
১. ভূমিকা: আজকের দিনে জলবায়ু পরিবর্তনের বৈরী আবহাওয়া এবং চাষের ক্রমবর্ধমান খরচের কারণে কৃষকরা এমন ফসলের সন্ধান করছেন যা কম খরচে, কম জলে এবং সামান্য পরিচর্যাতেই নিশ্চিত লাভ দিতে পারে। এই চাহিদার মুখে সবচেয়ে লাভজনক বিকল্প হলো সজনে ডাটা চাষ পদ্ধতি। একে অলৌকিক বৃক্ষ বা “Miracle Tree” বলা হয়, কারণ এর প্রতিটি অংশ বাণিজ্যিকভাবে মূল্যবান। বর্তমান সময়ে অনেক উন্নত জাত বেরিয়েছে যেগুলি বারমাস ফল দেয় বলে বিশেষজ্ঞরা বলেন। প্রান্তিক কৃষকর আয় দ্বিগুণ করতে বারোমাসি সজনে চাষকে একটি প্রধান হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।
২. সজনা চাষের পুষ্টিগুণ ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা
২.১ সজনা পাতা ও ডাঁটার পুষ্টি উপাদান: সজনে ডাটা চাষ পদ্ধতি-তে সজনা কেবল একটি সাধারণ সবজি নয়, এটি একটি বৈজ্ঞানিক “সুপারফুড”। সজনা পাতায় কমলার চেয়ে ৭ গুণ বেশি ভিটামিন ‘সি’, দুধের চেয়ে ৪ গুণ বেশি ক্যালসিয়াম, কলার চেয়ে ৩ গুণ বেশি পটাশিয়াম এবং ডিমের চেয়ে দ্বিগুণ প্রোটিন থাকে।
২.২ অর্থনৈতিক লাভ ও বাজার: স্থানীয় বাজারে কচি ও মাঝারি সজনে ডাঁটার চাহিদা বারো মাসই থাকে। এছাড়া, সজনার শুকনো পাতা গুঁড়ো করে আন্তর্জাতিক বাজারে উন্নত পুষ্টির পরিপূরক (Moringa Powder) হিসেবে চড়া দামে রপ্তানি করা সম্ভব।
৩. জলবায়ু ও মাটি নির্বাচন
৩.১ তাপমাত্রা ও আবহাওয়া: সজনা মূলত উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুর ফসল। ২৫°C থেকে ৩৫°C তাপমাত্রা এর বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে আদর্শ, তবে এটি সহজে ৪০°C পর্যন্ত গরম সহ্য করতে পারে। তীব্র ঠান্ডা বা তুষারপাত সজনা গাছের ক্ষতি করে।
৩.২ মাটির রাসায়নিক ও ভৌত প্রোফাইল: সজনা চাষের জন্য মাটির পিএইচ ($pH$) মান অবশ্যই ৬.০ থেকে ৭.৫-এর মধ্যে থাকা আদর্শ। বেলে-দোআঁশ বা পলি-দোআঁশ মাটি সজনা চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী।
৩.৩ জল নিষ্কাশনের গুরুত্ব: সজনা গাছ খরা সহ্য করতে পারলেও গাছের গোড়ায় জল জমে থাকা একদম সহ্য করতে পারে না। মাত্র ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা জল জমে থাকলে সজনার মূল পচে গাছ মারা যায়। তাই সর্বদা উঁচুজমি বা জল নিকাশি নালা যুক্ত জমি নির্বাচন করতে হবে।
আড়ও জানতে ক্লিক করুন: উন্নত জাতের অধিক ফলনশীল পেপে চাষ পদ্ধতি।
৪. সজনের উন্নত উচ্চফলনশীল জাত নির্বাচন
বাণিজ্যিক চাষের জন্য প্রথাগত দেশি জাতের বদলে সরকারি ল্যাবরেটরিতে তৈরি সজনের উন্নত উচ্চফলনশীল জাত বেছে নেওয়া জরুরি:
৪.১ পিকেএম-১ (PKM-1): এটি ভারতের তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (TNAU) দ্বারা উদ্ভাবিত সবচেয়ে জনপ্রিয় বার্ষিক জাত। রোপণের মাত্র ৭-৮ মাসের মধ্যে ফুল আসে এবং ডাঁটাগুলো ৭৫-৮০ সেমি লম্বা, সুস্বাদু ও আঁশহীন হয়। গাছ প্রতি বার্ষিক ২০০-২৫০টি ডাঁটা পাওয়া যায়।
৪.২ পিকেএম-২ (PKM-2): এটি পিকেএম-১ এর চেয়েও উন্নত এবং উচ্চফলনশীল জাত। এর ডাঁটাগুলো আরও চওড়া এবং মাংসল হয়, যা বাণিজ্যিক প্যাকেজিং ও পরিবহণের জন্য খুব ভালো।
৪.৩ ওডিসি-৩ (ODC3): এটি একটি চমৎকার বারোমাসি জাত, যা খরাপ্রবণ এলাকাতেও দারুণ ফলন দেয়। এই জাতটি বছরে দুবার ফলন দেয় এবং এর ডাঁটা বাজারে সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হয়।
৫. জমি তৈরি ও চারা রোপণের বৈজ্ঞানিক নিয়ম
৫.১ জমি তৈরি ও শোধন: সজনে ডাটা চাষ পদ্ধতি-তে জমিকে ২-৩টি গভীর চাষ দিয়ে আগাছামুক্ত এবং সমতল করে নিতে হবে। শেষ চাষের সময় মাটি শোধনের জন্য একর প্রতি ৪ কেজি ট্রাইকোডার্মা ভিরিডি মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে।
৫.২ মাদা বা গর্তের নিখুঁত পরিমাপ: বৈজ্ঞানিক নিয়ম মেনে জমিতে ৪৫ সেমি × ৪৫ সেমি × ৪৫ সেমি সাইজের গর্ত বা মাদা খনন করতে হবে। গর্ত করার পর ১০-১২ দিন রোদ খাইয়ে নিতে হবে।
৫.৩ রোপণের দূরত্ব : বাণিজ্যিক সজনা ডাঁটা উৎপাদনের জন্য আদর্শ দূরত্ব হলো সারি থেকে সারির দূরত্ব ২.৫ মিটার (প্রায় ৮ ফুট) এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ২.৫ মিটার। তবে নিবিড় পদ্ধতিতে বা শুধু পাতা উৎপাদনের জন্য ১.৫ মিটার × ১.৫ মিটার দূরত্বেও রোপণ করা যায়।
৫.৪ চারা তৈরি ও রোপণ প্রযুক্তি: সরাসরি গর্তে বীজ বপন করা যায়, তবে পলিব্যাগে নার্সারিতে চারা তৈরি করে রোপণ করলে চারার মৃত্যুর হার কমে। প্রতি গর্তের ওপরের মাটির সাথে ৫-১০ কেজি পচা গোবর সার বা কেঁচো সার, ৫০ গ্রাম সিঙ্গেল সুপার ফসফেট (SSP) এবং ৫০ গ্রাম পটাশ (MOP) সার ভালোভাবে মিশিয়ে গর্ত ভরাট করে ঠিক মাঝখানে চারা রোপণ করতে হবে এবং গোড়ায় হালকা জল সেচ দিতে হবে।
সজনের উন্নত উচ্চফলনশীল জাত খুব দ্রুত বাড়ে, তাই এর পুষ্টির চাহিদাও অনেক বেশি। প্রথম বছরের মাদা বা গর্ত তৈরির সময় দেওয়া প্রাথমিক সারের পর, গাছের বৃদ্ধি এবং অধিক ফুল-ফল নিশ্চিত করতে নিচে উল্লিখিত নিয়মে টপ-ড্রেসিং (উপরি প্রয়োগ) করতে হবে।
আড়ও জানতে ক্লিক করুন – উচ্চফলনশীল উন্নত জাতের সুপারি চাষের আধুনিক পদ্ধতি।
৬. সজনে ডাঁটা চাষে সঠিক সার প্রয়োগ ও জল সেচ ব্যবস্থাপনা
৬.১ সারের নিখুঁত বাৎসরিক ডোজ ও সময়সূচী:
প্রথম ডোজ (রোপণের ৩ মাস পর): প্রতি গাছের গোড়া থেকে ১ ফুট দূরে রিং বা নালা তৈরি করে গাছ প্রতি ১০০ গ্রাম ইউরিয়া, ১০০ গ্রাম সিঙ্গেল সুপার ফসফেট (SSP) এবং ৫০ গ্রাম মিউরেট অব পটাশ (MOP) সারের সাথে ২ কেজি কেঁচো সার বা ভার্মিকম্পোস্ট ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে এবং মাটি চাপা দিয়ে হালকা জল সেচ দিতে হবে।
দ্বিতীয় ডোজ (রোপণের ৬ মাস পর – ফুল আসার ঠিক আগে): এই সময়ে গাছের পটাশ এবং ফসফরাসের চাহিদা বাড়ে। গাছ প্রতি ১০০ গ্রাম ইউরিয়া, ১৫০ গ্রাম সিঙ্গেল সুপার ফসফেট (SSP) এবং ১০০ গ্রাম পটাশ (MOP) সার প্রয়োগ করতে হবে। এর সাথে অণুখাদ্যের ঘাটতি মেটাতে গাছ প্রতি ২০ গ্রাম দস্তা (Zinc) ও ১০ গ্রাম বোরন (Boron) দিলে ফুল ঝরে পড়া বন্ধ হয়।
পরবর্তী বছরগুলোতে: সজনে ডাটা চাষ পদ্ধতি-তে প্রতি বছর বর্ষার শুরুতে (জুন-জুলাই মাসে) গাছ প্রতি ১৫-২০ কেজি পচা গোবর সার বা কেঁচো সার এবং ৪০০ গ্রাম ইউরিয়া, ৫০০ গ্রাম ফসফেট ও ৩০০ গ্রাম পটাশ সার দুটি সমান কিস্তিতে ভাগ করে দিতে হবে।
৬.২ জল সেচ দেওয়ার বৈজ্ঞানিক সিডিউল:
যদিও সজনা একটি খরা সহনশীল গাছ, তবে বাণিজ্যিক ডাঁটা উৎপাদনের জন্য সুষম জল সেচ অত্যন্ত জরুরি। চারা রোপণের পর প্রথম ২-৩ মাস মাটিতে আর্দ্রতা বজায় রাখতে ৫-৭ দিন পর পর হালকা জল সেচ দিতে হবে।
গাছ বড় হয়ে গেলে শীতকালে ১৫ দিন পর পর এবং গ্রীষ্মের খরতাপে ১০ দিন পর পর জল সেচ দেওয়া দরকার।
বিশেষ সতর্কতা: গাছে যখন ফুল আসবে, তখন জল সেচ একদম সীমিত বা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হবে। ফুল আসার সময় অতিরিক্ত জল দিলে ফুল পচে ঝরে যায়। তবে ফুল থেকে যখন ছোট ছোট কচি ডাঁটা বা গুঁটি বের হতে শুরু করবে, তখন নিয়মিত পর্যাপ্ত জল সেচ দিতে হবে, অন্যথায় ডাঁটা শুকিয়ে ঝরে পড়বে।
৭. সজনা গাছের ছাঁটাইকরণ বা প্রুনিং প্রযুক্তি
বাণিজ্যিক সজনা চাষে গাছের উচ্চতা নিয়ন্ত্রণ করা এবং ডালপালার সংখ্যা বাড়ানোই হলো আসল লাভ। গাছ যদি লম্বা হয়ে আকাশের দিকে উঠে যায়, তবে ফলন কমে যাবে এবং ডাঁটা সংগ্রহ করা কঠিন হবে। কৃষি গবেষণা অনুযায়ী ৩টি ধাপে ছাঁটাই বা পিঞ্চিং করতে হবে:
৭.১ প্রথম ছাঁটাই বা পিঞ্চিং
বারোমাসি সজনে চাষে চারা গাছটি রোপণের পর যখন সোজা হয়ে বেড়ে ৩ ফুট (প্রায় ৬০-৯০ সেমি) উচ্চতায় পৌঁছাবে (সাধারণত রোপণের ২ থেকে ৩ মাসের মধ্যে), তখন গাছের প্রধান বা অগ্রভাগের কচি ডগাটি ধারালো কাঁচি বা ছুরি দিয়ে ২ ইঞ্চি কেটে দিতে হবে। একে ফার্স্ট প্রুনিং বলে। এর ফলে প্রধান কাণ্ডের বৃদ্ধি থমকে যাবে এবং পাশ থেকে ৪-৫টি নতুন শক্তিশালী শাখা (Secondary Branches) বের হবে।
৭.২ দ্বিতীয় ও তৃতীয় ছাঁটাই
বারোমাসি সজনে চাষে প্রথম ছাঁটাইয়ের পর বের হওয়া পার্শ্ববর্তী শাখাগুলো যখন আবার ২ ফুট লম্বা হবে, তখন সেই শাখাগুলোরও অগ্রভাগের ডগা ২ ইঞ্চি করে কেটে দিতে হবে (দ্বিতীয় ছাঁটাই)।
একইভাবে সেই ডালগুলো থেকে যখন আরও নতুন উপ-শাখা (Tertiary Branches) বের হয়ে ২ ফুট হবে, তখন সেগুলোরও ডগা কেটে দিতে হবে (তৃতীয় ছাঁটাই)। এই ৩টি ধাপের ছাঁটাইয়ের ফলে গাছটি লম্বা না হয়ে চারপাশ জুড়ে ছাতার মতো গোল ও ঝোপালো আকার ধারণ করবে। ছাঁটাই করা গাছে সাধারণ গাছের তুলনায় ৩০০% বেশি ফুল ও ডাঁটা আসে।
৭.৩ বাৎসরিক আমূল ছাঁটাই
বারোমাসি সজনে চাষে প্রতি বছর সজনে ডাঁটা সংগ্রহের মরশুম শেষ হয়ে গেলে (সাধারণত মে-জুন মাসে), মাটির স্তর থেকে ৩-৪ ফুট উচ্চতা রেখে গাছের সমস্ত ডালপালা ওপর থেকে কেটে বা ছেঁটে দিতে হবে। ছাঁটাইয়ের কাটা অংশে ছত্রাকের আক্রমণ রোধ করতে বোর্ডো পেস্ট বা কপার অক্সিক্লোরাইডের প্রলেপ লাগিয়ে দিতে হবে। এর ফলে পরবর্তী মরশুমে গাছ থেকে আবার নতুন সতেজ ডালপালা গজাবে এবং ফলন দ্বিগুণ হবে।
আড়ও দেখুন লাভজনক বারো মাসি কাঁঠাল চাষ পদ্ধতি: আধুনিক পিংক কাঁঠাল চাষের সম্পূর্ণ গাইড
৮. সজনা রোগ-বালাই ও সমন্বিত দমন ব্যবস্থা ( IPM)
সজনে ডাটা চাষ পদ্ধতিতে গাছে সাধারণত খুব বেশি রোগ-বালাই হয় না, তবে বাণিজ্যিক চাষের ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট পোকা ও রোগের আক্রমণ ফলন মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিতে পারে। আইসিএআর (ICAR) নির্দেশিত সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (IPM) নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো:
৮.১ প্রধান ক্ষতিকারক পোকা ও তার বৈজ্ঞানিক প্রতিকার:
সজনার শুঁয়োপোকা: এই পোকাগুলো দলবদ্ধভাবে সজনা গাছের পাতা ও কচি ছাল খেয়ে গাছকে পাতাশূন্য করে ফেলে। এদের দমনের জন্য ভোরের দিকে যখন পোকাগুলো গাছের কাণ্ডে দলা পাকিয়ে থাকে, তখন লাঠি দিয়ে সংগ্রহ করে কেরোসিন মিশ্রিত জলে ডুবিয়ে মেরে ফেলতে হবে। আক্রমণ তীব্র হলে প্রতি লিটার জলে ২ মিলিলিটার নিম তেল (১০,০০০ PPM) অথবা নিমবীজ নির্যাস (৫%) স্প্রে করতে হবে।
ফল মাছি ও কুঁড়ি পোকা : এই পোকা ফুল ও কচি সজনে ডাঁটার ভেতরে ডিম পাড়ে, যার ফলে ফুল ঝরে যায় এবং ডাঁটা পচে বেঁকে যায়। এদের দমনের জন্য প্রতি একরে ১০-১২টি ফেরোমন ফাঁদ (Pheromone Trap) এবং হলুদ আঠালো ফাঁদ (Yellow Sticky Trap) ব্যবহার করতে হবে।
৮.২ প্রধান ছত্রাকজনিত রোগ ও প্রতিকার:
গোড়া পচা ও মূল পচা রোগ: বারোমাসি সজনে চাষে জমিতে জল জমলে বা ছত্রাকের আক্রমণ হলে গাছের শিকড় পচে পাতা হলুদ হয়ে গাছ মারা যায়। এর প্রতিকারে জমি তৈরির সময় মাটির সাথে ট্রাইকোডার্মা ভিরিডি মেশানো আবশ্যক। রোগ দেখা দিলে আক্রান্ত গাছের গোড়ার মাটি সরিয়ে ১ লিটার জলে ৪ গ্রাম কপার অক্সিক্লোরাইড গুলে গোড়ায় ভালোভাবে স্প্রে করে দিতে হবে।
ডাল শুকিয়ে যাওয়া রোগ: ছাঁটাইয়ের পর কাটা অংশ দিয়ে ছত্রাক ঢুকে ডাল শুকাতে শুরু করে। এর জন্য ছাঁটাইয়ের পর কাটা মুখে বাধ্যতামূলকভাবে বোর্ডো পেস্ট লাগাতে হবে।
৯. সজনা পাতা ও ডাঁটা সংগ্রহ এবং ফলন
৯.১ সজনা পাতা সংগ্রহ: সজনা পাতা গুঁড়ো বা মরিনগা পাউডার (Moringa Powder) তৈরির জন্য রোপণের ৪-৫ মাস পর থেকেই পাতা সংগ্রহ করা যায়। কাটার সময় পুরো ডাল না ভেঙে শুধু কচি ও মাঝারি পাতা ডালসহ আলতো করে ছাঁটাই করতে হবে।
৯.২ সজনে ডাঁটা সংগ্রহ: পিকেএম-১ বা ওডিসি জাতের ক্ষেত্রে রোপণের ৭ম থেকে ৮ম মাসের মধ্যে প্রথম ডাঁটা তোলার উপযোগী হয়। ডাঁটা যখন সম্পূর্ণ লম্বা কিন্তু কচি ও নমনীয় থাকবে (বীজগুলো শক্ত হওয়ার আগে), তখনই সংগ্রহ করতে হবে। অতিরিক্ত পাকা ডাঁটায় আঁশ হয়ে যায় এবং বাজারে দাম পাওয়া যায় না।
৯.৩ গড় ফলনের সরকারি পরিসংখ্যান: বারোমাসি সজনে চাষে প্রথম বছরে প্রতি গাছ থেকে গড়ে বছরে ২০০ থেকে ২৫০টি (প্রায় ১৫-২০ কেজি) ডাঁটা পাওয়া যায়। দ্বিতীয় বছর থেকে এই ফলন গাছ প্রতি ৪০০-৫০০টি পর্যন্ত হয়। এই হিসাবে ১ একর জমিতে প্রথম বছরে গড়ে ১০ থেকে ১২ টন এবং পরবর্তী বছরগুলোতে ১৫ থেকে ২০ টন পর্যন্ত সজনে ডাঁটার ফলন পাওয়া সম্ভব।
আড়ও দেখুন থাই পেয়ারা চাষ পদ্ধতি: গোল্ডেন ৮ বাণিজ্যিক চাষের সম্পূর্ণ নির্দেশিকা
১০. প্রক্রিয়াকরণ, মূল্য সংযোজন ও লাভ-ক্ষতির হিসাব
১০.১ সজনে পাতা পাউডার উৎপাদন প্রযুক্তি: সজনার কাঁচা পাতা সংগ্রহ করে পরিষ্কার জলে ধুয়ে নিতে হবে। এরপর সরাসরি রোদে না শুকিয়ে, ঘরের ভেতর ফ্যানের হাওয়ায় বা ছায়াযুক্ত স্থানে ৩-৪ দিন শুকাতে হবে (রোদে শুকালে ভিটামিন নষ্ট হয়ে যায়)। পাতা মচমচে শুকিয়ে গেলে তা পালভারাইজার বা গ্রাইন্ডার মেশিনে গুঁড়ো করে এয়ারটাইট প্যাকেজিং করতে হবে।
১০.২ দলগত বিপণন : আনন্দধারা প্রকল্পের উৎপাদক দলের (PG), JLG, FPO মাধ্যমে সজনে ডাঁটাগুলোকে গ্রেড বা আকার অনুযায়ী আলাদা করে আঁটি বেঁধে সরাসরি শহরের পাইকারি বাজারে বা সুপারশপে পাঠালে ফড়িয়াদের হাত থেকে বাঁচা যায় এবং ৩০% বেশি নিট দাম পাওয়া যায়।
১০.৩ একর প্রতি আয়-ব্যয়ের বাস্তব অর্থনৈতিক খতিয়ান (১ম বছর):
| ব্যয়ের খাত (১ একর জমির জন্য) | আনুমানিক খরচ (টাকা) |
|---|---|
| জমি তৈরি, মাদা খনন ও চারা ক্রয় (৬৪০টি চারা) | ১২,০০০/- |
| জৈব সার (গোবর/ভার্মি), রাসায়নিক সার ও অনুখাদ্য | ১৫,০০০/- |
| জল সেচ, ছাঁটাই ও শ্রমিক খরচ | ১৪,০০০/- |
| বালাই ব্যবস্থাপনা (নিম তেল, ফাঁদ ও জৈব ছত্রাকনাশক) | ৪,০০০/- |
| সর্বমোট প্রাথমিক বিনিয়োগ (ব্যয়) | ৪৫,০০০/- |
বাস্তব আয়ের হিসাব: ১ম বছরে ১ একর থেকে সর্বনিম্ন ১০ টন (১০,০০০ কেজি) সজনে ডাঁটা উৎপাদন হলে এবং বাজারে গড় পাইকারি দর ন্যূনতম ৩০ টাকা প্রতি কেজি পেলেও:
মোট আয়: ১০,০০০ কেজি × ৩০ টাকা = ৩,০০,০০০/- টাকা।
নিট লাভ (১ম বছর): ৩,০০,০০০ – ৪৫,০০০ = ২,৫৫,০০০/- টাকা।
(পরবর্তী বছর গুলোতে জমি তৈরি বা চারার খরচ না থাকায় উৎপাদন খরচ অর্ধেকে নেমে আসে এবং লাভ প্রায় ৩.৫ থেকে ৪ লক্ষ টাকায় পৌঁছায়।)
১১. উপসংহার
কম ঝুঁকি, সামান্য জলের প্রয়োজনীয়তা এবং অত্যন্ত কম উৎপাদন খরচের কারণে সজনে ডাটা চাষ পদ্ধতি বর্তমান যুগে কৃষকদের জন্য একটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও স্থায়িত্বশীল ফসলের মডেল। আইসিএআর (ICAR) নির্দেশিত ছাঁটাই প্রযুক্তি এবং সুষম পুষ্টি ব্যবস্থাপনা মেনে চললে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষীরা তাদের উৎপাদক দলের মাধ্যমে মরিনগা পাউডার ও উন্নত জাতের সজনে ডাঁটা বিক্রি করে খুব সহজেই নিজেদের স্থায়ী অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা নিশ্চিত করতে পারেন।
আড়ও দেখুন আত্মা (ATMA) প্রকল্প কি? উদ্দেশ্য, লক্ষ্য ও সুবিধা সমূহ ২০২৬
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর (FAQ)
প্রশ্ন ১: সজনা গাছে কত দিনে ফলন আসে এবং বছরে কয়বার ফলন দেয়?
উত্তর: উন্নত বারোমাসি জাত (যেমন: PKM-1 বা ODC3) রোপণের মাত্র ৭ থেকে ৮ মাসের মধ্যে প্রথম ফলন বা ডাঁটা দেওয়া শুরু করে। আর জাতের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বছরে ২ থেকে ৩ বার পর্যন্ত প্রচুর পরিমাণে ডাঁটার ফলন পাওয়া যায়।
প্রশ্ন ২: সজনা গাছের ফলন বাড়াতে ছাঁটাই বা প্রুনিং কখন ও কীভাবে করতে হয়?
উত্তর: চারা গাছের উচ্চতা যখন ৩ ফুট হবে, তখন প্রথমবার ডগা কেটে দিতে হবে। এরপর নতুন ডালগুলো ২ ফুট লম্বা হলে আবার কাটতে হবে। এইভাবে প্রথম বছরে ৩ বার ছাঁটাই করলে গাছটি লম্বা না হয়ে ঝোপালো ছাতার মতো আকার নেয় এবং ৩০০% বেশি ফলন দেয়।
প্রশ্ন ৩: সজনা গাছের প্রধান শত্রু কী এবং এর প্রতিকার কী?
উত্তর: সজনা গাছের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো গোড়ায় জল জমা এবং শুঁয়োপোকা। গোড়ায় জল জমলে গাছ পচে মারা যায়, তাই জল নিকাশি ব্যবস্থা ভালো রাখতে হবে। আর শুঁয়োপোকা দমনের জন্য প্রতি লিটার জলে ২ মিলি নিম তেল মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।
তথ্য সূত্র
- ICAR – TNAU (তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়): সজনার বিশ্ববিখ্যাত উচ্চফলনশীল জাত PKM-1 এবং PKM-2 মূলত এই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েরই উদ্ভাবন। তাদের অফিশিয়াল হর্টিকালচার ম্যানুয়াল এবং ‘Moringa Cultivation Practices’ থেকে জাতের বৈশিষ্ট্য ও বীজ বপনের দূরত্ব নেওয়া হয়েছে।
- পশ্চিমবঙ্গ সরকার (কৃষি বিভাগ): রাজ্য কৃষি দপ্তরের বাণিজ্যিক সবজি চাষ গাইডলাইন এবং মাটির আদর্শ পিএইচ (pH) মান ও জল নিষ্কাশন সংক্রান্ত নির্দেশিকা।
- ডাইরেক্টরেট অব অনিয়ন অ্যান্ড গার্লিক রিসার্চ (DGR): সজনার শুঁয়োপোকা ও ফল মাছি দমনের জন্য নিম তেল ও ফেরোমন ফাঁদের বৈজ্ঞানিক ব্যবহার।










