.jpg)
মুসুরীর ডাল আমাদের ঘরে ঘরে সব চাইতে জনপ্রিয়। প্রায় প্রতি দিন কম বেশী পাতে পড়ে। আমন ধান কাটার পর সেচ বিহীন বেশীর ভাগ জমি এখনও পতিত পরে থাকে অথচ মাটির সঞ্চিত রসেই মুসুর ডালের আধুনিক লাভজনক চাষ পদ্ধতি-তে করতে পারি। আমন ধান কাটার পর ১২-১৫ দিন আগে জমি জল ছেড়ে দিয়ে ধান কাটার ৩-৪ দিন আগে শুধু বীজ ছড়িয়ে পয়রা পদ্ধতিতে মুসুরীর চাষ আমাদের রাজ্যে ভালোই হয়। আমাদের রাজ্যে ডালের প্রয়োজন বেশীর ভাগটাই বাইরে থেকে আমদানী করতে হয়। ডাল চাষ কৃষি অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা নিতে পারে।
১. মুসুর ডালের উচ্চফলনশীল জাত বীজ ও বৈশিষ্ট :
- মালিকা (K-75): উত্তর প্রদেশের স্থানীয় বাছাই করা জাত৷ দানায় ধূসর বা ছাই রং-এর ছিটে থাকে, দানা বড়, ১০০০টি দানার ওজন ২৭ গ্রাম৷ স্বাভাবিক চাষে ১২৫-১৭৫ কেজি এবং পয়রা চাষে ৮০-১০০ কেজি বিঘা প্রতি ফলন হয়।
- আশা (B-77): আসামের স্থানীয় বাছাই করা জাত, ১২০ দিনে পাকে৷ দানার রং মালিকার মত, আকারে ছোট, ১০০০টি দানার ওজন ১৬ গ্রাম৷ খরা সহ্য করার ক্ষমতা ভাল। বিঘা প্রতি উৎপাদন ১২৫-১৭৫ কেজি হয়৷ পয়রা চাষে ৬০-৮০ কেজি পর্যন্ত পাওয়া যায়। পশ্চিমবঙ্গে এর চাষ বেশী হয়৷ ১২০ দিনে পাকে ৷
- রঞ্জন (B-256): দানার আকার মাঝারি, ধূসর বর্ণের। গাছ শাখাবহুল। ১২৫-১৩০ দিনে পাকে ৷
২. জমি ও মাটি
মুসুর ডালের আধুনিক লাভজনক চাষ পদ্ধতি-তে পলিমাটি, দোঁয়াশ, ও এঁটেল মাটিতে ভাল।
আড়ও দেখুন আধুনিক রাজমা চাষ পদ্ধতি: অর্থকরী ফসল হিসেবে রাজমা চাষের সম্পূর্ণ গাইডলাইন
৩. মুসুর ডাল চাষের সময় :
অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ (কার্তিকের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত) মুসুর ডাল চাষের সময়। বিনা চাষে পয়রা পদ্ধতিতে করলে ধান কাটার ২ সপ্তাহ আগে জল বের করে দিয়ে কাটার ৩-৪ দিন আগে বীজ ছেটাতে হয়। বেশী আগে বীজ ছেটালে বাড় ভাল হয় না, শাখা প্রশাখা কম হয়, গাছ সরু ও লম্বা হয়ে যায়৷ ফসল কম হয়৷
৪. বীজের হার :
বিঘা প্রতি ছোট দানা ৪-৫ কেজি ও বড় দানা ৫-৬ কেজি। প্রতি কেজি বীজের সঙ্গে ২০-৩০ গ্রাম তিসির বীজ মিশিয়ে লাগালে গোড়া পচা, ঢলে পড়া রোগ কম হয়।
৫. সারি ও গাছের দূরত্ব :
সারিতে বুনলে সারির দূরত্ব ২০-২৫ সেমি বা ৮-১০ ইঞ্চি৷ সারিতে চারার দূরত্ব ৩-৪ সেমি বা ১-১.৫ ইঞ্চি। ছিটিয়ে বুনলে প্রতি বর্গ হাতে ৩২-৩৫ টি হারে দানা ছড়াতে হয়৷ মাটি চষে লাগালে দুই আঙ্গুল বা ৩-৪ সেমি গভীরে বীজ বুনতে হবে।
৬. সার প্রয়োগ :
রাইজোবিয়াম স্পেসিস জাতের জীবাণুসার অবশ্যই বীজে মাখাতে হবে। এরপর জলে ভেজানো ঠান্ডা করা ২০০ গ্রাম চুন প্রতি কেজি বীজে মাখিয়ে বুনলে খুবই ভালো হয়। বিঘা প্রতি ৬-৮ কুইন্টাল ভালো কম্পোস্ট, ১৫-২০ কেজি রক ফসফেট বা ডলোমাইট দিলে ভালো হয়। ফসলের একমাস বয়স থেকে, পনেরো দিন অন্তর তিনবার তরল সার স্প্রে করে ২৫% উৎপাদন বাড়িয়ে তোলা যায় ৷ এতে পাতার মরচে পড়া রোগ কম হয় ।
৭.সেচ ব্যবস্থাপনা :
মসুর ডাল চাষ পদ্ধতি-তে বোনার সময় মাটিতে রস না থাকলে একটি সেচ দিয়ে মাটি তৈরী করতে হবে এবং দানা পুষ্ট হওয়ার সময় একবার করে হালকা সেচ দিলে ফলন বাড়ে। পয়রা চাষে কখনও মাটিতে রসের অভাব হলে – মাটি ফেটে গেলে একটা হালকা সেচ দিলে ভালো হয়৷ সেচ বেশী হলে বা গোড়ায় জল জমলে হলদে হয়ে মরে যায়।
৮. সাথি ফসল :
কুসুম, গম, তিসি, সরষে। দেখা গেছে মুসুরের ৪-৬ লাইন পর ১ লাইন যব বা তিসি লাগালে মিশ্র চাষে একক চাষের তুলনায় মুসুরের ফলন বাড়ে৷ ছোলার তুলনায় মুসুর কিছুটা ছায়া পছন্দ করে তাই মিশ্র চাষে উৎপাদন বাড়ে৷ পয়রা চাষে মুসুর লাভজনক ফসল হিসাবে স্থান করে নিয়েছে।
আড়ও দেখুন উন্নত ছোলা চাষ পদ্ধতি: আমন পরবর্তী পতিত জমিতে লাভের নতুন দিশা
৯. মুসর ডালের রোগ ও পোকা প্রতিকার
শুঁটি ছিদ্রকারী লেদা পোকার আক্রমণ হতে পারে। ১৫ শতাংশ নিম পাতার নির্যাস ৭-১ দিন অন্তর ২-৩ বার স্প্রে করলে পোকা নিয়ন্ত্রন হয়। পাতা ঝলসা রোগ হলে ৫ শতাংশ নিম তুঁতের দ্রবণ বা বোর্দো দ্রবণ ১২-১৫ দিন অন্তর ২ বার স্প্রে করতে হবে। পাতা ঝলসা রোগে টাটকা গোবরের ১৫ শতাংশ নির্যাস ৭-১০ দিন অন্তর স্প্রে করলেও মুসর ডালের রোগ ও পোকা প্রতিকার পাওয়া যায়।
১০. মুসুর ডালের উৎপাদন ও লাভ
ফলন: মসুর ডাল চাষ পদ্ধতি-তে ১ বিঘা জমি থেকে গড়ে ৪-৫ মণ মুসুর ডাল পাওয়া যায়।
বিক্রয় মূল্য: বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী ১ মণ মুসুর ডালের দাম গড়ে ২,৫০০ – ২,৮০০ টাকা।
মোট আয়: ৫ মণ × ২,৮০০ টাকা = ১৪,০০০ টাকা।
নিট লাভ: ১৪,০০০ – ৪,০০০ = ১০,০০০ টাকা (প্রায়) লাভ হয় মুসুর ডালের আধুনিক লাভজনক চাষ পদ্ধতিতে।
১১. কেন মুসুর চাষ লাভজনক?
- ১. মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি: মুসুর ডাল চাষ করলে মাটিতে নাইট্রোজেন যুক্ত হয়, ফলে পরবর্তী ফসলে (যেমন পাট বা ধান) ইউরিয়া সার কম লাগে।
- ২. অল্প খরচ: এতে সেচ ও বালাইনাশক খরচ অন্যান্য ফসলের তুলনায় অনেক কম।
- ৩. খড় বা ভুসি: ডাল ঝাড়াই করার পর যে খড় পাওয়া যায়, তা উন্নত মানের পশুখাদ্য হিসেবে বিক্রি করা যায়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. মুসুর ডাল চাষের সঠিক সময় কোনটি?
মুসুর ডাল রবি মৌসুমের ফসল। কার্তিক মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে অগ্রহায়ণের মাঝামাঝি (অক্টোবরের শেষ থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি) পর্যন্ত বীজ বপনের আদর্শ সময়। দেরি করে বুনলে ফলন কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
২. ১ বিঘা জমিতে কতটুকু বীজের প্রয়োজন হয়?
সাধারণত ১ বিঘা (৩৩ শতাংশ) জমিতে ৪ থেকে ৫ কেজি উন্নত জাতের মুসুর বীজের প্রয়োজন হয়। তবে বীজ ছিটিয়ে বুনলে কিছুটা বেশি এবং সারিতে বুনলে কিছুটা কম বীজ লাগে।
৩. মুসুর ডাল চাষে কি সেচ দেওয়া বাধ্যতামূলক?
না, মুসুর ডাল মূলত বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল বা মাটির অবশিষ্ট রসে হয়ে যায়। তবে যদি মাটিতে রসের পরিমাণ খুব কমে যায়, তাহলে ফুল আসার আগে একটি হালকা সেচ দিলে ফলন অনেক বৃদ্ধি পায়। মনে রাখবেন, জমিতে যেন পানি জমে না থাকে।
তথ্য সূত্র
- ভারতীয় কৃষি গবেষণা কেন্দ্র (ICAR)










