১২ মাসে সবজি চাষ করার পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা: কৃষকের লাভজনক ক্যালেন্ডার

১২ মাসে সবজি চাষ করার পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা

আমাদের দেশ কৃষিপ্রধান। জলবায়ু ও ঋতুর পরিবর্তনের সাথে সাথে মাটির গুণাগুণ পরিবর্তিত হয়। তাই ১২ মাসে সবজি চাষ সফল করতে হলে কোন মাসে কোন ফসলটি ভালো হয়, তা জানা অত্যন্ত জরুরি। সঠিক সময়ে সঠিক ফসল নির্বাচন করলে যেমন রোগবালাই কম হয়, তেমনি ফলনও পাওয়া যায় আশাতীত। আপনি যদি বাণিজ্যিক চাষি হন কিংবা বাড়ির আঙিনায় বা ছাদে বাগান করতে চান, তবে আমাদের এই ১২ মাসে সবজি চাষ নির্দেশিকাটি আপনার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ সমাধান।

প্রকৃতির পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে মাঠে, বাগানে কিংবা ছাদ বাগানে চাষের জন্য নিম্নলিখিত শাক-সবজি, ফলমূল ও মসলাগুলো নির্বাচন করলে এবং সঠিক যত্ন নিলে ভালো ফল পাওয়া যায়। নিচে মাস ভিত্তিক বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

সূচিপত্র

১. বৈশাখ মাসে (এপ্রিল/মে) ১২ মাসে সবজি চাষ

বৈশাখ মাসে গরমের তীব্রতা থাকে বেশি। এই সময়ে মাটি শুকিয়ে যায় দ্রুত, তাই ১২ মাসে সবজি চাষ করার ক্ষেত্রে সেচ ব্যবস্থার দিকে বিশেষ নজর দিতে হয়।

  • শাক: লাল ডাঁটা, মুলো শাক, কাটোয়া ডাঁটা, চাঁপানটে, সাদা পুঁই, পালং, ডাঙ্গা কলমী ও পুদিনা।
  • সবজি: উচ্ছে, করলা, লাউ, শসা, ঝিঙে, বেগুন, কুমড়ো, খামালু, চাল কুমড়ো, ধুন্দুল, লঙ্কা, কুন্দ্রী, শিমূল আলু, পঞ্চমুখী কচু, গুড়ি কচু, গুঁয়ারশুটি ও কাঁচা কলা।
  • ফলমূল: পেঁপে, শসা, শাঁকালু, তরমুজ, কাঁকুড় ও পাকা কলা।
  • মসলা: আদা ও হলুদ।

এই সময়ে গ্রীষ্মকালীন সবজিগুলো দ্রুত বৃদ্ধি পায়। নিয়মিত নিড়ানি দেওয়া এবং জৈব সার ব্যবহার করলে এই মাসের ফসলগুলো থেকে ভালো ফলন নিশ্চিত করা যায়।

২. জ্যৈষ্ঠ মাসে (মে/জুলাই) ১২ মাসে সবজি চাষ

জ্যৈষ্ঠ মাসে ভ্যাপসা গরম আর মাঝে মাঝে কালবৈশাখীর ঝড়ো হাওয়া থাকে। এই প্রতিকূল আবহাওয়ায় ১২ মাসে সবজি চাষ চালিয়ে যেতে হলে গাছের গোড়ায় যাতে পানি না জমে সেদিকে খেয়াল রাখতে হয়।

  • শাক: কাটোয়া ডাঁটা, চাঁপানটে, পুঁই, লাল নটে, সুরেশ্বর ডাঁটা, ডাঙ্গা কলমী ও দোপাটি পালং।
  • সবজি: বেগুন, বর্ষাতি কুমড়ো, ধুন্দুল, মূলো, মাচার ঝিঙে, সিম, কাঁকরোল, চিচিঙ্গে, ওল, গুঁড়ি কচু, কুন্দ্রী, শিমূল আলু, পঞ্চমুখী কচু, মানকচু ও গুঁয়ারশুটি।
  • ফলমূল: পেঁপে, খরমুজ, কাঁকুড়, মাচার শসা, শসা, পাকা কলা ও কাঁচা কলা।
  • মসলা: আদা, হলুদ ও সূর্যমুখী লঙ্কা।

৩. আষাঢ় মাসে (জুলাই/আগস্ট) ১২ মাসে সবজি চাষ

বর্ষার আগমনে প্রকৃতি সজীব হয়ে ওঠে। এই সময়ে ১২ মাসে সবজি চাষ এর জন্য বৃষ্টির পানি আশীর্বাদ হয়ে আসে, তবে অতিরিক্ত বৃষ্টিতে চারার ক্ষতি হতে পারে।

  • শাক: লালশাক, পুঁই শাক, চাঁপানটে, ডাঙ্গা কলমী শাক ও দোপাটি পালং ইত্যাদি।
  • সবজি: করলা, উচ্ছে, লাউ, বরবটি, মিষ্টি কুমড়ো, চাল কুমড়ো, চিচিঙ্গে, বেগুন, বর্ষাতি সাদা মুলো, ঝিঙে, দেশী সিম, ওল, কাঁকরোল, ঢেঁড়স, গুড়ি কচু ও মানকচু।
  • ফলমূল: মাচার শসা, শাঁকালু ও পেঁপে।
  • মসলা: আদা।

৪. শ্রাবণ মাসে (আগস্ট/সেপ্টেম্বর) ১২ মাসে সবজি চাষ

শ্রাবণ মাসে বৃষ্টির বেগ বৃদ্ধি পায়। নিচু জমিতে পানি জমে যাওয়ার ভয় থাকে। তাই উঁচু জায়গায় বা ড্রেনেজ সিস্টেম ঠিক রেখে ১২ মাসে সবজি চাষ করতে হবে।

  • শাক: লালশাক, কাটোয়া ডাঁটা, চাঁপানটে ও হিঞ্চে।
  • সবজি: সয়াবিন, সিম, মুলো, টমেটো, বরবটি, ঢেঁড়স, লাউ, লঙ্কা ও মানকচু।
  • মসলা: রাঁধুনি।

৫. ভাদ্র মাসে (সেপ্টেম্বর/অক্টোবর) ১২ মাসে সবজি চাষ

ভাদ্র মাসের গরমে অনেক ফসল নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে এই মাস থেকেই শীতের আগাম সবজি চাষের প্রস্তুতি শুরু হয়। লাভজনক ১২ মাসে সবজি চাষ করতে হলে এই সময়ে চারা তৈরির কাজ শেষ করতে হয়।

  • শাক: সাদা পুঁই, চাঁপানটে, চীনারাই, কাটোয়া ডাঁটা, পালং ও সরষে শাক।
  • সবজি: বরবটি, বিট, বিবি কুমড়ো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, শালগম, মুলো, লেটুস, টমেটো, লাউ, পটল, ঢেঁড়স, ওলকপি, লঙ্কা ও সবজি অড়হড়।
  • ফলমূল: কার্তিক শসা ও পেঁপে।
  • মসলা: ধনে ও লঙ্কা।

আড়ও দেখুন মাশরুম দিয়ে খাদ্য পণ্য তৈরির পদ্ধতি: ডাল বড়ি, পাঁপড় ও বিস্কুট তৈরির বিস্তারিত গাইড

৬. আশ্বিন মাসে (অক্টোবর/নভেম্বর) ১২ মাসে সবজি চাষ

আশ্বিন মাসে ঋতু পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। সকালবেলা কুয়াশা দেখা দিতে শুরু করে। এই সময়ে ১২ মাসে সবজি চাষ এর জন্য রবি শস্যের বীজ বপন করা হয়।

  • শাক: চীনারাই, ঝাড় পালং, মেথি, পিড়িং ইত্যাদি নানান স্থানীয় শাক।
  • সবজি: গাজর, মুলো, আলু, পেঁয়াজ, বাঁধাকপি ও ফুলকপি, ওলকপি, টমেটো, বিট, শালগম, লাউ ও মটরশুঁটি।
  • ফলমূল: শীতের শসা।
  • মসলা: মৌরী, জিরে, ধনে, মেথি, যোয়ান ও রসুন।

৭. কার্তিক মাসে (নভেম্বর/ডিসেম্বর) ১২ মাসে সবজি চাষ

কার্তিক মাসে শীতের আমেজ পুরোদমে শুরু হয়। ১২ মাসে সবজি চাষ এর ক্যালেন্ডারে এটি সবথেকে ব্যস্ততম সময়, কারণ এই সময়ে শীতকালীন সবজির ফলন আসা শুরু করে।

  • শাক: চীনারাই, পালং, মেথি, পিড়িং, সরষে ও বেথো ইত্যাদি।
  • সবজি: ওলকপি, বিট, কুমড়ো, শালগম, গাজর, টমেটো, বোম্বাই মুলো, নাবীজাত ফুলকপি ও বাঁধাকপি, আলু, সয়াবিন, ফ্রেঞ্চ বীন, পটল, কনক নটে, মাটির করলা ও পেঁয়াজ।
  • ফলমূল: শীতের শসা।
  • মসলা: মৌরী, জিরে, ধনে, মেথি ও রসুন।

৮. অগ্রহায়ণ মাসে (নভেম্বর/ডিসেম্বর) ১২ মাসে সবজি চাষ

অগ্রহায়ণ মাসে মাঠের আবহাওয়া থাকে নাতিশীতোষ্ণ। এই সময়ে ১২ মাসে সবজি চাষ করলে গাছে রোগবালাই কম হয় এবং ফলনও ভালো পাওয়া যায়।

  • শাক: পালং, নটে, লেটুস, রাই, মেথি ও সরষে শাক।
  • সবজি: পেঁয়াজ, করলা, উচ্ছে, লাউ, আলু, বিট, মটর, ফ্রেঞ্চবীন, ১২ পাতা ঝিঙে, সয়াবিন, পটল ও গাজর।
  • ফলমূল: শসা ও কাঁকুড়।
  • মসলা: ধনে, মেথি, রসুন, মৌরী ও যোয়ান।

৯. পৌষ মাসে (ডিসেম্বর/জানুয়ারি) ১২ মাসে সবজি চাষ

পৌষের শীতে সবজি বাগান সতেজ থাকে। এই সময়ে কুয়াশা থেকে ফসল বাঁচাতে সঠিক পরিচর্যা জরুরি। ১২ মাসে সবজি চাষ এর আওতায় থাকা ফসলগুলো এই মাসে বাজারে ভালো দামে বিক্রি করা যায়।

  • শাক: পুঁই, মটর, পালং, রাই সরষে, মেথি, লেটুস, বেথুয়া, পিড়িংশাক ও সরষে শাক।
  • সবজি: লাউ, বেগুন, করলা, মটর, ১২ পাতা ঝিঙে, ঢেঁড়স, গাজর, গোলমুলো ও ধুন্দুল।
  • ফলমূল: তরমুজ, খরমুজ, ফুটি, কাঁকুড় ও ১২ পাতা শসা।
  • মসলা: ধনে ও মেথি।

১০. মাঘ মাসে (জানুয়ারি/ফেব্রুয়ারি) ১২ মাসে সবজি চাষ

মাঘের শেষ দিকে শীত বিদায় নিতে শুরু করে। এই সময়ে যারা ১২ মাসে সবজি চাষ করেন, তারা আবার গ্রীষ্মকালীন ফসলের প্রস্তুতি নেন।

  • শাক: পুঁই, লাল ডাঁটা, মেথি, চাঁপা নটে, পালং ও ধনে।
  • সবজি: লাউ, কুমড়ো, উচ্ছে, করলা, বেগুন, শসা, ঢেঁড়স, ঝিঙে, মিষ্টি আলু, ধুন্দুল, লঙ্কা, বরবটি ও ঝুপি বীন।
  • ফলমূল: শসা, ফুটি ও কাঁকুড়।
  • মসলা: ধনে।

১১. ফাল্গুন মাসে (ফেব্রুয়ারি/মার্চ) ১২ মাসে সবজি চাষ

ফাল্গুন মাসে বসন্তের আগমনে তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। এই সময়ে নতুন চারা রোপণের জন্য ১২ মাসে সবজি চাষ নির্দেশিকা অনুসরণ করা প্রয়োজন।

  • শাক: চাঁপা নটে, পদ্ম নটে, কাটোয়া ডাঁটা, পালং, মেথি, ডাঙ্গা কলমী ও দোপাটি পালং।
  • সবজি: ঝিঙে, কুমড়ো, লাউ, উচ্ছে, করলা, বেগুন, ঢেঁড়স, লঙ্কা, বরবটি, ধুন্দুল, চাল কুমড়ো, চিচিঙ্গে, ওল ও কুন্দ্রী।
  • ফলমূল: তরমুজ, কাঁকুড়, ফুটি, খরমুজ ও শসা।
  • মসলা: আদা ও হলুদ।

১২. চৈত্র মাসে (মার্চ/এপ্রিল) ১২ মাসে সবজি চাষ

বাংলা বছরের শেষ মাসে প্রখর রোদ থাকে। এই সময়ে খরা সহ্য করতে পারে এমন সবজি দিয়ে ১২ মাসে সবজি চাষ এর বছর শেষ হয়।

  • শাক: চাঁপা নটে, কাটোয়া ডাঁটা, পুঁই, লাল ডাঁটা, পদ্ম নটে, ডাঙ্গা কলমী ও দোপাটি পালং।
  • সবজি: বেগুন, ঢেঁড়স, লঙ্কা, বরবটি, ধুন্দুল, চাল কুমড়ো, লাউ, চিচিঙ্গে, করলা, উচ্ছে, ওল, মেটে আলু, খামালু, সূর্যমুখী লঙ্কা, কুন্দ্রী, শিমূল আলু ও কাঁচা কলা।
  • ফলমূল: শসা, তরমুজ, খরমুজ ও পাকা কলা।
  • মসলা: আদা ও হলুদ।

কৃষি সুত্র পরামর্শ: চাষ কার্য পরিচালনা করার সময় বা শুরু করার আগে আপনার নিকটবর্তী কৃষি বা উদ্যানপালন বিভাগে যোগাযোগ করে এলাকা অনুসারে সঠিক কৃষি পরামর্শ নিন ।

আপনার খাদ্য তালিকায় অবশ্যই রাখতে দেখুন মাশরুম চাষ পদ্ধতি ও লাভ: জাত, রোগ দমন এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পূর্ণাঙ্গ গাইড ২০২৬

১৩. সফল চাষাবাদের জন্য কিছু প্রয়োজনীয় কৃষি সুত্র টিপস

আপনি যদি সফলভাবে ১২ মাসে সবজি চাষ করতে চান, তবে শুধু মাস জানলেই হবে না, চাষের পদ্ধতির দিকেও নজর দিতে হবে।

  • মাটি তৈরি: চাষের আগে মাটি পরীক্ষা করিয়ে ফসল অনুসারে খাদ্যের চাহিদা পূরণের জন্যে মাটিতে পর্যাপ্ত জৈব সার ও গোবর সার মিশিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে নিন।
  • বীজ নির্বাচন: ভালো ফলনের জন্য সবসময় রোগমুক্ত এবং উন্নত মানের বীজ ব্যবহার করুন।
  • সেচ ও নিষ্কাশন: গ্রীষ্মে পর্যাপ্ত জল দেওয়া এবং বর্ষায় অতিরিক্ত জল বের করার ব্যবস্থা রাখা ১২ মাসে সবজি চাষ এর প্রধান শর্ত।
  • রোগবালাই দমন: রাসায়নিক কীটনাশকের বদলে নিম তেল বা জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করার চেষ্টা করুন।

১৪. উপসংহার

পরিশেষে আমার বলতে পারি যে, ১২ মাসে সবজি চাষ একটি শিল্প। ঋতু ও আবহাওয়ার পরিবর্তনকে কাজে লাগিয়ে যদি সঠিক সবজিটি নির্বাচন করা যায়, তবে প্রতিটি পরিবারই বিষমুক্ত এবং টাটকা ফসল পেতে পারে। কৃষিকাজ এখন আর শুধু মাঠে সীমাবদ্ধ নেই, এটি আমাদের জীবনযাত্রার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওপরের তালিকাটি অনুসরণ করে পরিকল্পিতভাবে চাষাবাদ শুরু করলে ফলন যেমন ভালো হবে, তেমনি আপনার বাগানও সারা বছর সবজিতে পূর্ণ থাকবে।

১৫. সচরাচর জিজ্ঞাস্য প্রশ্ন(FAQ)

প্রশ্ন: কোনো মাসে কি সব সবজি চাষ করা সম্ভব?

উত্তর: না, প্রতিটি ফসলের নির্দিষ্ট আবহাওয়া প্রয়োজন। তবে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে (গ্রিন হাউস) অনেক ফসলই সারা বছর চাষ করা যায়।

প্রশ্ন: বারোমাসি ঝিঙে বা শসা চাষের সুবিধা কী?

উত্তর: এগুলো যেকোনো মাসেই ফলন দিতে সক্ষম, তবে সঠিক যত্ন ও সার প্রয়োগ জরুরি।

প্রশ্ন: ১২ মাসে সবজি চাষ করতে কোন সার সেরা?

উত্তর: ভার্মিকম্পোস্ট এবং পচা গোবর সার দীর্ঘমেয়াদী চাষের জন্য সবথেকে ভালো।

তথ্য সুত্র

  • বিধান চন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদিয়ালয় (BCKV) ভারত সরকার ।
  • জাতীয় উদ্যান পালন বিভাগ (NHB) ভারত সরকার ।
Spread the love

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top