বাংলা কৃষি সেচ যোজনা (BKSY): কৃষি সেচ প্রকল্পে আবেদনের নিয়ম

বাংলা কৃষি সেচ যোজনা (BKSY) প্রকল্পে ড্রিপ ও স্প্রিঙ্কলার পদ্ধতিতে ফসলের জমিতে জল দেওয়া হচ্ছে।
বাংলা কৃষি সেচ যোজনা (BKSY) প্রকল্পে ড্রিপ ও স্প্রিঙ্কলার পদ্ধতিতে ফসলের জমিতে জল দেওয়া হচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং কৃষকদের জন্য লাভজনক প্রকল্প হলো বাংলা কৃষি সেচ যোজনা (BKSY)। এই যোজনার মূল লক্ষ্য হলো আধুনিক ড্রিপ ও স্প্রিঙ্কলার পদ্ধতির মাধ্যমে ফসলের জমিতে কম জলে বেশি চাষ করা এবং জলের অপচয় রোধ করা। ১০০% সরকারি ভর্তুকিতে বাংলা কৃষি সেচ প্রকল্পে কিভাবে কোথায় আবেদন করবেন ও কি কি নথিপত্র লাগে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হল।

১. এক নজরে: বাংলা কৃষি সেচ যোজনা (BKSY) ২০২৬

বিষয়অতি সংক্ষেপে তথ্য
BKSY ফুল ফর্মBangla Krishi Sech Yojana (বাংলা কৃষি সেচ যোজনা)
মূল উদ্দেশ্যড্রিপ ও স্প্রিঙ্কলার সেচের মাধ্যমে জমিতে কম জলে বেশি চাষ করা।
প্রবর্তকপশ্চিমবঙ্গ সরকার (রাজ্য সরকারি প্রকল্প)।
সরকারি ভরতুকিক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য আধুনিক সেচ প্রযুক্তিতে ১০০% ভরতুকি।
আবেদনের মাধ্যমসম্পূর্ণ অফলাইন (নিজের ব্লকের কৃষি আধিকারিক বা ADA অফিসে)।
আবেদনের সময়রবি মরশুম (শীতকালীন চাষ) এবং বোরো চাষের আগে সবচেয়ে উপযুক্ত।
প্রধান লাভপ্রথাগত সেচের চেয়ে প্রায় ৪০%-৫০% জল সাশ্রয় ও ফলন বৃদ্ধি।
সাবসিডিক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ১০০ শতাংশ সাবসিডি দেয়। কৃষক শুধু GST ট্যাক্স ১২% দিতে হয়।
প্রয়োজনীয় কাগজভোটার কার্ড, জমির পর্চা/খতিয়ান এবং ব্যাংক পাসবই।

আড়ও জানতে লিংকে ক্লিক করুনকৃষক বন্ধু প্রকল্পে আবেদন ও স্ট্যাটাস চেক পদ্ধতি।

২. কৃষি সেচ প্রকল্পে আবেদনের যোগ্যতা

কৃষি সেচ প্রকল্পে আবেদনের জন্য নিচের শর্তাবলী গুলি দেখা থাক আবশ্যক:

১. কৃষকের ধরন

  • ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক: রাজ্যের সমস্ত ক্ষুদ্র এবং প্রান্তিক কৃষকরা এই প্রকল্পের প্রধান দাবিদার এবং অগ্রাধিকার পাবেন।
  • মহিলা কৃষক: নারী ক্ষমতায়নকে জোর দিতে মহিলা কৃষকদের এই প্রকল্পে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
  • তপশিলি জাতি ও উপজাতি (SC/ST): SC এবং ST ক্যাটাগরির কৃষকদের জন্য এই স্কিমে বিশেষ সুবিধার ব্যবস্থা রয়েছে।

২. জমির মালিকানা ও নথিপত্র

  • নিজস্ব চাষযোগ্য জমি: আবেদনকারী কৃষকের নিজের নামে চাষযোগ্য জমি থাকতে হবে।
  • বৈধ ল্যান্ড রেকর্ড: জমির নিজস্ব খতিয়ান বা পরচা (RoR) থাকা বাধ্যতামূলক।
  • ভাগচাষী বা লিজ নেওয়া জমি: যদি জমি নিজের নামে না থাকে, তবে নূন্যতম ৩ থেকে ৫ বছরের জন্য লিজ নেওয়া বা রেজিস্টার্ড ভাগচাষী (Sharecropper) হওয়ার বৈধ চুক্তিপত্র থাকলেও আবেদন করা যায়।

৩. জলের উৎস

জমিতে ড্রিপ বা স্প্রিঙ্কলার সেট চালু করার জন্য নিজস্ব বা যৌথ কোনো জলের উৎস (যেমন— পাম্পসেট, বোরওয়েল, অগভীর নলকূপ বা পুকুর) থাকা আবশ্যক। কারণ পানির প্রেশার ছাড়া এই আধুনিক সেচ যন্ত্রগুলো চালানো সম্ভব নয়।

৩. বাংলা কৃষি সেচ আবেদনের নিয়ম ও প্রদান পদ্ধতি

ধাপ ১: আবেদন ফর্ম সংগ্রহ

কৃষি সেচ প্রকল্পের নির্দিষ্ট আবেদন ফর্মটি আপনি আপনার ব্লকের সহকারী কৃষি অধিকর্তা (ADA – Assistant Director of Agriculture) অফিস থেকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পেয়ে যাবেন। এছাড়া রাজ্য সরকারের কৃষি দপ্তরের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট থেকেও এটি ডাউনলোড করা যায়। অনলাইনে আবেদন জানতে

ধাপ ২: ফর্ম পূরণ ও ডিলার নির্বাচন

ফর্মে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য, জমির বিবরণ এবং আপনি কোন সেচ ব্যবস্থা (ড্রিপ নাকি স্প্রিঙ্কলার) নিতে চান তা সঠিকভাবে লিখুন। ফর্মে সরকারের অনুমোদিত কিছু কোম্পানির (যেমন— সুপ্রিম, ক্যাপ্টেন, জিন্দাল ইত্যাদি) তালিকা থাকে, সেখান থেকে আপনাকে যেকোনো একটি পছন্দ বা সিলেক্ট করতে হবে।

ধাপ ৩: ফর্ম জমা দেওয়া

পূরণ করা ফর্মের সাথে ওপরের সমস্ত নথিপত্র যুক্ত করে আপনার ব্লকের কৃষি অফিসে (ADA Office) গিয়ে জমা দিন। এছাড়া আপনার এলাকায় দুয়ারে সরকার (Duare Sarkar) ক্যাম্প চললে সেখানেও এই ফর্ম জমা নেওয়া হয়।

ধাপ ৪: জমি পরিদর্শন

ফর্ম জমা দেওয়ার পর কৃষি দপ্তরের আধিকারিক বা মনোনীত কোম্পানির প্রতিনিধিরা আপনার জমিতে আসবেন। তাঁরা যাচাই করে দেখবেন যে আপনার জমিতে জলের কোনো উৎস (যেমন— পুকুর বা পাম্পসেট) আছে কি না এবং জমিটি এই সেচ ব্যবস্থার জন্য উপযুক্ত কি না।

ধাপ ৫: জিএসটি (GST) বা কৃষকের অংশ জমা ও মেশিন বসানো

যাচাইকরণ সফল হলে ADA থেকে আপনাকে ওই নির্দিষ্ট কোম্পানির নামে ব্যাংকের মাধ্যমে বা ড্রাফটে আপনার অংশের টাকা (যা মূলত যন্ত্রাংশের ওপর বসা ১২% GST এবং সামান্য টেকনিক্যাল চার্জ) জমা দিতে হবে। টাকা জমা দেওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই কোম্পানির ইঞ্জিনিয়াররা এসে আপনার জমিতে সম্পূর্ণ সেচ ব্যবস্থাটি বিনামূল্যে ইনস্টল করে দিয়ে যাবেন।

প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর (FAQ)

১: সেচ কি?

উত্তর: বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কৃত্রিম উপায়ে নদী, খাল, বিল বা ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে ফসলের জমিতে প্রয়োজন মতো জল সরবরাহ করাকে সেচ বলা হয়। সহজ কথায়, বৃষ্টির ওপর নির্ভর না করে উদ্ভিদের সঠিক বৃদ্ধির জন্য জমিতে কৃত্রিমভাবে পানি দেওয়াই হলো সেচ।

২: সেচ কৃষি কাকে বলে?

উত্তর: যে বিশেষ কৃষি পদ্ধতিতে শুধুমাত্র প্রকৃতির বৃষ্টির ওপর ভরসা না করে, সম্পূর্ণ কৃত্রিম সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে জমিতে নিয়মিত জল দিয়ে ফসল ফলানো হয়, তাকে সেচ কৃষি বলে। শুষ্ক অঞ্চল বা কম বৃষ্টিপাতের এলাকায় ফসলের ফলন নিশ্চিত করতে এই ধরনের চাষাবাদ অত্যন্ত জরুরি।

৩: বাংলা কৃষি সেচ যোজনা কি?

উত্তর: বাংলা কৃষি সেচ যোজনা (BKSY) হলো পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একটি বিশেষ কল্যাণমূলক প্রকল্প, যার মূল উদ্দেশ্য হলো আধুনিক ড্রিপ ও স্প্রিঙ্কলার পদ্ধতির মাধ্যমে ফসলের জমিতে কম জলে বেশি চাষ নিশ্চিত করা। এই যোজনার আওতায় রাজ্যের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের আধুনিক সেচ প্রযুক্তি বসানোর জন্য রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ১০০% পর্যন্ত ভরতুকি দেওয়া হয়।

৪: সেচ প্রকল্পের উদাহরণ?

উত্তর: সেচ প্রকল্পের প্রধান উদাহরণগুলোর মধ্যে রয়েছে— পশ্চিমবঙ্গের দামোদর উপত্যকা বহুমুখী পরিকল্পনা (DVC) এবং কংসাবতী সেচ প্রকল্প। এছাড়া আধুনিক প্রযুক্তির সেচ প্রকল্পের চমৎকার উদাহরণ হলো— ‘বাংলা কৃষি সেচ যোজনা’-র অধীনে পরিচালিত বিন্দু সেচ (ড্রিপ) এবং ঝরণা সেচ (স্প্রিঙ্কলার) ব্যবস্থা।

তথ্য সূত্র

মাটির কথা কৃষি সেচ বিজ্ঞপ্তি (matirkotha)

Spread the love

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top