
টমেটো চাষে ভালো ফলন পেতে হলে ফসলের সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় বিভিন্ন রোগ ও ক্ষতিকারক পোকার আক্রমণে পুরো ফসল নষ্ট হয়ে যায়। তাই সঠিক সময়ে টমেটো গাছের রোগ ও প্রতিকার (tometo gacher rog o protikar) সম্পর্কে জানা এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (IPM) গ্রহণ করা প্রয়োজন। আজ আমরা টমেটোর প্রধান ক্ষতিকারক পোকা এবং ভাইরাসজনিত রোগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
আড়ও পড়ুন টমেটো চাষের আধুনিক পদ্ধতি ও উন্নত জাত
১. টমেটো গাছের পোকা দমন ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা
টমেটো গাছে নানা ধরনের পোকার আক্রমণ ঘটে থাকে। সঠিক জৈবিক ও রাসায়নিক উপায়ে টমেটো গাছের পোকা দমন করার পদ্ধতি নিচে আলোচনা করা হলো:
ক. নিম খোল ও জৈব সুরক্ষা:
জমি তৈরির সময় বা রোপণের ৩০-৪০ দিন পর একর প্রতি ১০০ কেজি নিম খোল (৮-১০% তেলযুক্ত) ক্ষেতের ৮-১০টি স্থানে ঢিবি করে রাখুন। এতে পোকার আক্রমণ অনেক কমে যায়।
খ. টমেটো ছিদ্রকারী পোকা দমন :
- লক্ষণ: টমেটো ছিদ্রকারী পোকা কচি ফল ফুটো করে ভেতরে ঢুকে শাঁস খায়।
- জৈব প্রতিকার: রোপণের ২৮, ৩৫ ও ৪২ দিন পর ১০০ লিটার জলে ২.৫ থেকে ৩ লিটার অগ্নিঅস্ত্র ভালো করে ছেঁকে নিয়ে মিশিয়ে ১ একর জমিতে স্প্রে করতে হয়। (প্রতি ১৫ লিটার স্প্রে ট্যাংকে প্রায় ৪০০-৪৫০ মি.লি.)।
- রাসায়নিক পদ্ধতি: আক্রমণ বেশি হলে ইন্দোক্সাকার্ব ১৪.৫% এস.সি. (১ মি.লি./লিটার) অথবা থায়োডিকার্ব ৭৫% ডব্লিউ.পি. (১.০ গ্রাম/লিটার) অথবা এমামেকটিন বেনজোয়েট ৫% এস.জি. (০.৪ গ্রাম/লিটার) স্প্রে করতে হবে।
গ. তামাক পাতা খাদক শুঁয়োপোকা :
- গাছের পাতা ও শুঁয়োপোকার ডিমের গুচ্ছ হাত দিয়ে সংগ্রহ করে নষ্ট করুন।
- চালের কুঁড়ো, গুড় ও ডায়মিথোয়েট (১০:১:০.১ অনুপাতে) মিশিয়ে বিষটোপ তৈরি করে পোকা দমন করুন।
ঘ. টমেটো পাতা ম্যাপ বা সুরঙ্গী পোকা (Leaf Miner):
- লক্ষণ: পাতায় সাদা আঁকাবাঁকা দাগ পড়ে, যাকে সাধারণ ভাষায় টমেটো পাতা ম্যাপ বা সুরঙ্গী বলা হয়।
- প্রতিকার: আক্রান্ত পাতা হাত দিয়ে তুলে নষ্ট করুন। এই পোকার বিরুদ্ধে কোনো কড়া রাসায়নিক ব্যবহার করবেন না। প্রয়োজনে নিম বীজের শাঁসের নির্যাস (৫০ গ্রাম/লিটার) অথবা ট্রাইজোফস ৪০% ই.সি. (১.৫ মি.লি./লিটার) স্প্রে করুন।
ঙ. টমেটো মথ (Tuta absoluta):
খেতের মধ্যে ফেরোমোন ফাঁদ বসান এবং নিমজাত কীটনাশক ‘অ্যাজাডিরাকটিন ৫% ই.সি.’ (২.০ মি.লি./লিটার) জলে গুলে প্রয়োগ করুন।
চ. সাদা মাছি ও থ্রিপস দমন:
- চারা শোধন: রোপণের ১ দিন আগে ইমিডাক্লোপ্রিড ১৭.৮% এস.এল. (০.৫ মি.লি./লিটার) দিয়ে প্রো-ট্রে ভিজিয়ে নিন অথবা চারার শিকড় ৫ মিনিট ডুবিয়ে রাখুন।
- জৈব সমাধান: চারা রোপনের ১০ দিন পর থেকে ১০ দিন পর পর নিয়মিত জৈব কীটনাশক অগ্নিঅস্ত্র প্রয়োগ করুন।
- স্প্রে: মূল জমিতে ডাইনোটেফিউরন ২০% এস.জি. (০.৪ গ্রাম/লিটার) অথবা স্পাইরোমেসিফেন ২২.৯% এস.সি. (০.৫ মি.লি./লিটার) অথবা ফিপ্রোনিল ৫% এস.সি. (১.০ মি.লি./লিটার) এক সপ্তাহের ব্যবধানে অদল-বদল করে স্প্রে করুন।
ছ. লাল মাকড়সা :
পাতার উল্টো পিঠে স্পাইরোমেসিফেন ২২.৯% এস.সি. (০.৫ মি.লি./লিটার) অথবা দ্রবণীয় সালফার ৮০% ডব্লিউ.পি. (৩.০ গ্রাম/লিটার) অথবা ডাইকোফোল ১৮.৫% ই.সি. (২.৫ মি.লি./লিটার) স্প্রে করুন।
২. টমেটো গাছের পাতা কোকরানো রোগের প্রতিকার ও ভাইরাস ব্যবস্থাপনা
টমেটো চাষে সবচেয়ে মারাত্মক সমস্যা হলো ভাইরাসজনিত রোগ, যার কারণে পাতা কুঁকড়ে যায় এবং উৎপাদন থমকে দাঁড়ায়।
ক. টমেটো পাতা ককড়ানো রোগ ও পাতা মোড়ানো (TLCV):
- লক্ষণ: টমেটো পাতা ককড়ানো রোগ (tomato gacher pata kokrano rog) বা টমেটো পাতা মোড়ানো রোগে গাছের পাতা ছোট, শক্ত ও কোঁকড়ানো হয়ে যায় এবং গাছের বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়। এটি মূলত সাদা মাছির মাধ্যমে ছড়ায়।
খ. টমেটো গাছের পাতা কোকরানো রোগের প্রতিকার:
- রোগপ্রতিরোধী সংকর জাতের বীজ ব্যবহার করুন।
- আক্রান্ত গাছ দেখা মাত্রই উপড়ে তুলে মাটিতে পুঁতে বা পুড়িয়ে ফেলুন।
- সাদা মাছি ও থ্রিপস দমনে ১০ দিন অন্তর নিম তেল (১০ গ্রাম/লিটার) অথবা ফিপ্রোনিল ৫% এস.সি. (১.০ মি.লি./লিটার) অথবা ডায়মিথোয়েট ৩০% ই.সি. (২.০ মি.লি./লিটার) স্প্রে করুন।
- জৈব সমাধান হিসাবে জৈব উপায়ে ভাইরাস দমনে দই সাচ ব্যাবহার বিধি দেখুন।
৩. টমেটো গাছের রোগ বালাই ও ছত্রাকজনিত রোগ দমন
টমেটো গাছের রোগ বালাই-এর মধ্যে ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ অন্যতম। নিচে এগুলোর বিস্তারিত প্রতিকার দেওয়া হলো:
ক. টমেটো গাছের ঢলে পড়া রোগ ও টমেটো ব্যাক্টেরিয়াল উইল্ট:
- লক্ষণ: গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় টমেটো গাছের ঢলে পড়া রোগ বা টমেটো ব্যাক্টেরিয়াল উইল্ট দেখা দিলে হঠাৎ করে সুস্থ গাছ মাথা নিচু করে শুকিয়ে মারা যায়।
- প্রতিকার: রোগপ্রতিরোধী বা সংকর জাত চাষ করতে হবে এবং শস্য পর্যায় মেনে চলতে হবে। চারার শিকড় রোপণের পূর্বে সিউডোমোনাস ফ্লুরোসেন্স (১০ গ্রাম/লিটার) দ্রবণে ডুবিয়ে নিতে হবে।
খ. টমেটো গাছের গোড়া পচা রোগ ও চারার অবমন্দন :
- প্রতিকার: ক্যাপটাফ ৫০% ডব্লিউ.পি. (২.০ গ্রাম/লিটার) অথবা কপার অক্সিক্লোরাইড ৫০% ডব্লিউ.পি. (৩.০ গ্রাম/লিটার) অথবা মেটালেক্সিল এম ৪% + ম্যানকোজেব ৬৪% ডব্লিউ.পি. (৩ গ্রাম/লিটার) জলে গুলে মাটির গোড়ায় প্রয়োগ করতে হবে।
গ. টমেটো পাতা ঝলসানো ও টমেটো পাতা পচা রোগ:
- আগাম ধসা (Early Blight): বীজ বপনের ১২ দিন পর এবং চারা রোপণের ১-২ দিন আগে প্রো-ট্রে কপার অক্সিক্লোরাইড ৫০% ডব্লিউ.পি. (৩.০ গ্রাম/লিটার) দিয়ে ভেজান। এছাড়া কপার অক্সিক্লোরাইড (৩.০ গ্রাম/লিটার) অথবা ক্লোরোথ্যালোনিল ৭৫% ডব্লিউ.পি. (২.০ গ্রাম/লিটার) অথবা প্রোপিনেব (২.০ গ্রাম/লিটার) ১০-১৫ দিন অন্তর স্প্রে করুন।
- জৈব সমাধান: ৭ দিন পর পর ১০ লিটার জলে ১ কেজি কাচা গোবর সকালে ভিজিয়ে রোদে রেখে বিকেলে ছেকে স্প্রে করলে ভাল ফল পাওয়া যায়।
- সেপ্টোরিয়া পাতা পোড়া: আগাম ধসা রোগের জন্য ব্যবহৃত ছত্রাকনাশক এখানেও কার্যকর।
ঘ. টমেটো নাবি ধবসা রোগ (Late Blight):
- লক্ষণ: টমেটো নাবি ধবসা রোগ বা দেরিতে আসা ধসা রোগে পাতা ও ফলে ভেজা ভেজা বাদামী দাগ দেখা দেয় এবং দ্রুত পুরো গাছ পচে যায়।
- জৈব সমাধান: ৭ দিন পর পর ১০ লিটার জলে ১ কেজি কাচা গোবর সকালে ভিজিয়ে রোদে রেখে বিকেলে ছেকে স্প্রে করলে ভাল ফল পাওয়া যায়।
- প্রতিকার: ম্যানকোজেব ৭৫% ডব্লিউ.জি. (২.০ গ্রাম/লিটার) অথবা কপার অক্সিক্লোরাইড ৫০% ডব্লিউ.পি. (৩.০ গ্রাম/লিটার) অথবা বোর্ডো মিশ্রণ (১%) অথবা ডাইমেথোমর্ফ ৫০% ডব্লিউ.পি. (১.০ গ্রাম/লিটার) + মেটিরাম (২.০ গ্রাম/লিটার) স্প্রে করতে হবে।
ঙ. বাক আই রট ও পাউডারি মিলডিউ:
রোগ দেখা মাত্রই হেক্সাকোনাজোল ৫% ই.সি. (১.০ মি.লি./লিটার) অথবা কার্বেন্ডাজিম ৫০% ডব্লিউ.পি. (১.০ গ্রাম/লিটার) বা দ্রবণীয় সালফার (৩.০ গ্রাম/লিটার) স্প্রে করুন।
চ. ফিউজেরিয়াম ঢলে পড়া:
গাছের গোড়ায় ট্রাইকোডার্মা হারজিয়ানাম (১০ গ্রাম/লিটার) এবং এক সপ্তাহ পর সিউডোমোনাস ফ্লুরোসেন্স (১০ গ্রাম/লিটার) প্রয়োগ করুন।
৫. টমেটো পচা রোগ ও ফল সুরক্ষা
ক. টমেটো পচা রোগ ও ফল ফাটা সমস্যা:
- লক্ষণ: ফল মাটিতে লাগলে বা অতিরিক্ত আর্দ্রতায় টমেটো পচা রোগ হতে পারে। এছাড়া ক্যালসিয়ামের অভাবে ফলের নিচের দিক পচে যায় ।
- প্রতিকার: ফল পচনের লক্ষণ দেখা দিলেই ক্যালসিয়াম নাইট্রেট (৫ গ্রাম/লিটার) গাছে স্প্রে করুন এবং এক সপ্তাহ পর পুনরায় প্রয়োগ করুন।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর (FAQ)
প্রশ্ন ১: টমেটো গাছের রোগ সৃষ্টিকারী ভাইরাস কোনটি?
উত্তর: টমেটো গাছে একাধিক ভাইরাসের আক্রমণ হতে পারে, তবে তার মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক হলো টমেটো লিফ কার্ল ভাইরাস (Tomato Leaf Curl Virus – TLCV)। এছাড়া টমেটো মোজাইক ভাইরাস (ToMV) এবং spotted উইল্ট ভাইরাসও (TSWV) টমেটো গাছে নানা রোগ সৃষ্টি করে। এই ভাইরাসগুলো প্রধানত সাদা মাছি ও থ্রিপস পোকার মাধ্যমে এক গাছ থেকে অন্য গাছে ছড়ায়।
প্রশ্ন ২: টমেটো গাছের পাতা কোঁকড়ানো রোগের ওষুধ কী?
উত্তর: পাতা কোঁকড়ানো মূলত ভাইরাসজনিত রোগ, তাই এর সরাসরি কোনো প্রতিষেধক ওষুধ নেই। তবে রোগটি যে পোকা (সাদা মাছি) ছড়ায় তা দমনে রোপণের ১০ দিন পর থেকে ফিপ্রোনিল ৫% এস.সি. (১.০ মি.লি./লিটার জলে) অথবা ডায়মিথোয়েট ৩০% ই.সি. (২.০ মি.লি./লিটার জলে) ১০-১২ দিন অন্তর স্প্রে করতে হবে। এছাড়া লক্ষণ দেখা দেওয়া মাত্রই আক্রান্ত গাছ উপড়ে পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
প্রশ্ন ৩: টমেটো গাছের পাতায় কালো দাগ হওয়ার কারণ ও প্রতিকার কী?
উত্তর: টমেটো পাতায় কালো বা গাঢ় বাদামী দাগ হওয়া সাধারণত আগাম ধসা (Early Blight) বা সেপ্টোরিয়া পাতা পোড়া ছত্রাকজনিত রোগের লক্ষণ। এটি দমনে কপার অক্সিক্লোরাইড ৫০% ডব্লিউ.পি. (৩.০ গ্রাম/লিটার জলে) অথবা ম্যানকোজেব ৭৫% ডব্লিউ.জি. (২.০ গ্রাম/লিটার জলে) মিশিয়ে ১০-১৫ দিন অন্তর স্প্রে করতে হবে।
প্রশ্ন ৪: টমেটো গাছের পাতা পুড়ে যাওয়ার রোগ কেন হয় এবং এর সমাধান কী?
উত্তর: টমেটো গাছের পাতা পুড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হলো নাবি ধসা বা লেট ব্লাইট রোগ এবং কড়া রোদে জলীয় বাষ্পের ভারসাম্যহীনতা। নাবি ধসা রোগ হলে পাতা ভেজা ভেজা হয়ে পোড়া বা ঝলসানো দেখায়। এটি নিয়ন্ত্রণে ম্যানকোজেব + মেটিরাম বা ডাইমেথোমর্ফ ৫০% ডব্লিউ.পি. (১.০ গ্রাম/লিটার জলে) দ্রুত স্প্রে করা উচিত।
প্রশ্ন ৫: টমেটো গাছের পাতা হলুদ হওয়ার কারণ কী?
উত্তর: টমেটো গাছের পাতা হলুদ হওয়ার পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে—
১. মাটিতে নাইট্রোজেন সারের অভাব।
২. গোড়ায় অতিরিক্ত জল জমে থাকা বা সেচের অনিয়ম।
৩. গাছের পুরোনো পাতায় স্বাভাবিকভাবে পুষ্টির অভাব হওয়া কিংবা ছত্রাকজনিত গোড়া পচা রোগের শুরু হওয়া।
প্রশ্ন ৬: টমেটো ফেটে যাওয়ার কারণ কি?
উত্তর: টমেটো ফল ফেটে যাওয়ার প্রধান কারণ হলো মাটিতে রসের অসমতা বা অনিয়মিত সেচ (দীর্ঘদিন খরা বা শুকানোর পর হঠাৎ অতিরিক্ত সেচ দিলে বা বৃষ্টি হলে) এবং ক্যালসিয়াম ও বোরন অনুখাদ্যের ঘাটতি। এটি রোধ করতে জমিতে সুষম আর্দ্রতা বজায় রাখতে হবে এবং গাছে ফলের আকার আসার পর বোরন (২ গ্রাম/লিটার জলে) ও ক্যালসিয়াম স্প্রে করতে হবে।
তথ্য সূত্র
- ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ হর্টিকালচার রিসার্চ ব্যাঙ্গালোর (ICAR-IIHR)
- ভারতীয় প্রাকৃতিক কৃষি মিশন (NMNF)










