গোবর দিয়ে তরল জৈব সার তৈরির পদ্ধতি: গাছের গ্রোথ প্রোমোটার বা ভিটামিন তৈরি গাইড

তরল জৈব সার তৈরির পদ্ধতি: কৃষি খামারে একটি ২০০ লিটার ড্রামের মধ্যে Taral joiba sar তৈরি করা হচ্ছে।
তরল জৈব সার তৈরি: বাড়িতে তৈরি প্রাকৃতিকভাবে পুষ্টিকর ও কার্যকরী তরল জৈব সারের প্রস্তুতি।

ভূমিকা: কৃষিকাজে রাসায়নিক সারের ক্ষতিকর প্রভাব কমিয়ে মাটির দীর্ঘস্থায়ী উর্বরতা ধরে রাখতে গোবর দিয়ে তৈরি তরল জৈব সার (Liquid Organic Fertilizer) এক অলৌকিক উপাদানের মতো কাজ করে। এটি মূলত গোবর, মূত্র এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদান নির্দিষ্ট সময় ধরে পচিয়ে তৈরি করা একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর ও অণুজীব সমৃদ্ধ মিশ্রণ। সম্পূর্ণ ঘরোয়া পদ্ধতিতে এবং নামমাত্র খরচে তৈরি এই তরল সার গাছের শিকড় ও পাতায় সরাসরি পুষ্টি জোগায়, যা ফসলের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দ্রুত বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। অত্যন্ত সহজ উপায়ে বাড়িতেই গোবর দিয়ে কার্যকরী তরল জৈব সার তৈরির পদ্ধতি ও এর সঠিক প্রয়োগ নিয়ম, উপকারিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হল।

তরল জৈব সার তৈরির পদ্ধতি

গোবর দিয়ে বাড়িতে ১০০ লিটার তরল জৈব সার তৈরি করার সহজ পদ্ধতি নিচে আলোচনা করা হল:

তরল জৈব সার উপাদান –

  • দেশী গরুর টাটকা গোবর ১০ কেজি।
  • দেশী গরুর গমুত্র ১০ লিটার।
  • চিটা গুড় ১ কেজি (সাধারণ গুড় হলেও চলবে)
  • ডালের গুড়া বা বেসন ১ কেজি।
  • হলুদ গুড়া ২০০ গ্রাম।
  • সরিষার খৈল ১ কেজি।
  • পচা কলা বা অন্য মিষ্টি ফল ১৫-২০ টি।
  • জল ৯০ লিটার।
  • একটি ১০০ লিটার ড্রাম।
  • মাটি ১ কেজি (বট, পাকর গাছের গোড়ার বা রাসায়নিক সার ও বিষের সংস্পর্শে আসেনি এমন মাটি।)

তরল জৈব সার তৈরির নিয়ম

উপরের সবটা একটা পাত্রে নিয়ে ভাল করে হাত দিয়ে মিশিয়ে নিয়ে ১০০ লিটারের ড্রামে ঢালুন তার পর ৯০ লিটার জল ঢালুন এবং একটি লাঠি নিয়ে ভাল করে ঘেটে দিয়ে একটি অন্ধকার জায়গায় ৩ দিন রেখে দিন এবং ঐ দিন থেকে দিনে ৩ বার একটি লাঠি দিয়ে ১০ বার সোজা এবং ১০ বার উল্টো করে নাড়াতে হবে ৩ দিন। চতুর্থ দিন ব্যবহারের জন্যে উপযোগী হয়ে যাবে।

তরল জৈব সার প্রয়োগের নিয়ম

চতুর্থ দিনে আপনার তরল জৈব সার রেডি হয়ে গেছে এবার ব্যাবহার করতে পারেন । তবে যতদিন ব্যাবহার চলাকালীন ড্রামে থাকবে ততদিন ডাল দিয়ে নিয়মিত ঘোড়াতে হবে দ্রবনটি ।

চারা গাছে ব্যাবহার করলে ১ লিটার তরল জৈব সারের সাথে ৭-৮ লিটার জল মেশবেন এবং বড় গাছ হলে ১ লিটার তরল জৈব সারের সাথে ৫-৬ লিটার জল মিশিয়ে, গাছের গোড়াতে দিবেন সঙ্গে গাছের গায়ে দিবেন ও বিশেষত পাতায় দিবেন। মনে রাখবেন গাছ শুধু শিকড় দিয়ে নয় তার পাতা দিয়েও খাদ্য আহার গ্রহণ করে।

তরল জৈব সার কিভাবে কাজ করে

গোবরে রয়েছে অজস্র জীবাণু। বেসন এ রয়েছে রাইবোজিয়াম্ এবং চিটে গুড় ও পচা ফলে রয়েছে কার্বন, উদ্ভিদ ও জীবনুদের নানান খাদ্য। সেই সাথে গাছের গোড়ার মাটিতে রয়েছে একধরনের উপকারী জীবাণু। ৩ দিন ধরে ঐ মিশ্রণ পচতে থাকে এবং জীবাণু গুলির সংখ্যা বাড়তে থাকে। যত পচতে থাকবে তত জীবাণুর সংখ্যা বাড়তে থাকে, চতুর্থ দিনে জীবাণুদের সংখ্যা বেশি বাড়ে এবং এর পর ধীরে ধীরে কমতে থাকে, তাই চতুর্থ দিন ব্যাবহার করলে মিশ্রণটি ভাল কাজে আসে।

দ্রবনটি ব্যবহারে উদ্ভিদের খাদ্য ও জীবাণুরা মাটিতে প্রবেশ করে মাটিতে জীবাণুর সংখ্যা বাড়িয়ে মাটি উর্বর করে এবং পাতায় অনুখাদ্যের কাজ করে, তাই দেখা গেছে যে ঐ সার দেওয়ার ফলে গাছের স্বাস্থ্য ভাল হয় এবং উৎপাদন বেড়ে যায়। এটি মূলত গাছের গ্রোথ প্রোমোটার বা ভিটামিন হিসেবে কাজ করে।

আড়ও দেখুন ভার্মি কম্পোস্ট কী? কেঁচো সার তৈরির পদ্ধতি বা ভার্মি কম্পোস্ট কিভাবে তৈরি করে ও মার্কেটিং কৌশল

তরল জৈব সারের গুরুত্ব ও উপকারিতা

কৃষিকাজে রাসায়নিক সারের যথেচ্ছ ব্যবহার কমিয়ে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা এবং ফসলের গুণগত মান বাড়াতে তরল জৈব সার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিচে এর প্রধান গুরুত্ব ও সুবিধাসমূহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. দ্রুত পুষ্টি উপাদান সরবরাহ

কঠিন বা গুঁড়ো জৈব সারের (যেমন গোবর বা কম্পোস্ট) তুলনায় তরল জৈব সার গাছ খুব দ্রুত গ্রহণ করতে পারে। এটি জলের সাথে স্প্রে করার ফলে গাছের পাতা এবং শিকড় সরাসরি ও তাৎক্ষণিকভাবে পুষ্টি উপাদান (যেমন- নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাসিয়াম এবং অনুখাদ্য) শোষণ করে নেয়।

২. মাটির স্বাস্থ্য ও উর্বরতা বৃদ্ধি

তরল জৈব সারে প্রচুর পরিমাণে উপকারী অণুজীব থাকে। এটি মাটিতে প্রয়োগ করলে মাটির উপকারী ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের বংশবৃদ্ধি ঘটে, যা মাটির গঠন উন্নত করে এবং দীর্ঘমেয়াদে মাটির উর্বরতা শক্তি ধরে রাখে।

৩. কম খরচ ও সহজে তৈরিযোগ্য

কৃষকেরা নিজেদের বাড়িতেই খড়, পাতা, গোবর, মূত্র, খোল কিংবা রান্নাঘরের তরকারি কাটার বর্জ্য পচিয়ে খুব কম খরচে ‘খামারজাত তরল সার’ (যেমন- তরল জৈব সার, জীবামৃত, পঞ্চগব্য বা খোল পচা জল) তৈরি করতে পারেন। এতে চাষের উৎপাদন খরচ অনেক কমে যায়।

৪. গাছের গ্রোথ প্রোমোটার

গাছের দ্রুত বৃদ্ধি এবং পুষ্টির জোগান দিতে তরল জৈব সার প্রাকৃতিক গ্রোথ প্রোমোটার এবং ভিটামিন হিসেবে চমৎকার কাজ করে। এই সারে উপস্থিত অতিপ্রয়োজনীয় এনজাইম, হরমোন এবং খনিজ উপাদানগুলি গাছের কোষ বিভাজন বাড়িয়ে ডালপালা ও পাতার বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। এর নিয়মিত ব্যবহারে গাছের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে, যার ফলে ফুল ও ফল ঝরে পড়ার হার অনেকটাই কমে যায়। এককথায়, রাসায়নিক ভিটামিনের পরিবর্তে কোনো পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া ছাড়াই এটি গাছকে ভেতর থেকে সতেজ, সবুজ এবং দ্বিগুণ ফলনশীল করে তোলে।

৫. রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি

এই সারে উপস্থিত জৈব উপাদানগুলি গাছের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে। ফলে ফসলে ক্ষতিকর ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া এবং পোকামাকড়ের আক্রমণ অনেকটাই কমে যায়।

৬. পরিবেশ-বান্ধব ও নিরাপদ

রাসায়নিক সারের মতো তরল জৈব সার জলের উৎস বা মাটির কোনো ক্ষতি করে না। এর ব্যবহারে উৎপাদিত ফসল, ফল ও সবজি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং বিষমুক্ত হয়।

আড়ও দেখুন জীবামৃত তৈরি পদ্ধতি: জীবামৃতের উপকারিতা-ঘনজীবামৃতের প্রয়োগ বিধি।

উপসংহার:

পরিশেষে বলা যায়, গোবর দিয়ে তৈরি তরল জৈব সার রাসায়নিক সারের একটি সাশ্রয়ী, পরিবেশ-বান্ধব এবং অত্যন্ত কার্যকরী প্রাকৃতিক বিকল্প। এই পুষ্টিকর মিশ্রণটি একদিকে যেমন মাটির স্বাস্থ্য ও দীর্ঘমেয়াদী উর্বরা শক্তি রক্ষা করে, অন্যদিকে ফসলের দ্রুত বৃদ্ধি ও রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে।

মিরাক্কেল শব্দটি সম্পর্কে আপনারা সকলেই জানেন যার আশা নেই তবু বেচে ফিরে আসে যে শব্দটি হয়ত ডাক্তার বাবুদের মুখে শুনে থাকি আমরা এই সারের গুণ ঠিক তাই যার আশা নেই ফলন দিবেনা মরে যাবে সেই গাছ ও আর ফলন দেয়, অর্থাৎ যদি আমরা সঠিক সময়ে বাড়িতে তরল জৈব সার প্রস্তুত করে গাছে প্রয়োগ করতে পারি, তাহলে কম খরচে অধিক ফসল উৎপাদন করে আয় দীগুণ করে দিবে – তাই বিষমুক্ত ও টেকসই উপায়ে অধিক ফলন পেতে প্রত্যেক কৃষকেরই নিয়মিত এই তরল জৈব সার ব্যবহার করা উচিত।

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর (FAQ)

১. প্রশ্ন: তরল জৈব সার কী?

উত্তর: তরল জৈব সার হলো গোবর, প্রাণীর মূত্র, গুড় বেসন, ফল বা উদ্ভিদের বিভিন্ন অংশ নির্দিষ্ট সময় ধরে জলের সাথে পচিয়ে তৈরি করা একটি পুষ্টিকর প্রাকৃতিক মিশ্রণ। এটি অণুজীব সমৃদ্ধ এমন একটি সার যা গাছের শিকড় ও পাতা খুব দ্রুত শোষণ করতে পারে, ফলে গাছের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়।

২. প্রশ্ন: গাছের দ্রুত বৃদ্ধির উপায় কী?

উত্তর: গাছের দ্রুত বৃদ্ধির প্রধান উপায় হলো সুষম পুষ্টি নিশ্চিত করা। এর জন্য নিয়মিত বিরতিতে তরল জৈব সার প্রয়োগ করা প্রয়োজন, যা প্রাকৃতিক গ্রোথ প্রোমোটার হিসেবে কাজ করে। এছাড়া সময়মতো সঠিক পরিমাণে জল সেচ, আগাছা পরিষ্কার এবং গাছের গোড়ায় পর্যাপ্ত অক্সিজেন চলাচলের জন্য মাটি আলগা করে দিলে গাছ দ্রুত বড় হয়ে ওঠে।

৩. প্রশ্ন: তরল জৈব সার ব্যবহারের সেরা সময় কোনটি?

উত্তর: তরল জৈব সার ব্যবহারের সবচেয়ে ভালো সময় হলো খুব সকালে অথবা বিকেলে রোদ কমে যাওয়ার পর। সরাসরি কড়া রোদে এটি স্প্রে করলে বা প্রয়োগ করলে বাষ্পীভূত হয়ে কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। এছাড়া মেঘলা আকাশ বা বৃষ্টির ঠিক আগে এটি ব্যবহার না করাই ভালো।

তথ্য সূত্র

জাতীয় জৈব ও প্রাকৃতিক কৃষি কেন্দ্র (NCOF) ভারত সরকার।

Spread the love

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top