১. মাটির জৈব কার্বনের গুরুত্ব ও মাটির আসল প্রাণ
আমরা সচরাচর খালি চোখে যে মাটিকে নির্জীব বালি বা কাদার স্তূপ মনে করি, প্রকৃতপক্ষে তা কোটি কোটি অণুজীব ও জৈব উপাদানের এক জীবন্ত জগত। বিজ্ঞানের ভাষায়, মাটিতে জৈব কার্বনের গুরুত্ব এতটাই অপরিসীম যে একে মাটির স্বাস্থ্যের মূল সূচক বা ‘প্রাইম ইন্ডিকেটর‘ বলা হয়ে থাকে। মাটির উর্বরতা, ভৌত গঠন এবং ফসল ফলানোর সামর্থ্য কতটা থাকবে—তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে এই সয়েল অর্গানিক কার্বন (Soil Organic Carbon বা SOC)-এর ওপর।
জৈব কার্বন মূলত মাটির ভেতরে দানাযুক্ত বা দানা বাঁধার উপযোগী অবস্থা তৈরি করে, যা মাটিতে বাতাস চলাচলের সুবিধা বাড়ায় এবং উপরিভাগের অতিরিক্ত জল ধুয়ে যাওয়া কমায়। পুরোপুরি পচে যাওয়া জৈব পদার্থ বা হিউমাস হলো গাছের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান ধরে রাখার মূল ভাঁড়ার। এটি মাটিতে অম্লত্ব বা ক্ষারত্বের দ্রুত পরিবর্তন ঠেকানোর জন্য ‘বাফারিং এজেন্ট’ হিসেবে কাজ করে। আমরা গবেষণার তথ্যে দেখেছি যে, ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব এগ্রিকালচারাল রিসার্চ(ICAR)-এর ন্যাশনাল ব্যুরো অব সোয়েল সার্ভে অ্যান্ড ল্যান্ড ইউজ প্ল্যানিং (ICAR-NBSS&LUP, 2017-18)-এর হিসাব অনুযায়ী ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের মাটিতে জৈব কার্বনের পরিমাণে ব্যাপক ফারাক রয়েছে। সার্বিকভাবে বিশ্বের ক্রান্তীয় অঞ্চলের মোট জৈব কার্বনের প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ ধারণ করে ভারতের মাটি, যা বৈশ্বিক কার্বন ভরের প্রায় ৩ শতাংশ।

২. মাটিতে অনুজীবের ভূমিকা ও নিউট্রিয়েন্ট সাইক্লিং
আমরা মাঠে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি যে, যে জমিতে পর্যাপ্ত জৈব পদার্থ বা গোবর দেওয়া হয়, সেখানকার ফসল বেশি সতেজ থাকে। বিজ্ঞান বলে, সুস্থ মাটিতে বাস করে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন অণুজীব। এই মাটিতে অনুজীবের ভূমিকা বাদ দিয়ে প্রাকৃতিক বা টেকসই চাষাবাদের কথা ভাবাই যায় না।
মাটির অণুজীবের কাজ গুলো নিচে দেওয়া হলো:
- জৈব পদার্থ ভাঙন ও পুষ্টি সরবরাহ: মাটিস্থ ব্যাকটেরিয়া, অ্যাক্টিনোমাইসিটিস ও ছত্রাক জটিল জৈব পদার্থকে ভেঙে উদ্ভিদের শোষণের উপযোগী তরল ও খনিজ উপাদানে রূপান্তর করে।
- বায়োগিওকেমিক্যাল চক্র: এই অণুজীবগুলো নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টির প্রাকৃতিক চক্র বজায় রাখে।
- এনজাইমের কাজ: অণুজীবের জৈবিক কার্যকলাপ এবং তাদের নিঃসৃত এনজাইম মাটির গুণগত মান পরিমাপের অত্যন্ত সংবেদনশীল সূচক হিসেবে কাজ করে।
- নাইট্রোজেন ও কার্বন সঞ্চয়: অণুজীবগুলোর দেহ খনিজ উপাদান, কার্বন ও নাইট্রোজেনের এক প্রত্যক্ষ ও স্থায়ী আধার যা ধীরে ধীরে মাটিতে মুক্ত হয়।
গাছের শিকড়ের চারপাশে (Rhizosphere) ব্যাকটেরিয়ার বিভিন্ন প্রজাতি বসবাস করে, যা শিকড়ের বৃদ্ধিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে এবং ক্ষতিকর জীবাণুর হাত থেকে গাছকে রক্ষা করে।
সমুদ্রের অণুজীবগুলো আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের ৫০% অক্সিজেন তৈরি করে এবং বায়ুমণ্ডলের সমপরিমাণ CO_2 শোষণ করে নেয়। এছাড়া ৯০% পর্যন্ত মিথেন গ্যাস দূর করে।
বিজ্ঞান বলে, অণুজীব কেবল মাটিতেই নয়, সমগ্র পৃথিবীর পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। সমুদ্রের অণুজীবগুলো যেমন বায়ুমণ্ডলের বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড ও মিথেন গ্যাস শোষণ করে আমাদের শ্বাস নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ৫০% অক্সিজেন যোগায়, ঠিক তেমনি মাটির অণুজীবগুলো মাটি থেকে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন নিয়ন্ত্রণ করে মাটিকে জীবন্ত রাখে।
আরো দেখুন ফসল উৎপাদনে মাটির গুরুত্ব
৩. মাইকোরাইজা ছত্রাক ও কার্বন স্পঞ্জ গঠন
আমরা আর্বাসকুলার মাইকোরাইজাল ফাংগাই (Arbuscular Mycorrhizal Fungi – MF) সম্পর্কে জেনেছি, যা গাছের শিকড়ের সাথে এক অদ্ভুত সখ্য তৈরি করে। গাছ সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে যে শর্করা তৈরি করে, তার কিছু অংশ এই ছত্রাককে দেয়। বিনিময়ে মাইকোরাইজা ছত্রাক মাটির দূর-দূরান্ত থেকে খনিজ পুষ্টি এবং রস শোষণ করে সোজা গাছের শিকড়ে পৌঁছে দেয়।
গবেষণায় দেখা গেছে যে, একটি স্বাস্থ্যকর মাটিতে মাইকোরাইজা ছত্রাকের নেটওয়ার্ক ঠিক স্পঞ্জের মতো কাজ করে। এটি মাটিতে জৈব কার্বনের স্থায়িত্ব বাড়ায়, নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও সালফারের ব্যবহারিক দক্ষতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই ছত্রাকের বিস্তার বাড়াতে হলে জমিতে রাসায়নিক সার ও বিষের প্রয়োগ বন্ধ করতে হবে এবং ক্রমাগত জমি চষা কমানো প্রয়োজন। জমিতে কভার ক্রপ বা আচ্ছাদনকারী ফসল রাখলে মাটির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং আর্দ্র পরিবেশ তৈরি হওয়ার ফলে মাটিতে উপকারী ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের বংশবৃদ্ধি দ্রুত গতিতে ঘটে।
মাটির জৈব কার্বন বনাম মাটির অণুজীব: মূল পার্থক্য
| পার্থক্যের বিষয় | মাটির জৈব কার্বন | মাটির অণুজীব |
|---|---|---|
| মুল প্রকৃতি | এটি মাটির একটি অজীবজাত রাসায়নিক উপাদান (মৃত উদ্ভিদ, পাতা ও প্রাণীর পচা অবশিষ্টাংশ থেকে তৈরি)। | এরা মাটির জীবন্ত জৈবিক উপাদান (যেমন—ব্যাকটেরিয়া, অ্যাক্টিনোমাইসিটিস, ছত্রাক ও মাইকোরাইজা)। |
| মাটিতে ভূমিকা | এটি অণুজীবের খাদ্য হিসেবে কাজ করে এবং মাটির ভৌত গঠন ও জল ধারণ ক্ষমতা বজায় রাখে। | এরা জৈব পদার্থকে ভেঙে পুষ্টি মুক্ত করে এবং গাছের গ্রহণ উপযোগী রাসায়নিক রূপ দেয়। |
| কাজের ধরন | স্পঞ্জের মতো কাজ করে মাটিতে রস, আর্দ্রতা ও খনিজ উপাদান ধরে রাখে। | সক্রিয়ভাবে ‘নিউট্রিয়েন্ট সাইক্লিং’ বা পুষ্টি চক্র পরিচালনা করে এবং এনজাইম নিসরণ করে। |
| পরিমাপের একক | মাটিতে এর পরিমাণ শতাংশ (%) হিসেবে মাপা হয় (যেমন—০.৫% বা ১%)। | মাটিতে এদের উপস্থিতি জীবন্ত কোশের সংখ্যা বা বায়োমাস (CFU/g) দিয়ে মাপা হয়। |
| উদাহরণ/উপাদান | হিউমাস, পচা লতাপাতা, গোবর সার বা কম্পোস্টের কার্বন অংশ। | নাইট্রোজেন সংবন্ধনকারী ব্যাকটেরিয়া, আরবাসকুলার মাইকোরাইজা ছত্রাক (AMF) ইত্যাদি। |
| পারস্পরিক সম্পর্ক | জৈব কার্বন হলো জ্বালানি/খাদ্য; এটি না থাকলে অণুজীব বাঁচতে পারে না। | অণুজীব হলো কারিগর; এরা না থাকলে জৈব কার্বন ভেঙে মাটিতে মিশতে পারে না। |
৪. মাটির কেঁচো ও মাটি চষার প্রাকৃতিক কারিগর
আমরা আগের পেজে দেখেছি কীভাবে জৈব কার্বন ও অণুজীব মাটির ভেতরের প্রাণচাঞ্চল্য বজায় রাখে। এবার আসি মাটির আরেকটি প্রধান উপাদানে—যা হলো কেঁচো ও বিভিন্ন ধরণের উপকারী মাটির পোকা । মাঠে গেলে কৃষকরা প্রায়ই বলেন, “যে জমিতে কেঁচো বেশি, সেই জমির মাটি সোনা।” বিজ্ঞান ও কৃষি গবেষণাও এই কথা শতভাগ স্বীকার করে। কেঁচো মাটিকে নিচ থেকে উপরে উল্টে-পাল্টে দেয় এবং মাটি খুঁড়ে সরু সুরঙ্গ তৈরি করে, যা গাছের শিকড়ে বাতাস ও সেচের রস পৌঁছাতে চমৎকার সাহায্য করে।
প্রাকৃতিক কৃষি বাস্তুতন্ত্রে তাদের বসবাস ও খাবার গ্রহণের অভ্যাসের ওপর ভিত্তি করে কেঁচোকে প্রধানত ৩টি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়:
- এপিজিক : এরা মাটির একেবারে উপরের স্তরে অর্গানিক ম্যাটার বা কাঁচা পাতা পচিয়ে খায়। এরা আকারে ছোট এবং গায়ে রঙ থাকে।
- এন্ডোজিক : এরা মাটির মাঝামাঝি ৩ থেকে ১০ সেন্টিমিটার গভীরে থাকে। এরা মাটি খেয়ে ভেতরের পুষ্টি উপাদানগুলোকে আলগা করে দেয়।
- অ্যানেসিক : এরা মাটির একদম গভীরে—প্রায় ২ মিটার পর্যন্ত খাড়া সুড়ঙ্গ তৈরি করে যাতায়াত করে। এরা ওপরের শুকনো লতাপাতা নিচে টেনে নিয়ে যায় এবং মাটির গভীরতম স্তরে বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা করে।
৫. কেঁচোর মল ও রাসায়নিক বনাম প্রাকৃতিক চাষের উপাত্ত
কেঁচো যখন মাটির সাথে জৈব পদার্থ খেয়ে মল ত্যাগ করে, তাকে ‘ওরম কাস্ট‘ বলা হয়। এই ওরম কাস্ট অত্যন্ত পুষ্টিকর জৈব সারের কাজ করে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, কেঁচোর তাজা মলে সাধারণ উপরিভাগের মাটির তুলনায় ৫ গুণ বেশি সহজে গ্রহণযোগ্য নাইট্রোজেন, ৭ গুণ বেশি ফসফরাস এবং ১১ গুণ বেশি সহজলভ্য পটাশিয়াম উপস্থিত থাকে।
আমরা বিভিন্ন গবেষণা পত্রে দেখেছি যে, কীভাবে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও বিষ প্রয়োগের কারণে জমি থেকে কেঁচো হারিয়ে যাচ্ছে। Subhash Palekar Natural Farming (SPNF) এবং রাসায়নিক চাষের ওপর পরিচালিত এক বৈজ্ঞানিক সমীক্ষায় দেখা গেছে:
| ফসলের ধরন ও পদ্ধতি | কেঁচোর সংখ্যা (প্রতি বর্গ মিটারে) | কেঁচোর মলের ওজন (প্রতি বর্গ মিটারে) |
|---|---|---|
| SPNF পদ্ধতি ( বাঁধা কপি+মেথি, মোটর। | ১৮৩.৩৩ টি | ৫৭.২৩ গ্রাম |
| রসায়নিক চাষ (একক বাঁধা কপি) | ৪১.৬৭ টি | ১৪.৮৭ গ্রাম |
অন্ধ্রপ্রদেশের প্রাকৃতিক কৃষির ওপর করা অন্য একটি বিস্তৃত সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রাকৃতিক চাষের জমিতে প্রতি বর্গমিটারে গড়ে ২৩২ টি কেঁচো সক্রিয় থাকে, যেখানে রাসায়নিক ব্যবহার করা জমিতে এই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৩২ টি-তে। গোমূত্র ও গোবরভিত্তিক প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করলে বর্ষাকালে কেঁচোর বংশবৃদ্ধি ও কার্যকারিতা জ্যামিতিক হারে বাড়ে।
৬. মাইক্রো-আর্থ্রোপোডস ও মাটির খাদ্য শৃঙ্খল
খালি চোখে দেখা যায় না বা সামান্য আতশ কাঁচ দিয়ে দেখতে হয়—এমন বহু ক্ষুদ্র পোকা বা মাইক্রো-আর্থ্রোপোডস (Soil Micro-arthropods) মাটিতে কাজ করে চলেছে। এদের মধ্যে স্প্রিংটেল (Collembola) এবং মাইটস প্রধান।
আমরা জেনেছি যে, এই ক্ষুদ্র পোকাগুলো মাটিতে থাকা ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া খেয়ে বেঁচে থাকে, যাকে ‘গ্রাজিং‘ বলা হয়। এদের এই খাওয়ার প্রক্রিয়ার ফলে অণুজীবদের কাজের গতি আরও বেড়ে যায় এবং মাটিতে নাইট্রোজেন খনিজ রূপ লাভ করে গাছকে পুষ্টি দেয়। জমিতে যদি মাটির জৈব কার্বন এবং নাইট্রোজেনের ভারসাম্য ঠিক থাকে, তবে এই ক্ষুদ্র পোকাগুলোর সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং তা মাটির স্বাস্থ্য ভালো থাকার অন্যতম প্রধান ইঙ্গিত বা ইন্ডিকেটর হিসেবে কাজ করে।
৭. মাটির ভৌত গুণাবলী ও বায়ুমণ্ডলীয় ভারসাম্য
আমরা এতক্ষণ মাটির জৈবিক রাসায়নিক পরিবর্তন এবং অণুজীব ও কেঁচোর অবদান জানলাম। এই সবকিছুর শেষ ও সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়ে মাটির ভৌত গুণাবলী ও জল ধারণ ক্ষমতা এবং এর অভ্যন্তরীণ কাঠামোর ওপর। মাঠে গেলে কৃষকরা প্রায়ই বলেন, “জমি চষলে যদি মাটি ঝুড়ঝুড়ে না হয়, তবে বীজ বুনে ফসল ভালো পাওয়া যায় না।” বিজ্ঞান একেই বলছে মাটির স্ট্রাকচার বা ভৌত গঠন।
মাটির ভৌত পরিবেশ মূলত সংজ্ঞায়িত হয় মাটি কতটা জল ধরে রাখতে পারছে, মাটিতে বাতাস চলাচলেরসুবিধা কেমন এবং বীজ অঙ্কুরোদগমের জন্য তাপমাত্রা কতটা অনুকূল তা দিয়ে। মাটি যখন অতিরিক্ত শক্ত হয়ে যায় বা তার দানাগুলো ভেঙে জমাট বেঁধে যায়, তখন গাছের শিকড় মাটির গভীরে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে পুষ্টি ও রসের অভাব দেখা দেয়। জমিতে ড্রেনেজ বা জল নিকাশি ব্যবস্থা সঠিক রাখা এবং মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখার জন্য অনুকূল আবহ তৈরি করাই হলো মাটির ভৌত পরিবেশ সুরক্ষার মূল উদ্দেশ্য।
৮. মাটির ছিদ্রতা ও জল সঞ্চয় ক্ষমতা
মাটির ভেতরে থাকা সূক্ষ্ম থেকে অতিসূক্ষ্ম ছিদ্র বা পোর স্পেস (Porous Spaces) হলো জল ও বাতাস চলাচলের প্রধান পথ। আমরা জেনেছি যে, মাটিতে জৈব কার্বন (SOC) এবং অণুজীবের বৈচিত্র্য (ছত্রাকের হাইফি ও ব্যাকটেরিয়া) যত বেশি থাকবে, মাটির ছিদ্রতা বা পোরোসিটি তত উন্নত হবে।
সহজ কথায়, মাটিতে অর্গানিক ম্যাটার বা কার্বনের মাত্রা বাড়লে মাটির কণাগুলো একত্রিত হয়ে ছোট ছোট সুস্থ দানা তৈরি করে। এই প্রক্রিয়ায় মাটিতে ছিদ্র তৈরি হয়, যা বৃষ্টির জল বা সেচের রসকে সরাসরি মাটির ভেতরে টেনে নিতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে:
- জল ধরে রাখার ক্ষমতা বৃদ্ধি: জৈব পদার্থে সমৃদ্ধ মাটি স্পঞ্জের মতো কাজ করে, যা খরা বা শুষ্ক মৌসুমেও মাটির গভীরে রস সঞ্চয় করে রাখতে পারে।
- হাইড্রলিক কন্ডাক্টিভিটি: মাটি যদি অতিরিক্ত শক্ত ও জমাটবদ্ধ না হয়ে ছিদ্রযুক্ত হয়, তবে মাটির ভেতরের জল চলাচলের গতি বা প্রবাহ স্বাভাবিক থাকে, যা শিকড়কে সুস্থ রাখে।
- বিনা চাষের সুবিধা : জমিতে গভীর চাষ না দিয়ে যদি জৈব উপায়ে ফসল ফলানো হয়, তবে মাটির ভেতরে কেঁচো ও পোকাদের তৈরি স্বাভাবিক সুড়ঙ্গগুলো অক্ষত থাকে, যা বাতাস ও রস চলাচলের হার বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়।
আরো দেখুন মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় জৈব সারের গুরুত্ব।
৯. মাটিতে জৈব কার্বন ও অণুজীব বৃদ্ধির উপায়
নিচে সহজ ভাষায় মাটিতে জৈব কার্বন ও অণুজীব বৃদ্ধির কয়েকটি কার্যকর উপায় দেওয়া হলো:
- জৈব আচ্ছাদন বা মালচিং করা: খড়, শুকনো পাতা, বা ফসলের অবশিষ্টাংশ দিয়ে মাটির উপরিভাগ ঢেকে রাখুন। এতে মাটির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে, রস বজায় থাকে এবং এগুলো পচে সরাসরি জৈব কার্বন ও অণুজীব তৈরি হয়।
- জীবন্ত সবুজ আচ্ছাদন : প্রধান ফসল না থাকলে জমি খালি না রেখে ধঞ্চে, কলাই বা মটরের মতো কভার ক্রপ রোপণ করুন। সবুজ গাছের শেকড় মাটির নিচে অণুজীবকে সক্রিয় রাখে এবং জৈব কার্বন জমা করে।
- দেশীয় অণুজীব উপকরণ ব্যবহার: নিয়মিত জীবামৃত, ঘনজীবামৃত বা পাঁচপর্ণী নির্যাস ব্যবহার করুন। এতে শত কোটি উপকারী অণুজীব ও মাইকোরাইজা ছত্রাক মাটিতে প্রবেশ করে দ্রুত কার্বন স্পঞ্জ গড়ে তোলে।
- কম চাষ দেওয়া : বারবার গভীর চাষ দেওয়া বন্ধ করুন। বেশি চাষ দিলে মাটির বাতাস বেড়ে অনুজীবের তৈরি বাসস্থান নষ্ট হয় এবং জৈব কার্বন বাতাসে উড়ে যায়।
- রাসায়নিক সার ও বিষমুক্ত রাখা: অতিরিক্ত ইউরিয়া, রাসায়নিক সার এবং তীব্র আগাছানাশক ব্যবহার কমাল বা বন্ধ করুন। এগুলো মাটির উপকারী কেঁচো ও অণুজীবকে মেরে ফেলে।
- ফসলের নাড়া বা অবশিষ্টাংশ না পোড়ানো: জমিতে ধানের নাড়া না পুড়িয়ে তা মাটিতে পচতে দিন বা মিশিয়ে দিন। এটি মাটিতে জৈব কার্বন বাড়াতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে।
১০. প্রাকৃতিক কৃষি ও টেকসই মাটির ভবিষ্যৎ
আমরা শেষ গবেষণার উপাত্ত ও তথ্য বিশ্লেষণে দেখেছি যে, নিবিড় রাসায়নিক কৃষি ও বারবার গভীর জমি চাষের ফলে মাটির এই ভৌত ও জৈবিক বন্ধন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই ওপরের উর্বর মাটি ধুয়ে যায় এবং খরা এলে মাটি নিমেষেই শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়।
এর বিপরীতে প্রাকৃতিক চাষাবাদ পদ্ধতি মাটিতে মাটির জৈব কার্বন বৃদ্ধি করে, মাইকোরাইজা ছত্রাক ও কেঁচোর সংখ্যা বাড়ায় এবং মাটির ছিদ্রতা ফিরিয়ে আনে। মাটিতে যখন জৈব কার্বন, অণুজীব, জল এবং বাতাসের সঠিক সমন্বয় ঘটে, তখনই মাটি তার পূর্ণ উৎপাদনশীলতা ফিরে পায়।
FAQ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর)
প্রশ্ন ১: মাটিতে জৈব কার্বনের মূল কাজ কী?
উত্তর: জৈব কার্বন মাটির অণুজীবের প্রধান খাদ্য হিসেবে কাজ করে, মাটির দানাযুক্ত গঠন বজায় রাখে এবং খরাকালেও সেচের রস ও পুষ্টি ধরে রাখতে সাহায্য করে।
প্রশ্ন ২: মাটির কেঁচো কীভাবে জমির উর্বরতা বাড়ায়?
উত্তর: কেঁচো মাটিতে সুড়ঙ্গ তৈরি করে বাতাস চলাচলের সুবিধা বাড়ায় এবং তাদের মলে (ওরম কাস্ট) সাধারণ মাটির চেয়ে বহু গুণ বেশি নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়াম মুক্ত করে।
প্রশ্ন ৩: জমিতে জৈব কার্বন ও অনুজীব কীভাবে বাড়ানো যায়?
উত্তর: রাসায়নিক সার ও বিষের ব্যবহার কমিয়ে গোবর, জীবামৃত, কভার ক্রপ বা আচ্ছাদনকারী ফসল ব্যবহার করা এবং জমিতে বারবার গভীর চাষ দেওয়া বন্ধ করলে জৈব কার্বন ও অণুজীব দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
তথ্যসূত্র ও গবেষণার উৎস
- ১. ICAR-NBSS&LUP (2017-18): ভারতীয় মাটির জৈব কার্বন (SOC) মজুদ ও বৈচিত্র্যের পরিসংখ্যান।
- ২. Subhash Palekar Natural Farming (SPNF) Study: অন্ধ্রপ্রদেশে রাসায়নিক চাষ বনাম প্রাকৃতিক চাষে কেঁচো ও ওরম কাস্টের ঘনত্বের ওপর করা গবেষণার উপাত্ত।
- ৩. Farming Connect (2019): মাটির গঠন, কেঁচোর ইকোলজিক্যাল কাজ এবং ওরম কাস্টে N-P-K এর মাত্রার বিশ্লেষণ।
- ৪. Soil Matter Journal (2023): মাটির মাইক্রো-আর্থ্রোপোডস (Springtails/Mites) এবং মাটির জৈব পদার্থের পুষ্টি রূপান্তরের আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্র।
কৃষি সূত্র নোট: কৃষিতে লাভ করতে হলে দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা করতে হবে। মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করা আমাদের মানে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য উর্বর সম্পদ রেখে যাওয়া। তাই নিজে মাটির প্রতি সচেতন হন এবং অপরকে সচেতন করতে এই পোস্ট টি নিচে WhatsApp বা ফেসবুক বটম ক্লিক করে share করুন। প্রয়োজন হলে নিজে পড়তে পারবেন ও আপনার দ্বারা অন্য কৃষক বন্ধুরা বাঁচবে। মাটি বাঁচলে কৃষক বাচবে আর কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ।










