারা ধান গাছের পোকাগুলো খুঁজে খুঁজে খাবে। মাজরা পোকা দমনে আমরা আরও একটি দেশি টোটকা ব্যবহার করতে পারি—কেরোসিন তেল ও বালুর মিশ্রণ। দড়ি দিয়ে ধানের ওপর দিয়ে টান দিলে মাজরা পোকাগুলো মাটিতে পড়ে নষ্ট হয়ে যাবে।
১৪. গান্ধী পোকা দমনের অদ্ভুত কৌশল
ধান যখন থোড় থেকে বের হয়, তখন গান্ধী পোকার আক্রমণ আমাদের দুশ্চিন্তায় ফেলে। আমরা এর জন্য এক চমৎকার ফাঁদ ব্যবহার করব। ২০-২৫ টি বাঁশের কাঠির মাথায় থেঁতো করা শামুক বা কাঁকড়া লাগিয়ে দেব। এই পচা গন্ধে গান্ধী পোকারা আকৃষ্ট হয়ে সেখানে জমা হবে এবং আমরা খুব সহজেই তাদের ভোরে ধরে মেরে ফেলতে পারব। অথবা কয়েকটা গান্ধী পোকা থেঁতো করে তার জল জমিতে স্প্রে করলে সেই গন্ধে বাকি পোকারা ওই জমি থেকে ১০ দিনের জন্য পালিয়ে যায়।
১৫. ধানের সাথে সাথী ফসল ও পয়েন্ট চাষ (বাড়তি আয়ের পথ)
আমরা কি ভেবেছি ধান জমি থেকে দ্বিগুণ আয় করা সম্ভব? হ্যাঁ, সম্ভব! আমরা ধান চাষের পাশাপাশি আইল বা ধারের জমিতে ঝিঙে, শশা বা করলার চাষ করতে পারি বস্তা পদ্ধতিতে। এটি কেবল বাড়তি আয় দেবে না, ওই মাচার মাথায় পাখিরা বসে আমাদের ধানের পোকা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবে।
আর ধান কাটার ঠিক আগে যখন মাটিতে রস থাকে, তখন আমরা খেত খেসারি বা কলাইয়ের বীজ ছড়িয়ে দিতে পারি। একেই বলা হয় ‘পয়রা চাষ’। এতে কোনো বাড়তি চাষ বা সারের প্রয়োজন হয় না এবং ধানের পর আমরা অনায়াসেই একটি ডাল বা তৈলবীজ ফসল ঘরে তুলতে পারি।
উপসংহার
আমাদের এই দীর্ঘ যাত্রা আজ এক সফল পরিণতির দিকে। আমরা মাটিকে ভালোবেসে, প্রকৃতিকে সাথে নিয়ে বিষমুক্ত অন্ন উৎপাদনের শপথ নিয়েছি। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা একদিন বৃহত্তর বিপ্লব ঘটাবে। জৈব পদ্ধতিতে ধান চাষে আমাদের সুস্থ পরিবার এবং উর্বর মাটিই হবে আমাদের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার।
সচরাচর জিজ্ঞাস্য প্রশ্নাবলী (FAQ)
১. জৈব পদ্ধতিতে ধান চাষ করলে কি ফলন কমে যায়?
প্রাথমিকভাবে রাসায়নিক থেকে জৈব পদ্ধতিতে ফিরলে প্রথম বছর ফলন সামান্য কম মনে হতে পারে, কারণ মাটি তখন নিজেকে বিষমুক্ত করতে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু দ্বিতীয় বছর থেকেই মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি পায় এবং আপনি রাসায়নিক চাষের সমান বা তার চেয়ে বেশি ফলন পেতে পারেন, তাও অনেক কম খরচে।
২. জীবামৃত ও ঘন জীবামৃতের মধ্যে পার্থক্য কী?
জীবামৃত হলো একটি তরল জৈব সার যা মূলত সেচের জলের সাথে বা স্প্রে হিসেবে ব্যবহার করা হয় দ্রুত ফল পেতে। অন্যদিকে, ঘন জীবামৃত হলো জীবামৃতেরই শুষ্ক রূপ যা দীর্ঘসময় ধরে মাটিতে পুষ্টি জোগাতে সাহায্য করে এবং এটি জমি তৈরির সময় বা লাইনের মাঝে ছিটিয়ে দেওয়া হয়।
৩. কারেন্ট পোকা বা BPH দমনে ১০ লাইন পর পর ফাঁকা রাখা কি বাধ্যতামূলক?
হ্যাঁ, এটি অত্যন্ত কার্যকর একটি কৌশল। ধান জমির মাঝে আলো-বাতাস চলাচলের জন্য ১০ লাইন পর পর এক লাইন ফাঁকা রাখলে আর্দ্রতা কম থাকে, ফলে কারেন্ট পোকা বংশবৃদ্ধি করতে পারে না। আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, এই পদ্ধতিতে কোনো বিষ ছাড়াই বিপিএইচ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
৪. জৈব পদ্ধতিতে চাষ করলে ধান পাকতে কি বেশি সময় লাগে?
সাধারণত জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত ফসল প্রাকৃতিকভাবে পুষ্টি পায় বলে এটি রাসায়নিক ফসলের তুলনায় কয়েক দিন বেশি সময় নিতে পারে। তবে এই ধানের দানা অনেক বেশি পুষ্ট ও ওজনে ভারী হয় এবং চাল দীর্ঘক্ষণ ভালো থাকে।
৫. হাঁস পালন করলে কি ধান গাছের ক্ষতি হয় না?
ধান রোপণের ২১ দিন পর যখন চারা শিকড় ধরে নেয়, তখন হাঁস ছাড়লে কোনো ক্ষতি হয় না। বরং হাঁসগুলো ধানের গোড়ায় জমে থাকা আগাছা ও ক্ষতিকারক পোকা খেয়ে ফেলে। তবে ধান থোড় আসার পর বা ফুল আসার সময় হাঁস সরিয়ে নেওয়া সঠিক।










