১. মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা ও আমাদের জীবনধারার সম্পর্ক
আমরা প্রতিনিয়ত মাঠের পর মাঠ সবুজ ফসল দেখি, কিন্তু সেই ফসলের প্রাণ জুগিয়ে চলা মাটির ভেতরে কী ঘটছে তা খেয়াল করি না। সহজ কথায়, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা ও মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা বলতে বোঝায় মাটির এমন এক জীবন্ত অবস্থা যা উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটায়, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে এবং মানুষ ও পশুপাখির জন্য নিরাপদ খাদ্য উৎপন্ন করে। মাটি কেবল কোনো নির্জীব কাদা-বালুর স্তূপ নয়; এটি একটি জটিল জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র। কিন্তু কয়েক দশক ধরে অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক সার ও বিষ ব্যবহারের ফলে মাটির সেই স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ও জীবন হারিয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় জৈব সারের গুরুত্ব অপরিসীম।
ভারতে সাধারণত ছয় ধরনের মাটি বেশি চোখে পড়ে—পলি মাটি, লাল মাটি, কালো মাটি, ল্যাটেরাইট মাটি, শুষ্ক বা মরু মাটি এবং পার্বত্য মাটি। প্রতিটি মাটির নিজস্ব খনিজ ও রাসায়নিক গঠন রয়েছে। যেমন—পলি মাটিতে পটাশ ও ফসফেটের ভালো উপস্থিতি থাকে, আবার ল্যাটেরাইট ও লাল মাটি অ্যাসিডিক প্রকৃতির এবং এতে পটাশ বা লোহা থাকলেও ফসফরাসের ঘাটতি দেখা যায়। মাঠে গেলে কৃষকরা বলেন যে, আগের মতো আর অল্প সারে ফসল উঠছে না; বছর বছর সারের বস্তা বাড়াতে হচ্ছে। এর মূল কারণ হলো একটানা একক ফসল (Mono-cropping) চাষ এবং রাসায়নিকের মাত্রাতিরিক্ত প্রয়োগের ফলে মাটির গভীরে থাকা স্বাভাবিক জৈব কাঠামোর পতন ঘটেছে।
মাটির স্বাস্থ্য কি?
সহজ কথায়, মাটির স্বাস্থ্য (Soil Health) হলো মাটির একটি সজীব ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা, যা একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র হিসেবে কাজ করে প্রতিনিয়ত উদ্ভিদ, প্রাণী ও মানুষের জীবনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO)-র মতে, সুস্থ মাটি কেবল শস্য উৎপন্ন করে না, বরং এটি জল ধরে রাখে, ক্ষতিকর উপাদান ছাঁকন করে এবং বাতাসে কার্বনের সামঞ্জস্য রক্ষা করে। মাটিতে থাকা কোটি কোটি উপকারী অণুজীব, জৈব পদার্থ এবং সঠিক বায়ু-জল চলাচলের ব্যবস্থার ওপরই মাটির এই স্বাস্থ্য বা জীবনীশক্তি নির্ভর করে।
আরও দেখুন ফসল উৎপাদনে মাটির গুরুত্ব: কম সার প্রয়োগে ফসল হবে দিগুণ
২. অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের বিষময় ফল
সবুজ বিপ্লবের পর থেকে খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে দ্রুত কার্যকরী রাসায়নিক সারের ওপর আমরা মাত্রাতিরিক্ত নির্ভর হয়ে পড়েছি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সুষম সারের তোয়াক্কা না করে প্রধানত ইউরিয়া বা নাইট্রোজেনজাতীয় সার একচেটিয়া প্রয়োগ করার ফলে মাটির মৌলিক পুষ্টির সামঞ্জস্য সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ভারতীয় মাটির প্রায় ৫৯% অংশে সহজলভ্য নাইট্রোজেনের ঘাটতি রয়েছে এবং প্রায় ৪৯% মাটিতে ফসফরাসের তীব্র অভাব তৈরি হয়েছে। শুধু তাই নয়, পটাশিয়ামের ঘাটতিও প্রায় ৩৯% মাটিতে স্পষ্ট। আমরা যখন জমিতে কেবল নাইট্রোজেন ঢালতে থাকি, তখন মাটির তলদেশে থাকা অনুজীবগুলোর জৈবিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়। এতে মাটিতে থাকা প্রাকৃতিক ফসফরাস বা পটাশ গাছ শোষণ করতে পারে না।
রাসায়নিক সারের অপ্রতুল ও একমুখী ব্যবহারের কারণে কেবল মূল পুষ্টি উপাদানই কমছে না, বরং দস্তা (Zinc), বোরণ (Boron), লোহা (Iron), ম্যাঙ্গানিজ ও মলিবডেনামের মতো অতি প্রয়োজনীয় গৌণ পুষ্টি উপাদানের অভাব প্রকট হচ্ছে। তথ্য অনুযায়ী, এদেশের মাটির প্রায় ৩৬.৫% জায়গায় জিংকের এবং ২৩.৪% জায়গায় বোরণের ঘাটতি দেখা গেছে। বিখ্যাত পরিবেশবিদ র্যাচেল কার্সন তাঁর ‘সাইলেন্ট স্প্রিং’ বইয়ে সতর্ক করেছিলেন যে কৃত্রিম রাসায়নিক কীভাবে মাটির অনুজীব ও ভূগর্ভস্থ জলকে বিষাক্ত করে তোলে। আজ আমাদের চোখের সামনে সেই চিত্রই সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

৩. অনুজীব বিনাশ ও জৈব কার্বনের সংকট
আমরা দেখেছি যে, একটি সুস্থ মাটিতে কোটি কোটি উপকারী ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও কেঁচো কাজ করে। এরা মাটির ভেতরে থাকা কঠিন খনিজকে ভেঙে গাছের খাদ্য উপযোগী তৈরি করে। কিন্তু অতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের প্রয়োগে মাটির পুষ্টিপ্রদানকারী মাইক্রোফ্লোরা বা অনুজীব সম্প্রদায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
- জৈব কার্বনের ঘাটতি: জৈব কার্বনকে বলা হয় মাটির মূল মেরুদণ্ড বা হৃদস্পন্দন। নিবিড় চাষাবাদ ও রাসায়নিকের ব্যবহারের কারণে ভারতের অধিকাংশ চাষের জমিতে জৈব কার্বনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
- কীটনাশকের ব্যবহার বৃদ্ধি: ভারত সরকারের কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ সালে দেশে কীটনাশকের ব্যবহার ছিল প্রায় ৫৯,৬৭০ মেট্রিক টন, যা ২০২১-২২ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৬৩,২৮৪ মেট্রিক টনে।
- উৎপাদনশীলতার ফারাক: ১৯৬৯ সালে যেখানে প্রতি হেক্টরে মাত্র ১২.৪ কেজি সার ব্যবহার হতো, ২০২১ সালে তা বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ১৩৭ কেজিতে। কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো—সারের প্রয়োগ প্রায় ১১ গুণেরও বেশি বাড়লেও সেই অনুপাতে ফসলের উৎপাদনশীলতা মোটেই বাড়েনি।
রাসায়নিক সার মাটিতে ঢালার পর তা অনুজীবের বাসস্থান ধ্বংস করে দেয়, যার ফলে মাটির স্বাভাবিক জৈব পদার্থের গঠন নষ্ট হয় এবং শক্ত আস্তরণ (Hardpan) তৈরি হয়ে বাতাস ও জল চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যায়।
৪. অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক ব্যবহারের বহুমুখী ক্ষতি
জমিতে ক্রমাগত রাসায়নিক সার ও বিষ ঢালার ফলে শুধুমাত্র যে ফসল নষ্ট হচ্ছে তা নয়, পুরো কৃষি ব্যবস্থা একটি মারাত্মক চক্রের মধ্যে জড়িয়ে পড়ছে। বিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে যে, অন্ধের মতো এগ্রো-কেমিক্যাল ব্যবহারে মাটির উর্বরতা নষ্ট হয়, যার ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে ফসলের গুণগত মান, সার্বিক উৎপাদনশীলতা, ক্ষতিকারক পোকার প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক পরিবেশের ওপর।
কৃষি বিজ্ঞানীরা একে বলছেন “কৃষির বহুমুখী ধ্বস”। মাটিতে যখন অতিরিক্ত রাসায়নিক পড়ে, তখন উপকারী অনুজীব ও পোকা (যেমন কেঁচো, মাকড়সা বা মৌমাছি) মারা যায়। এর সরাসরি সুযোগ নেয় ক্ষতিকারক পোকাগুলো, ফলে জমিতে পেস্ট বা পোকার আক্রমণ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সেই পোকা দমনে কৃষক আবার নতুন ও তীব্র বিষ স্প্রে করেন। এতে জমির স্থায়ী ক্ষতি তো হয়ই, একই সাথে চাষের খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
আরও দেখুন সবুজ বিপ্লব কি? ভারতে সবুজ বিপ্লবের গুরুত্ব, দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব
৫. কৃষকের অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও ঋণের বোঝা
আমরা মাঠে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি যে, বর্তমানে দেশের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জীবিকা কতটা সংকটের মুখে। আধুনিক রাসায়নিক নির্ভর চাষ কৃষকদের জন্য এক চরম অর্থনৈতিক ফাঁদ তৈরি করেছে।
- উৎপাদন ব্যয় ও সারের সাবসিডি: কেন্দ্রীয় বাজেটের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২১-২২ সালে সার ভর্তুকির জন্য বরাদ্দ ছিল ৭৯,৫৩০ কোটি টাকা। কিন্তু বাজারে সারের চাহিদা ও দাম বাড়ার কারণে ২০২২-২৩ অর্থবর্ষে তা লাফিয়ে বেড়ে প্রায় ২.২৫ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছায়। সরকার এত বিপুল পরিমাণ টাকা ভর্তুকি দেওয়া সত্ত্বেও স্থানীয় বাজারে সার ও কীটনাশকের আকাশছোঁয়া দাম কৃষকের পকেট খালি করে দিচ্ছে।
- জলের চরম সংকট: মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা না করার কারণে মাটিতে জল ধারণ ক্ষমতা কমছে। ভারত এমনিতেই একটি জল-সংকটপূর্ণ দেশ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৫১ সালে দেশে মাথা পিছু জলের প্রাপ্যতা ছিল ৫,১৭৮ ঘনমিটার/বছর, যা ২০১১ সালে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১,৫৪৪ ঘনমিটার। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যে এই পরিমাণ ১,১৪০ ঘনমিটারে নেমে আসবে।
- ভূগর্ভস্থ জলের অপচয়: আমাদের মোট উত্তোলিত ভূগর্ভস্থ জলের প্রায় ৮৯% ব্যবহৃত হয় চাষের কাজে। মাটিতে পর্যাপ্ত জৈব পদার্থ না থাকায় অতিরিক্ত জল দিতে হয়, যা ভূগর্ভস্থ জলের স্তরকে আরও নিচে নামিয়ে দিচ্ছে।
অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, জমিভিত্তিক উৎপাদনশীলতার চেয়ে এখন “জলভিত্তিক উৎপাদনশীলতা” (Water Productivity)-র দিকে নজর দেওয়া জরুরি। বীজ ও কেমিক্যালের উচ্চ দাম, সীমিত সেচের ব্যবস্থা এবং ফসল বিক্রির সঠিক মূল্য না পাওয়ায় প্রান্তিক কৃষকেরা বাধ্য হয়ে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছেন।
৬. মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা: মাটির ক্ষয় ও জীববৈচিত্র্য বিনাশ
- মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা: মাটির ক্ষয় ও জীববৈচিত্র্য বিনাশকৃষিজমিতে ব্যবহৃত বিষাক্ত রাসায়নিক কেবল জমিতে আটকে থাকে না। বৃষ্টির জলের সাথে ধুয়ে তা আশপাশের খাল-বিল, নদী ও পুকুরের জলে গিয়ে মেশে। একে বলা হয় “এগ্রোকেমিক্যাল পলিউশন”।
- মাটির গঠন নষ্ট ও ক্ষয়: রাসায়নিকের কারণে মাটির কণাগুলোর ভেতরের বাঁধন বা বন্ধন ভেঙে যায়। ওপরের উর্বর মাটির স্তর আলগা হয়ে পড়লে সামান্য বৃষ্টিতেই তা ধুয়ে নদীতে চলে যায়, যাকে মাটির জলক্ষয় বলে। মাটির ছিদ্রগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে বৃষ্টির জল ভেতরের স্তরে প্রবেশ করতে পারে না ।
- জীববৈচিত্র্যের বিনাশ: মাটির উপরিভাগের উর্বর অংশ ধুয়ে যাওয়ার পাশাপাশি একফসল চাষ বা মোনো-ক্রপিংয়ের কারণে জমিতে প্রাকৃতিকভাবে বেঁচে থাকা গাছপালা, উপকারী পোকা ও পাখিদের বাসস্থান ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
আমরা যখন প্রাকৃতিকভাবে গঠিত মাটি ও মাটির অনুজীবকে রাসায়নিক দিয়ে মেরে ফেলছি, তখন জমি তার নিজস্ব পুনর্জীবন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। এর ফলে কৃষি ও পরিবেশ দূষণ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মাটিকে পুনরুজ্জীবিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
৭. ভোক্তাদের স্বাস্থ্যের ওপর বিষাক্ত খাদ্যের প্রভাব ও মাটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা
আমরা সচরাচর বাজারে সুন্দর, চকচকে ফল বা সবজি দেখে কিনি; কিন্তু ভেবে দেখি না এর ভেতরে কতটা বিষ লুকিয়ে রয়েছে। মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা না করে মাত্রাতিরিক্ত কেমিক্যাল ঢালার প্রভাব এখন সোজা আমাদের থালায় এসে পৌঁছাচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় (WHO) প্রকাশিত তথ্য ও আন্তর্জাতিক গবেষণা নিবন্ধ অনুযায়ী, মানুষের জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী রোগের প্রায় ৫০% কারণ হলো আমাদের গ্রহণ করা অস্বাস্থ্যকর ও বিষাক্ত খাদ্য। জমিতে স্প্রে করা বিষাক্ত কীটনাশক সরাসরি ফসলের ভেতরে প্রবেশ করে খাদ্যশৃঙ্খলে গেঁথে যায়।
- পুষ্টির ঘাটতি: মাটি থেকে উদ্ভিদের প্রাকৃতিকভাবে প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান গ্রহণ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় খাদ্যের পুষ্টিঘনত্ব (Nutrient Density) আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। বিশ্বজুড়ে মানুষের খাদ্য তালিকায় প্রায় ২০-৩০% প্রয়োজনীয় সূক্ষ্ম পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।
- ক্যান্সার ও মরণব্যাধির ঝুঁকি: অতিরিক্ত এগ্রো-কেমিক্যাল ও পেস্টিসাইড ব্যবহারের ফলে খাদ্যে যে বিষাক্ত রাসায়নিক অবশিষ্টাংশ (Chemical Residues) থেকে যাচ্ছে, তা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে ক্যান্সার, পেটের রোগ, হরমোনজনিত সমস্যা এবং প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাসের মূল কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বিজ্ঞান বলে, যে মাটিতে প্রাণ নেই, সেই মাটিতে উৎপাদিত খাদ্য কোনোদিন মানুষকে পূর্ণাঙ্গ পুষ্টি দিতে পারে না।
৮. বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা
বিশ্বজুড়ে আজ জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে কৃষি খাতে। আমরা ভেবে দেখি না এর ভেতরে কতটা বিষ লুকিয়ে রয়েছে। সঠিক মাটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বজায় না রেখে মাত্রাতিরিক্ত কেমিক্যাল ঢালার প্রভাব এখন সোজা আমাদের থালায় এসে পৌঁছাচ্ছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, তীব্র খরা এবং অসময়ের বন্যা কৃষকের সমস্ত পরিশ্রম মাটি করে দিচ্ছে।
জাতিসংঘের তথ্য (UN-India) অনুযায়ী, ভারতে বর্তমানে প্রায় ১৯৫ মিলিয়ন (১৯.৫ কোটি) মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছেন। একদিকে ২০৫০ সালের মধ্যে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যের যোগান দিতে উৎপাদন বহুগুণ বাড়ানো প্রয়োজন, অন্যদিকে ক্লাবিষাক্ত কেমিক্যালভিত্তিক চাষের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকা আর সম্ভব নয়।
ক্লাইমেট চেঞ্জের কারণে কৃষি রাজস্ব ১৫ থেকে ২৫% পর্যন্ত হ্রাস পাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। উষ্ণতা বাড়ার কারণে মাটির ভেতরের জৈব কার্বন বায়ুমণ্ডলে উবে যাচ্ছে, ফলে গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন আরও বাড়ছে। আবহাওয়ার এই চরম রূপান্তরের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রান্তিক কৃষক, ভূমিহীন খেতমজুর এবং নারী ও শিশুরা। এই পরিস্থিতিতে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় করণীয় ঐতিহ্যবাহী প্রাকৃতিক কৃষির দিকে ফিরে যাওয়া।
৯. প্রাকৃতিক উপায়ে মাটির উর্বরতা বাড়ানোর উপায় ও মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় করণীয়
এই সার্বিক সংকট থেকে নিষ্ক্রান্ত হওয়ার একমাত্র উপায় হলো প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়া এবং টেকসই কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলা। বিজ্ঞানের বিভিন্ন গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের কৃষি বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতা থেকে মাটির উর্বরতা বাড়ানোর উপায় এবং মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় জৈব সারের গুরুত্ব বুঝে জৈব পদ্ধতিতে মাটির যত্ন নেওয়ার মূল দিকগুলো সংকলিত হলো:
- আচ্ছাদন বা কভার ক্রপ : বৃষ্টি বা কড়া রোদে মাটি যেন সরাসরি উন্মুক্ত না থাকে, সেজন্য জমিতে সবসময় কোনো না কোনো আচ্ছাদনকারী ফসল বা কভার ক্রপ রাখা জরুরি। এটি বৃষ্টিবিন্দুর সরাসরি আঘাতে মাটির কণা ক্ষয়ে যাওয়া আটকায় এবং মাটিতে জৈব কার্বনের যোগান দেয়।
- ফসলের বৈচিত্র্য ও সাথী ফসল: ক্ষতিকর একফসল বা মনোকালচার বাদ দিয়ে শস্য পর্যায় বা বহুমাত্রিক ফসল বিন্যাস গ্রহণ করতে হবে। ডালজাতীয় শস্য বেশি চাষ করলে বাতাসে থাকা নাইট্রোজেন প্রাকৃতিকভাবে মাটিতে আবদ্ধ হয়।
- অনুপস্থিত উপাদান পূরণ ও দেশীয় সার: গোবর, খড়, জীবামৃত, ঘনজীবামৃত ও কম্পোস্ট ব্যবহারের মাধ্যমে মাটিতে অনুজীবের সংখ্যা বাড়িয়ে জৈব কার্বনের মাত্রা বাড়াতে হবে।
- কৃষি বনায়ন ও প্রাকৃতিক শেড: জমির আইলে বা চারপাশের সীমান্তে দেশীয় গাছ রোপণ করলে মাটির ক্ষয় কমে এবং প্রাকৃতিকভাবে পোকা দমনের ফাঁদ তৈরি হয়।
জৈব
১০. মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় জৈব সারের মূল গুরুত্ব:
গোবর, কম্পোস্ট, জীবামৃত, ঘনজীবামৃত ও সবুজ সারের মতো জৈব উপাদান মাটিতে ঢাললে তা কেবল সরাসরি পুষ্টি জোগায় না, বরং মাটিতে অণুজীবের সংখ্যা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই অণুজীবগুলো মাটিতে আটকে থাকা জটিল খাদ্য উপাদানকে উদ্ভিদের গ্রহণযোগ্যে রূপান্তর করে, মাটির জৈব কার্বন বাড়ায় এবং মাটির জল ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ফলে রাসায়নিক সার ছাড়াই মাটি দীর্ঘমেয়াদে সজীব ও উর্বর থাকে। মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় জৈব সারের গুরুত্ব বুঝে এখনই উচিত মাটিতে জৈব সার প্রয়োগের পরিমাণ বাড়ানো।
FAQ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর)
প্রশ্ন ১: অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক সার ব্যবহারে মাটির মূল ক্ষতি কী হয়?
উত্তর: অতিরিক্ত রাসায়নিক সার মাটির বন্ধু অনুজীব ও জৈব কার্বন ধ্বংস করে, ফলে মাটি শক্ত হয়ে জল ধারণ ক্ষমতা ও প্রাকৃতিকভাবে পুষ্টি জোগানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
প্রশ্ন ২: জৈব পদ্ধতিতে মাটির স্বাস্থ্য ও উর্বরতা ফেরানোর উপায় কী?
উত্তর: জমিতে সবুজ সার (কভার ক্রপ), ফসল বিন্যাস বা শস্য পর্যায় অনুসরণ, পর্যাপ্ত গোবর ও জীবামৃত ব্যবহার এবং খড় দিয়ে মালচিং বা আচ্ছাদন দেওয়ার মাধ্যমে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করা যায়।
প্রশ্ন ৩: রাসায়নিক সারের প্রভাবে মানবস্বাস্থ্যে কী ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে?
উত্তর: খাদ্যে বিষাক্ত রাসায়নিক অবশিষ্টাংশ থেকে যাওয়ায় মানুষের শরীরে পুষ্টির ঘাটতি দেখা দিচ্ছে এবং ক্যান্সার, হরমোনজনিত সমস্যাসহ নানা দীর্ঘমেয়াদী রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।
তথ্য সূত্র
- জাতীয় প্রকৃতিক কৃষি মিশন (NMNF) ভারত সরকার।
- সুভাষ পালেকর প্রাকৃতিক কৃষি (SPNF)










