
মুরগি পালন গ্রাম ও শহর—উভয় অঞ্চলেই বর্তমানে একটি লাভজনক ব্যবসা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। তবে মুরগি পালনে সফল হওয়ার প্রধান শর্ত হলো উৎপাদন খরচ কমানো। বিশেষ করে মুরগির খাদ্য তালিকা ও ঔষধ খরচ সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে খামারিরা দ্রুত লাভের মুখ দেখেন। দেশি ও সোনালী মুরগির ক্ষেত্রে যেমন পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি, তেমনি ব্রয়লার মুরগির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত ওজন আনা আবশ্যক। এই নিবন্ধে আমরা মুরগির খাদ্য হাতে তৈরির পদ্ধতি এবং ব্রয়লার মুরগির ৪২ দিনের পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
হাতে তৈরি মুরগির খাবার তৈরির সহজ নিয়ম
বাজারে কেনা ফিডের দাম প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকায় অনেক খামারি এখন বাড়িতেই খাবার তৈরি করছেন। হাতে তৈরি মুরগির খাবার তৈরির নিয়ম সঠিকভাবে জানলে আপনি খুব সহজেই অল্প খরচে সুষম খাদ্য প্রস্তুত করতে পারেন। বিশেষ করে দেশি মুরগির ঘরোয়া খাবার হিসেবে ভুট্টা ভাঙ্গা, গমের ভুষি এবং খৈল ব্যবহার করে পুষ্টিকর মিশ্রণ তৈরি করা সম্ভব। মুরগির খাদ্য হাতে তৈরির পদ্ধতি অনুসরণ করলে মুরগির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে এবং উৎপাদন খরচ প্রায় ২০% থেকে ৩০% পর্যন্ত কমিয়ে আনা যায়। মনে রাখবেন, বাড়িতে তৈরি খাদ্য ৭ দিনের বেশি মজুত রাখা উচিত নয়, কারণ এতে খাদ্যের গুণমান নষ্ট হতে পারে।
আড়ও দেখুন লাভজনক Murgi Palon পদ্ধতি: বাসস্থান থেকে টিকার তালিকা—এক নজরে সব (২০২৬)
১. স্টার্টার ফিড তৈরি (১ দিন থেকে ৬ সপ্তাহ) – ২০% প্রোটিন যুক্ত
বাচ্চা মুরগির দ্রুত দৈহিক বৃদ্ধির জন্য স্টার্টার ফিড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পর্যায়ে হাড় মজবুত করা এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া হয়। নিচে ১ দিন থেকে ৬ সপ্তাহ বয়স পর্যন্ত মুরগির বাচ্চার জন্য উচ্চ প্রোটিন সমৃদ্ধ মুরগির খাদ্য হাতে তৈরির পদ্ধতি সংক্রান্ত গাইডলাইন দেওয়া হলো:
| খাদ্য উপাদানের নাম | পরিমাণ |
|---|---|
| গম ভাঙা /খুদ ভাঙা | ২০ কেজি |
| ভুট্টা ভাঙা | ৩৮ কেজি |
| রাইস ব্র্যান্ড বা ধানের ১নং ভুসি | ১০ কেজি ৪০০ গ্রাম |
| সয়াবিন মিল | ২২ কেজি |
| ফিশ মিল বা শুটকি গুঁড়ো | ৬ কেজি |
| DCP বা ডাই ক্যালসিয়াম ফসফেট | ৫০০ গ্রাম |
| ঝিনুক গুঁড়া/ডিমের খোসা ২০ মিনিট বয়েল করে শুকিয়ে তার গুঁড়ো | ১ কেজি |
| সয়াবিন তেল (রান্না কার্যে ব্যবহৃত হয়) | ১ লিটার |
| লাইসিন | ১০০ গ্রাম |
| মিথিউনিন | ২৫০ গ্রাম |
| কলিন | ২৫০ গ্রাম |
| ভিটামিন প্রিমিক্স | ২৫০ গ্রাম |
| টক্সিন ব্র্যাইন্ড | ২৫০ গ্রাম |
| খনিজ লবন | ৩৫০ গ্রাম |
| মোট | ১০০ কেজি |
২. গ্রোয়ার ফিড তৈরি (৭ সপ্তাহ থেকে ২০ সপ্তাহ) – ১৫% প্রোটিন যুক্ত
মুরগি যখন বয়ঃসন্ধিকাল বা বৃদ্ধির মাঝামাঝি পর্যায়ে থাকে, তখন তাকে গ্রোয়ার ফিড দেওয়া হয়। সোনালী মুরগির খাদ্য তালিকা অনুযায়ী এই সময়ে প্রোটিনের পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে কার্বোহাইড্রেট ও ফাইবারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয় যাতে মুরগি সঠিক শারীরিক কাঠামো পায়। সঠিক মুরগির খাদ্য হাতে তৈরির পদ্ধতি মেনে চললে এই সময়ে খাবারের অপচয় রোধ করা সম্ভব।
| খাদ্য উপাদানের নাম | পরিমাণ |
|---|---|
| গম ভাঙা /খুদ ভাঙা | ২৫ কেজি |
| ভুট্টা ভাঙা | ৪২ কেজি |
| রাইস ব্র্যান্ড বা ধানের ১নং ভুসি | ১১ কেজি ৪০০ গ্রাম |
| সয়াবিন মিল | ৬ কেজি |
| ফিশ মিল বা শুটকি গুঁড়ো | ২ কেজি |
| DCP বা ডাই ক্যালসিয়াম ফসফেট | ৫০০ গ্রাম |
| সয়াবিন তেল (রান্না কার্যে ব্যবহৃত হয়) | ১ লিটার |
| লাইসিন | ১০০ গ্রাম |
| মিথিউনিন | ২৫০ গ্রাম |
| কলিন | ২৫০ গ্রাম |
| ভিটামিন প্রিমিক্স | ২৫০ গ্রাম |
| টক্সিন ব্র্যাইন্ড | ২৫০ গ্রাম |
| খনিজ লবন | ৩৫০ গ্রাম |
| মোট | ১০০ কেজি |

৩. লেয়ার ফিড তৈরি (২১ সপ্তাহ থেকে পরবর্তী) – ১৬% প্রোটিন যুক্ত
ডিম পাড়া মুরগির জন্য লেয়ার ফিড ফর্মুলা সাধারণ খাবারের চেয়ে কিছুটা আলাদা হয়। ডিমের খোসা মজবুত করতে এবং নিয়মিত ডিম উৎপাদন বজায় রাখতে এই খাবারে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস সঠিক পরিমাণে থাকা জরুরি। নিয়মিত মুরগির খাদ্য হাতে তৈরির পদ্ধতি অনুসরণ করলে লেয়ার খামারে ডিমের হার সর্বোচ্চ রাখা যায়।
| খাদ্য উপাদানের নাম | পরিমাণ |
|---|---|
| গম ভাঙা /খুদ ভাঙা | ১৯ কেজি ৯৫০ গ্রাম |
| ভুট্টা ভাঙা | ৪১ কেজি |
| রাইস ব্র্যান্ড বা ধানের ১নং ভুসি | ১৩ কেজি ৪০০ গ্রাম |
| সয়াবিন মিল | ১০ কেজি |
| ফিশ মিল বা শুটকি গুঁড়ো | ২ কেজি |
| DCP বা ডাই ক্যালসিয়াম ফসফেট | ১ কেজি |
| ঝিনুক গুঁড়া/ডিমের খোসা ২০ মিনিট বয়েল করে শুকিয়ে তার গুঁড়ো | ১ কেজি |
| সয়াবিন তেল (রান্না কার্যে ব্যবহৃত হয়) | ১ লিটার |
| লাইসিন | ৫০ গ্রাম |
| মিথিউনিন | ৫০ গ্রাম |
| কলিন | ১০০ গ্রাম |
| ভিটামিন প্রিমিক্স | ২৫০ গ্রাম |
| টক্সিন ব্র্যাইন্ড | ২৫০ গ্রাম |
| খনিজ লবন | ৩৫০ গ্রাম |
| সরিষার খৈল | ১০ কেজি |
| মোট | ১০০ কেজি |
ব্রয়লার মুরগির ঔষধ এবং খাদ্য প্রয়োগের সম্পূর্ণ দৈনিক চার্ট
ব্রয়লার মুরগি পালনে সময় ব্যবস্থাপনা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এখানে এফ.সি.আর (FCR) ঠিক রাখা অপরিহার্য। আদর্শ এফ.সি.আর হলো ১:১.৮ অর্থাৎ ১ কেজি ৮০০ গ্রাম খাবার খেয়ে মুরগি ১ কেজি ওজন দেবে। এই লক্ষ্য পূরণে ব্রয়লার মুরগির ৪২ দিনের ঔষধ চার্ট এবং সঠিক সময়ে ফিড সরবরাহ করা প্রয়োজন। ব্রয়লারের ক্ষেত্রে স্টার্টার, গ্রোয়ার ও ফিনিশার ফিড ব্যবহারের পাশাপাশি ভিটামিন ও ভ্যাকসিনের সঠিক ডোজ প্রয়োগ করলে খামারে মৃত্যুর হার কমে এবং ওজন দ্রুত বৃদ্ধি পায়। মুরগির খাদ্য হাতে তৈরির পদ্ধতি ব্রয়লারের ক্ষেত্রেও খরচ কমাতে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে এই মুরগির খাদ্য তালিকা ও ঔষধ চার্ট:
| মুরগির বয়স | ঔষধ/খাদ্য | দিন সংখ্যা |
|---|---|---|
| ১ দিন | কোনো খাবার নয় ,কেবল জল প্রতি লিটার জলে ১০ গ্রাম ইলেকট্রাল বা গ্লোকোজ | ১ দিন |
| ২ দিন | প্রতিদিন ১ বেলার জলে অক্সিটেট্রাসাইক্লিন ৫ গ্রাম প্রতি ১০০ বাচ্চা পিছু | ৪ দিন |
| ২ দিন | প্রি স্টার্টার ম্যাশ | ১০ দিন |
| ৬ দিন | রানীক্ষেত রোগের F১ টিকা নাকে ১ ফোটা | ১ দিন |
| ১১ দিন | প্রতিদিন ১ বেলার জলে ভিটামিন AD3 দিতে হবে ৫ মিলি প্রতি ১০০ বাচ্চা পিছু | ৩ দিন |
| ১১ দিন | স্টার্টার ম্যাশ দিতে হবে | ২০ দিন |
| ১৫ দিন | গামবোরো রোগের টিকা মুখে ১ ফোটা | ১ দিন |
| ২১ দিন | প্রতিদিন ১ বেলার জলে ভিটামিন AD3 দিতে হবে ৫ মিলি প্রতি ১০০ বাচ্চা পিছু | ৩ দিন |
| ২৫ দিন | রানীক্ষেত রোগের ল্যাসোটা টিকা নাকে ১ ফোটা | ১ দিন |
| ৩১ দিন | প্রতিদিন ১ বেলার জলে ভিটামিন AD3 দিতে হবে ৫ মিলি প্রতি ১০০ বাচ্চা পিছু | ৩ দিন |
| ৩১ দিন | ফিনিশার ম্যাস | শেষ পর্যন্ত |

এক্সপার্ট টিপস (Expert Tips)
- স্টার্টার ফিডে প্রোটিনের সঠিক উৎস নিশ্চিত করুন (শুধুমাত্র ভাত বা খুদ খাওয়ালে ২০% প্রোটিন পূরণ হবে না; প্রোটিনের জন্য শুঁটকি মাছের গুঁড়ো বা সয়াবিন মিল অবশ্যই নির্দিষ্ট অনুপাতে মেশাতে হবে মুরগির খাদ্য হাতে তৈরির পদ্ধতি-তে)।
- ভ্যাকসিনের দিন কোনো কড়া ঔষধ বা এন্টিবায়োটিক দেবেন না (ভ্যাকসিনের আগে ও পরে শুধুমাত্র সাধারণ জল বা ভিটামিন সি দিলে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা ভালো থাকে)।
- মুরগির খাদ্য হাতে তৈরির পদ্ধতি-তে লেয়ার মুরগির খাবারে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম নিশ্চিত করুন (ডিম পাড়ার সময়ে ১৬% প্রোটিনের পাশাপাশি ৩-৪% ক্যালসিয়াম বা ঝিনুক চূর্ণ না থাকলে ডিমের খোসা পাতলা হয়ে যাবে)।
- ব্রয়লারের লিটার বা বিছানা সবসময় শুকনো রাখুন (ভেজা লিটার থেকে আমাশয় বা কক্সিডিওসিস রোগ হতে পারে; যা মুরগির ওজন কমিয়ে দেয়)।
আড়ও দেখুন ২৮ টি জটিল হাঁসের রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা পদ্ধতি: খামারির অভিজ্ঞতা ও প্রতিকার
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, মুরগি পালনকে লাভজনক করতে হলে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মুরগির খাদ্য তালিকা ও ঔষধ ব্যবস্থাপনা করতে হবে। আপনি চাইলে আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী ২৫ বা ৫০ কেজির মিশ্রণ তৈরি করতে পারেন, তবে মুরগির খাদ্য হাতে তৈরির পদ্ধতি অনুসরণ করলে তা যেন অবশ্যই টাটকা থাকে। সঠিক যত্ন এবং সুষম খাদ্যই আপনার খামারের সাফল্যের চাবিকাঠি।
সতর্কতা: মুরগির খাদ্য তালিকা ও ঔষধ তৈরির তালিকা টি খামারীর অভিজ্ঞতা ও প্রাণী বিশেষজ্ঞদের থেকে নেওয়া হয়েছে। মুরগির বৃদ্ধি শুধু খাদ্যের উপরে নয় বাসস্থান পরিবেশের উপরেও নির্ভর করে কাজেই পৌলট্রি লিটার ও পানীয়জলের উপরেও গুরুত্ব দিবেন। এবং ঔষধ প্রয়োগের পূর্বে নিকটস্থ প্রাণী সম্পদ বিকাশ অধিদপ্তরে বা প্রাণী বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে করবেন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. হাতে তৈরি মুরগির খাবার কতদিন সংরক্ষণ করা যায়?
মুরগির খাদ্য হাতে তৈরির পদ্ধতি-তে বাড়িতে তৈরি খাবার সাধারণত ৭ দিনের মধ্যে ব্যবহার করে ফেলা ভালো। বেশিদিন রাখলে এতে ছত্রাক বা ফাঙ্গাস হওয়ার ভয় থাকে।
২. ব্রয়লার মুরগির আদর্শ এফ.সি.আর (FCR) কত?
ব্রয়লারের ক্ষেত্রে এফ.সি.আর ১.৮ এর নিচে থাকা ভালো। অর্থাৎ ১ কেজি ৮০০ গ্রাম খাবার খেয়ে মুরগির ওজন ১ কেজি হওয়া উচিত।
৩. মুরগির বাচ্চার নাভি না শুকালো কি ঔষধ দেব?
বাচ্চার নাভি শুকানোর জন্য প্রথম ২-৩ দিন উপযুক্ত এন্টিবায়োটিক এবং বি-কমপ্লেক্স ভিটামিন ব্যবহার করা যেতে পারে।
৪. ডিম পাড়া মুরগিকে কি প্রতিদিন ক্যালসিয়াম দিতে হবে?
হ্যাঁ, লেয়ার মুরগির খাবারের সাথে ঝিনুক চূর্ণ বা ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট মিশিয়ে দেওয়া জরুরি যাতে ডিমের মান ভালো থাকে।
তথ্য সুত্র
- সফল মুরগি খামারীর অভিজ্ঞতা।
- রাজ্য আজীবিকা মিশন।
- প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (DLS)
পশুপালন ও উন্নত কৃষি বিষয়ক আরও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট এবং চার্ট পেতে নিয়মিত ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট: www.krishisutra.com







![বস্তায় আদা চাষ পদ্ধতি: ১টি বস্তায় ৩ কেজি আদা পাওয়ার ৭টি গোপন কৌশল [২০২৬ আপডেট] বস্তায় আদা চাষ পদ্ধতি ও মাটি তৈরির সঠিক নিয়ম - ১টি বস্তায় ৩ কেজি ফলন](https://krishisutra.com/wp-content/uploads/2026/02/bostay-ada-chash-podhati-krishi-sutra-300x169.webp)


